পদার্থবিজ্ঞান অধ্যয়ন নির্দেশিকা/তাপগতিবিদ্যা
ভূমিকা
[সম্পাদনা]তাপগতিবিদ্যা (থার্মোডাইনামিক্স) হল এমন একটি শাখা যেখানে তাপের গতি এবং এর যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তর নিয়ে আলোচনা কর হয় ।
তাপগতিবিদ্যার সূত্রসমূহ
[সম্পাদনা]প্রথম সূত্র
[সম্পাদনা]প্রথম সূত্র শক্তি সংরক্ষণ সূত্রের একটি রূপ:
|
|
প্রথম সূত্র অনুযায়ী, কোনো সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ শক্তির পরিবর্তন () সমান সেই সিস্টেমে যুক্ত হওয়া শক্তি (Q) যেমন তাপ – থেকে সিস্টেম কর্তৃক আশেপাশের উপর করা কাজ (W) বিয়োগ করলে যা থাকে।
যদি Q ধনাত্মক হয় তবে সিস্টেম শক্তি অর্জন করে।
যদি W ধনাত্মক হয় তবে সিস্টেম পরিবেশের উপর কাজ করে শক্তি হারিয়েছে।
এই সমীকরণগুলোর একটি সীমাবদ্ধতা হলো Q এবং W কেউই স্থির ফাংশন নয়। অর্থাৎ, এই মানগুলো সরাসরি মাপা যায় না যদি না সিস্টেমের পূর্ব ইতিহাস জানা থাকে।
গ্যাসের ক্ষেত্রে, প্রথম সূত্রকে স্থির ফাংশনের রূপে প্রকাশ করা যায়:
|
|
শূন্যতম (শূন্য-তম) সূত্র
[সম্পাদনা]প্রথম সূত্রটি নামকরণের পর পদার্থবিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এর আগে আরও একটি মৌলিক সূত্র রয়েছে, যেটিকে তাঁরা 'শূন্যতম সূত্র' নামে অভিহিত করেন।
এই সূত্রটি বলে:
|
যদি দুটি বস্তুর তাপমাত্রা এক হয়, তবে তাদের মধ্যে কোনো তাপের আদান-প্রদান ঘটে না। |
এই সূত্রের একটি বিকল্প রূপ হলো:
|
যদি দুটি বস্তু তৃতীয় একটি বস্তুর সাথে তাপীয় সাম্যাবস্থায় থাকে তবে তারা একে অপরের সাথেও তাপীয় সাম্যাবস্থায় থাকবে। |
এই দ্বিতীয় বিবৃতির মাধ্যমে তাপমাত্রা (T) সম্পর্কে একটি সংজ্ঞা পাওয়া যায়:
|
তাপীয় সাম্যাবস্থায় থাকা দুটি ভিন্ন বস্তুর মধ্যে একমাত্র অভিন্ন বিষয় হলো তাদের তাপমাত্রা। |
দ্বিতীয় সূত্র
[সম্পাদনা]এই সূত্র অনুযায়ী, তাপ কখনোই নিজে নিজে শীতল বস্তু থেকে গরম বস্তুর দিকে প্রবাহিত হয় না।
এখানে হল বোল্টজমান ধ্রুবক () এবং হল বিভাজন ফাংশন অর্থাৎ সিস্টেমের সকল সম্ভাব্য অবস্থার সংখ্যা।
এটি এন্ট্রপির একটি পরিসংখ্যানগত সংজ্ঞা। এর একটি "ম্যাক্রোস্কোপিক" সংজ্ঞাও রয়েছে:
এখানে T হল তাপমাত্রা এবং dQ হল সিস্টেমে যুক্ত হওয়া ক্ষুদ্র শক্তি।
তৃতীয় সূত্র
[সম্পাদনা]তৃতীয় সূত্র বলছে, একটি একেবারে শূন্য তাপমাত্রা (অ্যাবসোলিউট জিরো) কখনো অর্জন করা যায় না।
তাপমাত্রা স্কেলসমূহ
[সম্পাদনা]তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য বিভিন্ন স্কেল ব্যবহৃত হয়। পদার্থবিজ্ঞানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত স্কেল দুটি হলো সেলসিয়াস ও কেলভিন।
সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রতীক Θ। ডিগ্রি সেলসিয়াস বোঝাতে ব্যবহৃত হয় °C। কেলভিন তাপমাত্রার প্রতীক T। কেলভিন বোঝাতে ব্যবহৃত হয় K।
সেলসিয়াস স্কেল
[সম্পাদনা]সেলসিয়াস স্কেলটি পানির গলনাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্কের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
পানির জমার তাপমাত্রা 0 °C। এটি ফ্রিজিং পয়েন্ট নামে পরিচিত।
পানির স্ফুটনের তাপমাত্রা 100 °C। এটি স্টিম পয়েন্ট নামে পরিচিত।
