বিষয়বস্তুতে চলুন

বাংলা ব্যাকরণ/ভাষা ও ব্যাকরণ/বাংলা ভাষা

উইকিবই থেকে

বাংলা একটি ধ্রুপদি ইন্দো-আর্য ভাষা, যা দক্ষিণ এশিয়ার বাঙালি জাতির ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। পৃথিবীর হাজারো ভাষার ভিড়েও এটি স্বকীয়-অনন্য-গৌরবোজ্জ্বল স্থানের অধিকারী। এটি কেবল বাঙালির যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং রক্তস্নাত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এক পরম সম্পদ। ২০২৫ সালের হিসেব অনুসারে বাংলা ভাষা প্রায় ২৪.২ কোটি মানুষের মাতৃভাষা (প্রথম ভাষা) এবং আরও প্রায় ৪.৩ কোটি মানুষের দ্বিতীয় ভাষা। এটি মাতৃভাষীর সংখ্যায় বিশ্বে ষষ্ঠ এবং মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যায় বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ভাষা।

বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা তথা সরকারি ভাষা বাংলা এবং ভারতের একটি তফসিলি (বা সংবিধান স্বীকৃত) ভাষা। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং আসামের বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষা। বঙ্গোপসাগরের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের প্রধান কথ্য ভাষা বাংলা। এছাড়া, ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, মেঘালয়, মিজোরাম, ওড়িশার মতো রাজ্যগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বাংলাভাষী জনগণ রয়েছেন। ভারত সরকার ২০২৪ সালের ৩রা অক্টোবরে বাংলাকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দেয়।

১.১ বাংলা ভাষার বিবর্তন

[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের একটি ভাষা। নিচে ভাষা পরিবার বিভাজনের মাধ্যমে বাংলা ভাষার অবস্থান দেখানো হয়েছে। এটি বাংলা ভাষার সাথে অন্যান্য নিকটাত্মীয় ভাষার সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করতে পারে!

ইন্দো-ইউরোপীয়
কেন্তমশতম
আর্মেনীয়আলবানীয়ইন্দো-ইরানীয়বাল্টো-স্লাভীয়
ইন্দো-আর্যইরানীয়নুরিস্তানিপশ্চিমাঞ্চলীয়
কেন্দ্রীয় (হিন্দি ভাষাসমূহ)পূর্বাঞ্চলীয় (মাগধী)হিন্দুকুশ (দারদীয়)উত্তরাঞ্চলীয় (পাহাড়ি)উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয়
পূর্বী মাগধীপশ্চিমী মাগধী (বিহারি ভাষাসমূহ)
বাংলা-অসমীয়া (গৌড়-কামরূপ)হালবীয়ওড়িয়া
গৌড়-বঙ্গকামরূপী প্রাকৃত (অসমীয়া ও অন্যান্য)
বাংলাবিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীচাঙমাসিলোটিচাটগাঁইয়া

বাংলা ভাষার পূর্বসূরি

[সম্পাদনা]

আনুমানিক এক হাজার বছর পূর্বে পূর্ব-ভারতীয় আর্য ভাষা বা পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্য ভাষার প্রাকৃত রূপ, তথা 'মাগধী প্রাকৃত' থেকে বাংলা ভাষার জন্ম। বাংলা ভাষার নিকটতম আত্মীয় অসমীয়াওড়িয়া ভাষা। বাংলা ভাষার পূর্বসূরী ভাষাগুলোর হলো:

  • মাগধী প্রাকৃত (Māgadhī Prākrīt): মাগধী প্রাকৃত (পালি-প্রাকৃত) হলো পালি ভাষার বিলোপের পর প্রাচীন ভারতের সাহিত্যের ভাষা হয়ে ওঠা তিনটি নাট্য প্রাকৃত ভাষার একটি। এটি একটি মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষা, যেটি বৈদিক সংস্কৃত ভাষাকে প্রতিস্থাপিত করেছিল।
    • মাগধী অপভ্রংশ (Māgadhī Apabhraṃśa): মাগধী অপভ্রংশ বলতে মাগধী প্রাকৃত বা পালি প্রাকৃতের পরবর্তী ঐতিহাসিক ধাপকে বোঝানো হয়।
      • অবহট্‌ঠ (Avahaṭṭha): অবহট্‌ঠ হলো মধ্য ইন্দো-আর্যভাষা তথা প্রাকৃত পরবর্তী ঐতিহাসিক ধাপ অপভ্রংশ ভাষার পরবর্তী স্তর বা শেষ পরিণতি। এই ভাষা থেকেই নব্য ভারতীয় আর্যভাষাসমূহের উৎপত্তি। বাংলা ভাষা পূর্ব ভারতীয় মাগধী ভাষা অবহট্‌ঠের পরিণত রূপ। ষষ্ঠ থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত অবহট্‌ঠ ভাষার প্রচলন ছিলো। মাগধী অবহট্‌ঠ থেকে প্রাচীন বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে।

