বিষয়বস্তুতে চলুন

নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা/সিস্টেম মডেলিং

উইকিবই থেকে

নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া

[সম্পাদনা]

একজন নিয়ন্ত্রন ব্যাবস্থা প্রকৌশলীর কাজ হলো বিদ্যমান সিস্টেম বিশ্লেষণ করা এবং নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণের জন্য নতুন সিস্টেমের নকশা প্রস্তুত করা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূলত বিদ্যমান সিস্টেম বা ব্যাবস্থার কর্মক্ষমতা উন্নত করার জন্য সিস্টেমের একটি নিয়ন্ত্রনকারী একক যন্ত্রাংশ (কন্ট্রোল ইউনিট) -এর নকশা প্রস্তুত করার প্রয়োজন হয়। তবে কখনো কখনো সম্পূর্ন যান্ত্রিক সিস্টেমেরই নকশা প্রস্তুত করার প্রয়োজন হয়ে পরে। একটি সিস্টেমের নকশা প্রস্তুত করার সময়, অথবা একটি বিদ্যমান সিস্টেমকে উন্নত করার জন্য একটি নিয়ন্ত্রক প্রস্তুতির সময় কিছু মৌলিক পদক্ষেপ অনুসরণ করতে হয়, যেগুলি সিস্টেমের মানদন্ড বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরী। এই মৌলিক পদক্ষেপগুলি সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হয়েছে:

  1. প্রথমে গাণিতিকভাবে সিস্টেমটির নকশা বা মডেল তৈরি করতে হয়।
  2. এরপর গাণিতিক মডেল বা নকশার বিশ্লেষণ করা আবশ্যক।
  3. সিস্টেম/নিয়ন্ত্রক(কন্ট্রোলার) -এর জন্য প্রথমে তার নকশা প্রস্তুত করতে হয়।
  4. এবার সেই নকশার উপর ভিত্তি করে সিস্টেম/নিয়ন্ত্রকটির বাস্তব রূপ প্রদান করা হয় এবং তারপর তার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।

এই বইয়ের বেশিরভাগ আলোচনা উপরিউক্ত নির্দেশ তালিকার দ্বিতীয় ধাপ অর্থাৎ গাণিতিক পদ্ধতির মাধ্যমে সিস্টেমের বিশ্লেষণের উপর কেন্দ্রীভূত হবে, অর্থাৎ এই অধ্যায়ে শুধুমাত্র সিস্টেমগুলির গাণিতিক মডেল প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনার করা হবে।

বাহ্যিক বর্ণনা

[সম্পাদনা]

একটি সিস্টেমের পূর্ণ অবয়ব সংক্ষেপে বর্ণনা করার সময় সিস্টেমের নিবেশিত অংশ বা ইনপুটের সাথে সিস্টেমের বাহ্যিক অংশ বা আউটপুটের সম্পর্ক প্রদর্শিত করা হয়, কিন্তু এক্ষেত্রে সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ কার্যকারিতা ও অন্যান্য জটিল বিষয় সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়না। একটি সিস্টেমের বাহ্যিক বর্ণনাকে কখনও কখনও সিস্টেমের ইনপুট-আউটপুট বর্ণনাও বলা হয় , কারণ এতে কেবলমাত্র সিস্টেমের ইনপুট এবং আউটপুটের উপরই মনোনিবেশ করা হয়।

যদি সিস্টেমটিকে একতি গাণিতিক ফাংশন h(t, r) -এর মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় যেখানে t সময়ে সিস্টেম থেকে আউটপুট বা কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া যায় এবং r হল সেই নির্দিষ্ট সময়কাল যখন সিস্টেমে নিবেশিত মান বা ইনপুট প্রয়োগ করা হয়েছে, তাহলে সিস্টেম ফাংশন h(t, r) -এর সাথে ইনপুট মান x এবং আউটপুট মান y -এর সম্পর্ক নিম্নলিখিত সমাকলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়:


[সাধারণ সিস্টেমের বর্ণনা]

