প্রকৌশল শব্দবিজ্ঞান/মাইক্রোফোন ডিজাইন ও পরিচালনা
ভূমিকা
[সম্পাদনা]মাইক্রোফোন হলো এমন একটি যন্ত্র যা বায়ুচাপের তারতম্যকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত করে। আজকের মূলধারার বিনোদন শিল্পে দুটি প্রধান পদ্ধতি ব্যবহার করে এটি তৈরি হয়, এবং পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে এদের নাম হয়েছে - ডাইনামিক মাইক্রোফোন এবং কন্ডেন্সার মাইক্রোফোন। পিজোইলেকট্রিক ট্রান্সডিউসারকেও মাইক্রোফোন হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে কিন্তু বিনোদন শিল্পে সাধারণত এগুলি ব্যবহৃত হয় না।
ডাইনামিক মাইক্রোফোন
[সম্পাদনা]ডাইনামিক মাইক্রোফোনগুলি 'ফ্যারাডে'র সূত্র' ব্যবহার করে তৈরি হয়। এই সূত্র অনুযায়ী একটি স্থির চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে একটি চলমান পরিবাহীকে রাখলে, পরিবাহীর মধ্যে একটি বৈদ্যুতিক প্রবাহ আবেশিত হয়। এই মাইক্রোফোনগুলিতে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির জন্য স্থায়ী চুম্বক ব্যবহার করা হয়। পরিবাহীর জন্য দুটি সাধারণ ব্যবস্থা রয়েছে।
চিত্র ১: চলমান-কয়েল ডাইনামিক মাইক্রোফোনের অনুদৈর্ঘ্য ছেদের দৃশ্য
প্রথম পরিবাহী বিন্যাসে তারের একটি চলমান কয়েল থাকে। তারটি সাধারণত তামার তৈরি হয় এবং সেটি একটি বৃত্তাকার ঝিল্লি বা পিস্টনের ওপর প্যাঁচানো থাকে, পিস্টনটি সাধারণত হালকা প্লাস্টিক বা কখনো কখনো অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি করা হয়। পিস্টনের ওপর চাপের তারতম্যের ফলে সেটি চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে চলাচল করে এবং এইভাবে তার মধ্যে কাঙ্ক্ষিত বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরি হয়।
চিত্র ২: ডাইনামিক রিবন মাইক্রোফোন
দ্বিতীয় পরিবাহী বিন্যাসে চুম্বকের মধ্যে ঝুলন্ত ধাতব ফয়েলের একটি ফিতা থাকে। চাপের তারতম্যের প্রতিক্রিয়ায় ধাতব ফিতাটি চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে গতিশীল থাকে এবং তাতে একটি বৈদ্যুতিক প্রবাহ উৎপন্ন হয়। উভয় বিন্যাসেই, ডাইনামিক মাইক্রোফোনগুলি শব্দীয় ট্রান্সডিউসারের মতো একই নীতি অনুসরণ করে।
কনডেন্সার মাইক্রোফোন
[সম্পাদনা]কনডেন্সার মাইক্রোফোন বৈদ্যুতিক ক্যাপাসিট্যান্সের (ধারকত্ব) পরিবর্তনের মাধ্যমে চাপের তারতম্যকে বৈদ্যুতিক বিভবে রূপান্তরিত করে, তাই এগুলি ক্যাপাসিটর (ধারক) মাইক্রোফোন নামেও পরিচিত। একটি বৈদ্যুতিক ক্যাপাসিটর দুটি চার্জযুক্ত বৈদ্যুতিক পরিবাহী নিয়ে গঠিত যাদের একে অপরের থেকে তুলনামূলকভাবে কম দূরত্বে স্থাপন করা হয়। যে মৌলিক সম্পর্ক দিয়ে ক্যাপাসিটারগুলিকে বর্ণনা করা যায় তা হল:
যেখানে Q হলো ক্যাপাসিটরের পরিবাহীর বৈদ্যুতিক চার্জ, C হলো ক্যাপাসিট্যান্স এবং V হলো ক্যাপাসিটরের পরিবাহীর মধ্যে বৈদ্যুতিক বিভব। যদি পরিবাহীগুলির বৈদ্যুতিক চার্জ একটি ধ্রুবক মানে ধরে রাখা হয়, তাহলে পরিবাহীগুলির মধ্যে তৈরি হওয়া বিভব (ক) ক্যাপাসিট্যান্সের মানের এবং (খ) পরিবাহীগুলির মধ্যে দূরত্বের ব্যস্তানুপাতিক হবে।
চিত্র ৩: কনডেন্সার মাইক্রোফোনের অনুদৈর্ঘ্য ছেদের দৃশ্য
একটি কনডেন্সার মাইক্রোফোনের ক্যাপাসিটর দুটি অংশ নিয়ে গঠিত: ডায়াফ্রাম (মধ্যচ্ছদা) এবং ব্যাকপ্লেট। ব্যাকপ্লেটটি স্থির অবস্থানে থাকে এবং চাপের তারতম্যের কারণে ডায়াফ্রামটি নড়ে। যখন ডায়াফ্রামটি ব্যাকপ্লেটের কাছাকাছি চলে আসে, তখন ক্যাপাসিট্যান্স বৃদ্ধি পায় এবং বৈদ্যুতিক বিভবের পরিবর্তন ঘটে। ডায়াফ্রামটি সাধারণত ধাতব আবরণযুক্ত মাইলার দিয়ে তৈরি করা হয়। ব্যাকপ্লেট এবং ডায়াফ্রাম সমন্বিত সম্পূর্ণ অংশটিকে সাধারণত ক্যাপসুল বলা হয়।
ডায়াফ্রাম এবং ব্যাকপ্লেটকে ধ্রুবক চার্জে রাখার জন্য, ক্যাপসুলে একটি বৈদ্যুতিক বিভব প্রদান করা থাকে। এটি অর্জনের বিভিন্ন উপায় রয়েছে। প্রথম উপায়টি হল ক্যাপসুলে প্রয়োজনীয় একমুখী বিভব (ডিসি পোটেনসিয়াল) সরবরাহ করার জন্য একটি ব্যাটারি ব্যবহার করা হয় (চিত্র ৪)। ক্যাপসুলের চার্জ ধ্রুবকের কাছাকাছি রাখার জন্য ক্যাপসুলের তারের রেজিস্ট্যান্স (রোধ) খুব বেশি রাখা হয়, ১০ মেগা ওহমের মধ্যে।
চিত্র ৪: অভ্যন্তরীণ ব্যাটারি চালিত কনডেন্সার মাইক্রোফোন
ক্যাপাসিটরের ওপর ধ্রুবক চার্জ প্রদানের একটি বিকল্প কৌশল হল মাইক্রোফোনের আউটপুট সংকেত বহনকারী মাইক্রোফোন কেবলের মাধ্যমে একটি ডিসি বৈদ্যুতিক বিভব সরবরাহ করা। সাধারণভাবে ব্যবহৃত মাইক্রোফোনের কেবলটি এক্সএলআর (XLR) কেবল নামে পরিচিত এবং এটির শেষে তিনটি সংযোগকারী পিন থাকে। প্রথম পিনটি কেবলের চারপাশের অন্তরকের সাথে সংযুক্ত থাকে। মাইক্রোফোনের সিগন্যাল দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পিনের মধ্যে দিয়ে প্রেরণ করা হয়।
চিত্র ৫: এক্সএলআর কেবলের মাধ্যমে একটি মিক্সিং কনসোলের সাথে সংযুক্ত ডাইনামিক মাইক্রোফোন
৪৮ ভোল্ট ফ্যান্টম পাওয়ারিং
[সম্পাদনা]মাইক্রোফোন কেবলের মাধ্যমে ডিসি বিভব প্রদানের সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো মাইক্রোফোন আউটপুট তিনটি পিনের মধ্যে, পিন ২ এবং ৩-এ +৪৮ ভোল্ট সরবরাহ করা এবং পিন ১-কে কেবলের অন্তরকে সংযুক্ত করে বর্তনীর গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করা। যেহেতু পিন ২ এবং ৩-এ একই বিভব থাকে, মাইক্রোফোনের পাওয়ারিং বিভবের যেকোনো ওঠানামা সংযুক্ত অডিও সরঞ্জাম মাইক্রোফোন থেকে যে সিগন্যাল পায় তার ওপর প্রভাব ফেলবে না। মাইক্রোফোনের +৪৮ ভোল্ট বিভবটিকে একটি স্টেপ ডাউন ট্রান্সফরমার ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাকপ্লেট ও ডায়াফ্রামে বিভব সরবরাহ করা হয়, যেভাবে সাধারণত ব্যাটারি দ্রবণে বিভব দেওয়া হয় সে একই ভাবে।