প্রাপ্ত নিদর্শনের ভিত্তিতে বাংলা ভাষার কালক্রম ও নিদর্শন

[সম্পাদনা]
প্রাচীন বাংলা
(Old Bengali)
মধ্য বাংলা (Medieval Bengali) আধুনিক বাংলা
(Modern Bengali)
আদি-মধ্যযুগের বাংলা অন্ত্য-মধ্যযুগের বাংলা
দশম শতাব্দী থেকে ১৩৫০ সাধারণ অব্দ ১৩৫০ অব্দ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে বর্তমান
নিদর্শন—
  • চর্যাপদ বা বৌদ্ধগান ও দোহা - লুইপা, কাহ্নপা ও অন্যান্য।
নিদর্শন —
  • শ্রীকৃষ্ণকীর্তন - বড়ু চণ্ডীদাস, চতুর্দশ শতাব্দী;
  • শ্রীকৃষ্ণবিজয় - মালাধর বসু, পঞ্চদশ শতাব্দী;
  • রামায়ণ - কৃত্তিবাস, পঞ্চদশ শতাব্দী;
  • মনসাবিজয় - বিপ্রদাস পিপিলাই, পঞ্চদশ শতাব্দী;
  • চণ্ডীমঙ্গল - মানিক দত্ত, পঞ্চদশ শতাব্দী;
  • ইউসুফ জোলেখা - শাহ মুহম্মদ সগীর, আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দী;
  • পদ্মাপুরাণ (মনসামঙ্গল) - বিজয়গুপ্ত, পঞ্চদশ শতাব্দী।
নিদর্শন —
  • চণ্ডীমঙ্গল - মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, ষোড়শ শতাব্দী;
  • লাইলী মজনু - দৌলত উজির বাহরাম খান, ষোড়শ শতাব্দী;
  • পদ্মাবতী - আলাওল, সপ্তদশ শতাব্দী;
  • সতীময়না ও লোরচন্দ্রাণী- দৌলত কাজী, সপ্তদশ শতাব্দী;
  • মহাভারত - কাশীরাম দাস, সপ্তদশ শতাব্দী;
  • অন্নদামঙ্গল - ভারতচন্দ্র, অষ্টাদশ শতাব্দী।
নিদর্শন —
  • গীতাঞ্জলি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ;
  • অগ্নিবীণা - কাজী নজরুল ইসলাম, ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ;
  • এবং অন্যান্য।

১.২ বাংলা শব্দভাণ্ডার

[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষায় মোট শব্দের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। উৎস বিবেচনায় বাংলা ভাষার এ শব্দভাণ্ডারকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়, যথা: তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দ। আবার, তৎসম ও তদ্ভবকে নিজস্ব এবং দেশি ও বিদেশি শব্দকে আগন্তুক উৎসের শব্দ বলা হয়। বাংলা শব্দের সঙ্গে অসমীয়া শব্দের সাদৃশ্য রয়েছে এবং প্রকৃতপক্ষে অসমীয়াই বাংলার সবচেয়ে নিকটবর্তী স্বীকৃত ভাষা। আবার নেপালি ভাষার সঙ্গে বাংলা শব্দভাণ্ডারের অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

তৎসম শব্দ

[সম্পাদনা]
তৎসম [সংস্কৃত] = তদ্ + সম
অর্থ: তার সমান, তদ্রূপ, তৎসদৃশ; সংস্কৃত থেকে গৃহীত ও বাংলায় অবিকৃতরূপে প্রচলিত; সংস্কৃতের অনুরূপ বাংলা শব্দ।