এই সমীকরনের মাধ্যমে সমস্ত রৈখিক সিস্টেমের বর্ণনা করা যায়।

সিস্টেমে t=r সময়ে প্রয়োগীকৃত নিবেশিত সংকেত বা ইনপুট সংকেত সিস্টেমের কার্যকারিতাকে একমাত্র তখনই প্রভাবিত করতে পারে যদি, এবং t=0 সময়ের পূর্বে যদি সিস্টেমে কোন প্রকার ইনপুট প্রয়োগ না করা হয়, তাহলে আমরা উপরের সমাকলনের সীমাটি নিম্নরূপে পরিবর্তিত করতে পারি:

সময় নিরপেক্ষ ব্যাবস্থা

[সম্পাদনা]

যদি কোনও সিস্টেম বা ব্যাবস্থা সময় নিরপেক্ষ হয়, তাহলে আমরা সিস্টেমের বিশ্লেষণকারী সমীকরণটি নিম্নরূপে পুনর্লিখন করতে পারি:

এই সমীকরণটি কনভোল্যুশন সমাকলন নামে পরিচিত , এবং আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে এটি সম্পর্কে আরও আলোচনা করব।

প্রত্যেক সময়-নিরপেক্ষ রৈখিক সিস্টেম (এলটিআই) -কে ল্যাপ্লেস রুপান্তরন নামক গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা যায়। এই বহু ব্যাবহৃত গানিতিক মডেলের মাধ্যমে কোন সময় নির্ভর সিস্টেমের গাণিতিক মডেলকে কম্পাঙ্ক নির্ভর ক্ষেত্র বা ফ্রিকোয়েন্সি ডোমেইন -এ পরিবর্তিত করা যায় (ল্যাপ্লেস রূপান্তরনে ফ্রিকোয়েন্সি ডোমেইনকে এস-ডোমেইন বলা হয়), যার ফলে অনেক সমীকরনের সমাধান অত্যন্ত সহজ হয়। সময় নিরপেক্ষ সিস্টেমের ক্ষেত্রে ল্যাপ্লেস রুপান্তরন ব্যাবহার করা যায়না।

অভ্যন্তরীণ বর্ণনা

[সম্পাদনা]

যদি কোনো সিস্টেম রৈখিক এবং সমাকীর্ণ (লাম্পড) হয়, তাহলে সেটিকে একটি বিশেষ গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে বর্ণনা করা যায়। এই বিশেষ সমীকরণকে বলা হয় অবস্থান সমীকরন অথবা স্টেট-স্পেস সমীকরণ। স্টেট-স্পেস সমীকরণে আমরা সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বোঝাতে চলরাশি x ব্যবহার করি। সিস্টেমে ইনপুট বা নিবেশিত মান বোঝাতে u এবং সিস্টেমের আউটপুট বা ফলাফল বোঝাতে y ব্যবহার করা হয়। আমরা স্টেট-স্পেস সমীকরণগুলোকে নিম্নরূপে প্রকাশ করতে পারি:

আধুনিক নিয়ন্ত্রন ব্যাবস্থা সম্পর্কে আলোচনার সময় আমরা স্টেট-স্পেস সমীকরন বা অবস্থান সমীকরনের ব্যাপারে বিশদে আলোচনা করব।

জটিল বর্ণনা

[সম্পাদনা]

সময়-নিরপেক্ষ রৈখিক সিস্টেম এবং সমাকীর্ণ (লাম্পড) সিস্টেমসমূহকে স্টেট-স্পেস সমীকরণ এবং ল্যাপ্লেস রুপান্তরনের সংমিশ্রণ ব্যবহার করেও বর্ণনা করা যেতে পারে। যদি আমরা উপরে তালিকাভুক্ত স্টেট-স্পেস সমীকরণগুলির ল্যাপ্লেস রূপান্তরন নির্ধারণ করি, তাহলে আমরা রূপান্তরন ম্যাট্রিক্স (ট্রান্সফার ম্যাট্রিক্স) ফাংশন নামে পরিচিত ফাংশনের একটি সেট পেতে পারি। আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে এই ফাংশনগুলি নিয়ে আলোচনা করব।

উপস্থাপনা

[সম্পাদনা]

নিম্নের তালিকায় বিভিন্ন সিস্টেম বা ব্যাবস্থার বৈশিষ্ট্য এবং তাদের বিশ্লেশষনের জন্য বযাবহৃত একাধিক গাণিতিক মডেল সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে:

