প্রকৌশল শব্দবিজ্ঞান/মারিম্বার মৌলিক শব্দবিজ্ঞান
টেমপ্লেট:Engineering Acoustics
পরিচিতি
[সম্পাদনা]
একটি জাইলোফোনের মতোই মারিম্বায় কাঠের বার বা পাত থাকে যা সুর তৈরি করার জন্য ম্যালের সাহায্যে আঘাত করা হয়। তবে, জাইলোফোনের কর্কশ শব্দের বিপরীতে মারিম্বা একটি গভীর ও মৃদু সুর তৈরি করে। মারিম্বা খুব বিরল কোনো বাদ্যযন্ত্র নয় এবং বেশিরভাগ উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যান্ডে এটি বাজানো হয়।
এখন যেখানে সব ট্রাম্পেট, ফ্লুট আর ক্ল্যারিনেট বাদকেরা তাদের বাদ্যযন্ত্র সুরে মেলাতে ব্যস্ত, সেখানে মারিম্বা বাদক পার্কাসন বিভাগে পা তুলে আরাম করছে। এটা কিছুটা অবাক করার মতো, কারণ মারিম্বা একটি সুরেলা বাদ্যযন্ত্র যা ভালোভাবে শোনাতে হলে সুরে থাকা জরুরি। তাহলে ব্যাপারটা কী? মারিম্বা কেন সুরে মেলানো হয় না? আপনি কীভাবে একটি মারিম্বা সুর করবেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হলে মারিম্বার পেছনের (অথবা ভেতরের) শব্দবিজ্ঞান বোঝা দরকার।
শব্দের উপাদানসমূহ
[সম্পাদনা]কীভাবে মারিম্বা তার অনন্য শব্দ তৈরি করে? এটি মূলত দুটি উপাদানে নির্ভর করে: বার (পাত) এবং রেজোনেটর (প্রতিধ্বনি নল)। সাধারণত বারগুলো রোজউড বা কাঠের কোনো সিন্থেটিক সংস্করণ দিয়ে তৈরি হয়। কাঙ্ক্ষিত স্বরের উপর নির্ভর করে বারগুলো নির্দিষ্ট আকারে কাটা হয়, এরপর নিচের দিক থেকে কাঠ চেঁছে সুর আরও সূক্ষ্মভাবে মেলানো হয়।
উদাহরণ: রোজউড বার, মধ্যম সি, ১ সেন্টিমিটার পুরু
[সম্পাদনা]|
বারের দৈর্ঘ্য এবং কাঙ্ক্ষিত কম্পাঙ্কের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনকারী সমীকরণটি এমন একটি বারের মডেলিং তত্ত্ব থেকে আসে যা উভয় প্রান্ত মুক্ত থাকে। এই তত্ত্বটি নিম্নলিখিত সমীকরণটি প্রদান করে:
যেখানে t হলো বারের পুরুত্ব, v হলো বারের মধ্যে শব্দের গতি, এবং f হলো স্বরের কম্পাঙ্ক। রোজউডের জন্য v=5217 মিটার/সেকেন্ড। মধ্যম সি-এর জন্য, f=262 হার্জ। অতএব, একটি রোজউড মারিম্বার জন্য মিডেল মধ্যম সি কী (key) তৈরি করতে, বারটিকে কাটতে হবে:
|
উদাহরণ: অ্যালুমিনিয়াম প্রতিধ্বনি নল, মধ্যম সি
[সম্পাদনা]|
প্রতিধ্বনি নলের দৈর্ঘ্য ও কাঙ্ক্ষিত কম্পাঙ্কের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনকারী সমীকরণটি আসে একটি পাইপকে এমনভাবে মডেল করার মাধ্যমে যেটি একপ্রান্তে চালিত এবং অপর প্রান্তে বন্ধ থাকে। “চালিত” পাইপ বলতে বোঝানো হয় এমন একটি পাইপ যার এক প্রান্তে কম্পনের উৎস থাকে (এই ক্ষেত্রে কম্পনশীল কী)। এই মডেল থেকে যে সমীকরণটি পাওয়া যায় তা হলো:
যেখানে c হলো বাতাসে শব্দের গতি এবং f হলো নোটের কম্পাঙ্ক। বাতাসের জন্য, c=343 মি/সেকেন্ড। মধ্যম সি-এর জন্য, f=262 হার্জ। অতএব, মধ্যম সি কী-এর জন্য একটি প্রতিধ্বনি নল তৈরি করতে হলে তার দৈর্ঘ্য হওয়া উচিত:
|
প্রতিধ্বনি নলের আকৃতি
[সম্পাদনা]প্রতিধ্বনি নলের আকৃতি উৎপাদিত শব্দের গুণমান নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আদর্শ আকৃতি হলো একটি গোলক। এটি হেলমহোল্টজ রেজোনেটর দ্বারা মডেল করা হয়। (আরো জানতে হেলমহোল্টজ রেজোনেটর পৃষ্ঠা দেখুন)। তবে, কীসমূহের নিচে বড়, গোলাকার, বিচ বলের মতো রেজোনেটর লাগানো সাধারণত বাস্তবসম্মত নয়। রেজোনেটরের জন্য সবচেয়ে খারাপ পছন্দ হলো বর্গাকার বা ডিম্বাকার নল। এই আকৃতিগুলি অ-হারমোনিক সুরকে বিবর্ধিত করে, যা কখনও কখনও "জাঙ্ক পিচ" নামে পরিচিত। সাধারণত বৃত্তাকার নল ব্যবহার করা হয় কারণ এটি পছন্দসই হারমোনিককে বিবর্ধিত করার ক্ষেত্রে (গোলক ছাড়া) সেরা কাজ করে এবং অন্য অপ্রয়োজনীয় সুর খুব কমই বৃদ্ধি করে।
