বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রাণীর অঙ্গসংস্থান ও শরীরবিদ্যা/হৃদযন্ত্র/রক্ত সংবহন

উইকিবই থেকে

উদ্দেশ্যসমূহ | রক্ত সংবহন

[সম্পাদনা]

এই অংশ পাঠ শেষে আপনি জানতে পারবেন:

  • সংবহন তন্ত্র দুটি অংশে ফুসফুসীয় ও তন্ত্রীয় সংবহন নামে দুটি অংশে বিভক্ত, রক্ত হৃৎপিণ্ডের মধ্য দিয়ে দুইবার গমন করে;
  • ধমনি, কৈশিক ও শিরার গঠন ও কার্যকারিতার মধ্যে পার্থক্য কী কী;
  • নাড়িঘাত কীভাবে সৃষ্টি হয় এবং কোথায় তা অনুভব করা যায়;
  • টিসু তরল (tissue fluid) ও লসিকা (lymph) কী এবং সেগুলো কীভাবে তৈরি হয়;
  • প্রধান ধমনি ও শিরাগুলোর নাম কী কী।

রক্ত সংবহন

[সম্পাদনা]

রক্ত সংবহন তন্ত্র একটি ধারাবাহিক নালিকাব্যবস্থা, যার মাধ্যমে রক্ত সারা দেহে প্রবাহিত হয়। এই ব্যবস্থা দেহকোষসমূহকে প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করে এবং বিপাকজাত বর্জ্য পদার্থ অপসারণে সাহায্য করে। স্তন্যপায়ী প্রাণী ও পাখির দেহে রক্ত দুটি পৃথক পথে সংবাহিত হয়—প্রথম পথটি হৃৎপিণ্ড থেকে ফুসফুসে এবং সেখান থেকে পুনরায় হৃৎপিণ্ডে ফিরে আসে, যা ফুসফুসীয় সংবহন নামে পরিচিত। দ্বিতীয় পথটি হৃৎপিণ্ড থেকে মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্যান্য অংশে রক্ত সরবরাহ করে এবং পরে আবার হৃৎপিণ্ডে ফিরে আসে; এ ব্যবস্থাকে বলা হয় তন্ত্রীয় সংবহন (চিত্র ৮.১২ দেখুন)।

চিত্র ৮.১২ – স্তন্যপায়ীদের সংবহন তন্ত্র

যে নালিকাগুলোর মাধ্যমে রক্ত প্রবাহিত হয়, সেগুলো হলো ধমনি, কৈশিক জালিকা বা কৈশিকা এবং শিরা। হৃৎপিণ্ড ধমনিতে রক্ত পাম্প করে, যা রক্তকে হৃৎপিণ্ড থেকে দেহের বিভিন্ন অংশে বহন করে নিয়ে যায়। ধমনিগুলো পরে অনেক সূক্ষ্ম ও সরু নালিতে বিভক্ত হয়, যেগুলোকে কৈশিক জালিকা বলা হয়। এই কৈশিক জালিকা দেহকোষগুলোর মাঝখানে একটি জালিকার মতো নেটওয়ার্ক তৈরি করে। পরে এসব কৈশিক নালি একত্রিত হয়ে শিরা গঠন করে, যা রক্তকে আবার হৃদপিণ্ডে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

ধমনিসমূহ

[সম্পাদনা]

