বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রকৌশল শব্দবিজ্ঞান/টারবাইন ব্লেডের শব্দ

উইকিবই থেকে

ভূমিকা

[সম্পাদনা]

তরল পদার্থে শব্দ তরঙ্গের গতিপ্রকৃতি বোঝা ও অনুমান করা বেশ কঠিন। তরল পদার্থে শব্দ তরঙ্গের গতিপ্রকৃতি ব্যাখাকারী বেশিরভাগ গাণিতিক নিয়মগুলি জটিল অরৈখিক সমীকরণের মাধ্যমে ব্যাখা করা হয়। শব্দ সাধারণত তখনই উৎপন্ন হয় যখন রেইনল্ডস সংখ্যা -এর মান অত্যন্ত উচ্চ হয় কারন রেইনল্ডস সংখ্যার মান উচ্চ হলে তরলের জড়তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তরলের সান্দ্রতা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদিও তরলের ভেতরে অনেক শক্তির সঞ্চার ঘটে কিন্তু এর মধ্যে শব্দ উৎপন্ন হয় খুব অল্প পরিমাণে, বিশেষ করে যখন তরলের গতি সাবসনিক (শব্দের চেয়ে কম) হয় এবং তরল মাধ্যমের পরিপার্শ্বে মুক্ত বাতাসের উপস্থিতি থাকে। তরলের জটিল প্রবাহে শব্দ তরঙ্গের গতিপ্রকৃতি ও ধর্ম বুঝতে বিজ্ঞানীরা অ্যারোঅ্যাকোস্টিক্স বা বায়ুশব্দবিজ্ঞান নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এখানে তারা তরলের একটি আদর্শ প্রবাহ বিবেচনা করে বাস্তবিক জগতে তরলের প্রবাহের সাথে তার পার্থক্য খুঁজে বের করে এবং তার মাধ্যমে তরলে শব্দের উৎসের কারন বিশ্লেষণ করেন। এবার কোন মাধ্যমে শব্দ কিভাবে উৎপন্ন হয় এবং কীভাবে বিস্তার লাভ করে, তা বোঝার জন্য ব্যবহার করা হয় গ্রীনের ফাংশন নামক একটি বিশেষ গাণিতিক পদ্ধতি। এই গাণিতিক পদ্ধতির সাহায্যে দেখানো যায় যে, যদি আমরা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় শব্দ উৎপন্ন করি তাহলে সেই শব্দ তার উৎস থেকে কীভাবে চারপাশে বিস্তার লাভ করবে। এই গ্রীনের ফাংশনকে প্রকাশ করা হয় একটি বিশেষ গাণিতিক রূপে, যেখানে স্থান ও সময় অনুযায়ী একটি ক্ষণিক ডেল্টা ফাংশন ব্যবহার করা হয়। গ্রীণের ফাংশনটি হল:

সংক্ষেপে, অ্যারোঅ্যাকোস্টিক্স বা বায়ুশব্দবিজ্ঞান হলো বিজ্ঞানের এমন একটি শাখা যেখানে তরল মাধ্যমে শব্দের গতিপ্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করে এবং এটি বিশেষ করে টারবাইন বা ইঞ্জিনে উৎপন্ন শব্দ বিশ্লেষণ করতে ব্যবহার হয়।

টারবাইনের পাখার স্থানচ্যুতি জনিত শব্দ (একমেরু বিশিষ্ট শব্দ উৎস)

[সম্পাদনা]

টারবাইনের পাখার স্থানচ্যুতি থেকে উৎপন্ন শব্দ একটি একক মেরু বিশিষ্ট শব্দ উৎস বা মোনোপোল উৎস, অর্থাৎ এটি এমন এক ধরনের শব্দ উৎস যার থেকে সবদিকে সমান তীব্রতায় ও সমানভাবে শব্দ ছড়িয়ে পরে। এই ধরণের শব্দ সাধারণত টার্বাইন ও হেলিকপ্টারের পাখা থেকে তৈরি হতে পারে।

