বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রকৌশল শব্দবিজ্ঞান/ম্যানাকিন পাখির অনুরণিত পালক

উইকিবই থেকে

ভূমিকা

[সম্পাদনা]

লেক্কিং এর সময় পুরুষ ক্লাব-উইংড ম্যানাকিন যার বৈজ্ঞানিক নাম Machaeropterus deliciosus (পরিবার: Pipridae), তাদের গৌণ পালকগুলোকে অস্বাভাবিকভাবে (হাইপারট্রফি) বাড়িয়ে তোলে। এই বাড়তি পালকগুলোর কম্পনের ফলে সেগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় এবং কম্পিত হয়, যার মাধ্যমে ১৫০০ হার্জ মৌলিক কম্পাঙ্ক-বিশিষ্ট সুসংহত সুরেলা ধ্বনি তৈরি হয়। স্ত্রী মানাকিনের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পুরুষটি একেবারেই অনন্য এক শব্দ সৃষ্টি করে। শব্দ উৎপাদনের জন্য প্রচলিত কণ্ঠস্বরের পরিবর্তে সে তার ডানাকেই বাদ্যযন্ত্রের মতো ব্যবহার করে।

চিত্র ১: পুরুষ গোল্ডেন-হেডেড ম্যানাকিন

শব্দ সৃষ্টির প্রক্রিয়া

[সম্পাদনা]
চিত্র ২: শব্দ সৃষ্টির ধাপ

পুরুষ ম্যানাকিন তার ষষ্ঠ এবং সপ্তম গৌণ পালক পরিবর্তন করে, যা যুগ্ম অনুনাদক হিসেবে কাজ করে। তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও পাঁচটি গৌণ পালক সেগুলোর সাথে একই দশায় স্পন্দিত হয়ে শব্দ সৃষ্টি করে যা কানেতে টিক‑টিক‑টিং[১] রিনিঝিনি ধ্বনির মতো শোনায়। এই নৃত্যময় ধারায় দুটি সংক্ষিপ্ত যান্ত্রিক টিক থাকে, যখন ডানা ঝাপটানো হয় এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী যান্ত্রিক টিং থাকে, যখন ডানা পিঠের ওপরে উল্টে যায় [২]। টিকটিং শব্দের ধ্বনিতাত্ত্বিক গঠন একই; পার্থক্য কেবল টিং‑এর স্থায়িত্ব বেশি। এদের প্রতিটি ধ্বনি গড়ে ১.৪৯ কিলোহার্জ মৌলিক কম্পাঙ্ক এবং তার উচ্চতর কম্পাঙ্কের সুরেলা ধ্বনি দ্বারা গঠিত।

টিক-টিং ভিডিও এবং অডিও প্রদর্শনী

চিত্র ৩: পরিবর্তিত গৌণ পালক

সাধারণ গৌণ পালকের চেয়ে ১‑৫ নম্বর গৌণ পালকে পারদর্শী পার্থক্য দেখা যায়। প্রথমে ১‑২ নম্বর পালকে কাঠিন্যদণ্ড একটু চওড়া, কিন্তু তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম সেকেন্ডারি পালকগুলোর ক্ষেত্রে এদের শেষ দুই-তৃতীয়াংশ, তিন-চতুর্থাংশ এবং চার-পঞ্চমাংশ বরাবর একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায় – পালকগুলো একটি নিরবচ্ছিন্ন সরু অবস্থা থেকে হঠাৎ করে সরু হয়ে যায়। পঞ্চম গৌণ পালকের এই আকস্মিক সরু অংশের পর র্যাচিগুলো ভেতরের দিকে বেঁকে যায়, ফলে বিশ্রাম‑অবস্থায় সেটি পাশাপাশি থাকা ষষ্ঠ পালকের র্যাচিসের ওপর চেপে বসে এবং স্পর্শ করে [৩]। ষষ্ঠ ও সপ্তম গৌণ পালক দুটিতে আরও স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায় — এদের র্যাচি গোড়ার দিকে মোটা থাকে, এবং প্রায় অর্ধেক দৈর্ঘ্য পর্যন্ত এসে এদের প্রস্থ দ্বিগুণ হয়ে যায়। এগুলো তাদের দীর্ঘ অক্ষ বরাবর এমনভাবে মোচড়ানো থাকে যে, পালকের পৃষ্ঠীয় দিকটি ভেতরের দিকে মুখ করে থাকে। ষষ্ঠ গৌণ পালকে খাঁজ থাকে, অন্যদিকে পঞ্চম পালকের ডগা বাঁকানো থাকে [৪]। পরিবর্তিত পালকের সবচেয়ে ভেতরের জোড়া (সপ্তম গৌণ পালক) পিঠের ওপর দিয়ে একে অপরকে আঘাত করে। এই সংঘর্ষের ঠিক পরেই, ডানাগুলো পার্শ্বীয়ভাবে এবং ভেতরের দিকে কেঁপে ওঠে, যা তাদের মাত্র কয়েক মিলিমিটার দূরে টেনে নেয়। প্রায় ৮ মিলি-সেকেন্ড পরে, তারা আবার ডানা জোড়া লেগে দ্বিতীয় সংঘর্ষ ঘটে। এই পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে শব্দ সৃষ্টির সুর ক্রমাগত উৎপন্ন হতে থাকে এবং পালকগুলো ঠিক‑ঠাক সেই মৌলিক কম্পাঙ্কে কম্পন তৈরি করে [৩]।