চিত্র ৬: কনডেন্সার মাইক্রোফোন পাওয়ারিং কৌশল
১২ ভোল্ট টি-পাওয়ারিং
[সম্পাদনা]তারের মাধ্যমে বিভব চালানোর একটি কম জনপ্রিয় পদ্ধতি হল পিন ২ এবং ৩ এর মধ্যে ১২ ভোল্ট সরবরাহ করা। এই পদ্ধতিটিকে টি-পাওয়ারিং বলা হয়। টি-পাওয়ারিংয়ের প্রধান সমস্যা হল ক্যাপসুলের পাওয়ারিংয়ে সম্ভাব্য ওঠানামা একটি অডিও সিগন্যালে হিসেবে প্রেরিত হয়ে যায় কারণ মাইক্রোফোন সিগন্যাল বিশ্লেষণকারী অডিও সরঞ্জামগুলি চাপের ওঠানামার কারণে পিন ২ এবং ৩-এর বিভবের পরিবর্তন এবং পাওয়ার উৎসের বৈদ্যুতিক বিভবের তারতম্যের কারণে তৈরি হওয়া বিভবের পরিবর্তনের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে না।
ইলেকট্রেট কনডেন্সার মাইক্রোফোন
[সম্পাদনা]পরিশেষে, ডায়াফ্রাম এবং ব্যাকপ্লেট এমন একটি উপাদান থেকে তৈরি করা যেতে পারে যা একটি স্থির চার্জ বজায় রাখে। এটি 'ইলেক্ট্রেট' নামে পরিচিত (বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রিক + চৌম্বক বা ম্যাগনেট থেকে, কারণ এই উপকরণগুলিকে স্থায়ী চুম্বকের বৈদ্যুতিক সমতুল্য হিসাবে দেখা যেতে পারে)। ফলস্বরূপ, এই মাইক্রোফোনগুলিকে ইলেকট্রেট কনডেন্সার মাইক্রোফোন (ইসিএম) বলা হয়। প্রাথমিক ইলেকট্রেটগুলিতে, সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে উপাদানের ওপর চার্জ স্থির থাকত না। বিজ্ঞান এবং উৎপাদন ক্ষেত্রে অগ্রগতি বর্তমান নকশাগুলিতে এই সমস্যাটি কার্যকরভাবে দূর করেছে।
উপসংহার
[সম্পাদনা]বিনোদন শিল্পে দুই ধরণের মাইক্রোফোন ব্যবহার করা হয়।
- ডাইনামিক মাইক্রোফোন, যা গতিশীল-কয়েল এবং রিবন বিন্যাসে পাওয়া যায়। ডাইনামিক মাইক্রোফোনে পরিবাহীর চলনের ফলে বৈদ্যুতিক প্রবাহ উৎপন্ন হয়, যেটি রূপান্তরিত হয় শব্দে।
- কনডেন্সার মাইক্রোফোনে ক্যাপাসিটরের ধর্মকে ব্যবহার করা হয়। কনডেন্সার মাইক্রোফোনের ক্যাপসুলের চার্জ সম্পন্ন করা যেতে পারে ব্যাটারি, ফ্যান্টম পাওয়ারিং, টি-পাওয়ারিং এবং 'ইলেকট্রেট' বা নির্দিষ্ট চার্জযুক্ত উপকরণ ব্যবহার করে।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]-সাউন্ড রেকর্ডিং হ্যাণ্ডবুক। ওরাম, জন এম. ১৯৮৯।
-হ্যান্ডবুক অফ রেকর্ডিং ইঞ্জিনিয়ারিং, চতুর্থ সংস্করণ। আর্গল, জন। ২০০৩।
মাইক্রোফোন উৎপাদকের লিঙ্ক
[সম্পাদনা]প্রকৌশল শব্দবিজ্ঞান-এ ফেরত যান।
