বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রকৌশল শব্দবিজ্ঞান/বেসেল ফাংশন ও কেটলড্রাম

উইকিবই থেকে

সারাংশ

[সম্পাদনা]

এর আগের অধ্যায়ে আমরা বহুমাত্রিক তরঙ্গ সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান করতে শিখেছি। এই বহুমাত্রিক তরঙ্গের ক্ষেত্রে আকর্ষনীয় বিষয় হল, বিভিন্ন রকম সীমান্ত শর্তাবলির প্রয়োগ এবং তার সমাধান। বহুমাত্রিক তরঙ্গের ক্ষেত্রে বৃত্তাকার সীমান্ত শর্তাবলি প্রযোজ্য হয় যার সামাধানের জন্য বেসেল ফাংশন ব্যাবহার হয়। এই ধরনের সমাধানের একটি বাস্তব উদাহরণ হল কেটলড্রাম নামের বাদ্যযন্ত্রটি। এই পাতায় সহজ ভাষায় বোঝানো হবে যে কেটলড্রাম কিভাবে শব্দ উৎপন্ন করে। এই আলোচনায় আমরা আমরা কেটলড্রামকে একটি বৃত্তাকার ঝিল্লি (বা চামড়া টানা পাত্র) হিসেবে বিবেচনা করব এবং তার কম্পনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেব। এখানে বেসেল ফাংশনের চিত্র, কেটলড্রাম বাজানোর ভিডিও এবং শব্দের (অডিও ফাইল) সাহায্যে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হবে। এছাড়াও, যারা আরও বিস্তারিত জানতে চান, তাদের জন্য অতিরিক্ত লিঙ্ক ও তথ্যসূত্রও দেওয়া থাকবে।

কেটলড্রাম কি?

[সম্পাদনা]

কেটলড্রাম এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র, যেটি দেখতে অনেকটা হাঁড়ির মতো এবং এর ওপর একটি গোলাকার এক টুকরো চামড়া দিয়ে ঢাকা থাকে, যাকে বলা হয় ড্রামহেড। এই ড্রামহেডে কাঠের তৈরি একটি দন্ড (যাকে বলা হয় মালেট) দিয়ে মারলে সোই চামড়ার আবরনে কম্পন সৃষ্টি হয়, আর সেই কম্পন থেকেই শব্দ তৈরি হয়। এই শব্দ কেমন হবে— তীব্র নাকি লঘু—তা নির্ভর করে ড্রামহেডের চামড়ার আবরনকে কতটা টেনে লাগানো হয়েছে। কেটলড্রাম বাদ্যযন্ত্র হিসাবে ব্যাবহার করার আগে চামড়ার টান ঠিকমতো মেলানো হয়, যাতে বাজানোর সময় সঠিক সুর পাওয়া যায়। কেটলড্রামের এই বাজনাকে ধ্রুপদী সঙ্গীতে টিম্পানি বলা হয় সারা বিশ্বের অনেক ধরনের গানে এই কেটলড্রামের সুর শোনা যায়।

কেটলড্রামের ধারণার গাণিতিক ভিত্তি: সংক্ষিপ্ত সংস্করণ

[সম্পাদনা]

