দর্শনের সাথে পরিচয়/ব্যক্তি কী?
এক সময় কিছু ধর্মীয় সমাজে সাধারণ বিশ্বাস ছিল যে মানুষের আত্মা রয়েছে যা মৃত্যুর পর স্বর্গে বা নরকে যায়। অথবা নতুন করে জন্ম নেয়। আত্মাকে একজন মানুষের মূল সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এই ধারণাটি আজকাল হয়তো কিছুটা অচল কিন্তু এটি অধিকাংশ ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তি গঠন করে। মনের সঙ্গে দেহের এই আলাদা অস্তিত্বে বিশ্বাসকে আজকের দিনে বলা হয় দ্বৈতবাদ।
বর্তমান বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা এই বিশ্বাসের বিপরীত ধারণার দিকে ঝুঁকে রয়েছে যা একত্ববাদ নামে পরিচিত। এই মত অনুযায়ী মানবদেহকে জটিল জৈবিক সত্তা হিসেবে দেখা হয়, যা তার সব আচরণ ও চিন্তাভাবনার জন্য দায়ী। যেহেতু আত্মার অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না তাই কেবল শারীরিক সত্তাকেই বিবেচনায় নেওয়া হয়। যদি বলা হয় যে একসময় X এবং পরবর্তীতে Y একই ব্যক্তি তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় তাদের মধ্যে দেহগত স্থানিক ও কালিক ধারাবাহিকতা রয়েছে।
ব্যক্তিগত পরিচয় সংক্রান্ত প্রশ্নটি প্রথম উত্থাপন করেন লক এবং পরে লাইবনিজ তা আরও বিশদভাবে আলোচনা করেন। প্রথমে এটি তুচ্ছ একটি বিষয় বলে মনে হতে পারে। কারণ একজন মানুষ বা একটি বস্তুকে তার জীবনকালজুড়ে সহজেই অনুসরণ করা যায়। যদি আমি একটি কলম পিঠের পেছনে রাখি এবং পরে সেটি আবার বের করি তখনও সেটি একই কলম বলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন যখন এমন কিছু উদাহরণ আসে যেগুলো এতটা সহজ নয়।
আসুন ব্যক্তির উদাহরণে ফিরে যাই। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আপনার দেহের অনেক উপাদান পরিবর্তিত হয়। তাহলে কি আপনি একই ব্যক্তি? একটি গাছ যা একটি বাদাম থেকে জন্মে তার জীবনকালজুড়ে একটি বিষয় একই থাকে তার উৎপত্তি। কিন্তু তারপরও সেই গাছটি কি সবসময় একই ‘গাছ’? যখন সেটি শুধুই একটি বাদাম ছিল কিংবা আমার বাড়ির পেছনে জ্বালানির কাঠ হয়ে আছে তখন কি সেটি একই গাছ? একটি বস্তু কখন আর আগের বস্তু থাকে না এবং একেবারে নতুন কিছু হয়ে যায়?
সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহাসিক উদাহরণটি হলো থিসিয়াসের জাহাজ। থিসিয়াসের জাহাজে ১০০টি খুচরা যন্ত্রাংশ ছিল এবং এর ভেতরের গুদামে একই রকম ১০০টি অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ রাখা ছিল। জাহাজটি যাত্রা শুরু করে। প্রথম দিনেই ক্যাপ্টেন একটি অংশে সমস্যা খুঁজে পান এবং সেটি গুদামের একটি খুচরা অংশ দিয়ে বদলে ফেলেন। পরের দিনও আরেকটি অংশ বদলানো হয়, এবং এভাবে প্রতিদিন একটি করে বদল হতে থাকে। ১০০ দিনের শেষে প্রতিটি অংশ বদলানোর পর জাহাজটি বন্দরে ফিরে আসে। এখন প্রশ্ন হলো এই জাহাজটি কি আগের সেই একই জাহাজ? যদি ক্যাপ্টেন গুদামের খালি অংশগুলো জড়ো করে নতুন করে একটি জাহাজ তৈরি করেন যেটির অংশ ছিল থিসিয়াসের মূল জাহাজের তাহলে কোনটি আসল থিসিয়াসের জাহাজ? বন্দরে আসা জাহাজ নাকি নতুন তৈরি করা জাহাজ?
