পেশাদার ও কারিগরি লেখনী/প্রতিবেদন/পরিকল্পনা
পরিকল্পনা প্রতিবেদন
[সম্পাদনা]প্রতিবেদন শুরু করার আগে প্রথম যে কাজটি করতে হয় তা হলো নির্ধারণ করা কোন বিষয়গুলো এতে উপস্থাপন করতে হবে। পল ভি. অ্যান্ডারসনের গ্রন্থ টেকনিক্যাল কমিউনিকেশনে রিডার-সেন্টার্ড অ্যাপ্রোচ অনুসারে একটি প্রতিবেদন তৈরির মৌলিক কাঠামো এবং প্রতিটি অংশে যেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় তা হলো (পৃষ্ঠা ৫৪১)
- ভূমিকা - পাঠকরা এই প্রতিবেদন পড়ে কী লাভ করবেন?
- তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি - এই তথ্যগুলো কি নির্ভরযোগ্য?
- তথ্য - আপনি এমন কী তথ্য পেয়েছেন যা পাঠকদের কাজে লাগবে?
- আলোচনা - এই তথ্যগুলো পাঠকের দৃষ্টিকোণ থেকে কেমন কার্যকর?
- উপসংহার - কেন এই তথ্যগুলো পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
- সুপারিশ - আপনি মনে করেন পাঠকদের কী করা উচিত?
- সংযুক্তি
এটি একটি মৌলিক কাঠামো কোনো নির্দিষ্ট রূপরেখা নয়। এর কিছু অংশ অন্য ক্রমে থাকতে পারে একসঙ্গে আলোচনা করা হতে পারে বা বাদও যেতে পারে। একটি কার্যকর প্রতিবেদন এসব উপাদান অন্তর্ভুক্ত করে যাতে তা পাঠকের জন্য বোধগম্য ও ব্যবহারযোগ্য হয়। যদি প্রতিবেদনটি সহজবোধ্য না হয় তবে সেটির প্রভাব কমে যাবে অথবা পাঠক তা পড়তে আগ্রহ হারাবেন।
ভূমিকা
[সম্পাদনা]কিছু প্রতিবেদন হলে ভূমিকা মাত্র এক বা দুইটি বাক্যে শেষ করা যায়। কিন্তু বৃহৎ এবং বিস্তারিত প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে ভূমিকা অংশটি একাধিক পৃষ্ঠা হতে পারে। এখানে গবেষণার উদ্দেশ্য উল্লেখ করতে হয় এবং তা সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করতে হয়। একটি ভালো ভূমিকা পাঠকদের জানাবে যে এই প্রতিবেদনের মূল লক্ষ্য কী এবং কেন এই গবেষণা ও প্রতিবেদন তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মূলত এখানে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয় “এই প্রতিবেদন পড়ে আমরা কী জানতে পারব?” ভূমিকায় সেই সমস্যাটিও তুলে ধরতে হবে যেটি প্রতিবেদনটি সমাধান করতে চায়।
দীর্ঘ প্রতিবেদন হলে আপনার ভূমিকা অংশটি অনেক বড় হতে পারে। এই অংশে থাকা উচিত —
১) কোন সমস্যা সমাধানে এই প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে।
২) আপনি সেই সমস্যা সমাধানের জন্য কী কী কাজ করেছেন এবং
৩) পাঠকেরা কীভাবে এই তথ্য নিজের কাজে লাগাতে পারেন।
এছাড়াও, ভূমিকায় আপনার মূল বিষয়বস্তুগুলোও তুলে ধরতে হবে।
বেশিরভাগ ভূমিকায় প্রধান উপসংহার ও সুপারিশের সংক্ষিপ্ত ধারণাও দেওয়া হয়। যদিও এগুলো বিস্তারিতভাবে প্রতিবেদনের শেষে আলোচনা করা উচিত। তবে ভূমিকা অংশে সংক্ষেপে তুলে ধরলে পাঠক উপকৃত হন।
উদাহরণ:
- প্রতিবেদনের শুরুতে: "এই প্রতিবেদনে, আমি পরবর্তী বছরের প্রধান তহবিল অভিযানের তালিকায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনি যে তথ্য চেয়েছিলেন তা উপস্থাপন করছি।"(অ্যান্ডারসন, ২০০৭, পৃষ্ঠা ৫৪২)
- মূল বিষয়গুলির সারসংক্ষেপ: "সামগ্রিকভাবে মনে হচ্ছে যে আস্তাবলগুলি একটি ভালো তহবিল সংগ্রহ প্রকল্প হতে পারে কারণ সেখানে প্রদত্ত বর্তমান কর্মসূচির শক্তি, বর্তমান সুযোগ-সুবিধার অবস্থা এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধাগুলি ব্যবহার করে এমন প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের একটি অনুগত মূলের অস্তিত্ব রয়েছে।" (অ্যান্ডারসন, ২০০৭, পৃষ্ঠা ৫৪৩)
ভূমিকায় আরও থাকতে পারে প্রতিবেদন কীভাবে সাজানো হয়েছে এর পরিধি কী, পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণের আহ্বান, এবং এমন প্রয়োজনীয় পটভূমি যা প্রতিবেদন বুঝতে সাহায্য করে।
তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি
[সম্পাদনা]এই অংশের উদ্দেশ্য হলো — আপনি কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করেছেন তা পাঠকদের জানানো। আপনি কোথা থেকে তথ্য পেয়েছেন তা উল্লেখ করলে পাঠকেরা বুঝতে পারবেন গবেষণাটি কতটা নির্ভরযোগ্য। আপনি কোন পদ্ধতিতে কাজ করেছেন, তা জানালে পাঠকেরা বুঝতে পারবেন এই গবেষণার প্রয়োগ ও সীমাবদ্ধতা কোথায়।
একটি ভালো ও বিস্তারিত পদ্ধতির বর্ণনা অন্য কাউকে ঠিক একইভাবে গবেষণাটি পুনরায় করতে সাহায্য করবে এবং ফলাফলও একই হবে। তাই এই অংশটি খুব পরিষ্কার ও বিস্তারিতভাবে লিখুন। এমনভাবে লিখুন যেন আপনি নিজেই প্রথমবার এই নির্দেশনা দেখে গবেষণাটি করতে যাচ্ছেন।
ফলাফল
[সম্পাদনা]ফলাফল অংশটি পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গবেষণার মূল উদ্দেশ্যই হলো ফলাফল পাওয়া তাই এই অংশে তথ্যগুলো স্পষ্ট ও কার্যকরভাবে উপস্থাপন করতে হবে। ফলাফলের অংশে সাধারণত সারণি, গ্রাফ, লেখা ও ছবি থাকতে পারে। গবেষণার মাধ্যমে কী পাওয়া গেছে তা পাঠকদের বোঝাতে যেসব উপাদান দরকার তা-ই এখানে যোগ করুন। অপ্রয়োজনীয় তথ্য যোগ করবেন না। এতে শুধু ফলাফলের অংশটি জটিল হয়ে যাবে। তথ্য সংগ্রহের তারিখ, উৎস কোথা থেকে এসেছে এবং তথ্যদাতা কে ছিল সেসব ভালোভাবে যাচাই করে নিন। এই অংশে ভাষা সরল ও বর্ণনামূলক রাখুন। বিশ্লেষণের কাজ আলোচনা অংশের জন্য তুলে রাখুন।
আলোচনা
[সম্পাদনা]আলোচনা অংশে আপনি আপনার ফলাফলগুলোর ব্যাখ্যা দেন। ফলাফল অংশে হয়তো শুধু কিছু সারণি, গ্রাফ এবং অল্প কিছু বাক্য থাকবে। কিন্তু আলোচনা অংশেই আপনি ব্যাখ্যা করবেন এই সারণি ও গ্রাফগুলোর অর্থ কি। এগুলো কীভাবে প্রতিবেদনটির সমস্যা বা প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আলোচনায় আরও ব্যাখ্যা করা হয় যছ এই ফলাফল প্রতিষ্ঠান বা পাঠকের জন্য কী তাৎপর্য বহন করে। কিছু প্রতিবেদন বিশেষ করে সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনগুলোর ক্ষেত্রে, আলোচনা ও তথ্য উপস্থাপনের অংশ একসঙ্গে লেখা হতে পারে যাতে প্রতিবেদনটি পড়া সহজ ও সংক্ষিপ্ত হয়।
উপসংহার
[সম্পাদনা]উপসংহার অংশে ব্যাখ্যা করা হয় কেন ফলাফলগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং এগুলো পাঠকের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে। এখানে আপনার তথ্যগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করা এবং সমস্যাটি আবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া ভালো অভ্যাস। এতে পাঠক আপনার অনুসন্ধানের গুরুত্ব ভালোভাবে বুঝতে পারে। এই অংশেই আপনি পাঠককে বোঝাতে পারেন আপনার অনুসন্ধান থেকে তারা বা তার প্রতিষ্ঠান কীভাবে উপকৃত হতে পারে। সাধারণত উপসংহারে কোনো সুপারিশ করা হয় না। তবে এটি পাঠকদের সেই দিকেই ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
সুপারিশ
[সম্পাদনা]এই অংশে আপনি জানিয়ে দেন প্রতিবেদন তৈরির উদ্দেশ্য কী এবং পাঠক প্রতিবেদনটি পড়ে কী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিছু প্রতিবেদনে এই অংশ নাও থাকতে পারে। কারণ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ লেখকের জ্ঞানের বাইরে বা কর্তৃত্বের বাইরে হতে পারে।
পাঠকের ছয়টি মৌলিক প্রশ্ন
[সম্পাদনা]আপনার প্রতিবেদন পড়ার সময় পাঠক ছয়টি মৌলিক প্রশ্ন করে থাকেন। যা একটি প্রধান লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে গঠিত আপনি যেসব তথ্য ও ধারণা দিয়েছেন। সেগুলো ভবিষ্যতের পদক্ষেপের জন্য কোনো দিকনির্দেশনা দেয় কি না। লেখার সময় নিজেকে পাঠকের জায়গায় কল্পনা করুন এবং এই প্রশ্নগুলো মাথায় রেখে লিখুন। প্রতিবেদনটি যেন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয় সেটি নিশ্চিত করুন। এতে প্রতিবেদনটি পরিপূর্ণ ও গঠনমূলক হবে।
- আমরা আপনার প্রতিবেদন পড়ে কী লাভ করব?