কেটলড্রাম কীভাবে শব্দ তৈরি করে তা বুঝতে হলে আমাদের মূলভাবে নজর দিতে হবে ড্রামহেডের দিকে। এই যন্ত্রে একটি গোলাকার পাতলা চামড়া (যাকে মেমব্রেন বা ঝিল্লি বলা হয়) একটি পাত্রের মতো খোলার ওপর টানটান করে লাগানো থাকে। এই চামড়ায় যখন হাতুড়ির মতো মালেট দিয়ে আঘাত করা হয়, তখন সেটা কাঁপে। এই কম্পনের ফলে ড্রামের ভেতরের বাতাসও কাঁপে, আর এভাবেই শব্দ তৈরি হয়। এই কম্পনের পিছনে যে গাণিতিক যুক্তি আছে তা তুলনামূলকভাবে সহজ। আমরা যদি ড্রামহেডের একটা ছোট অংশ কল্পনা করি, তাহলে সেটা অনেকটা একটা টানা তারের মতো আচরণ করে। পার্থক্য শুধু এই যে, তারের ক্ষেত্রে কম্পন একদিক দিয়ে হয়, কিন্তু ড্রামহেডে সেটা দুই দিকেই হয় কারণ এটি একটি সমতল পৃষ্ঠে বিস্তৃত। এই দুই দিকের কম্পনকে বোঝাতে একটি বিশেষ গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার করা হয়, যাকে হেল্মহোল্‌টজ সমীকরণ বলা হয়। এই সমীকরণ সমাধান করতে হলে আমরা ধরে নিই, ড্রামহেডের স্থানচ্যুতি অর্থাৎ ড্রামহেডে কতটা কম্পন সৃষ্টি হচ্ছে, তা পরিমাপের জন্য দুইটি আলাদা ফাংশনের গুণফল করা হয় —একটি কৌণিক স্থানচ্যুতির জন্য (θ) এবং অন্যটি চামড়ার আবরনের ব্যাসার্ধের জন্য (r)। এই উপায়ে বড় সমীকরণটি দুইটি ছোট সমীকরণে ভাগ হয়ে যায়, যেগুলি সমাধান করা অনেক সহজ। এইভাবে, কেটলড্রামের কম্পন এবং শব্দ তৈরি হওয়ার পদ্ধতি আমরা গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারি। নিচে আরও বিশদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

কেটলড্রামের ধারণার গাণিতিক ভিত্তি: অন্তরকলন

[সম্পাদনা]

হেল্মহোল্‌টজ সমীকরণ অনুসারে;

এখানে k হল তরঙ্গ সংখ্যা অথবা বলকৃত কম্পনের কম্পাঙ্ক যাকে চামড়ার আবরনে উৎপন্ন শব্দের গতিবেগ দিয়ে ভাগ করা হচ্ছে।

যেহেতু আমরা এখানে গোলাকার বস্তু নিয়ে কাজ করছি, তাই কার্তেসীয় স্থানাঙ্কের পরিবর্তে মেরু স্থানাঙ্ক (ব্যাসার্ধ এবং কৌনিক অবস্থান) বিবেচনা করা যুক্তিসংগত। মেরু স্থানাঙ্কের নিরিখে হেল্মহোল্‌টজ সমীকরণের ল্যাপ্লেসীয় মান () -টি হবে;

এবার ধরে নেওয়া যাক যে:

চলরাশির পৃথকীকরণের পদ্ধতি অনুসরণ করে উপরিউক্ত অনুমানটি করা হয়। (অতিরিক্ত তথ্যের জন্য তথ্যসূত্রের তৃতীয় লিংক দেখুন)। এই মানটি হেল্মহোল্‌টজ সমীকরণে প্রয়োগ করলে আমরা পাই,

যেহেতু আমরা সমীকরনের সমাধানের জন্য ব্যাবহৃত চলরাশিগুলিকে দুটি এক-মাত্রিক ফাংশনে বিভক্ত করেছি, তাই আংশিক অন্তরকলনগুলি সাধারণ অন্তরকলনে পরিণত হয়। সমীকরনের উভয়পার্শ্বকেই একটি নির্দিষ্ট ধ্রুবরাশির সমান হতে হবে। সহজতার জন্য এখানে -কে ধ্রুবক হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে নিম্নলিখিত দুটি সমীকরণ তৈরি হয়:

প্রথম সমীকরণটি একটি আদর্শ দ্বিতীয় ক্রমের সাধারণ অবকল সমীকরণ যার সমাধান হয় সাইন ও কোসাইনের মাধ্যমে, যেখানে কম্পনের কম্পাঙ্ক নির্ধারিত হয় দ্বারা। দ্বিতীয় সমীকরণটি একটি বেসেল সমীকরণ। এই বেসেল সমীকরনের সমাধান বেসেল ফাংশন নামে পরিচিত। প্রথম ও দ্বিতীয় প্রকারের বেসেল ফাংশন, যেগুলির ক্রম হল - এই বেসেল ফাংশনগুলি প্রথমে দেখতে জটিল মনে হলেও এগুলো আসলে একটি বিশেষ ধরনের কম্পন রূপ। এক্ষেত্রে এই বেসেল ফাংশনগুলি মূলত কেটল্ড্রামের গোলাকার চামড়ার আবরনের ব্যাসার্ধ() ও বাদ্যযন্ত্রে উৎপন্ন শব্দের তরঙ্গসংখ্যার () গুণফলের উপর নির্ভরশীল। এখানে সমীকরনে ব্যাবহৃত চিহ্ন অনুসারে তরঙ্গসংখ্যা ও ব্যাসার্ধের এই গুনফল হল । এই -এর মান কমতে থাকলে বেসেল ফাংশনের মান অসীম হয়ে পড়ে এবং -এর মান বাড়লে হলে এই ফাংশনের মান দ্রুত ক্ষয় পেতে শুরু করে। (এই ফাংশনগুলি সম্পর্কে আরও তথ্যের জন্য তথ্যসূত্রের ১ম, ২য় এবং ৩য় লিংক দেখুন)

এখন যেহেতু আমাদের কাছে এই সমীকরণের সাধারণ সমাধান আছে, আমরা এখন পরবর্তী বিশ্লেষনের জন্য একটি অসীম ব্যাসার্ধের কেটলড্রাম বিবেচনা করতে পারি। কিন্তু অসীম ব্যাসার্ধের কেটলড্রাম বাস্তবে অনুপস্থিত, তাই আমরা একটি সীমাবদ্ধ ব্যাসার্ধের মান বিবেচনা করলাম। যেহেতু কেটল্ড্রামের ড্রামহেডের প্রান্তের সাথে চামড়ার আবরনটি খুব ভালোভাবে টেনে লাগানো থাকে, তাই আমরা বিবেচনা করতে পারি যে কেটল্ড্রামের প্রান্তে চামড়াটির কোনো প্রকার স্থানচ্যুতি হতে পারে না। এই সীমান্ত শর্তটিকে নিম্নরূপে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করা যায়:

এখানে হল কেটল্ড্রামের ব্যাসার্ধ। এছাড়াও সমাধানের জন্য আরেকটি শর্ত প্রয়োগ হবে যে, ড্রামহেডের কেন্দ্রস্থলে স্থানচ্যুতি সীমিত থাকতে হবে, অর্থাৎ কেন্দ্রস্থলে চামড়ার পর্দার স্থানচ্যুতি অসীম হতে পারবে না। এই শর্তের ফলে উপরে উল্লিখিত দ্বিতীয় প্রকার বেসেল ফাংশনটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে পরিবর্তিত মানটি হল;

এখানে হল উপরে উল্লিখিত -তম ক্রমের প্রথম বেসল ফাংশন। ড্রামের ব্যাসার্ধের নিরিখে আরোপিত সীমান্ত শর্তাবলীর জন্য তরঙ্গসংখ্যা -এর নির্দিষ্ট কিছু বিচ্ছিন্ন মান থাকা আবশ্যক এবং এই বিচ্ছিন্ন মানগুলি মূলত -এর দ্বারা সূচিত হয়। এই সব তথ্য একত্র করে আমরা ড্রামহেডের কার্যাবলীর জন্য একটি পূর্ণ গাণিতিক সমাধান পাই, যা নিম্নরূপ:

কেটলড্রামের ধারণার গাণিতিক ভিত্তি: সম্পূর্ণ ড্রাম

[সম্পাদনা]

