প্রকৌশল শব্দবিজ্ঞান/অরৈখিকতার শব্দীয় পরামিতি
অরৈখিকতার শব্দীয় পরামিতি
[সম্পাদনা]প্রকৌশল শব্দবিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রয়োগক্ষেত্রে, কোন অরৈখিক শব্দ তরঙ্গ কোন শব্দ পরিবাহী মাধ্যমে (যেমন: গ্যাস, তরল ইত্যাদিতে) কেমন এবং কিভাবে আচরণ করে তা বোঝাতে একটি একক মান ব্যবহার করা হয়, যাকে বলা হয় অরৈখিকতার শব্দীয় পরামিতি বা প্যারামিটার অফ নন-লিনিয়ারিটি। এই ধারণাটি মূলত রবার্ট টি. বায়ার ১৯৬০ সালে তাঁর তরল মাধ্যমে অরৈখিকতার পরামিতি[১] শীর্ষক গবেষণাপত্রে উপস্থাপন করেন এবং পরে তাঁর লেখা অরৈখিক শব্দবিজ্ঞান[২] নামক বইতেও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন, যদিও এই ধারণার মূল উৎস হিসেবে তিনি ফক্স ও ওয়ালেস-এর ১৯৫৪ সালের একটি পুরনো গবেষণাপত্রের কথা উল্লেখ করেছিলেন।[৩]
অরৈখিকতার শব্দীয় পরামিতি নামক ধারনার গাণিতিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে টেইলর সিরিজের উপর ভিত্তি করে। এই টেলর সিরিজের সাহায্যে যেকোন শব্দ পরিবাহী মাধ্যমে চাপ (p ') ও ঘনত্বের (ρ ') ক্ষুদ্র পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়। পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, একটি নির্দিষ্ট এবং পরিবেষ্টিত অবস্থার নিরিখে এই ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলির পরিমাপ করা হয়, যেখানে ঘনত্ব ρo এবং এন্ট্রপির মাত্রা হল ধ্রুবক (s = so)। বিশদ বুঝতে নিম্নের গাণিতিক শ্রেনীটি লক্ষ্য করুন।
এখানে A, B এবং C হল বিভিন্ন গুণাঙ্ক, যা শব্দ পরিবাহী মাধ্যমের চাপ ও ঘনত্বের পরিবর্তনের মধ্যেকার গভীর সম্পর্ক বা অরৈখিকতাকে বোঝানোর জন্য ব্যাবহার করা হয়। A গুণাঙ্কটি সরল (রৈখিক) সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা করতে আর B ও C গুণাঙ্কগুলি উচ্চতর (অ-রৈখিক) প্রভাব বোঝাতে ব্যাবহার করা হয়। এই গুণাঙ্কগুলি বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায়। B ও C গুণাঙ্কগুলির একক প্রধানত বর্গমান ও ঘনমানে নির্ধারিত হয়, এই গুণাঙ্কগুলি শব্দ পরিবাহী মাধ্যমের চাপ (p ') ও ঘনত্ব (ρ)-এর সম্পর্কের অ-রৈখিকতার পরিমাণ নির্দেশ করে। A, B এবং C গুণাঙ্কগুলিকে বিভিন্ন পরীক্ষামূলক কৌশলের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায়।[২][৪][৫]
এছাড়াও, যদি চাপ ও ঘনত্বের মধ্যেকার একটি গঠনগত সম্পর্ক জানা থাকে, তাহলে টেইলর সিরিজের সাহায্যে A, B এবং C -এই গুণাঙ্কগুলোর মান হিসাব করা সম্ভব। এই উদ্দেশ্যে আদর্শ গ্যাস সমীকরণ বা টেইট সমীকরণ ব্যবহার করার পদ্ধতি পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হয়েছে।
টেইলর সিরিজের গুণাঙ্কগুলোর গাণিতিক সংজ্ঞা নিম্নরূপ:
এখানে পরিবেষ্টিত শব্দবেগ (অ্যাম্বিয়েন্ট সাউন্ড স্পীড) -এর সংজ্ঞা, (∂p/∂ρ)ρo,so = co2 -এর ব্যাবহার করা হয়েছে। উপরোক্ত সমীকরনে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, A গুনকের মান হল, A = ρo co2। বেশিরভাগ অরৈখিক শব্দ-প্রকৌশল বিদ্যা সম্পর্কিত সমস্যার ক্ষেত্রে টেইলর সিরিজের প্রথম দুটি পদই ঘনত্বের পরিবর্তনের পরিসর বোঝানোর জন্য যথেষ্ট। সেক্ষেত্রে, টেইলর সিরিজের সংক্ষিপ্ত রূপ হল:
-এই সংক্ষিপ্ত টেলর সিরিজের রূপ থেকেই কোন তরল মাধ্যমের অরৈখিকতার পরামিতির ধারনা পাওয়া যায় যা B/A হিসাবে পরিচিত। যদি সংক্ষিপ্ত টেইলর ধারার উভয় পদ থেকে A = ρo co2 -কে উপাংশ হিসেবে নিস্কাশিত করে নেওয়া হয়, তাহলে B/A-এর ভৌত গুরুত্ব আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়:
এই রাশিটির মাধ্যমে এই বিষয়টি লক্ষ্য করা যায় যে, B/A অনুপাতটি আসলে মাধ্যমের নির্ধারিত ঘনত্ব অবস্থা ρ' / ρo -এর জন্য স্থানীয় শাব্দিক চাপের অস্থিরতার উপর অ-রৈখিকতার প্রভাবকে পরিমাপ করে। অনুরূপভাবে, এটাও দেখানো যায় যে B/A অনুপাতটি ঘনত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় শব্দগত বেগের পরিবর্তনকে নিম্নলিখিতভাবে পরিমাপ করে:[৪]
শক্তি-নিয়মের অবস্থান সমীকরণ ও অরৈখিকতার সম্পর্ক
[সম্পাদনা]অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এমন পদার্থ নিয়ে কাজ করি যেগুলোর চাপ ও ঘনত্বের মধ্যেকার সম্পর্ক পদার্থবিদ্যার শক্তি-নিয়ম ভিত্তিক এক বা একাধিক সমীকরণ দিয়ে বোঝানো যায়। যেমন: তরল পদার্থের জন্য টেইট-কির্কউড ইওএস বা টেট সমীকরণ[৬][৪] অথবা আদর্শ গ্যাসের জন্য আইসেনট্রপিক সংকোচন [৭] ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার সমীকরণ ব্যবহার করে আমরা তরল বা গ্যাসের মধ্যে অরৈখিকতার মাত্রা নির্ধারণ করতে পারি। মূলত B/A পরামিতির মাধ্যমেই অরৈখিকতার মাত্রা নির্ধারিত হয়। শব্দ পরিবাহী মাধ্যমে চাপ ও ঘণত্বের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কটি বোঝাতে প্রথমে ঘনত্বের পরিবর্তনের তুলনায় চাপের আংশিক পরিবর্তন, ∂p/∂ρ,গণনা করা হয় টেট সমীকরণ ব্যবহার করে। এরপর এই মানগুলি টেলর সিরিজে ব্যাবহার করে প্রতিক্রিয়াশীল চাপ p' -এর মান নির্ণয় করে দেখানো যায় যে, কীভাবে চাপের ক্ষুদ্র পরিবর্তন ঘনত্বের ক্ষুদ্র পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যখন টেইট সমীকরণের পরিবর্তে আদর্শ গ্যাসের সমীকরণ ব্যবহার করা হয়, তখনও ফলাফলটি একই রকম থাকে, যা নিচে প্রদর্শিত হয়েছে:
যখন ঘনত্বের মান পরিবেষ্টিত (ρ = ρo), তখন চাপের প্রথম অন্তরকলজ (∂p/∂ρ) -এর হিসাব করার মাধ্যমেও আমরা শব্দের রৈখিক বেগ নির্ণয় করতে পারি। এই রৈখিক শব্দগত বেগের একটি সহজ সূত্র হলো:
co2 = γ(Po+D) / ρo
এখানে,
- co হলো শব্দের বেগ,
- γ হলো গ্যাসের জন্য নির্দিষ্ট একটি ধ্রুবক,
- Po হলো পরিবেষ্টিত চাপ,
- D হলো টেট সমীকরণে ব্যবহৃত একটি ধ্রুবক,
- এবং ρo হলো পরিবেষ্টিত ঘনত্ব।
এই সূত্রটি ব্যবহার করে আমরা চাপের পরিবর্তন ও ঘনত্বের মধ্যে সম্পর্ককে সহজভাবে নির্ধারণ করতে পারি। এরপর যখন আমরা ∂p/∂ρ -এর মান ব্যাবহার করে চাপের দ্বিতীয় ক্রমের অন্তরকলন ∂2p / ∂ρ2 -এর হিসেব করি তখন:
যখন আমরা চাপের পরিবর্তন (p' ) -কে ঘনত্বের (ρ' ) পরিবর্তন অনুযায়ী বিশ্লেষণ করি, তখন টেইলর সিরিজে প্রথম ও দ্বিতীয় অন্তরকলজ (চাপ কীভাবে ঘনত্ব অনুযায়ী পরিবর্তিত হচ্ছে তার গাণিতিক রূপ) ব্যবহার করে আমরা একটি সমীকরণ পাই (যা আসলে শক্তি-নিয়মের অবস্থান সমীকরণ)। এই সমীকরণটি যদি আমরা কোনো নির্দিষ্ট ধরনের গ্যাস বা তরলের জন্য নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে (যেমন: টেইট সমীকরণ বা আদর্শ গ্যাস সমীকরণ) প্রয়োগ করি, তাহলে আমরা এমন কিছু ফলাফল পাই যেগুলোকে পূর্ব নির্ধারিত B/A পরামিতিযুক্ত টেইলর সিরিজের সঙ্গে তুলনা করা যায়।