ধমনি হলো সেই রক্তনালি যেটি রক্তকে হৃৎপিণ্ড থেকে দেহের অন্যান্য অংশে বহন করে নিয়ে যায়। ধমনির প্রাচীর পুরু ও স্থিতিস্থাপক, যা প্রসারিত হতে পারে এবং হৃৎস্পন্দনের ফলে সৃষ্ট উচ্চচাপযুক্ত রক্তপ্রবাহকে সহ্য করতে সক্ষম (এই স্পন্দনকেই বলা হয় নাড়িঘাত, বিস্তারিত পরে উল্লেখ করা হয়েছে)। ধমনিগুলো শাখাবিন্যস্ত হয়ে ছোট রক্তনালিতে বিভক্ত হয়, যেগুলোকে ধমনিকা (arteriole) বলা হয়। ধমনির মাঝখানের ফাঁপা অংশকে লুমেন বা নালিকাগহ্বর (lumen) বলা হয়। একটি ধমনির প্রাচীরে তিনটি স্তর থাকে। ভেতরের স্তরটি স্কোয়ামাস বা আঁইশাকার আবরণী কোষ (squamous epithelial cells) দ্বারা আবৃত থাকে। মাঝের স্তরটি সবচেয়ে পুরু এবং এতে থাকে স্থিতিস্থাপক তন্তু ও মসৃণ পেশি, যা ধমনিকে প্রসারণযোগ্য করে তোলে। বাইরের স্তরটি আঁশযুক্ত এবং ধমনিকে বাহ্যিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করে (চিত্র ৮.১৩ দেখুন)। নাড়িঘাত কেবল ধমনিতেই অনুভব করা যায়, শিরা বা কৈশিকাতে নয়।

চিত্র ৮.১৩ – ধমনির প্রস্থচ্ছেদ

নাড়িঘাত

[সম্পাদনা]

নাড়িঘাত হলো উচ্চচাপযুক্ত রক্তের একটি তরঙ্গ, যা তখন সৃষ্টি হয় যখন হৃৎপিণ্ডের বাম নিলয় (left ventricle) সংকুচিত হয় এবং রক্তকে অ্যাওর্টা বা মহাধমনি ও অন্যান্য ধমনির মধ্য দিয়ে জোরে ঠেলে দেয়। এই রক্ততরঙ্গ যখন ধমনির ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়, তখন ধমনির স্থিতিস্থাপক প্রাচীর প্রসারিত হয়। তরঙ্গটি চলে যাওয়ার পর প্রাচীর আবার সংকুচিত হয় এবং এই সংকোচন রক্তকে সামনের দিকে ঠেলতে সাহায্য করে। নাড়িঘাত শরীরের এমন কিছু নির্দিষ্ট স্থানে স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়, যেখানে ধমনি ত্বকের খুব কাছে অবস্থান করে। উদাহরণস্বরূপ—ঘাড়, কব্জি, কাঁধ ও গোঁড়ালির পাশে। হৃৎপিণ্ডের কাছাকাছি স্থানে নাড়ি সবচেয়ে শক্তিশালী হয় এবং যত দূরে অগ্রসর হয়, তা ততই দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে, কৈশিকাতে পৌঁছানোর পর নাড়ির অনুভূতি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়।

কৈশিকা

[সম্পাদনা]

ধমনিকা বারবার শাখাবিন্যস্ত হয়ে এমন একটি জালিকা গঠন করে, যা দেহের প্রতিটি কোষের ফাঁকে ফাঁকে প্রবেশ করে। এই ক্ষুদ্র রক্তনালিগুলোকে বলা হয় কৈশিকা। এগুলোর প্রাচীর মাত্র একক কোষ স্তর দিয়ে গঠিত, ফলে পদার্থের আদান-প্রদান সহজ হয়। কিছু কৈশিকা এতটাই সরু যে, লোহিত রক্তকণিকাকে ভেতর দিয়ে পার হতে গেলে নিজেকে ভাঁজ করতে হয়। কৈশিকা একত্রিত হয়ে কৈশিক জালিকা (capillary bed) তৈরি করে, যা বিভিন্ন টিসুর মধ্যে বিস্তৃত থাকে। এই কৈশিক জালিকা এতটাই ঘন ও বিস্তৃত যে, দেহের কোনো জীবিত কোষই অক্সিজেন ও পুষ্টির উৎস থেকে খুব বেশি দূরে থাকে না (চিত্র ৮.১৪ দেখুন)।