উপরে যা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তা শুধুমাত্র কেটলড্রামের চামড়ার আবরনটির জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তব কেটলড্রামে এই বৃত্তাকার চামড়ার আবরনের এক পাশে একটি বদ্ধ গহ্বর বা ফাঁপা কাঠামো থাকে। যখন আঘাতের ফলে চামড়ার পর্দা কম্পিত হয়, তখন সেই গহ্বরে বাতাস সংকুচিত হয়। এই ক্রিয়াটি বিবেচনা করলে উপরের গাণিতিক ব্যাখাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। গাণিতিক দিক থেকে দেখলে, এই বদ্ধ গহ্বর বা ফাঁপা কাঠামোর উপস্থিতির জন্য হেলমহল্টজ সমীকরণকে জটিল করে তোলে। মূল সমীকরণে একটি অতিরিক্ত উপাদান যুক্ত হয় যা সমাধান প্রক্রিয়াটিকে অনেক বেশি জটিল করে তোলে। এই অতিরিক্ত বিশ্লেষণ এখানে করা হবে না, কারণ এটি অনেক দীর্ঘ এবং বিশদ ব্যাখ্যা দাবি করে। যাঁরা এই বিষয়ে আরও জানতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য তথ্যসূত্রে ৬ এবং ৭ নাম্বার লিংকে উল্লিখিত দুটি বইতে এই বিষয়গুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

অতিরিক্ত তথ্যের জন্য

[সম্পাদনা]

উপরের সূত্র থেকে দেখা যাচ্ছে যে, কেটলিড্রামের গাণিতিক ব্যাখা খুবই আকর্ষণীয়। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এই বাদ্যযন্ত্রের একটি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক সঙ্গীত ঐতিহ্যও রয়েছে। যেহেতু এই পৃষ্ঠাটিতে শুধুমাত্র গাণিতিক বিশ্লেষণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে, তাই নীচে এই বাদ্যযন্ত্রের সমৃদ্ধ ইতিহাসের অধ্য্যন করার জন্য কিছু লিঙ্ক দেওয়া হল,

পারস্যের কেটলড্রামের আলোচনা: ইরান এবং অন্যান্য দেশের কেটলড্রাম

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কেটলড্রামের আলোচনা: কেটল ড্রাম লিট

কেটলড্রাম ইতিহাস, নির্মাণ এবং কৌশলের জন্য একটি বিশাল সম্পদ; ভিয়েনা সুর সংগ্রহশালা

উইকিবুক উদ্ধৃতি, টিম্পানি: উইকিপিডিয়া তথ্যসূত্রের অধীনস্থ তথ্যভান্ডার থেকে

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. এরিক ডব্লিউ. ওয়েইস্টাইন। "প্রথম প্রকারের বেসেল ফাংশন।" ম্যাথওয়ার্ল্ড—এ উলফ্রাম ওয়েব উৎস থেকে।"
  2. এরিক ডব্লিউ. ওয়েইস্টাইন। "দ্বিতীয় ধরণের বেসেল ফাংশন।" ম্যাথওয়ার্ল্ড—এ উলফ্রাম ওয়েব উৎস থেকে।
  3. এরিক ডব্লিউ. ওয়েইস্টাইন। "বেসেল ফাংশন।" ম্যাথওয়ার্ল্ড—এ উলফ্রাম ওয়েব উৎস থেকে।
  4. এরিক ডব্লিউ. ওয়েইস্টাইন এবং অন্যান্য। "চলক পৃথকীকরণ।" ম্যাথওয়ার্ল্ড—এ উলফ্রাম ওয়েব উৎস থেকে।
  5. এরিক ডব্লিউ. ওয়েইস্টাইন। "বেসেল ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশন।" ম্যাথওয়ার্ল্ড—এ উলফ্রাম ওয়েব উৎস থেকে।
  6. কিনসলার এবং ফ্রে, "ফান্ডামেন্টালস অফ অ্যাকোস্টিক্স", চতুর্থ সংস্করণ, উইলি অ্যান্ড সন্স
  7. হ্যাবারম্যান, "অ্যাপ্লাইড পার্শিয়াল ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশনস", চতুর্থ সংস্করণ, প্রেন্টিস হল প্রেস