এই শেষ সমীকরণটি থেকে বোঝা যায় যে, চাপ p' -এর জন্য যেই দুটি টেইলর সিরিজ ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলো আসলে এক, শুধুমাত্র তাদের মধ্যে একটিতে B/A ব্যাবহৃত হয়েছে আর অপরটিতে তার পরিবর্তে (γ-1) -এর ব্যাবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, যেসকল তরলের ক্ষেত্রে টেট-কির্কউড শক্তি সমীকরন প্রযোজ্য অথবা যেসকল আদর্শ গ্যাসে আইসেনট্রপিক সংকোচন -এর নিয়ম প্রযোজ্য তাহলে সেই তরল বা গ্যাসের অ-রৈখিকতার মাত্রা (B/A) হল-
এখানে γ হচ্ছে অ্যাডিয়াব্যাটিক সূচক, অর্থাৎ চাপ ও ঘনত্বের মধ্যে সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহৃত একটি ধ্রুবক।
অরৈখিকতার নমুনা মান
[সম্পাদনা]প্রথম সারণিতে বিভিন্ন গ্যাস, তরল এবং জৈবিক পদার্থের B/A পরামিতির মানগুলির একটি নমুনা প্রদান করা হয়েছে। প্রতিটি নমুনার সাথে সংস্লিষ্ট তাপমাত্রা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কারণ একটি নির্দিষ্ট পদার্থের জন্য B/A -এর মান তাপমাত্রার সাথে পরিবর্তিত হবে। দ্বিতীয় সারণিতে বেশ কয়েকটি জৈব পদার্থ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কারণ জৈব চিকিৎসার ক্ষেত্রে আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করা হলে তাতে অরৈখিক শব্দ তরঙ্গের প্রভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।[৮]
সারণি ১: তরল পদার্থের নমুনা B/A মান। উপাদান B/A রেফ. তাপমাত্রা. oসেলসিয়াস তথ্যসূত্র দ্বৈত-পরমাণু গ্যাস (বায়ু) ০.৪ ২০ [৪] পাতিত জল ৫.০ ২০ [৪] পাতিত জল ৫.৪ ৪০ [৪] লবণাক্ত জল ৫.৩ ২০ [৪] ইথানল ১০.৫ ২০
সারণি ২: জৈব পদার্থের জন্য নমুনা B/A মান। উপাদান B/A রেফ. তাপমাত্রা. oসেলসিয়াস তথ্যসূত্র গ্লিসারস ৯.১ ৩০ [৫] হিমোগ্লোবিন (৫০%) ৭.৬ ৩০ [৪] লিভার ৬.৫ ৩০ [৫] ফ্যাট ৯.৯ ৩০ [৫] কোলাজেন ৪.৩ ২৫ [৪]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Beyer, R.T., 1960. "Parameter of Nonlinearity in Fluids", J. Acoust. Soc. Am., Vol. 32(6).
- ↑ ২.০ ২.১ Beyer, R.T., 1997. "Nonlinear acoustics". Acoustical Society of America, Woodbury, NY.
- ↑ Fox, F.E., Wallace, W.A., 1954. Absorption of Finite Amplitude Soundwaves. J. Acoust. Soc. Am. Vol. 89.
- ↑ ৪.০ ৪.১ ৪.২ ৪.৩ ৪.৪ ৪.৫ ৪.৬ ৪.৭ ৪.৮ Beyer, R.T, 2008. The Parameter B/A. In Nonlinear Acoustics (eds. Hamilton, M. F., Blackstock, D. T.)
- ↑ ৫.০ ৫.১ ৫.২ ৫.৩ Sehgal, C.M., Bahn, R.C., et al., 1984. "Measurement of the acoustic nonlinearity parameter B/A in human tissues by a thermodynamic method." J. Acoust. Soc. Am., Vol. 76(4).
- ↑ Wikipedia: Tait equation
- ↑ Wikipedia: Isentropic process
- ↑ Cobbold, R.S.C., 2007. Foundations of Biomedical Ultrasound. Oxford University Press, New York.