দ্রষ্টব্য: সাধারণত সব ধমনি অক্সিজেনযুক্ত রক্ত বহন করে, তবে একটি ব্যতিক্রম হলো পালমোনারি বা ফুসফুস ধমনি, যা অক্সিজেনবিহীন রক্তকে ফুসফুসে নিয়ে যায়।

চিত্র ৮.১৪ – একটি কৈশিক জালিকা

টিসু তরল ও লসিকা গঠন

[সম্পাদনা]

কৈশিকার পাতলা প্রাচীরের মাধ্যমে পানি, কিছু শ্বেত রক্তকণিকা এবং বিভিন্ন দ্রবীভূত পদার্থ সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। এসব উপাদান একত্রিত হয়ে একটি স্বচ্ছ তরল গঠন করে, যাকে বলা হয় টিসু তরল (বা বহিঃকোষীয় তরল অথবা ইন্টারস্টিশিয়াল তরল)। এই তরল টিসুর কোষগুলিকে চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে। টিসু তরল রক্ত থেকে অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদানকে কোষের দিকে যেতে এবং কোষ থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে (চিত্র ৮.১৫ দেখুন)।

চিত্র ৮.১৫ – রক্ত টিসু তরল ও লসিকা গঠন

কিছু টিসু তরল আবার কৈশিকাতে ফিরে আসে, এবং কিছু তরল একপ্রান্ত বন্ধ এমন লসিকাবাহতে প্রবাহিত হয়, যা টিসুর মধ্যে একটি জালিকা গঠন করে। একবার টিসু তরল লসিকাবাহতে প্রবেশ করলে, তাকে লিম্ফ বা লসিকা বলা হয়, যদিও এর উপাদান সমান থাকে। লসিকাবাহের প্রাচীর কৈশিকা থেকেও পাতলা। এর মানে হলো যে, কিছু বড় আকারের অণু এবং কণিকা যেমন—ক্যানসার কোষ এবং ব্যাকটেরিয়া, যা রক্তপ্রবাহে প্রবাহিত হতে পারত না, তারা লসিকাতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে। এসব কণিকা লিম্ফনোডসমূহে পরিস্রুত হয়ে বাদ পড়ে। (লসিকাতন্ত্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য চ্যাপটার ১০ দেখুন)

শিরাসমূহ

[সম্পাদনা]

কৈশিকাসমূহ (capillaries) একত্রিত হয়ে বৃহত্তর রক্তনালিতে পরিণত হয়, যাকে বলা হয় ভেনিউল (venules) বা উপশিরা। এই উপশিরাসমূহ মিলিত হয়ে শিরা (veins) গঠন করে। শিরাগুলো হৃৎপিণ্ডের দিকে রক্ত ফিরিয়ে নিয়ে যায়। যেহেতু শিরার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত রক্ত ইতোমধ্যে সূক্ষ্ম কৈশিকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, তাই এটি ধীরে প্রবাহিত হয়, এতে কোনো স্পন্দন থাকে না এবং চাপও কম থাকে। এই কারণে শিরার প্রাচীর ধমনির তুলনায় পাতলা হয়, যদিও ধমনির মতো শিরার মধ্যেও তিনটি স্তর (স্তরচিত্র ৮.১৬ দেখুন) থাকে। শিরার মধ্যে কোনো নিজস্ব স্পন্দন না থাকায়, এর মধ্য দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয় পাশ্ববর্তী কঙ্কাল পেশির সংকোচনের সাহায্যে, যা শিরাকে চেপে রক্তকে সামনের দিকে ঠেলে দেয়। শিরার মধ্যে কপাটিকা (valves) থাকে, যা রক্তকে পিছনের দিকে ফিরে যাওয়া থেকে বাধা দেয় (চিত্র ৮.১৭ক এবং খ দেখুন)।

