বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রাণীর অঙ্গসংস্থান ও শরীরবিদ্যা/পেশী

উইকিবই থেকে
original image by eclecticblogs cc by

উদ্দেশ্য

[সম্পাদনা]

এই অংশটি সম্পূর্ণ করার পর আপনি জানতে পারবেন:

  • মসৃণ, হৃদপেশি ও কঙ্কাল পেশির গঠন এবং তারা শরীরের কোথায় অবস্থান করে।
  • একটি পেশির ইনসারশন (সংযুক্তি) ও অরিজিন (উৎপত্তি) কী।
  • পেশির ফ্লেক্সন (বাঁকানো) ও এক্সটেনশন (সোজা করা) মানে কী।
  • পেশিগুলি সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বী জোড়ায় কাজ করে।
  • টেনডন কীভাবে পেশিকে হাড়ের সঙ্গে যুক্ত করে।

পেশি একটি প্রাণীর শরীরের বেশিরভাগ অংশ গঠন করে এবং শরীরের প্রায় অর্ধেক ওজনই পেশিজাত। চপ বা রোস্টে যে মাংস থাকে সেটি মূলত পেশি এবং এটি প্রোটিনে সমৃদ্ধ। পেশি কলার কোষগুলো লম্বাটে এবং বিশ্রামরত অবস্থায় নিজেদের দৈর্ঘ্যের অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে। গঠন ও কার্যকারিতার ভিত্তিতে তিন ধরনের পেশি আছে: মসৃণপেশি, হৃদপেশি ও কঙ্কাল পেশি।

পেশির প্রকারভেদ

[সম্পাদনা]
  • মসৃণ পেশি

মসৃণ বা অনৈচ্ছিক পেশি শরীরের অবচেতন স্বাভাবিক কাজ যেমন-খাবার হজমনালিতে ঠেলাধাক্কা দিয়ে এগিয়ে নেওয়া, চোখের ফোকাস বজায় রাখা এবং রক্তনালীর ব্যাস পরিবর্তনের কাজ করে। এই কোষগুলো চোঙা আকৃতির — মাঝখানে মোটা এবং দুই প্রান্ত সরু, মাঝখানে একটি নিউক্লিয়াস থাকে। সাধারণত পাতার মতো স্তরে থাকে এবং অবচেতন বা স্বায়ত্ত(autonomic) স্নায়ুতন্ত্র এবং হরমোন দ্বারা উদ্দীপ্ত হয় (দেখুন অধ্যায় ৩)।

  • হৃদপেশি

হৃদপেশি শুধুমাত্র হৃদপিন্ডের প্রাচীরে পাওয়া যায়। এটি শাখা-প্রশাখার মতো তন্তু দ্বারা তৈরি যা একটি ত্রি-মাত্রিক জাল গঠন করে। মাইক্রোস্কোপে দেখা যায় প্রতিটি কোষে একটি কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস ও হালকা দাগ বা স্ট্রিয়েশন থাকে। হৃদ্‌পিণ্ড পেশি নিজ থেকেই ছন্দময়ভাবে সংকুচিত হয়, কিন্তু সাইনোঅ্যাট্রিয়াল নোড (প্রাকৃতিক পেসমেকার) হৃদস্পন্দন সমন্বয় করে। স্নায়ু ও হরমোন এই ছন্দে প্রভাব ফেলে (দেখুন অধ্যায় ৩)।

  • কঙ্কাল পেশি

কঙ্কাল পেশি হাড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং কঙ্কালকে নড়াতে সাহায্য করে। এটি স্বেচ্ছাচালিত নিয়ন্ত্রণাধীন। এই পেশি লম্বাটে কোষ বা তন্তুর সমন্বয়ে তৈরি, যেগুলো একে অপরের পাশে সমান্তরালভাবে থাকে। প্রতিটি কোষে একাধিক নিউক্লিয়াস থাকে এবং মাইক্রোস্কোপে দেখলে দাগযুক্ত বা স্ট্রাইয়েটেড দেখা যায়। এই বৈশিষ্ট্য থেকেই নাম হয়েছে স্ট্রাইপড বা স্ট্রাইয়েটেড পেশি। প্রতিটি কোষে শত শত বা হাজারো ক্ষুদ্র তন্তু থাকে যেগুলো নিজস্ব স্ট্রাইপ তৈরি করে। এই দাগ দুটি ভিন্ন প্রোটিন দ্বারা তৈরি, যারা একে অপরের উপর সরে এসে কোষকে সংকুচিত করে (দেখুন চিত্র ৭.১)।