শাব্দিক বিশ্লেষণ

[সম্পাদনা]

পুরুষ ম্যানাকিন সামনের দিকে ঝুঁকে তার ডানা দুটিকে একসাথে ঝাপটায়, যার কম্পাঙ্ক সর্বোচ্চ ১৫০০ হার্জ (Hz) পর্যন্ত পৌঁছায় এবং অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ Q-মান থাকে। এই কম্পাঙ্ক একটি হামিং বার্ডের ডানার ঝাপটানোর গতির চেয়েও বেশি। গুণগত মান Q হলো সেই হার, যা দিয়ে একটি ব্যবস্থার কত দ্রুত সর্বোচ্চ প্রশস্ততায় পৌঁছায় তা পরিমাপের একটি সূচক। স্পেকট্রাল পদ্ধতি ব্যবহার করে, Q নির্ধারণ করা যেতে পারে এভাবে:

যেখানে f0 হলো ব্যবস্থার স্বাভাবিক কম্পাঙ্ক এবং BW – 3 dB,SPL হলো সর্বোচ্চ ধ্বনিচাপ (SPL) থেকে ৩ dB নিচে ব্যান্ডউইথ। পরীক্ষা থেকে দেখা গেছে, সমস্ত পালকের জন্য Q মান ১০-এর বেশি এবং ২৭ পর্যন্তপাওয়া গেছে। এর অর্থ হলো এই গঠনগুলো খুবই কার্যকর জৈব রেজোনেটর হিসেবে কাজ করতে পারে [৩]।

ডানার পরিবর্তন

[সম্পাদনা]

এত দ্রুত ডানা নাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত যে সহায়তা প্রয়োজন হয়, তা আসে অতিরিক্ত বড় আকারের ডানার হাড় থেকে। পুরুষ ম্যানাকিনের আলনা হাড়টি এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যে ডানাকে সাপোর্ট করার জন্য এতে উঁচু অংশ ও খাঁজ রয়েছে এবং এর প্রস্থ স্বাভাবিক প্রস্থের চারগুণ বেশি। আরেকটি বিস্ময়কর পরিবর্তন হলো ম্যানাকিনের ডানার হাড়গুলো নিরেট, যেখানে বেশিরভাগ পাখির হাড় ফাঁপা থাকে যা তাদের উড়তে সাহায্য করে। এইভাবে পরিবর্তিত ডানা নিখুঁত সুর তৈরি করতে সক্ষম।

চিত্র ৪: স্ত্রী ব্লু ম্যানাকিন

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]

[১] কে. এস. বোস্টউইক এবং আর. ও. প্রাম, "সঙ্গীতরত পাখি ডানার পালক ঘষে গান গায়," সায়েন্স, খণ্ড ৩০৯, পৃষ্ঠা ৭৩৬-, ২৯ জুলাই, ২০০৫।

[২] কে. এস. বোস্টউইক, "ক্লাব-উইংড ম্যানাকিনের (ম্যাখেরোপটেরাস ডেলিসিওসাস) প্রদর্শন আচরণ, যান্ত্রিক শব্দ এবং বিবর্তনীয় সম্পর্ক," দ্য আউক, খণ্ড ১১৭, পৃষ্ঠা ৪৬৫–৪৭৮, ২০০০।

[৩] কে. এস. বোস্টউইক এবং অন্যান্য, "রেজোনেটিং পালক প্রণয় সঙ্গীত তৈরি করে," প্রসিডিংস অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি: বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস, খণ্ড ২৭৭, পৃষ্ঠা ৮৩৫–৮৪১, ২২ মার্চ, ২০১০।

[৪] http://www.pbs.org/wnet/nature/episodes/what-males-will-do/photo-gallery-manakin-anatomy/955/

<< মূল পাতায় ফিরে যান