কর্মক্ষেত্রের পাঠকেরা শুধু তাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত তথ্য পড়তেই আগ্রহী। তাই আপনাকে স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে এই তথ্যগুলো কীভাবে তাদের দায়িত্ব, আগ্রহ ও লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
- আপনার তথ্যগুলো কি নির্ভরযোগ্য?
পাঠকরা নিশ্চিত হতে চান আপনি যে তথ্য দিয়েছেন তা যেন তাদের সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য একটি সঠিক ভিত্তি তৈরি করে।
- আপনার জানা কোন বিষয়গুলো আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়?
পাঠকেরা এমন সব তথ্য জানতে চান না যেগুলো কেবল আপনি জানেন। তারা কেবল সেই তথ্যই জানতে চান যা তাদের জন্য প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে যেগুলো তারা সরাসরি ব্যবহার করতে পারেন। (উদাহরণ: "এই ত্রৈমাসিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিক্রয়সংক্রান্ত পরিসংখ্যান হলো:...")
- আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি এই তথ্যগুলো কীভাবে ব্যাখ্যা করেন?
সংশ্লিষ্ট না হলে তথ্যের কোনো অর্থ থাকে না। তথ্যকে অর্থবহ করতে হলে মানুষকে তা বিশ্লেষণ করে সম্পর্ক বা ধরণ নির্ধারণ করতে হয়। পাঠকেরা সাধারণত চায় আপনি এই কাজটা তাদের হয়ে করে দিন যেন তাদের আলাদাভাবে চিন্তা করতে না হয়।
- এই তথ্যগুলো আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
তথ্য ব্যাখ্যার বাইরে গিয়েও পাঠকেরা জানতে চান যে এই তথ্যগুলো তাদের দায়িত্ব, আগ্রহ ও লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত।
- আপনার মতে আমাদের কী করা উচিত?
কারণ আপনি এই তথ্যগুলো বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন তাই পাঠকেরা ধরে নেন আপনি সুপারিশ করার জন্য যথেষ্ট যোগ্য।
এই প্রশ্নগুলো সাধারণভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেদনে প্রযোজ্য হয়। কিছু প্রতিবেদন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব অল্পতেই দিতে পারে। আবার বড় প্রতিবেদনে লেখককে শত শত পৃষ্ঠাও ব্যবহার করতে হতে পারে। পাঠকেরা প্রায়ই এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে আরও নির্দিষ্ট প্রশ্ন করেন। তবে এই ছয়টি প্রশ্নই মূল কাঠামো হিসেবে সব প্রতিবেদনে প্রযোজ্য।
সংশোধনের তালিকা
[সম্পাদনা]প্রতিবেদন লেখার পর এটি পুনরায় যাচাই করুন নিচের তালিকা অনুযায়ী।
ভূমিকা
- প্রতিবেদনের বিষয়টি কি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে?
- এই বিষয় নিয়ে আপনি কেন লিখছেন তা কি বলা হয়েছে?
- পাঠককে পড়তে আগ্রহী করার মতো কিছু আছে কি?
- পাঠকের জন্য কি প্রাসঙ্গিক পটভূমি তথ্য দেওয়া হয়েছে?
পদ্ধতি
- তথ্য ও ধারণাগুলো কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে তা কি ব্যাখ্যা করা হয়েছে?
তথ্য
- তথ্যগুলো কি স্পষ্ট ও নির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে?
আলোচনা
- তথ্য থেকে প্রাপ্ত সারাংশ পাঠকের জন্য অর্থবহভাবে কি উপস্থাপন করা হয়েছে?
উপসংহার
- তথ্যগুলোর গুরুত্ব কি ব্যাখ্যা করা হয়েছে?
সুপারিশ
- পাঠক কী করবেন এবং কেন করবেন তা কি বলা হয়েছে?
সূত্র
[সম্পাদনা]Anderson, Paul V. Technical Communication: A Reader-Centered Approach. 2008. Thompson Wadsworth Publishers. 2008. Pages 541-545.