চিত্র ৮.১৬ – একটি শিরার প্রস্থচ্ছেদ

চিত্র ৮.১৬ ক) ও খ) শিরার কপাটিকা

বিঃদ্রঃ অধিকাংশ শিরা অক্সিজেনবর্জিত রক্ত বহন করে। তবে একটি ব্যতিক্রম হলো ফুসফুস শিরা (pulmonary vein), যা ফুসফুস থেকে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত হৃদয়ের বাম অলিন্দে নিয়ে আসে।

রক্তপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ

[সম্পাদনা]

ধমনি, ধমনিকা (arterioles) ও কৈশিকার (capillaries) মাধ্যমে রক্তপ্রবাহ সবসময় একরকম থাকে না; এটি শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যখন কঙ্কাল পেশি, মস্তিষ্ক বা পরিপাকতন্ত্র সক্রিয় থাকে, তখন সেসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বেশি পরিমাণে রক্ত প্রবাহিত হয়। ত্বকের ধমনিকায় রক্তপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই রক্তনালিগুলোর প্রাচীরে থাকা মসৃণ পেশিতন্তুর (smooth muscle fibres) সংকোচন অথবা শিথিলতার মাধ্যমে রক্তনালির আকার পরিবর্তন করে রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়।

ইডিমা ও তরলহানি

[সম্পাদনা]

ইডিমা (Oedema) বা শোথ হলো টিসুতে তরল জমার ফলে সৃষ্ট ফোলাভাব। এটি তখন ঘটে যখন টিসুর তরল রক্তপ্রবাহে ফিরে যেতে না পেরে টিসুতে জমে থাকে। দীর্ঘ সময় অচল বা নিষ্ক্রিয় থাকা (যেমন—মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘ গাড়ি বা বিমানযাত্রা) কিংবা রক্তে প্রোটিনের ভারসাম্যহীনতার ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশু বা পোকামাকড়-আক্রান্ত কুকুরছানার পেট ফুলে যাওয়ার পেছনে এই কারণটি থাকে। শরীর থেকে তরল হ্রাস পাওয়ার কারণ শুধুমাত্র পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল পান না করাই নয়, বরং তা ডায়রিয়া, বমি বা রক্তক্ষরণ (haemorrhage)-এর ফলে হঠাৎ করে রক্তক্ষয় হলেও হতে পারে। এর ফলে রক্তের পরিমাণ কমে যায় এবং রক্তচাপ হ্রাস পায়। এটি বিপজ্জনক হতে পারে কারণ মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ নির্ভর করে একটি স্থিতিশীল রক্তচাপ বজায় থাকার ওপর।

তরল হ্রাসের ক্ষতি পূরণে শরীর বিভিন্ন প্রক্রিয়া সক্রিয় করে। প্রথমে, রক্তচাপ বজায় রাখতে রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়। এরপর, শরীরের রক্ত তুলনামূলকভাবে ঘন হয়ে পড়ায় এর অভিস্রবণিক চাপ (osmotic pressure) বেড়ে যায়, ফলে অভিস্রবণ (osmosis) প্রক্রিয়ায় টিসু থেকে রক্তে তরল প্রবেশ করতে শুরু করে।

প্লীহা

[সম্পাদনা]

প্লীহা পেটের বাম পাশে পাকস্থলীর কাছাকাছি অবস্থান করে এবং এতে প্রচুর রক্ত সরবরাহ থাকে। এটি রক্তকণিকার একটি সঞ্চয় বা আধার হিসেবে কাজ করে। হঠাৎ রক্তক্ষয়ের মতো পরিস্থিতিতে (যেমন হিমোরেজ) প্লীহা সংকুচিত হয়ে প্রচুর লাল রক্তকণিকা রক্তপ্রবাহে ছেড়ে দেয়। এটি পুরনো রক্তকণিকা ধ্বংস করে এবং নতুন লিম্ফোসাইট (lymphocyte) তৈরি করে। তবে এটি একটি অপরিহার্য অঙ্গ নয়, কারণ প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্লীহা অপসারণ করলেও সাধারণত কোনো জটিলতা দেখা যায় না।

তন্ত্রীয় সংক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ রক্তবাহসমূহ

[সম্পাদনা]

দেহে রক্ত সঞ্চালনের জন্য হৃৎপিণ্ড থেকে মাহধমনি বা অ্যাওর্টা (aorta) দিয়ে রক্ত পাম্প করা হয়। এটি মাথা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও অন্যান্য দেহঅঙ্গে রক্ত সরবরাহ করে। সূক্ষ্ম কৈশিকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রক্ত ভেনা কাভা (vena cava) নামক মহাশিরার মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডে ফিরে আসে (চিত্র ৮.৮, ৮.১২, ৮.১৮ ও ৮.১৯ দেখুন)। অনেক অঙ্গের সঙ্গে যুক্ত ধমনি ও শিরা পাশাপাশি চলে এবং তাদের নাম একই থাকে, যেমন—বৃক্কীয় ধমনি ও শিরা (বৃক্কের জন্য), ফিমোরাল ধমনি ও শিরা (পিছনের পায়ের জন্য), এবং সাবক্লাভিয়ান ধমনি ও শিরা (সামনের পায়ের জন্য)। তবে মাথায় রক্ত সরবরাহ করে ক্যারোটিড ধমনি, এবং সেই রক্ত জুগুলার শিরা দিয়ে ক্রেনিয়াল ভেনা কাভা-র মাধ্যমে ফিরে আসে। একটি বিশেষ ব্যতিক্রম দেখা যায় পরিপাকতন্ত্রের রক্তনালিতে। বিভিন্ন ধমনি অ্যাওর্টা থেকে অন্ত্রে রক্ত সরবরাহ করে, কিন্তু অন্ত্র থেকে রক্ত হেপাটিক পোর্টাল শিরা (hepatic portal vein)-এর মাধ্যমে যকৃতের দিকে যায়, যাতে পরিপাককৃত খাদ্য উপাদান প্রক্রিয়াকরণ করা যায় (চিত্র ৮.১২ দেখুন)। এই রক্তনালি অন্যান্যদের থেকে আলাদা কারণ এটি এক অঙ্গ থেকে আরেক অঙ্গে রক্ত বহন করে।

রক্তচাপ

[সম্পাদনা]

রক্তচাপ হলো প্রধান ধমনির প্রাচীরে রক্তের চাপ। যখন হৃৎপিণ্ডের বাম নিলয় সংকুচিত হয়ে রক্ত পাম্প করে, তখন ধমনিতে চাপ সর্বাধিক থাকে, একে বলে সিস্টোলিক চাপ (systolic pressure)। নাড়িঘাত বা হৃৎস্পন্দনের মধ্যবর্তী সময়ে চাপ অনেক কম থাকে, একে বলে ডায়াস্টোলিক চাপ (diastolic pressure)। রক্তচাপ মিলিমিটার পারদ (mm Hg)-এ পরিমাপ করা হয়। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রক্তচাপকে বলা হয় হাইপারটেনশন (hypertension) বা উচ্চ রক্তচাপ এবং স্বাভাবিকের চেয়ে কম রক্তচাপকে বলা হয় হাইপোটেনশন (hypotension) বা নিম্ন রক্তচাপ।