প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা (বা প্রাচীন ইন্দো-আর্য ভাষা) থেকে বিবর্তিত যেসকল বাংলা শব্দের লিখিত চেহারা সংস্কৃত শব্দের অনুরূপ সেসকল শব্দকে তৎসম শব্দ বলা হয়। বাংলা ভাষায় তৎসম শব্দের প্রচুর ব্যবহার আছে। রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন, বিদ্যাসাগর এবং বঙ্কিমের মতো শক্তিমান লেখকরা বাংলা ভাষার সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে তৎসম শব্দের পরিচয় করিয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে, বাংলার প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের সাধারণ লেখায় ব্যবহৃত শব্দের ২৫ শতাংশই ছিল তৎসম।

বাংলা অভিধানের প্রায় ৪০ শতাংশ শব্দই তৎসম এবং বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রায় চল্লিশ হাজার (৪০ শতাংশ) শব্দই তৎসম। এগুলো সরাসরি সংস্কৃত ভাষা থেকে গৃহীত এবং বানান একই হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে উচ্চারণ সংস্কৃত থেকে খানিকটা ভিন্ন। আবার, সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে নির্মিত পারিভাষিক শব্দও তৎসম শব্দ হিসেবে গণ্য।

উদাহরণ —
সাধারণ: অগ্নি, পৃথিবী, চন্দ্র, গ্রহ, আকাশ, গুরু, বৃক্ষ, মিত্র, মাতা, বন্ধু, বৎস, সন্তান, স্নেহ, পর্বত, নূতন, সঞ্চয়, পথ, বণিক, প্রশ্ন, ভৃত্য, জল, রাত্রি, নদী, গ্রাম, বর্ষা, নৌকা, বন, পত্র, দিক, ভূমি, সভা, ঋণ, স্ত্রী, ব্যক্তি, ছাত্র, শিক্ষা, সাগর, মানব, বজ্র, মধু, বৎসর, ভক্তি, প্রান্ত, স্থল প্রভৃতি।
পারিভাষিক: অধ্যাদেশ, মহাপরিচালক, সচিবালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী প্রভৃতি।

তদ্ভব শব্দ

[সম্পাদনা]
তদ্ভব [সংস্কৃত] = তদ্ + √ভূ + অ
অর্থ: তা থেকে উৎপন্ন, সংস্কৃত থেকে জাত (উদ্ভূত); সংস্কৃত থেকে উদ্ভুত ও ক্রমশ পরিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষায় গৃহীত ও প্রচলিত; প্রাকৃত শব্দ– প্রাচীন ইন্দো-আর্য ভাষা থেকে ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে রূপান্তরিত শব্দ।
(যেমন: চন্দ্র→চন্দ→চাঁদ, কৃষ্ণ→কহ্ন→কণহ→কানাই।)

তদ্ভব বলতে সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত শব্দকে বোঝানো হলেও, মূলত প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা থেকে বিবর্তিত যেসব শব্দ বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণভাবে স্বতন্ত্র, সেগুলোকেই তদ্ভব শব্দ বলা হয়। তদ্ভব শব্দগুলি বাংলা ভাষার মূল উপাদান, তাই এর আরেক নাম খাঁটি বাংলা শব্দ। বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত শব্দের অধিকাংশই তদ্ভব। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও খ্যাতনামা লেখকদের রচনার ৬০ শতাংশ শব্দই তদ্ভব। বাংলা শব্দভাণ্ডারে প্রায় ষোলো হাজার (১৬ শতাংশ) তদ্ভব শব্দ রয়েছে।

প্রাকৃতভাষা থেকে জাত (উৎপন্ন) বলে তদ্ভব শব্দকে প্রাকৃতজ শব্দও বলা হয়। এই শব্দগুলির মাঝে ভাষার পরিবর্তনের ইতিহাস লুকিয়ে আছে বলে ভাষাতত্ত্বের দিক থেকে এই শব্দগুলির গুরুত্ব অনেক বেশি। এসকল সাধারণ তদ্ভব ছাড়াও আরেকধরনের তদ্ভব শব্দ আছে, যাদের বলা যায় রূপান্তরিত তদ্ভব শব্দ। এগুলো অন্য ভাষা থেকে সংস্কৃত ভাষায় আগত শব্দ ধ্বনি পরিবর্তনের নিয়মে অন্যান্য তদ্ভবের মতোই রূপান্তরিত হয়ে বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছে।