একক মেরুবিশিষ্ট শব্দ উৎসকে একটি প্রসারনকারী গোলকের সাথে তুলনা করা যায় যেটি তার নিজ ব্যাসার্ধ বরাবর প্রসারিত হচ্ছে। যদি এই গোলকটি একটি অসীম, অভেদ্য মাধ্যমে স্পন্দিত হয়, তবে এটি এমন একটি বৃত্তাকার তরঙ্গ তৈরি করে যাকে নিম্নের সমীকরনের মাধ্যমে বিশ্লেষন করা যায়:

এখানে -এর মান একটি আনুমানিক সীমানা শর্ত থেকে নির্ধারিত হয়।

এবার একটি গড় ব্যাসার্ধ গোলক (ব্যাসার্ধের পরিমান ) বিবেচনা করা যাক, যা গতিতে কম্পিত হচ্ছে। এই অবস্থায় সৃষ্ট গোলীয় তরঙ্গের নির্দিষ্ট শব্দীয় প্রতিবাধা হবে:

যেখানে, । তাহলে, সেই গোলকের পৃষ্ঠের চাপ হবে:


এর ফলে, -এর মান হবে:


ফলে, কোনো বিন্দুতে (যেখানে r > a), সেই গোলকের উৎপন্ন চাপ হবে:


এইভাবে, ব্লেড স্থানচ্যুতি থেকে উৎপন্ন শব্দকে একটি গোলীয় তরঙ্গরূপে বিবেচনা করে তার বিশ্লেষণ করা যায় যা সময় ও স্থানের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।


স্বনসংক্রান্ত শব্দ (দ্বিমেরু শব্দ বিশিষ্ট উৎস)

[সম্পাদনা]

কোন ঘূর্ণনশীল যন্ত্রে, যেমন টারবাইনের পাখা ঘোড়ে, তখন তার থেকে একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি হয়। এই ধরনের শব্দকে স্বনসংক্রান্ত শব্দ বা টোনাল শব্দ বলে। এই ধরনের শব্দ মূলত দ্বিমেরু বিশিষ্ট শব্দ উৎস বা ডাইপোল শব্দ উৎস থেকে উৎপন্ন হয়। কোন শব্দ তরঙ্গের উৎসকে তখনই দ্বিমেরু শব্দ উৎস হিসাবে বিবেচনা করা হয় যখন তার সাথে চাপের তারতম্য জনিত কোন ঘটনা যুক্ত থাকে। উদাহরণস্বরূপ: টারবাইনের ঘূর্ণনকারী পাখায় যে চাপের ওঠানামা ঘটে, তা দ্বিমেরু বিশিষ্ট শব্দ উৎস। যদি সমান শক্তির দুটি একক মেরুর শব্দ উৎস বিপরীতমুখী হয় এবং একে অপরের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে, তাহলে সেগুলো সম্মিলিতভাবে একটি দ্বিমেরু শব্দ উৎসের ন্যায় আচরন করে। দ্বিমেরু শব্দ উৎসের আরও একটি উদাহরণ হল, একটি শক্ত গোলক যার কেন্দ্র একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে অনুরণিত হচ্ছে; এই গোলকটি চারপাশে যদি তরল পদার্থের উপস্থিতি থাকে তাহলে গোলকটি সেই তরলের উপর ওপর যে মোট বল বা চাপ প্রয়োগ করে, সেই চাপকে একটি ক্ষেত্রীয় সমাকলন বা সারফেস ইন্টেগ্রাল -এর মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। গোলকের যে পৃষ্ঠের নিরিখে এই ক্ষেত্রীয় সমাকলন করা হবে তার স্থানাঙ্ক এবং প্রতিসাম্যের জন্য এই বিশ্লেষণে শুধুমাত্র z অক্ষ বরাবর বলের যে উপাদানটি বর্তমান তা বিবেচনা করতে হবে, (ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রের x , y এবং z অক্ষ, যেহেতু এখানে একটি ত্রিমাত্রিক বল বিবেচনা করা হচ্ছে যার উপদান x , y এবং z অক্ষ বরাবর বিভাজিত এবং বিন্যস্ত)। বলটির গাণিতিক রূপ হল;


বায়ু টারবাইন ব্লেড থেকে শব্দ (ঘর্ষণজনিত শব্দ)

[সম্পাদনা]