চিত্র ৭.১ - একটি দাগযুক্ত পেশি কোষ

পেশির সংকোচন

[সম্পাদনা]

পেশি সংকোচনের জন্য শক্তি দরকার এবং এজন্য পেশি কোষে প্রচুর মাইটোকন্ড্রিয়া থাকে। তবে মাইটোকন্ড্রিয়া থেকে মুক্ত শক্তির মাত্র ১৫% পেশি সংকোচনে ব্যবহৃত হয়। বাকি শক্তি তাপে রূপান্তরিত হয়। তাই ব্যায়াম করলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং প্রাণীরা ঘামে বা হাঁপাতে থাকে এই অতিরিক্ত তাপ দূর করার জন্য—এটি উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের অংশ।

একটি পেশি বলতে আসলে বোঝানো হয় অনেক পেশি তন্তুর একটি গুচ্ছ, যেগুলো সংযোজক কলা দ্বারা ঘেরা থাকে। এই সংযোজক কলাগুলো পেশির দুই প্রান্তে একত্রিত হয়ে শক্ত, সাদা আঁশযুক্ত তন্তু তৈরি করে যাকে বলে টেনডন। এগুলো পেশিকে হাড়ের সঙ্গে সংযুক্ত করে। টেনডনের গঠন লিগামেন্ট–এর মতো, যা জয়েন্টে এক হাড়কে আরেক হাড়ের সঙ্গে যুক্ত করে (দেখুন চিত্র ৭.২ ক ও খ)।

চিত্র ৭.২ ক ও খ - একটি পেশির গঠন

মনে রাখবেন:

Tendons Tie (টেনডন পেশিকে হাড়ের সঙ্গে টানে)

এবং

Ligaments Link (লিগামেন্ট হাড়কে হাড়ের সঙ্গে যুক্ত করে)

একটি পেশির গঠন

[সম্পাদনা]

একটি পেশি মাঝখানে মোটা এবং দুই প্রান্ত সরু। মাঝের মোটা অংশটি, যা সংকোচনের সময় আরও মোটা হয়, তাকে বলে বেলি বা পেশির পেট। আপনার উপরের বাহুর বাইসেপস পেশি সংকুচিত করলে আপনি মাঝখানে এটি মোটা হতে দেখতে ও অনুভব করতে পারবেন। বাইসেপস পেশি উপরের প্রান্তে কাঁধের হাড়ের সঙ্গে এবং নিচের প্রান্তে নিচের বাহুর হাড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে। লক্ষ্য করুন, বাইসেপস সংকুচিত করলে শুধু একটি প্রান্তের হাড় নড়ে, যেটি পেশির ইনসারশন বা সংযুক্তি। অপর প্রান্ত যেটি অপেক্ষাকৃত স্থির থাকে, সেটিকে বলে পেশির অরিজিন বা উৎপত্তিস্থল (দেখুন চিত্র ৭.৩)।

চিত্র ৭.৩ - প্রতিদ্বন্দ্বী পেশি, ফ্লেক্সন ও এক্সটেনশন

প্রতিদ্বন্দ্বী পেশি

[সম্পাদনা]