উদাহরণ —
সাধারণ: হাতি, গরু, ঘোড়া, সাপ, পাখি, কুমির, গা, হাত, পা, কান, নাক, জিভ, দাঁত, পানি, মাছ, চাঁদ, ভাত, কাঠ, কাজ, বাঁক, মেয়ে, ঘা, দুধ, সোনা, খাজা, ভুল, উট, তেতো, পাহাড়, ঘড়ি, ঘাড়, নেবু, ধাম, আজ, সাঁতার, দিয়াশলাই, হালকা, দুপুর, বোন, পিসি, কানাই, পাতা, উঁচু, চাকা, বেয়াই, ব্যাটা প্রভৃতি।
রূপান্তরিত: দাম, সুড়ঙ্গ, ঠাকুর, তুরুক, পুথি প্রভৃতি।

দেশি শব্দ

[সম্পাদনা]

পূর্বভারত কিংবা বঙ্গদেশে আর্যদের আগমন ঘটেছে গুপ্তযুগে। তাঁরা আসার আগেও এদেশে অন্য মানুষজন ছিলেন, তাদের আলাদা ভাষাও ছিল। ইন্দো-আর্য ভাষার (ভারতীয় আর্য ভাষা) আগমনের পূর্বে এই অঞ্চলে বাসিন্দা তথা আদিবাসীদের ভাষা থেকে আগত শব্দগুলোকে বলা হয় দেশি শব্দ। এসব অনার্য ভাষার বেশিরভাগই এখন স্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গেছে। তবু তার মধ্যে কিছু শব্দ বাংলার মতো নব্য-ভারতীয় আর্য ভাষায় রয়ে গেছে।

বাংলা ভাষায় প্রায় ষোলো হাজার (১৬ শতাংশ) দেশি শব্দ রয়েছে। অনেক সময় এসব শব্দের মূল নির্ধারণ করা যায় না। শিকড়ের দিক থেকে কোনো শব্দ অস্ট্রিক (মুন্ডারি, কোল, ভিল), কিছু দ্রাবিড় (তামিল, তেলুগু, কন্নড), কিছুবা মঙ্গোলয়েড (তিব্বতি-বর্মী)। এই শব্দগুলিই বাংলা শব্দভান্ডারের সবচেয়ে প্রাচীন শব্দ। তাই খাঁটি দেশি শব্দ একমাত্র এগুলিকেই বলা চলে।

উদাহরণ —
অস্ট্রিক: কুড়ি, কুলা, কানা (অন্ধ), কালা (বধির), ঢেঁকি, গাদা, পাল, লাঙল, জোয়াল, খড়, চাটাই, ছাঁচ, ছোট, ঝাড়, ধামা, চাল, শিকড়, লেবু, ডাব, ঢং, তেঁতুল, কলা (<কদলি), খোঁচা, খোঁজ, খোঁপা, মাঠ, নেড়া (কচি), টোপর, ঠ্যাং, ডাগর, ঢোল, ঢাক, ঘুড়ি, ঝিনুক, কাঁটা প্রভৃতি।
দ্রাবিড়: পেট, চুলা, গাড়ু, ঝোল, মুড়ি, চিংড়ি, কাতলা, বাদুড়, গঞ্জ, দর, খুকি, খোকন, পিলে (ছেলেপিলে), মোট, কালা (কালো রং), মুণ্ডু, হাঁড়ি, কুঁড়ে (ঘর), টক, আড়ত, নারিকেল, ওল, গাড়ি, প্যান্ডেল প্রভৃতি।
তিব্বতি-বর্মী: দোয়েল, ফিঙে, চট, ঘ্যাঁট (তরকারি), ঝিলিক, শোল (মাছ), কচি, ল্যাংড়া, ঝোপ প্রভৃতি।

বিদেশি শব্দ

[সম্পাদনা]

রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক তথা নানান ঐতিহাসিক কারণে বাংলা অঞ্চলের সঙ্গে বিভিন্ন দেশ ও জাতির আন্তঃসম্পর্ক তৈরি হয় এবং সেসব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ভাষা থেকে বহু শব্দ বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে, এই শব্দগুলিকে বিদেশি শব্দ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের প্রভাব অনেক বেশি, যার সংখ্যা প্রায় আটাশ হাজার (২৮ শতাংশ)। এই সংখ্যা বাংলার সুদীর্ঘ ইতিহাসে নানা জাতি-গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের গভীরতা স্পষ্ট করে। বিদেশি শব্দের মধ্যে ফারসি, আরবি, ইংরেজি, পোর্তুগিজ, ফরাসি, ওলন্দাজ, তুর্কি ইত্যাদি ভাষার শব্দের আধিক্য রয়েছে।