টারবাইনের পাখার সাথে বায়ু বা অন্যান্য মাধ্যমের ঘর্ষনের ফলে একটি যান্ত্রিক শব্দ সৃষ্টি হয় যা একটি বহুকালীন সমস্যা। এই যান্ত্রিক শব্দকে ফ্লাটার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। পাখার ধাতব পাত ও কেন্দ্রের গোলাকার চাকতির পুরুত্ব কমানো হয়েছে এবং তাদের দৈর্ঘ্য বনাম প্রস্থের অনুপাত বাড়ানো হয়েছে, যাতে পাখার কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা যায়। এর ফলে পাখার কাঠিণ্য কমে যায় এবং স্বাভাবিকভাবেই কম্পন-সংখ্যাও কমে যায় যেগুলি অবশেষে ওই যান্ত্রিক শব্দের উৎপাদনের কারন হয়ে দাড়ায়। এই যান্ত্রিক শব্দের তীব্রতা পাখার কম্পনের উপর নির্ভরশীল। পাখায় যান্ত্রিক শব্দ হলে পরিপার্শ্বের মাধ্যমের সাপেক্ষে, পাখার উপর চাপের তারতম্য ঘটতে দেখা যায়, এবং এটি একটি দ্বিমেরু শব্দ উৎসের ন্যায় আচরন করে।

গ্যাস টারবাইন থেকে শব্দ

[সম্পাদনা]

গ্যাস টারবাইনে শব্দের তিনটি প্রধান উৎস: টারবাইন সংলগ্ন নলের সঙ্কীর্ণ অংশ বা ইনটেক, বায়ু নিষ্কাশন প্রনালী বা এক্সস্ট এবং যন্ত্রাংশের উপর ব্যাবহৃত আবরণ বা কেসিং। ইনটেকে শব্দ সৃষ্টি হয় কেন্দ্রস্থিত ঘূর্ণায়মান ভ্রামক (রোটর) এবং বৈদ্যুতিক মোটর (স্টেটরের) -এর পাসস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমে। এছাড়াও পাখার সংখ্যা, প্রান্তীয় অঞ্চলের গতি এবং চাপের বৃদ্ধির উপর এই শব্দ উৎপাদনের কারণ নিহিত থাকে। ইনটেক অংশ থেকে উৎপন্ন শব্দের তীব্রতা সামগ্রিকভাবে এক্সস্ট শব্দের তুলনায় কম, কিন্তু এর কম্পাঙ্ক, এক্সস্ট অঞ্চলে উৎপন্ন শব্দের তুলনায় অনেক বেশি। এক্সস্ট বা নিশকাশন প্রনালী অঞ্চলে উৎপন্ন শব্দের বিস্তার বেশি এবং কম্পাঙ্ক কম থাকে। কেসিং বা যন্ত্রাংশের আবরন অংশে শব্দ উৎপন্ন হয় উচ্চ গতির অসংলগ্ন যান্ত্রিক উপাদানগুলোর মাধ্যমে। নীতিগতভাবে, গ্যাস টারবাইনে শব্দের এই স্বাভাবিক উৎপত্তি বায়ুগতিবিদ্যার সাথে সম্পর্কিত। গ্যাস টারবাইনের কার্যকারিতা বায়ুর গতি এবং গ্যাসের দহন ক্রিয়ার সাথেও সম্পর্কিত।

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]
  1. পিয়ার্স, এডি, এবং বেয়ার, আরটি (১৯৯০)। প্রকৌশল শব্দবিজ্ঞান: এর ভৌত নীতি ও প্রয়োগের পরিচিতি। (মূল নাম-অ্যাকোস্টিকস: অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ইটস ফিজিক্যাল প্রিন্সিপলস অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশনস।) ১৯৮৯ সংস্করণ। ২। কিনসলার, এলই, ফ্রে, এআর, কোপেনস, এইচবি, স্যান্ডার্স, জেভি, এবং সন্ডার্স, এইচ. (১৯৮৩)। প্রকৌশল শব্দবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়।
  2. কিনসলার, এলই, ফ্রে, এআর, কোপেনস, এইচবি, স্যান্ডার্স, জেভি, এবং সন্ডার্স, এইচ. (১৯৮৩)। ধ্বনিবিদ্যার মৌলিক বিষয়।
  3. সান্দিয়া
  4. গ্যাস টারবাইন