বিষয়বস্তুতে চলুন

দর্শনের সাথে পরিচয়/রাজনৈতিক দর্শন কী?

উইকিবই থেকে

রাজনৈতিক দর্শনের একটি ভালো সংজ্ঞা পাওয়া যায় তখনই যখন আমরা ঠিকভাবে বুঝতে পারি "রাজনীতি" কী যা নিজেই একটি জটিল প্রশ্ন। রাজনীতি বলা যেতে পারে "অল্পসংখ্যক সম্পদ কীভাবে ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টন করা হবে সেই প্রশ্ন।" এর অর্থ দাঁড়ায় মানুষ কীভাবে ক্ষমতা লাভ করে, ধরে রাখে, এবং ব্যবহার করে। সুতরাং রাজনৈতিক দর্শন হচ্ছে রাজনীতির পেছনের তত্ত্বগুলোর অধ্যয়ন। এই তত্ত্বগুলো হয় ক্ষমতা অর্জনের জন্য নয়তো ক্ষমতার অস্তিত্বকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়।

তবে বেশিরভাগ সময়ে এসব তত্ত্ব আধুনিক রাজনৈতিক কাঠামোর বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এর পেছনে যুক্তি হিসেবে আনা হয়েছে "যুক্তিবোধ", "কারণ" কিংবা "প্রাকৃতিক আইন"।

প্লেটোর গণতন্ত্র রাজনৈতিক দর্শনের জন্য একটি ভালো সূচনাবিন্দু ছিল যদিও এটি আসলে শিক্ষাবিষয়ক একটি পাণ্ডিত্যপূর্ণ রচনা। এই গ্রন্থটি "ন্যায়বিচার" কী তা সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টায় শুরু হয় (যা কিনা কেনেথ বার্কের ভাষায় একটি "ঈশ্বরতুল্য শব্দ")। এতে প্লেটো একটি মিতব্যয়ী জীবনধারার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি তার পরিচিত প্লেটোনিক সংলাপের মাধ্যমে একটি ন্যূনতম কার্যকর সমাজের কাঠামো উপস্থাপন করেন। এরপর কিছুটা বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে তিনি বিলাসিতার প্রশ্নে সাড়া দেন। তিনি একটি এমন রাষ্ট্রের রূপরেখা দেন যেখানে অভিজাতদের জন্য ন্যায়সংগতভাবে বিলাসিতা রাখা যায় (যা দেখতে অনেকটা স্পার্টার মতো)। এই গ্রন্থটি একটি ভালো সূচনা বিন্দু কারণ এখানে তিনি ন্যায়বিচার সম্পর্কে নিজের ধারণা তুলে ধরেছেন। এই ধারণা তার "রূপতত্ত্ব" এর উপর ভিত্তি করে গঠিত যা "প্রাকৃতিক আইন" এর মতবাদগুলোরও ভিত্তি।

কয়েক হাজার বছর আর বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনা পেরিয়ে আমরা এসে পৌঁছি নিকলো ম্যাকিয়াভেলির The Prince বা রাজকুমার এ যা ১৫১৩ সালে লেখা হয় এবং তার মৃত্যুর পর ১৫৩২ সালে প্রকাশিত হয়। ম্যাকিয়াভেলি তখন ফ্লোরেন্সে মেডিসি পরিবারের শাসনের অধীনে ছিলেন। সংস্কারের একটি সংক্ষিপ্ত সময়কালে মেডিসি পরিবার ক্ষমতা হারায় আর তখন ম্যাকিয়াভেলি কূটনীতিক হিসেবে কাজ করেন। পরে মেডিসিরা ক্ষমতায় ফিরে এলে ম্যাকিয়াভেলি কার্যত নির্বাসনে চলে যান। বইটি লেখার একটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য ছিল হয়তো আবার ফ্লোরেন্সে রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা। এই বইটি প্রায়ই নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদের জন্য সমালোচিত হয়। এক কথায় বললে এতে বলা হয়েছে, ক্ষমতাই নৈতিক আচরণের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে।

এবার আমরা চলে আসি সামাজিক চুক্তিভিত্তিক তত্ত্বের দিকে। এই ধারায় রয়েছেন জ্যঁ জাক রুশো, টমাস হবস, জন লক, শার্ল মন্টেস্কিয়ে, এবং বারুখ স্পিনোজা। অবশ্যই, এখানে তাদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হবে কিন্তু এটা একটি সূচনা। হবসের তত্ত্ব মূলত তার Leviathan নামক গ্রন্থে পাওয়া যায়। সেখানে তিনি "প্রাক-রাজনৈতিক সমাজ" বা "প্রকৃতিস্থ অবস্থা" কে এমন এক জায়গা হিসেবে বর্ণনা করেন যেখানে জীবন "নৃশংস, বর্বর এবং সংক্ষিপ্ত"। এটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে, হবস এই লেখা লিখেছিলেন ত্রিশ বছরব্যাপী যুদ্ধের পর (যা মূলত ইংরেজ প্রোটেস্ট্যান্ট এবং স্প্যানিশ ক্যাথলিকদের মধ্যে একটি ধর্মীয় সংঘর্ষ)। তাই তার মানুষের স্বভাব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই নিরাশাবাদী। তিনি মনে করতেন মানুষ যদি নিজের ইচ্ছামতো চলতে পারে তবে তারা নিজেরাই নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে এটাই তার মূল বক্তব্য।

