দর্শনের সাথে পরিচয়/সুবিধাবাদ
সুবিধাবাদী নৈতিক তত্ত্বগুলো পরিণতির ওপর ভিত্তি করে কোনো কাজের মূল্যায়ন করে। একটি কাজ সঠিক তখনই হয় যখন সেটি স্বভাবগত ভালো কিছুর তুলনায় কম খারাপ কিছু বয়ে আনে। তাই সুবিধাবাদীরা আমাদের কাজ বা নীতিমালার পরিণতির ওপর গুরুত্ব দেন। জেরেমি বেনথাম এটি ব্যাখ্যা করেছেন তার বিখ্যাত "উপযোগ নীতি" তে। সুবিধাবাদ হল নৈতিক দর্শনের একটি শাখা যাকে বলে পরিণামবাদ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী কোনো কাজের নৈতিকতা নির্ধারিত হয় তার পরিণামের নিরপেক্ষভাবে গণ্য করা মূল্যের ওপর ভিত্তি করে। কোনটি ভালো আর কোনটি খারাপ এটি নির্ভর করে সুবিধাবাদের বিভিন্ন ধরনের ওপর। এর মধ্যে ভোগবাদী সুবিধাবাদ এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী সুবিধাবাদ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।
সুবিধাবাদের ইতিহাস
[সম্পাদনা]সুবিধাবাদের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জেরেমি বেনথাম এবং এটি আরও বিস্তৃত করেছিলেন তাঁর শিষ্য জন স্টুয়ার্ট মিল। বেনথাম মূলত আইন ব্যবস্থায় সুবিধাবাদী নীতির প্রভাব নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। তিনি এমন একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি তৈরি করেন যেখানে কোনো অপরাধের উপযোগবিরোধী প্রভাবকে শাস্তির মাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। মিল এই বিষয়টি দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেন এবং অন্য নৈতিক চিন্তাবিদদের সমালোচনার বিরুদ্ধে সুবিধাবাদকে রক্ষা করেন। তিনি বেনথামের এই বক্তব্যকে যে সুখের নির্দিষ্ট পরিমাণটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এটিকে আরও গভীর করেন। মিল বলেন, সুখের পাশাপাশি তার "গুণগত মান"ও বিবেচ্য এবং এই গুণমান নির্ধারণ করবেন সেই "সক্ষম বিচারকেরা" যারা পুরোপুরি কোনো সুখ উপভোগ করতে পারেন। তবে এর বাইরেও মিল বলেন, কিছু কিছু সুখ এত উচ্চমানের হয় যে এর সামান্য পরিমাণও অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের সুখ যেকোনো পরিমাণের চেয়ে শ্রেয়। এই মতবাদ বিতর্কিত। একদিকে এটি কিছুটা উপদেশমূলক বলে মনে হতে পারে অন্যদিকে প্রধান আপত্তি হচ্ছে মিল যে যুক্তিতে এই ধারণা দিয়েছেন অর্থাৎ "যদি একটি স্বাধীন ও সচেতন বিচারক দলকে বেছে নিতে বলা হয় তবে তারা সর্বদাই উচ্চমানের সুখ বেছে নেবে" – এমন ধারণা খুব শক্তিশালী নয় এবং সব ক্ষেত্রে সত্য নাও হতে পারে।
আরেকজন উনিশ শতকের দার্শনিক হেনরি সিজউইক সুবিধাবাদকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন যেটি আজকের দিনে বেশি প্রচলিত। তিনি মনে করেন উপযোগকে খুশি হিসেবে ব্যাখ্যা করা বেশ কষ্টকর তাই তিনি উপযোগকে আকাঙ্ক্ষা এবং সন্তুষ্টির একটি পরিমাপক হিসেবে বিবেচনা করা শুরু করেন। ফলে কোনো কিছু তখনই সুবিধাবাদ অনুযায়ী ভালো হবে যদি তা অনেক মানুষের ইচ্ছা পূরণ করে। আর খারাপ হবে যদি তা ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায় বা ইচ্ছা পূরণ না করে।
পরবর্তীতে সুবিধাবাদের দুটি শাখা গড়ে ওঠে যেগুলোর অস্তিত্ব এখনো রয়েছে:
কার্য সুবিধাবাদ বলে, কোনো ব্যক্তি যদি নৈতিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয় তাহলে তাঁর নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যা সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য সর্বাধিক সুখ বয়ে আনবে।
নিয়ম সুবিধাবাদ বলে, প্রত্যেকেরই এমন একটি নৈতিক নিয়মাবলির ভিত্তিতে কাজ করা উচিত যাতে যদি সবাই সেই নিয়ম মেনে চলে তাহলে অন্য যেকোনো নিয়মাবলির তুলনায় বেশি সুখ সৃষ্টি হবে।
আধুনিক সুবিধাবাদ
[সম্পাদনা]পিটার সিঙ্গার একজন সমসাময়িক দার্শনিক যিনি নৈতিক বিষয়ে সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন।