সেলসিয়াস স্কেলকে আগে কখনো কখনো 'সেন্টিগ্রেড' বলা হতো। তবে ১৯৪৮ সালে CGPM সংগঠন 'ডিগ্রি সেলসিয়াস' নামটি চূড়ান্ত করে। এখন আর 'সেন্টিজিমাল' বা 'সেন্টিগ্রেড' ব্যবহার করা উচিত নয়। বিস্তারিত জানতে দেখুন Wikipedia।
কেলভিন স্কেল
[সম্পাদনা]কেলভিন স্কেল বরফ গলনের তাপমাত্রার চেয়ে আরও মৌলিক একটি তাপমাত্রার উপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি হলো পরম শূন্য তাপমাত্রা (যা −273.15 °C এর সমান)। এটি সেই সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যার চেয়ে কোনো কিছু আর ঠান্ডা করা যায় না যেখানে যেকোনো সিস্টেমের গতি শক্তি সর্বনিম্ন থাকে। কেলভিন স্কেল তৈরি করা হয়েছিল একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে, যেখানে দেখা যায় গ্যাসের চাপ ও আয়তন তাপমাত্রার সাথে কীভাবে পরিবর্তিত হয়—PV/T একটি ধ্রুবক মান রাখে। যদি তাপমাত্রা (T) কমানো হয়, তবে গ্যাসের আয়তন (V) দ্বারা সৃষ্ট চাপ (P) সরাসরি অনুপাতে কমে যায়। এটি একটি সহজ পরীক্ষা এবং অধিকাংশ স্কুলের ল্যাবেই করা সম্ভব। ধরা হয়েছিল, গ্যাসের চাপ -273 ডিগ্রি সেলসিয়াসে সম্পূর্ণভাবে শূন্য হয়ে যাবে। (যদিও বাস্তবে গ্যাসগুলো এর কিছু আগেই তরল বা কঠিন অবস্থায় রূপ নেয়)
যদিও কেলভিন স্কেল সেলসিয়াসের চেয়ে আলাদা একটি পয়েন্ট থেকে শুরু হয়, তবে এ স্কেলের এককগুলোর মাপ সেলসিয়াসের এককগুলোর মতোই।
সুতরাং:
|
কেলভিনে তাপমাত্রা (K) = সেলসিয়াসে তাপমাত্রা (°C) + 273.15 |
আপেক্ষিক সুপ্ত তাপ
[সম্পাদনা]যখন কোনো পদার্থ তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়, তখন তার অণুগুলোর মধ্যে বন্ধন ভাঙতে শক্তির প্রয়োজন হয়। এই শক্তিকে সুপ্ত তাপ বলা হয়। অবস্থা পরিবর্তনের সময় তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকে।
অবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি হিসাব করার জন্য নিচের সমীকরণটি ব্যবহৃত হয়:
|
তাপ স্থানান্তর, ΔQ (J) = ভর, m (kg) × আপেক্ষিক সুপ্ত তাপধারকতা, L (J/kg) |
আপেক্ষিক সুপ্ত তাপ, L, হলো সেই শক্তি যা ১ কেজি পদার্থের অবস্থা পরিবর্তন করতে লাগে, তবে তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকে।
ফিউশন এর সুপ্ত তাপ বলতে গলনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিকে বোঝায়। বাষ্পীয়ভবন এর সুপ্ত তাপ বলতে স্ফুটনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিকে বোঝায়।
আপেক্ষিক তাপধারকতা
[সম্পাদনা]নির্দিষ্ট তাপ ধারকতা হলো একটি নির্দিষ্ট ভরের পদার্থের তাপমাত্রা নির্দিষ্ট পরিমাণ বাড়াতে যে শক্তি প্রয়োজন হয়।
কোনো পদার্থকে গরম বা ঠান্ডা করার সময় তাপমাত্রার পরিবর্তন নির্ভর করে ঐ পদার্থের ভরের ওপর এবং তাকে কত শক্তি দেওয়া হয়েছে তার ওপর। তবে, এটি পদার্থটির বৈশিষ্ট্যের ওপরও নির্ভর করে। এই প্রভাবকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় পদার্থটির আপেক্ষিক তাপধারকতা (c)। SI এককে এটি পরিমাপ করা হয় J/(kg·K)।
|
অভ্যন্তরীণ শক্তির পরিবর্তন, ΔU (J) = ভর, m (kg) × আপেক্ষিক তাপধারকতা, c (J/(kg·K)) × তাপমাত্রার পরিবর্তন, ΔT (K) |