উপরে দ্বিতীয় উদাহরণে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, মারিম্বার প্রতিধ্বনি নলকে (রেজোনেটর) একটি বন্ধ পাইপ হিসেবে মডেল করা যায়। এই মডেলটি ব্যবহার করে মারিম্বা কী ধরনের শব্দ (পূর্ণ ও গভীর, নাকি নিস্তেজ) তৈরি করবে তা ভবিষ্যদ্বাণী করা যায়। প্রতিটি পাইপ একটি "কোয়ার্টার ওয়েভ রেজোনেটর" (চতুর্থাংশ তরঙ্গ প্রতিধ্বনি নল) যা বারের মাধ্যমে উৎপাদিত শব্দ তরঙ্গকে বিবর্ধিত করে। এর অর্থ হল একটি পূর্ণ ও সমৃদ্ধ শব্দ তৈরি করার জন্য প্রতিধ্বনি নলের দৈর্ঘ্যকে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এক-চতুর্থাংশের সাথে হুবহু মিলে যেতে হবে। যদি দৈর্ঘ্য সঠিক না হয় তাহলে মারিম্বা সেই স্বরের জন্য একটি নিস্তেজ বা বেসুরো শব্দ তৈরি করবে।
মারিম্বার সুর মেলানোর প্রয়োজন কেন পড়ে?
[সম্পাদনা]তাত্ত্বিক জগতে যেখানে তাপমাত্রা সবসময় ৭২ ডিগ্রি ফারেনহাইট এবং আর্দ্রতা কম থাকে সেখানে মারিম্বার সুর মেলানোর প্রয়োজন হবে না। কিন্তু বাস্তবে যেহেতু আবহাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে (বিশেষ করে মার্চিং ব্যান্ডের জন্য), তাই মারিম্বা সবসময় একভাবে সুরে থাকে না। গরম ও ঠান্ডা আবহাওয়া বিভিন্ন ধরনের পারকাশন যন্ত্রের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, এবং মারিম্বাও এর ব্যতিক্রম নয়। গরমের দিনে মারিম্বার স্বর সাধারণত কিছুটা তীক্ষ্ণ হয়, আর ঠান্ডার দিনে তা ফ্ল্যাট হয়ে পড়ে।। এটি তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রে যা ঘটে তার ঠিক বিপরীত। কেন?
একটি তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রের সুর মূলত তারের টানের উপর নির্ভর করে, যা তাপের কারণে তার প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে কমে যায়। টানের এই হ্রাস একটি ফ্ল্যাট নোটের কারণ হয়। অন্যদিকে, মারিম্বা প্রতিধ্বনি নলের মাধ্যমে বাতাস সরানোর মাধ্যমে শব্দ তৈরি করে। এই বাতাস যে গতিতে চলে তা হল শব্দের গতি, যা তাপমাত্রার সাথে আনুপাতিকভাবে পরিবর্তিত হয়! সুতরাং, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে শব্দের গতিও বৃদ্ধি পায়। উপরের উদাহরণ ২ থেকে প্রদত্ত সমীকরণ থেকে আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে শব্দের গতি (c) বৃদ্ধির অর্থ হল একই স্বরের প্রতিধ্বনি তৈরি করার জন্য একটি দীর্ঘ পাইপের প্রয়োজন। যদি প্রতিধ্বনি নলের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি না করা হয়, তাহলে উৎপন্ন স্বরটি স্বাভাবিকের তুলনায় তীক্ষ্ণ শোনাবে। এখন, তাপ কাঠকে প্রসারিত করতে পারে, তবে এই প্রসারণের প্রভাব শব্দের গতির পরিবর্তনের প্রভাবের তুলনায় নগণ্য।
সুর মেলানো সংক্রান্ত ভুল ধারণা