বৈশিষ্ট্য স্টেট-স্পেস
সমীকরন
ল্যাপ্লেস
রূপান্তর
রূপান্তরন
ম্যাট্রিক্স
রৈখিক, সময়-সাপেক্ষ, বিন্যাস্ত না না না
রৈখিক, সময়-সাপেক্, সমাকীর্ণ হ্যাঁ না না
রৈখিক, সময়-নিরপেক্ষ, বিন্যাস্ত না হ্যাঁ না
রৈখিক, সময়-নিরপেক্ষ, সমাকীর্ণ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ

আমরা পরের অধ্যায়ে এইরূপ নানা রকম সিস্টেমের উপস্থাপনা সম্পর্কে আলোচনা করব।

বিশ্লেষণ

[সম্পাদনা]

উপরে তালিকাভুক্ত গাণিতিক মডেলগুলির মধ্যে উপযুক্ত একটি মডেল ব্যবহার করে যে কোনো সিস্টেমের প্রাথমিক নকশা প্রস্তুত করা যায়, তবে প্রথমে সেই সিস্টেমের বিশদ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আমরা সিস্টেমের বিভিন্ন পরিমাপক নির্ধারণ করতে পারি এবং তারপর সেই পরিমাপগুলিকে আমাদের নির্ধারিত মানদন্ডের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। যদি সিস্টেমটি সেই মানদন্ডগুলি পূরণ করে, তাহলে সিস্টেমের নকশা প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া শেষ হয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিস্টেমটি নির্ধারিত মানদন্ড পূরণ করে না। সেই ক্ষেত্রে উপযুক্ত যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রক (কন্ট্রোলার) এবং যান্ত্রিক ক্ষতিপূরনকারী (কম্পেনসেটর) -এর নকশা প্রস্তুত করে সিস্টেমে যুক্ত করতে হয়।

কিন্তু কন্ট্রোলার এবং কম্পেনসেটর তৈরী করলেই সিস্টেম মডেলিং -এর কাজ শেষ হয়ে যায় না, বরঞ্চ কন্ট্রোলার ও কম্পেনসেটর যুক্ত সম্মিলিত সিস্টেমটিকে বিশ্লেষণ করতে হবে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে নতুন যুক্ত যন্ত্রাংশগুলি সঠিকভাবে কাজ করছে এবং সিস্টেম আশানুরূপ ফল দিচ্ছে। পাশাপাশি, আমাদের নিশ্চিত করতে হয় যে সিস্টেমটি স্থিতিশীল আছে — কারণ, অস্থিতিশীল সিস্টেম বিপজ্জনক হতে পারে।

কম্পাঙ্কের সাপেক্ষে বিশ্লেষণ

[সম্পাদনা]

সিস্টেমের প্রাথমিক ডিজাইন বা দ্রুত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ফ্রিকোয়েন্সি ডোমেইন বা কম্পাঙ্কের সাপেক্ষে বিশ্লেষণ, সময় এককের সাপেক্ষে বিশ্লেষণের থেকে সহজ ও কার্যকর হয়। কম্পাঙ্কের সাপেক্ষে বিশ্লেষণের প্রক্রিয়ায় সিস্টেমে উৎপন্ন অস্থিতার শক্তি বিভাজনকে (পাওয়ার স্পেক্ট্রাল ডেনসিটি বা পিএসডি) সরাসরি ব্যবহার করা যায়, সিস্টেমের ট্রান্সফার ফাংশনও সরাসরি প্রয়োগ করা যায় এবং বিশ্লেষণের ফলাফলও সহজে পাওয়া যায়। এই বিশ্লেষণে যে আউটপুট বা ফলাফল পাওয়া যায় তা সাধারণত সময়ের সাপেক্ষে স্থিতিশীল (স্টেডি-স্টেট রেসপন্স) হয়। সিস্টেমের সাথে যুক্ত অনেক যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রক আউটপুটের মান শূন্যে নামিয়ে আনতে চেষ্টা করে। তাই সিস্টেমের আউটপুট থেকে প্রাপ্ত এই স্টেডি-স্টেট রেসপন্স আসলে সিস্টেমের একটি চূড়ান্ত ত্রুটি যা বিশ্লেষণের চূড়ান্ত ফলাফল বা মানদন্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সারনী ১: কম্পাঙ্কের সাপেক্ষে প্রস্তাবিত ইনপুট এবং আউটপুট
ইনপুট প্রস্তাবনা আউটপুট
পিএসডি স্থানান্তর ফাংশন পিএসডি