চিত্র ৮.১৯ – দেহের প্রধান ধমনিসমূহ

সারমর্ম

[সম্পাদনা]
  • রক্তসংবহনতন্ত্র দ্বৈত (double) প্রকৃতির, যেখানে রক্ত হৃদয়ের মধ্য দিয়ে দুইবার প্রবাহিত হয়।
  • ধমনি (Arteries) হৃৎপিণ্ড থেকে রক্ত বহন করে। এগুলোর প্রাচীর পুরু ও স্থিতিস্থাপক, যা প্রসারিত হতে পারে এবং উচ্চচাপযুক্ত রক্তচাপ (pulse) সহ্য করতে সক্ষম।
  • কৈশিকা (Capillaries) খুবই সূক্ষ্ম ও পাতলা প্রাচীরবিশিষ্ট রক্তনালি, যা টিসুর কোষগুলোর মাঝে জালিকা গঠন করে।
  • শিরা (Veins) নিম্নচাপযুক্ত রক্ত হৃদয়ের দিকে ফেরত আনে। এগুলোর প্রাচীর ধমনির তুলনায় পাতলা।
  • স্পন্দন (Pulse) হলো বাম নিলয় সংকোচনের ফলে ধমনির মাধ্যমে উচ্চচাপযুক্ত রক্ত প্রবাহের তীব্র ধাক্কা। এটি শরীরের এমন স্থানে অনুভব করা যায় যেখানে ধমনি ত্বকের কাছাকাছি অবস্থান করে।
  • টিসু তরল (Tissue fluid) হলো স্বচ্ছ তরল যা কৈশিকার মধ্য থেকে বের হয়ে টিসুর কোষগুলোর চারপাশ ঘিরে রাখে। যখন এই তরল লসিকা নালিতে প্রবেশ করে, তখন তাকে লসিকা (Lymph) বলা হয়।
  • গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালিগুলোর মধ্যে রয়েছে: ভেনা কাভা, অ্যাওর্টা, ফুসফুস ধমনি, ক্যারোটিড ধমনি, জুগুলার শিরা, বৃক্কীয় ধমনি ও শিরা, এবং হেপাটিক পোর্টাল ভেসেল।

অনুশীলনী

[সম্পাদনা]

এটি সংবহনতন্ত্রের অনুশীলন এটি আপনাকে রক্তসংবহনতন্ত্রের প্রধান রক্তনালিগুলো, ধমনি ও শিরার মধ্যে পার্থক্য, এবং কৈশিকার জালিকায় কী ঘটে—তা শিখতে সাহায্য করবে।

নিজেকে যাচাই করুন

[সম্পাদনা]

১। ধমনি ও শিরার মধ্যে ২টি পার্থক্য উল্লেখ কর।

২। সিস্টোলি (systole) কী?

৩। নিচের সঠিক উত্তরটিতে বৃত্ত দাও।

রক্ত দেহের রক্তনালির মাধ্যমে নিচের পথ অনুসরণ করে প্রবাহিত হয়।

ক) হৃৎপিণ্ড → শিরা → কৈশিকা → ধমনি → হৃৎপিণ্ড

খ) হৃৎপিণ্ড → ধমনি → কৈশিকা → শিরা → হৃৎপিণ্ড

গ) হৃৎপিণ্ড → শিরা → ধমনি → কৈশিকা → হৃৎপিণ্ড

ঘ) হৃৎপিণ্ড → কৈশিকা → ধমনি → শিরা → হৃৎপিণ্ড

৪। সেই রক্তনালিগুলোর নাম লেখো যা রক্ত বহন করে:

হৃৎপিণ্ড থেকে শরীরের প্রধান অঙ্গগুলোর দিকে:
অ্যাওর্টা থেকে মস্তিষ্কের দিকে:
অ্যাওর্টা থেকে বৃক্কের দিকে:
অন্ত্র থেকে যকৃতের দিকে:
অ্যাওর্টা থেকে হৃৎপিণ্ডপেশির দিকে:

Test Yourself Answers

ওয়েবসাইটসমূহ

[সম্পাদনা]
  • উইকিপিডিয়াতে রক্তসংবহনতন্ত্র সম্পর্কে ভালো তথ্য পাওয়া যায়, যদিও মনে রাখতে হবে, সেখানের অধিকাংশ তথ্যই মানবদেহের রক্তসংবহনতন্ত্রকে ঘিরে উপস্থাপিত।

শব্দকোষ

[সম্পাদনা]