[সম্পাদনা]পারকাশনবাদকদের মধ্যে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, মারিম্বার সুর শুধু প্রতিধ্বনি নলগুলোকে উপরে বা নিচে সরিয়েই ঠিক করা যায় (যেখানে কাঠের বারগুলোর অবস্থান অপরিবর্তিত থাকে)। এই ধারণার পেছনে যুক্তি হলো—যদি প্রতিধ্বনি নলকে নিচে নামানো হয়, তবে সেটি কার্যত দীর্ঘ হয়, এবং তাই স্বর পরিবর্তিত হয়। শুনতে এটি যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও বাস্তবে এটি কার্যকর নয়। মারিম্বা যেভাবে তৈরি হয় (নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যে বার এবং প্রতিধ্বনি নল কেটে) তা বিচার করলে দেখা যায় যে মারিম্বার সুর ঠিক করার সময় সত্যিই দুটি বিকল্প বিবেচনা করা যায়: বারগুলোর নিচের দিক থেকে কিছু কাঠ চেঁছে ফেলা অথবা প্রতিধ্বনি নলের দৈর্ঘ্য পরিবর্তন করা। তবে আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনের জন্য প্রতিবার কাঠ চেঁছে সুর ঠিক করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই একমাত্র যুক্তিসঙ্গত উপায় হলো প্রতিধ্বনি নলের দৈর্ঘ্য পরিবর্তন করা।
উপরে উল্লিখিত হিসাবে প্রতিটি প্রতিধ্বনি নলের নিচ প্রান্তে একটি স্টপার বা বন্ধনী থাকে। সেই স্টপারকে নলের ভেতরে উপরের দিকে ঠেলে দিলে, নলটি কার্যত ছোট হয় এবং স্বরটি আরও তীক্ষ্ণ হয়। বিপরীতে, স্টপারকে নিচের দিকে ঠেলে দিলে নলটি লম্বা হয় এবং স্বরটি ফ্ল্যাট হয়। তবে বেশিরভাগ মারিম্বা-ই এইরকম টিউনযোগ্য প্রতিধ্বনি নল নিয়ে তৈরি হয় না, ফলে এই প্রক্রিয়া কিছুটা কষ্টসাধ্য হতে পারে। (ঝাঁটা ও হাতুড়ি এ কাজে প্রচলিত “সরঞ্জাম” হিসেবে ব্যবহৃত হয়।)
উদাহরণ: মধ্যম সি প্রতিধ্বনি নলের দৈর্ঘ্য ১ সেন্টিমিটার বাড়ানো হলে
[সম্পাদনা]|
আদর্শ পরিস্থিতিতে, মধ্যম সি (২৬২ হার্জ) প্রতিধ্বনি নলের দৈর্ঘ্য হওয়া উচিত ৩২.৭ সেন্টিমিটার যা উদাহরণ ২-এ দেখানো হয়েছে। অতএব, দৈর্ঘ্যের পরিবর্তনের কারণে এই প্রতিধ্বনি নলের কম্পাংকের পরিবর্তন নিচের সমীকরণ দ্বারা নির্ধারিত হয়:
যদি দৈর্ঘ্য ১ সেন্টিমিটার বাড়ানো হয় তবে কম্পাংকের পরিবর্তন হবে:
|
মারিম্বার সুর মেলানোর পেছনের শব্দতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা যুক্ত আছে এর নকশার সঙ্গে, যেখানে প্রতিটি প্রতিধ্বনি নলের দৈর্ঘ্য নির্ধারিত স্বরের মোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ¼ অংশ হওয়া উচিত। কিন্তু যখন মারিম্বার সুর বেসুরো হয়ে যায় তখন প্রতিধ্বনি নলের দৈর্ঘ্য আর সেই নির্দিষ্ট ¼ অংশের সমান থাকে না — উপরে বর্ণিতভাবে নল দীর্ঘ বা সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে। যেহেতু দৈর্ঘ্য পরিবর্তিত হয়েছে তাই প্রতিধ্বনিতরঙ্গ আর ঠিকভাবে মিলছে না এবং ফলস্বরূপ সুরটি নিস্তেজ বা বেসুরো শোনাতে পারে।
উপসংহার
[সম্পাদনা]বর্তমানে কিছু মারিম্বা নির্মাতা তাদের নকশায় সুরনিয়ন্ত্রণযোগ্য প্রতিধ্বনি নল অন্তর্ভুক্ত করছেন। প্রকৃতপক্ষে বেশ কয়েকটি মারিম্বা কোম্পানি বহু দশক ধরে সুরনিয়ন্ত্রণযোগ্য প্রতিধ্বনি নল ব্যবহার করে আসছে। তবে খুব কমসংখ্যক কোম্পানিই সম্পূর্ণ রেঞ্জে সুর মেলানোর সুবিধা দেয়। যেহেতু প্রতিধ্বনি নলের প্রান্তে থাকা সিল বন্ধস্থানে কোনো ফাঁক থাকলে শব্দের গুণমান ও জোরে উল্লেখযোগ্যভাবে ঘাটতি দেখা দেয়, তাই এটি একটি বেশ কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে অন্তত এখন যন্ত্রের শব্দতাত্ত্বিক জ্ঞান থাকায়, বিশ্বজুড়ে পারকাশনবাদীরা কন্ডাক্টর যখন বলেন “সুর মিলাও!”, তখন কী করতে হবে তা ভালোভাবেই জানেন।