উদাহরণ —
ফারসি: আওয়াজ, আঙ্গুর, আদমি, আবহাওয়া, আমদানি, আয়না, আরাম, আস্তে, কম, কাগজ, কারখানা, খারাপ, খোদা, খুব, খুন, গরম, গুনাহ, চশম, চশমা, চাকর, চাদর, চাকরি, জবানবন্দি, জান, জানোয়ার, জায়গা, জিন্দা, ডেগচি, তারিখ, তোশক, দফতর, দম, দরবার, দস্তখত, দের, দোজখ, দোকান, দৌলত, নমুনা, নামাজ, নালিশ, পছন্দ, পর্দা, পয়গম্বর, ফেরেশতা, বদ, বাগান, বকশিশ, বদমাশ, বাদশাহ, বান্দা, বেগম, বেহেশত, মুসলমান, মেথর, রসদ, রফতানি, রাস্তা, রোজ, রোজা, হাঙ্গামা, হিন্দু প্রভৃতি।
আরবি: আল্লাহ্, আদালত, আলেম, আসল, ইনসান, ইসলাম, ঈমান, ঈদ, উকিল, ওজন, ওজর, ওজু, এজলাস, এলাকা, এলেম, কলম, কানুন, কিতাব, কিসমত, কিয়ামত, কুরআন, কেচ্ছা, কোরবানি, খবর, খারিজ, খালি, খালাস, খেয়াল, গরিব, গায়েব, গোসল, জমা, জাকাত, জান্নাত, জাহান্নাম, তওবা, তসবি, তারিখ, দুনিয়া, দোয়াত, নগদ, নকল, ফকির, বদল, বাকি, মহকুমা, মুন্সেফ, মোক্তার, রায়, শয়তান, সাহেব, সনদ, সন, হজ, হাদিস, হারাম, হালাল, হিসাব, হেকিম প্রভৃতি।
ইংরেজি: অফিস, আফিম, ইউনিভার্সিটি, ইউনিয়ন, জেল, ডাক্তার, পুলিশ, ব্যাংক, ভোট, নোট, ইস্কুল, স্কুল, হাসপাতাল, কাপ, গ্লাস, চেয়ার, টেবিল, বাক্স, বোতল, ব্যাগ, লণ্ঠন, লাইব্রেরি, পাউডার, পেনসিল, প্লাস্টিক, ফুটবল, মাস্টার, কলেজ, আস্তাবল, সাইকেল, টাউট, টিন, ইঞ্জিন, ক্যাঙারু, বুমেরাং প্রভৃতি।
পোর্তুগিজ: আলমারি, আয়া, ইস্ত্রি, ইস্পাত, কামিজ, গামলা, চাবি, জানালা, তামাক, পেরেক, ফিতা, বারান্দা, বালতি, বেহালা, বোতাম, মেজ, সাবান, কেদারা, আতা, আনারস, কাজু, কপি, পাঁউ, পেঁপে, নিলাম, পেয়ারা, সালাদ, ক্রুশ, গির্জা, যিশু, পাদ্রি, ইংরেজ প্রভৃতি।
ফরাসি বা ফ্রেন্স: ওলন্দাজ, কার্তুজ, রেস্তোরাঁ, শেমিজ, পাতি, ডিপো, কুপন প্রভৃতি।
তুর্কি: আপা, কোরমা, খান, খাতুন, বেগম, চকমক, ক্যাচি (কাঁচি) প্রভৃতি।
ওলন্দাজ বা ডাচ: ইস্কাবন, ইশকাপন, রুইতন, হরতন, চিড়িতন, টেক্কা, তুরুপ, ইস্ক্রুপ প্রভৃতি।
ইতালীয়: ফ্যাসিস্ট, স্টুডিও, ম্যালেরিয়া, মাফিয়া প্রভৃতি।
হিন্দি: পানি, ধোলাই, লাগাতার, ঘুগনি, সমঝোতা প্রভৃতি।
জাপানি: মাঙ্গা, অ্যানিমে, সুনামি, সুডোকু, রামেন, রিকশা, হারাকিরি প্রভৃতি।
চীনা: চা, চিনি, সাম্পান।
বর্মী: লুঙ্গি, ফুঙ্গি প্রভৃতি।
জার্মান: নাৎসি, কিন্ডারগার্টেন প্রভৃতি।