কঙ্কাল পেশি সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় কাজ করে। যখন এক পেশি সংকুচিত হয়, অন্যটি শিথিল হয়। এমন পেশি জোড়াকে বলে প্রতিদ্বন্দ্বী পেশি (Antagonistic muscles)। যেমন: উপরের বাহুর বাইসেপস ও ট্রাইসেপস পেশি (দেখুন চিত্র ৭.৩)। একত্রে তারা কনুই ভাঁজ করে। বাইসেপস সংকুচিত (এবং ট্রাইসেপস শিথিল) হলে নিচের বাহু উঠে যায় এবং জয়েন্টের কোণ কমে যায়—এটাকে বলে ফ্লেক্সন। আর ট্রাইসেপস সংকুচিত (এবং বাইসেপস শিথিল) হলে কনুইর কোণ বৃদ্ধি পায়—এটি হলো এক্সটেনশন

যখন মানুষ বা প্রাণীরা কঙ্কাল পেশি সংকুচিত করে, সেটিকে বলা হয় স্বেচ্ছাচালিত কাজ। যেমন: ঘর অতিক্রম করা, চামচ মুখে তোলা বা হাসা। তবে, পেশি সংকোচনের একটি অনৈচ্ছিক উপায়ও আছে—যেমন: হাত ভুলবশত গরম কিছু ছুঁলে হঠাৎ টেনে নেওয়া। এটিকে বলে রিফ্লেক্স অ্যাকশন এবং এটি রিফ্লেক্স আর্ক নামক প্রক্রিয়ায় ঘটে, যা অধ্যায় ১৪-১৫ তে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

সারসংক্ষেপ

[সম্পাদনা]
  • তিন ধরনের পেশি কলা আছে: মসৃণ পেশি (আন্ত্র ও রক্তনালির প্রাচীরে), হৃদ্পেশি (হৃদপিন্ডে), এবং কঙ্কাল পেশি (কঙ্কালের সঙ্গে যুক্ত)।
  • টেনডন কঙ্কাল পেশিকে হাড়ের সঙ্গে যুক্ত করে।
  • লিগামেন্ট হাড়কে জয়েন্টে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করে।
  • কঙ্কাল পেশি প্রতিদ্বন্দ্বী জোড়ায় কাজ করে। এক পেশি সংকুচিত হলে অপরটি শিথিল হয়।
  • ফ্লেক্সন হলো জয়েন্টের কোণ কমানো। এক্সটেনশন হলো জয়েন্টের কোণ বাড়ানো।

নিজেকে পরীক্ষা করুন

[সম্পাদনা]

১. কোন ধরণের পেশি:

ক) হাড় নাড়ায়:
খ) হৃদপিন্ডকে রক্ত পাম্প করতে সাহায্য করে:
গ) অন্ত্রে খাবার ঠেলে নিয়ে যায়:
ঘ) মুখে হাসির অভিব্যক্তি আনে:
ঙ) ঠান্ডায় লোম খাড়া করে:
চ) শ্বাস নিতে ডায়াফ্রাম সংকুচিত করে:

২. কোন গঠন পেশিকে হাড়ের সঙ্গে যুক্ত করে?

৩. পেশির ইনসারশন বলতে কী বোঝায়?

৪. বাইসেপসের প্রতিদ্বন্দ্বী পেশি কোনটি?

৫. আরও তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বী পেশি জোড়া লিখুন এবং তারা কী কাজ করে তা বলুন।

৬. হাঁটু বাঁকালে আপনি কোন ধরনের গতি করছেন?

৭. গোড়ালি সোজা করলে কী ধরনের গতি হয়?

৮. কোন কোষাঙ্গক (organelle) পেশিকে শক্তি সরবরাহ করে?

৯. টেনডন ও লিগামেন্টের মধ্যে পার্থক্য কী?

১০. "কঙ্কাল পেশি" অংশে দুটি প্রোটিনের কথা বলা হয়েছে। এই প্রোটিনগুলোর নাম কী, তাদের আকারগত পার্থক্য কী এবং তারা কীভাবে চলাচলে সাহায্য করে তা বলুন।

ওয়েবসাইট

[সম্পাদনা]

তিন ধরণের পেশির বর্ণনা এবং কিভাবে কঙ্কাল পেশি কাজ করে তার ব্যাখ্যা।

শব্দকোষ

[সম্পাদনা]