এই যুক্তি থেকে হবস এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে রাষ্ট্রবিহীন সমাজের চেয়ে যেকোনো ধরণের রাষ্ট্র ব্যবস্থা, যত খারাপই হোক না কেন তবুও ভালো। তাই তিনি বলেন, রাষ্ট্রের যেকোনো কাজ ন্যায়সঙ্গত যদি সেটি অন্তত "বাসযোগ্য একটি অবস্থা" বা তুলনামূলকভাবে ছোট মন্দ হয়। এই ধারণা এবং সমগ্র সামাজিক চুক্তির মূল কথাই হলো নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তি থাকে। এতে জনগণ কিছুটা ব্যক্তিস্বাধীনতা ছেড়ে দিয়ে জীবনের মান উন্নত করার চেষ্টা করে। হবসের ক্ষেত্রে এই ব্যক্তিস্বাধীনতা ত্যাগ করা হয়েছিল মূলত জীবনের মৌলিক সুরক্ষার জন্য।

লক কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধারণা পোষণ করেন। তার দৃষ্টিতে "প্রাকৃতিক অবস্থা" বা রাজনীতির আগের সমাজ অনেক বেশি ইতিবাচক। তার মতে সাধারণ মানুষ একে অপরকে সম্মান করবে এবং কারো ব্যক্তি বা সম্পত্তির ওপর হস্তক্ষেপ করবে না। কেউ যদি তা করে তবে যার ওপর আক্রমণ হয়েছে তার স্বাভাবিক অধিকার আছে সেই পরিস্থিতি ঠিক করার। আর যারা ওই আক্রমণ দেখতে পায় তাদের দায়িত্ব হলো ভুক্তভোগীকে সাহায্য করা।লক স্বীকার করেন যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এতটাই বেড়ে যাবে যে এগুলো সমাধান করতে প্রচুর সময় ব্যয় হবে। তাই মানুষের স্বার্থেই একটি রাষ্ট্র গঠিত হবে যাতে কেউ একজন মানুষের ব্যক্তি ও সম্পত্তির সুরক্ষা দিতে পারে। মূলত বিরোধ নিষ্পত্তি করাই এর উদ্দেশ্য। এ বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন তার The Second Treatise on Government গ্রন্থে। এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের অনেক কিছুই লকের রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে এই সামাজিক চুক্তি-ভিত্তিক তত্ত্বপ্রবক্তারা আসলে কেন এসব করছেন? তারা কেন একটি রাজনীতি-পূর্ব কল্পনার অবস্থা তৈরি করছেন যেখানে বাস্তবতা থেকে অনেক দূরের বিমূর্ত চিন্তাভাবনার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে? এর একটি উত্তর হলো তারা রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের কার্যকলাপকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।হোবাসের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী রাষ্ট্র যা কিছুই করুক না কেন এমনকি যদি তা মানবাধিকারের লঙ্ঘনও হয় তবু তা বৈধ। কারণ রাষ্ট্র না থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো। আর লক এর মাধ্যমে এমন একটি নিরপেক্ষ পদ্ধতির কথা বলেন যা মানুষের সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করতে পারে।

আরও কিছু আধুনিক সামাজিক চুক্তিভিত্তিক চিন্তাবিদ হলেন রবার্ট নোজিক (যার প্রধান গ্রন্থ Anarchy, the State, and Utopia হচ্ছে লিবার্টারিয়ান রাষ্ট্রের পক্ষে একটি যুক্তি), জন রলস (যিনি A Theory of Justice গ্রন্থে দায়িত্ববাদী উদারতন্ত্রের তত্ত্ব তুলে ধরেন যা একটি পুনর্বণ্টনভিত্তিক ন্যায়বিচারের পদ্ধতি) এবং ব্রুস অ্যাকারম্যান (যিনি লিখেছেন Social Justice in the Liberal State যেখানে তিনি একটি সংলাপভিত্তিক ন্যায়বিচারের পক্ষে মত দেন)।

আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ হলেন জন স্টুয়ার্ট মিল যিনি সুবিধাবাদ নিয়ে লিখেছেন। জেরেমি বেনথামের সুবিধাবাদের ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে মিল এই ছোট বইটি লেখেন যা শত বছরের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক চিন্তায় প্রভাব ফেলে। সুবিধাবাদের মূল ভাবনা হলো একটি সমাজে সামগ্রিক উপযোগ বা মঙ্গল বৃদ্ধি করা। উপযোগ বলতে এখানে আনন্দ বা সুখ বোঝানো হয়েছে। তাই এমন যেকোনো সিদ্ধান্ত বা সম্পদ বণ্টনের পদ্ধতি যা সমাজের সম্মিলিত সুখ বাড়াবে সেটিই ভালো সিদ্ধান্ত হবে।বেনথামের সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো যদি তিনজন ব্যক্তি থাকে এবং একটি বণ্টনের মাধ্যমে ব্যক্তি A ও B পায় ১৫১ করে উপযোগ ইউনিট আর ব্যক্তি C পায় ০ অথচ অন্য কোনো বিকল্প বণ্টনে তারা সবাই পেতে পারে ১০০ করে ইউটিলিটন তবে এই অতিরিক্ত ২টি ইউটিলিটন আসছে ব্যক্তি C কে কিছু না দিয়ে। এই ধরণের বণ্টনকে বলা হয় "সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়কত্ব"। মিল এই সমস্যার সমাধান হিসেবে তার সুবিধাবাদে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার কথাও যুক্ত করেন।

আরও কিছু সমসাময়িক রাজনৈতিক দার্শনিক হলেন হান্না আরেন্ড, জুর্গেন হাবারমাস, এরনেস্তো লাক্লাউ, জুডিথ বাটলার, রিচার্ড ররটি, এবং স্লাভয় জিজেক।