সমালোচনা
[সম্পাদনা]মূলত নিচের বিষয়গুলোর জন্য অধ্যাপক জেমস র্যাচেলস সুবিধাবাদ দর্শনের সমালোচনা করেন:
- কোনো কাজ সঠিক না ভুল তা শুধুমাত্র তার পরিণতির ভিত্তিতে বিচার করা হয়
- একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হচ্ছে এতে সুখ হলো কিনা বা দুঃখ হলো কিনা
- কারো সুখ কারো থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয় সবার সুখ সমানভাবে মূল্যবান
র্যাচেলস যে প্রথম সমস্যাটি চিহ্নিত করেন তা হলো সুখকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা। তিনি বলেন, নীতিগতভাবে এটি আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে এটি বেশ ত্রুটিপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ ধরুন কেউ তার বন্ধুর পেছনে বদনাম করছে তাহলে সুবিধাবাদ বলবে এটি একটি নৈতিক কাজ। কারণ যার সম্পর্কে বলা হয়েছে সে জানেই না তাই তার কোনো ক্ষতি হয়নি। র্যাচেলস বলেন, আমাদের বন্ধুত্বের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয় শুধুমাত্র নিজেকে সুখী করা। বরং সুখ হওয়া উচিত এমন একটি অনুভূতি যা অর্জন বা প্রাপ্তির পর আসে।
র্যাচেলস আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন সেটি হলো শুধু কাজের পরিণতি বিবেচনা করাটা ভুল। কাজটি নিজেই কেমন ছিল সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জাতিগত কারণে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে তাহলে সুবিধাবাদের মতে সেরা সমাধান হবে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা এবং কঠিন শাস্তি দেওয়া। কারণ এতে অনেক মানুষ খুশি হবে। কিন্তু র্যাচেলস বলেন, এটি নৈতিক নয়। কারণ এতে একজন মানুষের জীবন ন্যায্য বিচার ছাড়াই ধ্বংস হয়ে যায়। তাঁর মতে সেই ব্যক্তির একটি সঠিক বিচার পাওয়া উচিত এবং আইন অনুযায়ী তার বিচার হওয়া উচিত। আরও একটি উদাহরণ যদি কেউ টয়লেটে গোপনে ক্যামেরা বসায় এবং এতে সে নিজে খুশি হয় কিন্তু অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না তাহলে সুবিধাবাদ বলবে এটি নৈতিক কাজ। কারণ এতে কারো দুঃখ হয়নি বরং এক জনের সুখ হয়েছে। কিন্তু র্যাচেলস একে অস্বীকার করেন এবং বলেন এটি স্পষ্টতই অনৈতিক কাজ।
র্যাচেলস আরও বলেন, সুবিধাবাদের সেই যুক্তি যে প্রত্যেকের সুখ সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং নিজের সুখ অন্যদের সুখের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয় এটি বাস্তবে খুবই অপ্রয়োগযোগ্য। কারণ যখন কেউ কিছু কেনে তখন সে সাধারণত অন্য কারো সুখ বাড়াতে পারে। উদাহরণস্বরূপ যদি আপনার কাছে ২০ ডলার থাকে আপনি তা দিয়ে একটি নতুন জুতা কিনতে পারেন বা গরিবদের দান করতে পারেন। নিঃসন্দেহে দান করলে বেশি মানুষের উপকার হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে অজানা কিছু লোকের জন্য নিজের এবং প্রিয়জনের সুখ বিসর্জন দেওয়া কি যুক্তিসঙ্গত? র্যাচেলস বলবেন না, তা নয়।
সুবিধাবাদের আরও কিছু প্রচলিত সমালোচনার মধ্যে একটি হলো এই দর্শন মানুষের উদ্দেশ্যের বিষয়টি বিবেচনা করে না। কেউ যদি সুখ বাড়াতে চেয়ে কিছু করে কিন্তু তার ফলে যদি দুঃখ বাড়ে তাহলে কি সেটা অনৈতিক কাজ হয়ে গেল? আবার ধরুন চারজন মানুষের জীবন বাঁচাতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দরকার। এক্ষেত্রে যদি একজনকে জোর করে মেরে তার অঙ্গ অন্যদের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয় তাহলে অনেকের জীবন বাঁচবে। তাহলে কি এটি একটি নৈতিক কাজ হবে? যদি সুবিধাবাদ বলে যে, যেকোনো কাজ যা সর্বোচ্চ সুখ এনে দেয় সেটি নৈতিক তাহলে এর মানে দাঁড়ায় একজনকে জোর করে হত্যা করাও নৈতিক যদি এতে বাকিদের জীবন বাঁচে।
তথ্যসূত্র ও আরও পড়ুন
[সম্পাদনা]
উইকিপিডিয়ায় Utilitarianism।