বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রকৌশল শব্দবিজ্ঞান/শ্রবণের পরিবাহী প্রক্রিয়া

টেমপ্লেট:প্রকৌশল শব্দবিজ্ঞান

মানুষের কানের শারীরস্থান
মানুষের কানের শারীরস্থান

এই অধ্যায়ে আমরা শ্রাব্য তরঙ্গের অন্তঃকর্ণে পৌঁছানোর পথ অনুসন্ধান করবো। দুটি পরিবহন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হবে; প্রথমে বাহ্যিক ও মধ্যকর্ণের মাধ্যমে অন্তঃকর্ণে ধ্বনি পরিবহন এবং পরে অস্থি পরিবহন এর মাধ্যমে অন্তঃকর্ণে পরিবহন আলোচনা করা হবে। এই পরিবাহি পথগুলো ছাড়া শব্দ তরঙ্গ অন্তঃকর্ণে পৌঁছাতে পারতো না এবং আমরা শোনার সক্ষমতা হারাতাম।

বাহ্যিক কর্ণ

[সম্পাদনা]

শ্রবণপ্রক্রিয়ায় ধ্বনি সর্বপ্রথম প্রবেশ করে বাহ্যিক কর্ণে, যা দুটি অংশে বিভক্ত — পিনা (যা বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান) এবং শ্রবণনালী।

আগে মনে করা হতো পিনা শব্দ তরঙ্গ শ্রবণনালীতে প্রবাহিত করে, তবে এর মূল কাজ হলো শব্দ উৎসের অবস্থান নির্ণয়ে সহায়তা করা। পিনার ভাঁজগুলি ৪০০০ হার্জের ঊর্ধ্বে ফ্রিকোয়েন্সিতে সংকেতকে ছাঁকনির মাধ্যমে এমন পরিবর্তন ঘটায় যা থেকে মস্তিষ্ক শব্দের উচ্চতা এবং উৎসের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে।[১]

শ্রবণনালী

[সম্পাদনা]

একটি শ্রবণনালী প্রায় ২.৮ সেমি লম্বা নল যা এক প্রান্তে কাণছাপ দ্বারা বন্ধ। এটি কোন অনমনীয় নলের মতো নয়, তাই এটি ২–৫ কিলোহার্জ ফ্রিকোয়েন্সির মধ্যে একটি প্রশস্ত অনুরণন শিখরে (resonance peak) পৌঁছায়।[১] যেহেতু শ্রবণনালী সোজা ও অনমনীয় নয়, যার ফলে অনুরণন ফ্রিকোয়েন্সিতে পরিবর্তন আসে। তবে এই নালী শব্দচাপকে (Sound Pressure Level) প্রায় ১৫ ডিবি পর্যন্ত বাড়াতে পারে, যা ধ্বনি সংকেতকে প্রবল করে।[২]

Thumb
Thumb

মধ্যকর্ণ

[সম্পাদনা]

মধ্যকর্ণের প্রধান কাজ হলো শব্দ শক্তিকে বাহ্যিক কর্ণের বায়ু পরিবেশ থেকে অন্তঃকর্ণের তরল পরিবেশে দক্ষতার সঙ্গে স্থানান্তর করা। কক্লিয়ার তরলের প্রতিবন্ধকতা বায়ুর তুলনায় ৪০০০:১, তাই যদি মধ্যকর্ণ না থাকতো তবে শক্তি পরিবহনের গুণাঙ্ক, T, হতো:

T=4r(r+1)2

এতে T হয় ০.০০১ অর্থাৎ মাত্র ০.১% শক্তি পৌঁছাতো, যা ৪০ ডিবি শব্দচাপ হ্রাসের সমান।[১]

এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে মধ্যকর্ণে তিনটি যান্ত্রিক পরিবর্ধন পদ্ধতি রয়েছে: ১) টাইম্পানিক ঝিল্লি ও স্টেপিসের এলাকার অনুপাত, ২) স্টেপিস ও ওভাল জানালার এলাকার অনুপাত, ৩) অসিকুলার চেইনের লিভার প্রভাব।

এলাকা অনুপাত

[সম্পাদনা]

টাইম্পানিক ঝিল্লির গড় এলাকা ৬৬ mm2 এবং স্টেপিসের ৩.২ mm2। তাই আদর্শ অনুপাত ২০:১। তবে কার্যকর এলাকা মাত্র ৬৫%, অর্থাৎ ৬৬ × ০.৬৫ = ৪২.৯ mm2। ফলে প্রকৃত অনুপাত হয় ১৩.৪।

Thumb
Thumb

টাইম্পানিক ঝিল্লি

[সম্পাদনা]

টাইম্পানিক ঝিল্লি ধ্বনিকে যান্ত্রিক গতিতে রূপান্তর করে — এটি এক ধরনের ট্রান্সডিউসার।[৩] এর কঠোরতা সুনির্দিষ্ট হতে হয়; অতিরিক্ত কঠোর হলে প্রতিফলন ঘটায়, অতিরিক্ত নমনীয় হলে শক্তি শোষণ করে।[৪]

এছাড়াও, ঝিল্লির বাঁকানো গঠনের ফলে মানুব্রিয়াম-এ চাপ দ্বিগুণ হয়।[১] এর ফলে এলাকা অনুপাত ও টাইম্পানিক ঝিল্লির সম্মিলিত লাভ হয় ২৬.৮।

dB Gain=20log(26.8/1)=28.6dB 

স্টেপিস ও ওভাল জানালার অনুপাতও ২০:১ হওয়ায়:

dB Gain=20log(20/1)=26dB 

এইভাবে মধ্যকর্ণে আরও ২৬ ডিবি লাভ হয়।[৫]

অসিকুলার চেইন

[সম্পাদনা]

ম্যালিয়াস এবং ইনকাস একটি মৌলিক লিভারের মতো কাজ করে। ম্যালিয়াসের মানুব্রিয়াম ইনকাসের তুলনায় ১.৩ গুণ দীর্ঘ। তাদের সংযুক্ত লিগামেন্ট তাদের একত্রে নড়াচড়ায় সহায়তা করে। এর ফলে ইনকাসে ১.৩ গুণ চাপবৃদ্ধি ঘটে:

Thumb
Thumb
dB Gain=20log(1.3)=2.3dB 

যদিও এটি তুলনামূলক ছোট লাভ, তবুও এটি অন্তঃকর্ণে শব্দ পরিবহণে ভূমিকা রাখে।

মধ্যকর্ণের মোট লাভ / আদর্শ ট্রান্সফর্মার অনুমান

[সম্পাদনা]

মধ্যকর্ণের সব উপাদান একত্রে:

Middle Ear dB Gain=2.3dB+28.6dB +26dB=56.9dB

এটিকে “আদর্শ ট্রান্সফর্মার অনুমান” বলা হয়, যা বায়ু ও কক্লিয়ার প্রতিবন্ধকতার ফারাক পূরণ করে।[৪] ক্যাডাভারে পরীক্ষা করে এটি নিশ্চিত করা হয়েছে।

অস্থি পরিবহন

[সম্পাদনা]

অস্থি পরিবহন হলো খুলি দিয়ে কক্লিয়ায় শব্দ পরিবহন। সাধারণত খুলি বা টেম্পোরাল হাড়ে ৫০–৬০ ডিবি বেশি তীব্রতা প্রয়োগ করলে তা কক্লিয়ার তরঙ্গ সৃষ্টি করে, যা স্টেপিসের মতোই কাজ করে।[১] এটি প্রধানত শ্রবণ পরীক্ষায় ব্যবহৃত হয়।[৬]

যেসব ব্যক্তির মধ্যকর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু অন্তঃকর্ণ ঠিক আছে, তারা অস্থি পরিবহন শ্রবণ যন্ত্র ব্যবহার করতে পারে। এতে খুলিতে টাইটেনিয়ামের স্ক্রু বসিয়ে বাহ্যিক যন্ত্রের মাধ্যমে শব্দ কক্লিয়ায় পাঠানো যায়। যদিও এটি নিখুঁত নয়, তবে পরিষ্কারভাবে শব্দ শনাক্ত করা যায়।[৬]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. ↑ ১.০ ১.১ ১.২ ১.৩ ১.৪ Gelfand, Stanley A. Hearing, an Introduction to Psychological and Physiological Acoustics. New York: M. Dekker, 1981. পৃষ্ঠা ৮৫–১০২
  2. ↑ Kinsler, Lawrence E. Fundamentals of Acoustics. New York: Wiley, 2000. পৃষ্ঠা ৩১২–৩১৫
  3. ↑ Durrant, John D, and Jean H. Lovrinic. Bases of Hearing Science. Baltimore: Williams & Wilkins, 1977.
  4. ↑ ৪.০ ৪.১ Auditory Function. Emanuel,Maroonroge,Letowski.
  5. ↑ উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; "Hamill" নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  6. ↑ ৬.০ ৬.১ Yost, William A. Fundamentals of Hearing. San Diego: Academic Press, 2000. পৃষ্ঠা ৭২