ব্যক্তিগত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কখন একজন ব্যক্তি আর ব্যক্তি থাকেন না? যদি আপনার একটি বাহু কেটে ফেলা হয় তখনও আপনি কি একই ব্যক্তি? আপনার "ব্যক্তিসত্তা" কে কেড়ে নিতে হলে আমাকে কী কী সরাতে হবে?
একজন মানুষ বলতে আমরা কী বুঝি এই প্রশ্নটি বহু ধরণের তাৎপর্য বহন করে। উদাহরণস্বরূপ একটি গর্ভজাত কিন্তু এখনো জন্ম না নেয়া মানব সন্তান কি একজন "ব্যক্তি"? যদি আপনি একজন গর্ভপাত বিরোধী ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করেন তাহলে আপনি একরকম উত্তর পাবেন আবার যদি আপনি প্ল্যানড প্যারেন্টহুড এর কাউকে জিজ্ঞাসা করেন তাহলে আপনি নিশ্চয়ই ভিন্ন একটি উত্তর শুনবেন। যদি একটি গর্ভজাত মানব সন্তান "ব্যক্তি" হয়, তাহলে ঠিক কোন মুহূর্তে সেটি ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃত হয়? এটি কি সেই জীবসত্তার ভেতরেই নিহিত? তাহলে কীভাবে একটি গর্ভজাত মানুষ ও একটি গর্ভজাত মুরগির মধ্যে পার্থক্য করা যায়? সেই মুহূর্তে তো উভয়েই একই মাত্রার সচেতনতা ধারণ করে বলে মনে হয়। এই ধরনের বহু প্রশ্ন উঠে আসে যেকোন সংজ্ঞাতেই "ব্যক্তিত্ব"কে সংজ্ঞায়িত করতে চাইলে।
ইচ্ছার স্বাধীনতা এবং ব্যক্তি ধারণা
[সম্পাদনা]হ্যারি ফ্র্যাঙ্কফার্ট (১৯২৯) লিখেছেন, "[ব্যক্তি হওয়ার মানদণ্ডগুলো] এমন বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে চায় যেগুলো নিয়ে আমরা সবচেয়ে মানবিকভাবে নিজেদের নিয়ে ভাবি এবং যা আমাদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সমস্যাসঙ্কুল বিষয় হিসেবে বিবেচিত।" দর্শনে "ব্যক্তি কে?" এই প্রশ্নটি জীববিজ্ঞানের নয় বরং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে। হ্যারি ফ্র্যাঙ্কফার্ট বলেন, এই বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো ইচ্ছাশক্তির গঠন।
ইচ্ছার স্বাধীনতা বিষয়ক বিতর্কে তিনটি প্রধান মতবাদ রয়েছে: কঠোর নির্ধারণবাদ, নমনীয় নির্ধারণবাদ এবং মুক্ত ইচ্ছাবাদ । এই তিনটি মতবাদের বিভাজন দুটি বিষয়ে নির্ধারণবাদ বনাম অনির্ধারণবাদ এবং সামঞ্জস্যবাদ বনাম অসামঞ্জস্যবাদ। এই বিতর্কে নির্ধারণবাদ হল সেই মতবাদ যা বলে যে মানুষের মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশগুলো মূলত এলোমেলো বা দৈব নয় অন্যদিকে অনির্ধারণবাদ বলে যে এই অংশগুলো মূলত দৈব বা এলোমেলো। সামঞ্জস্যবাদীরা মনে করেন মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ যদি দৈব নাও হয় তবুও তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর অসামঞ্জস্যবাদীরা মনে করেন, শুধু তখনই স্বাধীন ইচ্ছা সম্ভব যখন সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া দৈব ও অনির্ধারিত।
এই বিতর্ক জটিল হয়ে ওঠে যখন কেউ কেউ "নির্ধারণবাদ" শব্দটি "কঠোর নির্ধারণবাদ" অর্থে ব্যবহার করেন। নির্ধারণবাদ হলো এমন একটি ব্যবস্থার অবস্থা, যেখানে t-0 সময়ে যা ঘটছে, তা t-1 সময়ে কী ঘটবে তা নির্ধারণ করে দেয় t-1 হচ্ছে ঠিক পরবর্তী মুহূর্ত। একজন নির্ধারণবাদী বিশ্বাস করেন, মানব মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া এমন একটি নির্ধারিত ব্যবস্থা। আর একজন কঠোর নির্ধারণবাদী এটাও বিশ্বাস করেন যে মানুষের সিদ্ধান্ত যদি চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষার দ্বারা নির্ধারিত হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত স্বাধীন নয়। তাই এই দুই শব্দের পার্থক্য পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। কারণ একজন নির্ধারণবাদী মানেই নয় যে সে স্বাধীন ইচ্ছার অস্তিত্ব অস্বীকার করে।
আরেকটি জটিলতা হলো কিছু লেখক বিশ্বাস করেন অনির্ধারণবাদ মানে একটি মৌলিক দৈবতা যেখানে একটি বস্তুর t-0 অবস্থার সঙ্গে তার পরবর্তী t-1 অবস্থার কোনো সম্পর্ক থাকে না। এতে করে নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। অন্যদিকে কিছু লেখক মনে করেন অনির্ধারিতভাবে গঠিত মানুষেরা t-1 সময়ে কী করবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এমনকি যদি তাদের মস্তিষ্কের অবস্থার সঙ্গে আগের অবস্থার কোনো সম্পর্ক না থাকে। প্রথম মতটি সাধারণত নমনীয় নির্ধারণবাদীদের আর দ্বিতীয়টি মুক্ত ইচ্ছাবাদীদের। কঠোর নির্ধারণবাদীরা এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির যেকোনো একটি গ্রহণ করতে পারে।
অসামঞ্জস্যবাদীরা বলেন একজন মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি থাকতে হলে সবকিছু একই রকম থাকলেও তার আচরণ ভিন্ন হতে পারার সুযোগ থাকতে হবে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক আমি আইসক্রিমের দোকানে গেছি চকোলেট আইসক্রিম খাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে। আমার সব অন্তর্দশা, মানসিক অবস্থা এবং পরিবেশ অপরিবর্তিত থাকলেও যদি আমার স্বাধীন ইচ্ছা থাকে তাহলে আমি হয় চকোলেট নয়তো নেপোলিটান আইসক্রিম অর্ডার করতে পারতাম। যদি এমন হয় যে আমি চকোলেট ভালোবাসি আর নেপোলিটান অপছন্দ করি এবং আমি শুধুমাত্র সেই কারণে চকোলেট অর্ডার করি তাহলে এটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির পরিচয় নয়। কারণ আমার পছন্দ আগে থেকেই পূর্বনির্ধারিত ছিল। অসামঞ্জস্যবাদীরা বলেন আমি তখনই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী হবো যদি এমন অবস্থা থেকেও যেখানে আমি চকোলেট চাই এবং নেপোলিটান ঘৃণা করি আমি চাইলে নেপোলিটানও অর্ডার করতে পারি।
অন্যদিকে সামঞ্জস্যবাদীরা বলেন, কারো স্বাধীন ইচ্ছা থাকতে হলে তার সিদ্ধান্ত জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা ছাড়া হতে হবে। যদি আমি আইসক্রিম খেতে চাই এবং আমার প্রবল ইচ্ছার কারণে আমি চকোলেট অর্ডার করি তাহলে এটিকে তারা স্বাধীন ইচ্ছার প্রকাশ বলেই গণ্য করেন। তাদের মতে মানুষ তার ইচ্ছাশক্তি হারায় তখনই যখন তাকে জোরপূর্বক কিছু করতে বাধ্য করা হয়। যেমন যদি কোনো উন্মাদ নেপোলীয় পর্যটক আমার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে আমাকে নেপোলিটান আইসক্রিম অর্ডার করায় তাহলে এটা আর স্বাধীন ইচ্ছার কাজ হবে না।
কঠোর নির্ধারকবাদীরা বিশ্বাস করেন যে সব কিছু পূর্বনির্ধারিত এবং মানুষ যেসব সিদ্ধান্ত নেয় তা এলোমেলো নয়। আর এই অনির্দৈশিকতা স্বাধীন ইচ্ছার সম্ভাবনাকে বাতিল করে দেয়। কম নির্ধারকবাদীরা বলেন, মানুষের সিদ্ধান্ত এলোমেলো নয় কিন্তু তা সত্ত্বেও স্বাধীন ইচ্ছা অস্বীকার করা যায় না। (তাদের মধ্যে অনেকে মনে করেন সিদ্ধান্ত যদি এলোমেলো হতো তাহলে বরং স্বাধীন ইচ্ছা অসম্ভব হতো।) স্বাধীনতাবাদীরা মনে করেন মানুষের সিদ্ধান্ত এলোমেলো এবং এই এলোমেলোতা স্বাধীন ইচ্ছাকে অস্বীকার করে না। বরং এই এলোমেলোতাই স্বাধীন ইচ্ছার পথ খুলে দেয়।
নির্ধারকবাদীরা মনে করেন যদি কোনো ব্যবস্থা পূর্বনির্ধারিত হয় তাহলে তার বর্তমান অবস্থা থেকেই পরবর্তী অবস্থা নির্ভর করে। অর্থাৎ যেকোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের ফলাফল প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত থাকে। প্রকৃতির প্রতিটি জিনিস পরমাণু দিয়ে গঠিত এবং সেগুলো নির্দিষ্ট নিয়মে চলে। আমরাও সেই নিয়মের বাইরে নই। নির্ধারকবাদের মতে সব কিছু পূর্বের ঘটনার কারণে অপরিহার্যভাবে ঘটে। কঠোর নির্ধারকবাদের মতে এই নিয়ম সত্য এবং মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে না। অসামঞ্জস্যবাদ বলছে, যদি প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী মানুষের আচরণ নির্ধারিত হয় এবং সেই পরিস্থিতিগুলোও আগে থেকে নির্ধারিত থাকে তাহলে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা থাকতে পারে না।
আমরা বিজ্ঞানের মাধ্যমে যা কিছু জানি তাতে দেখা যায় প্রায় সব ক্ষেত্রে নির্ধারকবাদ সত্য। তবে কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান এর কিছু ব্যাখ্যায় বলা হয় কিছু ঘটনা মূলত এলোমেলোভাবে ঘটে। যার ফলে কিছু মস্তিষ্কীয় কার্যক্রমও এলোমেলো হতে পারে। এর অর্থ দাঁড়ায় তত্ত্বগতভাবে হলেও মানুষের কিছু সিদ্ধান্ত এলোমেলো হতে পারে। যেমন কেউ যদি চকোলেট আইসক্রিম খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেও তারপরও কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ নেপোলিটান অর্ডার করে বসে।
স্বাধীনতাবাদীরা বিশ্বাস করেন প্রতিদিনকার জীবনের অভিজ্ঞতা বলে দেয় যে আমাদের স্বাধীন ইচ্ছা আছে। তাই মানব সিদ্ধান্ত নির্ধারিত নয়। নরম নির্ধারকবাদীরা একমত যে প্রমাণগুলো স্বাধীন ইচ্ছার পক্ষে। কিন্তু তারা বলেন মানুষ নিজের আচরণ অনেক সময় নিজেই নির্ধারণ করে এটা প্রমাণ করে না যে সেই সিদ্ধান্ত পূর্বনির্ধারিত ছিল না। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন যখন কেউ নিজের কাজ নিজে ঠিক করে সেটিই প্রমাণ করে যে কাজটি নির্ধারিত (কারণ সেটি তার নিজের দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে)।
স্বাধীনতাবাদীরা বলেন মানুষ কেবল তখনই চিন্তাভাবনা করে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে যখন সেই সিদ্ধান্ত সত্যিকার অর্থেই তার নিজের হাতের মধ্যে থাকে। তাই এটি প্রমাণ করে যে মানব আচরণ পূর্বনির্ধারিত নয়। নরম নির্ধারকবাদীরা এর জবাবে বলেন চিন্তাভাবনা কোনো এলোমেলো ঘটনার ধারা নয়। বরং এটা একটি পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়া যেখানে মানুষের মস্তিষ্ক তার চাহিদা, পছন্দ ও ইচ্ছার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
স্বাধীনতাবাদীরা প্রায়ই বলেন, তারা অন্তর থেকে অনুভব করেন যে তারা নিজের কাজ নিজের ইচ্ছায় করছেন। নরম নির্ধারকবাদীরা বলেন এই অনুভবটি সত্য। কারণ মস্তিষ্ক তার চাহিদা চিহ্নিত করে পছন্দ গঠন করে সিদ্ধান্ত নেয় এবং তারপর সে অনুযায়ী কাজ করে। এই প্রতিটি ধাপ এলোমেলো হলে বা মস্তিষ্ক যদি অনির্ধারিত হতো তবে এই ক্রমগত প্রক্রিয়া ঘটত না।
মানুষ ভাবে সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং বিভিন্ন বিকল্পের মধ্যে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা তার আছে। এই অনুভূতির কারণ হলো আমি অনুভব করি আমি কী চাই আমার সেই চাওয়ার উপর ভিত্তি করে ইচ্ছা গঠন করি তারপর ইচ্ছাগুলোর সমষ্টির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিই এবং অবশেষে সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করি।স্বাধীনতাবাদীরা বলেন, মানুষের আচরণ কোনো কারণ-প্রভাবের নিয়মে চলে না। কিন্তু তারা এই সুসংগঠিত "একটি ঘটনার পর আরেকটি ঘটনা"র ধারা ব্যাখ্যা করতে পারেন না। তাই এই অভিজ্ঞতাটি স্বাধীনতাবাদের বিপক্ষে একটি শক্তিশালী যুক্তি।
ইতিহাস জুড়ে বেশিরভাগ দার্শনিকই মাঝামাঝি অবস্থান নিয়েছেন এবং যুক্তি দিয়েছেন যে স্বাধীন ইচ্ছা ও নির্ধারকবাদ একসঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। ডেভিড হিউম এবিষয়ে একটি ভালো উদাহরণ। হিউম বলেন, মানুষ তখনই স্বাধীন যখন সে তার ইচ্ছামতো কাজ করতে পারে। হতে পারে আমি কঠোর নির্ধারকবাদী বা স্বাধীনতাবাদীদের মতে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। তবুও যদি আমি চকোলেট আইসক্রিম চাই এবং সেই চাওয়াই আমাকে তা বেছে নিতে বাধ্য করে তাহলে বলা যায় আমি স্বাধীন ইচ্ছায় কাজ করেছি।
আসুন আবার হ্যারি ফ্র্যাংকফুর্টে ফিরে যাই। তিনি বিশ্বাস করেন কার্যকারণ আসলে ইচ্ছার স্বাধীনতা বা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না। ফ্র্যাংকফুর্ট ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের একটি স্তরভিত্তিক কাঠামো নির্মাণ করেন। প্রথম স্তরের ইচ্ছা হলো কোনো কিছু করতে চাওয়া। প্রায় সব জীবেই এই রকম ইচ্ছা থাকে। যেমন “আমি খেতে চাই।” দ্বিতীয় স্তরের ইচ্ছা হলো নিজের পরিবর্তন চাওয়া বা নিজের প্রথম স্তরের ইচ্ছাগুলো ভিন্নরকম হোক এই আকাঙ্ক্ষা। ফ্র্যাংকফুর্ট বলেন, এই আত্মমূল্যায়নের ক্ষমতা মূলত মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য। এরও এক ধাপ ওপরে রয়েছে দ্বিতীয় স্তরের সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ যখন কেউ চায় যে তার একটি নির্দিষ্ট ইচ্ছাই তার কার্যকর সিদ্ধান্ত হোক। ফ্র্যাংকফুর্ট বলেন, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতাই একজন মানুষকে মানুষ করে তোলে। আর যাদের এই ক্ষমতা নেই যারা তাদের ইচ্ছার ব্যাপারে চিন্তা করে না এবং শুধু ইচ্ছার টানে চলে, তারা মানুষ নয় বরং এক ধরনের প্রাণী মাত্র।
এই তত্ত্বগুলো অন্যান্য অনেক তত্ত্বের মতোই এখনো টিকে আছে এবং পরস্পরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে রয়েছে।
এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমরা ঠিক বুঝতে পারব না আদৌ একজন "ব্যক্তি" তৈরি করা সম্ভব কি না। ইংরেজি শব্দ "person" বা ব্যক্তি অনেক সময় অস্পষ্ট। আমরা প্রায়ই এই শব্দটি "মানুষ" বোঝাতে ব্যবহার করি। কিন্তু এখানে নিশ্চয়ই সে অর্থে ব্যবহার করা হয়নি। হতে পারে অন্য কোনো গ্রহে এমন কিছু এলিয়েন আছে যাদের চিন্তা করার ক্ষমতা আমাদের মতোই যেমন ই.টি, ক্লোজ এনকাউন্টারস অফ দ্য থার্ড কাইন্ড কিংবা স্টার ওয়ার্স ছবির বিখ্যাত “বার দৃশ্য”। ভাবুন সেই এলিয়েনরা ভাষা ব্যবহার করে নৈতিক বিচার করে সাহিত্য ও শিল্প সৃষ্টি করে। তাহলে নিশ্চয়ই তারা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সত্তা অর্থাৎ তাদেরকে কুকুর বা বিড়ালের মতো সম্পত্তি হিসেবে কেনাবেচা করা নৈতিকভাবে ভুল হবে। আমাদের নিজেদের স্বার্থে তাদের ব্যবহার করাও ভুল হবে যদি তাদেরও আমাদের মতো নৈতিক অধিকার থাকে। তাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যক্তিকে সম্পত্তি থেকে আলাদা করা।একজন ব্যক্তি সেই সত্তা যার নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার নৈতিক অধিকার আছে। অন্যদিকে সম্পত্তি এমন একটি জিনিস যা কেনাবেচা করা যায় যার ব্যবহার আমার নিজের স্বার্থে করা যায়। (অবশ্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে কীভাবে তাদের ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে গুরুতর নৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা আপনাকে প্রাণীদের প্রতি নৈতিক আচরণ ও তাদের অধিকারের বিষয়ে দার্শনিক বিতর্কগুলো জানতে উৎসাহিত করছি।) ব্যক্তিকে সম্পত্তির মতো আচরণ করা উচিত নয়। তাই আমরা নিচের মতো করে "ব্যক্তি" সংজ্ঞা দিচ্ছি:
ব্যক্তি = “যেকোনো সত্তা যার নিজের ভাগ্য নির্ধারণের নৈতিক অধিকার রয়েছে।” সুতরাং যদি কোনো সত্তাকে ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় তবে সে সত্তা এমন এক ধরনের সত্তা যার অধিকার ন্যায়সঙ্গত সমাজের সংবিধানে রক্ষা পাওয়া উচিত। যেমন আপনি ভাবতে পারেন এ ধরনের যেকোনো সত্তার “জীবন স্বাধীনতা ও সুখের সন্ধান” করার অধিকার থাকা উচিত। পিটি প্রকল্পে আমাদের যেসব দার্শনিক প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে হয় তার একটি হলো: একটি সত্তার মধ্যে কী কী বৈশিষ্ট্য থাকলে তাকে "ব্যক্তি" বলা যাবে? অনেকে বিভিন্ন গুণের কথা বলেছেন: বুদ্ধিমত্তা, ভাষা ব্যবহার করার ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, নৈতিক বিচার করার সামর্থ্য, চেতনা, ইচ্ছার স্বাধীনতা, আত্মসচেতনতা এই তালিকা প্রায় অসীম।
ইচ্ছার স্বাধীনতা ও নৈতিকতা
[সম্পাদনা]ইচ্ছার স্বাধীনতা এবং নৈতিকতা ও দায়িত্বের ধারণার মধ্যে সুস্পষ্ট একটি সম্পর্ক আছে। ইচ্ছার স্বাধীনতার পক্ষে থাকা দার্শনিকেরা ও নিয়তিবাদীরা প্রায়ই একমত হন যে কোনো ব্যক্তিকে তার কর্মের জন্য দায়ী করতে হলে সেই ব্যক্তিকে অবশ্যই নিজের ইচ্ছায় সেই কাজটি করতে হবে। এই ধারণাটি আইন দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাধারণভাবে আমরা কাউকে কোনো অপরাধের জন্য দায়ী করি না যদি মনে করি সেই ব্যক্তি তার কাজের “মালিক” ছিল না। যেমন যদি কোনো স্কিজোফ্রেনিয়া রোগী হ্যালুসিনেশনের ঘোরে কারো উপর গুলি চালায় তাহলে আমরা বিশ্বাস করি না যে এটা তার দোষ। আমরা তাকে বলি “পাগলামির কারণে দোষী নয়।” যদি মানুষের ইচ্ছা স্বাধীন না হয় তাহলে দোষ দেওয়া যায় না, আবার প্রশংসাও করা যায় না।
তবে কিছু সহনশীল নিয়তিবাদী যেমন ডেভিড হিউম মনে করেন, মানুষকে তার কর্মের জন্য দায়ী করা যায় ঠিক তখনই যখন তারা স্বাধীন নয়। তার রচনায় “Of Liberty and Necessity” তিনি একটি যুক্তিতর্ক পেশ করেন। তিনি বলেন, হয় মানুষের সব কাজ পূর্বনির্ধারিত কিংবা সব কাজই এলোমেলো ও বিশৃঙ্খল। তিনি বলেন যদি মানুষের কাজ এলোমেলো হয় যদি আমার কাজ আমার চরিত্র থেকে না এসে শুধু দৈবভাবে ঘটে তাহলে কোনো নৈতিক দায়িত্ব থাকতে পারে না। আমি যদি নিজে থেকে কোনো কাজ না করি তাহলে আমাকে দায়ীও করা যায় না। কিন্তু যদি সবকিছু পূর্বনির্ধারিত হয় তাহলে অন্তত বলা যায়, আমার মানসিক অবস্থা ও চরিত্র থেকেই আমার কাজ এসেছে।
হিউম এই তর্কে শেষমেশ পরাজিত হন কারণ রিচার্ড টেলর তার যুক্তিকে খণ্ডন করেন এবং তৃতীয় একটি ধারণা দেন ব্যক্তির কারণ নির্ধারণ এটি এমন একটি ধারণা যেখানে বলা হয় একজন ব্যক্তি নিজে একটি ঘটনা ঘটাতে পারে। এটা নিয়তিবাদ ও এলোমেলো আচরণের ধারণা থেকে ভিন্ন বলে মনে হয়। তবে নিয়তিবাদীরা এটাও বলার সুযোগ পান যে যদিও একজন ব্যক্তি কোনো ঘটনা ঘটাতে পারে তবুও সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তার পূর্ব অভিজ্ঞতা ও জেনেটিক বৈশিষ্ট্য থেকেই বিশ্বাস ও ইচ্ছাগুলো গড়ে ওঠে। যদি কোনো ব্যক্তির কাজ এই পূর্বের বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতা থেকে না আসে তাহলে আমাদের আবার মেনে নিতে হয় যে এই পৃথিবী এলোমেলো ও বিশৃঙ্খল।
আরও পড়ার জন্য
[সম্পাদনা]- John Locke An Essay concerning Human Understanding, especially Book II Chapter xxvii
- Christian Smith What is a Person? University of Chicago Press 2010
- David Hume Of Liberty and Necessity
- Derek Parfit Reasons and Persons Oxford University Press 1984
- Harry Frankfurt Freedom of the Will and the Concept of the Person
- Richard Taylor Freedom and Determinism
- Simon Blackburn Think Oxford University Press 1999