গণিতের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

[সম্পাদনা]

ফ্রিকোয়েন্সি ডোমাইন বা কম্পাঙ্ক সাপেক্ষে সিস্টেমের বিশ্লেষণ হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সিস্টেমের ঘাত প্রতিক্রিয়া বা ইমপালস রেসপন্স নির্ধারণ করা যায়।

চিত্র ১: ফ্রিকোয়েন্সি ডোমেন সিস্টেম
[]

যেখানে,

হল সিস্টেমের অস্থিতার শক্তি বিভাজন বা পিএসডি, যার একক
হল সিস্টেমের ফাংশন যা কম্পাঙ্ক ক্ষেত্রে (ফ্রিকোয়েন্সি ডোমেইনে) রূপান্তরিত করা হয়েছে। একে ফ্রিকোয়েন্সি রেসপন্স ফাংশনও বলা হয়
আউটপুট ফাংশনের পিএসডি।

ফ্রিকোয়েন্সি রেসপন্স ফাংশন, , সিস্টেমের ঘাত প্রতিক্রিয়া বা ইম্পালস্‌ রেসপন্সের সাথে সম্পর্কিত।

বিভিন্ন বইয়ে এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়। কিছু বই বলে, উপরোক্ত সমীকরণ কেবলমাত্র স্থিতিশীল আকস্মিক (র‍্যান্ডম) প্রক্রিয়ার জন্যই প্রযোজ্য। অন্য কিছু বইতে র‍্যান্ডম প্রক্রিয়া ছাড়াও অন্যান্য কিছু প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে উপরের সমীকরণের প্রযোজ্যতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু বইতে আবার কঠোরভাবে স্থিতিশীল (সমস্ত ক্রমের গাণিতিক গড় অপরিবর্তিত) এবং দুর্বল স্থিতিশীল সিস্টেমের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়না তবে বাস্তব ক্ষেত্রে সাধারণভাবে যা ধরা হয়, তা হলো: যদি সিস্টেমের ইনপুট সিগন্যালের শক্তি বিভাজন বা পি এস ডি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বা দিনের পর দিন একরকম থাকে, তবে সেটিকে স্থিতিশীল সিস্টেম ধরা যায় এবং তখন উপরের সমীকরণটি ব্যবহারযোগ্য ও বৈধ।

মন্তব্য

[সম্পাদনা]
  1. Sun, Jian-Qiao (2006). Stochastic Dynamics and Control, Volume 4. Amsterdam: Elsevier Science. আইএসবিএন 0444522301.

নকশা প্রস্তুতকরনের উদাহরণ

[সম্পাদনা]

নিয়ন্ত্রন ব্যাবস্থায় সিস্টেম মডেলিং একটি বিশদ বিচার-বিবেচনার বিষয়। এই বিষয়ে বাস্তবিক জ্ঞান অর্জনের জন্য শুধু লিখিত তথ্য নয় বরং অন্যদের তৈরী সিস্টেম বা যান্ত্রিক মডেল ভালোভাবে পর্যবেক্ষন করা উচিত, তাহলে অনেক কিছু জানা যায়। কিছু সাইট আছে যেখানে সিস্টেম মডেলিং বা নকশা প্রস্তুতকরনের অনেক বাস্তব উদাহরণ রয়েছে। এখানে সেরকম কয়েকটি সাইটের লিঙ্ক দেওয়া হল;

উৎপাদন

[সম্পাদনা]

সঠিকভাবে সিস্টেমটির নকশা প্রস্তুত করা হয়ে গেলে আমরা আমাদের সিস্টেমটির একটি প্রাথমিক মডেল তৈরি করতে পারি এবং তার পরীক্ষা করতে পারি। যদি আমরা ধরে নিই যে আমাদের বিশ্লেষণ সঠিক ছিল এবং আমাদের প্রস্তুত করা যান্ত্রিক সিস্টেমের নকশাটি যথোপযুক্ত, তাহলে প্রাথমিক মডেল হয়তো প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করবে তবে তা পরীক্ষা সাপেক্ষ। যদি সিস্টেমের পরীক্ষার ফল ভালো হয় তাহলে আমরা আমাদের সিস্টেমগুলি বাস্তবে তৈরি করার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারি।