দর্শনের সাথে পরিচয়/দর্শন কী?
"দর্শন" একটি শব্দ যার বহু ভিন্ন অর্থ রয়েছে। এই শব্দের বিভিন্ন সংজ্ঞা একে অপরের সঙ্গে সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং তা অনেকটাই বিস্তৃত। আজকাল অনেকেই "দর্শন" বলতে বোঝে একজন ব্যক্তির জীবনের নীতিমূলক দিকনির্দেশনা মানে সে কীভাবে জীবন পরিচালনা করবে এবং পরিকল্পনা করবে সেই চিন্তাধারার ভিত্তি। তবে বুদ্ধিবৃত্তিক বা একাডেমিক অর্থে "দর্শন" সাধারণত এই অর্থে ব্যবহৃত হয় না। বরং একে বোঝানো হয় এমন একটি পরিচালিত জ্ঞানের অনুসন্ধান যা এই ধরনের বিষয় ব্যাখ্যা করে অস্তিত্বের প্রকৃতি, অস্তিত্বের কারণ, ব্যক্তির প্রকৃতি ও কারণ, জ্ঞানের প্রকৃতি ও কারণ এবং আরও অসংখ্য জটিল বিষয়।
এই অসংখ্য বিষয়ই দর্শনের মূল রূপ বা "অনুভব" গঠনে ভূমিকা রাখে। এগুলিই দর্শনকে পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান এমনকি সঙ্গীতের মতো অন্যান্য পরিচালিত গবেষণার ক্ষেত্র থেকে আলাদা করে। অথচ এক সময় এসবই দর্শনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো। আপনি যখন এই পাঠ পড়বেন তখন আপনি বুঝতে পারবেন পশ্চিমা জগতে দর্শনের প্রশ্নগুলো কীভাবে গঠিত ও বিকশিত হয়েছে এবং দর্শন মানব বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টার সঙ্গে কীভাবে সংযুক্ত।
আমরা আজকে যাকে "পশ্চিমা দর্শন" বলে জানি তার উৎপত্তি সাধারণভাবে ধরা হয় প্রাচীন গ্রিসে। সেখানে মানুষের বিশ্বসৃষ্টির কল্পকাহিনীগুলো থেকেই এর সূচনা। মিলেটাসের থেলিস প্রাচীন মিশর থেকে কিছু প্রাথমিক জ্ঞানের বীজ নিয়ে আসেন যা গ্রিকরা সময়ের সঙ্গে পরিণত করে প্রথম দর্শনে রূপান্তরিত করে যা আজও আমরা দর্শন হিসেবে চিনি। কাজেই এটি বিস্ময়ের বিষয় নয় যে "philosophy" শব্দটির মূল গ্রিক ভাষায়। "Philo" এসেছে গ্রিক শব্দ philein থেকে যার অর্থ ‘ভালোবাসা’, আর "sophy" এসেছে sophia থেকে যার অর্থ ‘জ্ঞান’ বা ‘প্রজ্ঞা’। সুতরাং Philosophy মানে দাঁড়ায় "জ্ঞান বা প্রজ্ঞার প্রতি ভালোবাসা"।
ফলে দার্শনিকেরা মানবজাতিকে ঘিরে থাকা সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবেন কী বিদ্যমান? কী বাস্তব? বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতি কী? ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি? মানুষের আত্মা আছে কি? জ্ঞান কী? সত্য কী? একজন মানুষ নিজেকে কীভাবে শাসন করবে? চেতনার প্রকৃতি কী? দর্শনের প্রশ্নগুলোও অন্য অনেক অনুসন্ধানের মতো জীবনের প্রকৃতি ও বাস্তবতা সম্পর্কে একধরনের কৌতূহল থেকে জন্ম নেয়।দর্শনের অনেক অংশই অত্যন্ত বিমূর্ত ধারণা নিয়ে কাজ করে। তাই বিজ্ঞান বা অন্যান্য একাডেমিক শাস্ত্রের মতোভাবে দার্শনিকেরা সব সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারেন না। তবে দার্শনিকদের জন্য অন্যান্য বহু পদ্ধতি রয়েছে। যেমন: আনুষ্ঠানিক যুক্তি, চিন্তানির্ভর পরীক্ষণ, যুক্তিপূর্ণ প্রবন্ধ, আলোচনাসভা, অভিজ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং আরও অনেক কিছু।
[দার্শনিক প্রজ্ঞার অনুসন্ধানকে দুই ধরনের জ্ঞানের সন্ধান হিসেবে বোঝা যায়। এরিস্টোটল একে দুটি ভাগে ভাগ করেছিলেন: তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা এবং ব্যবহারিক প্রজ্ঞা। তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা অনুসন্ধান করে শুধু বোঝার জন্য আর ব্যবহারিক প্রজ্ঞা বোঝার মাধ্যমে কিছু করবার উদ্দেশ্যে। এই পার্থক্য অন্যান্য ক্ষেত্রেও দেখা যায়। একজন পদার্থবিজ্ঞানী পদার্থ ও গতি বোঝার চেষ্টা করেন কেবল জ্ঞানের পরিসীমা বাড়ানোর জন্য। আর একজন প্রকৌশলী তা বোঝেন কিছু তৈরি করার জন্য। ঠিক তেমনি একজন দার্শনিক যিনি মহাবিশ্বের অস্তিত্বের আধ্যাত্মিক প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করেন তিনি দর্শনের তাত্ত্বিক শাখায় কাজ করছেন। অন্যদিকে যার লক্ষ্য ব্যবসার নৈতিক আচরণ বোঝা তিনি দর্শনের ব্যবহারিক দিক নিয়ে কাজ করছেন। এ ধরনের ব্যবহারিক প্রশ্ন নিয়ে কাজ করাকে সাধারণত "প্রয়োগযোগ্য দর্শন" বলা হয়।]
বিষয়বস্তুর দিক থেকে দর্শন সম্ভবত একমাত্র শাস্ত্র যেখানে সীমাবদ্ধতা প্রায় নেই বললেই চলে। এমন প্রায় সব চিন্তাভাবনা যা কল্পনা করা যায় দর্শন তাতে প্রবেশ করেছে বা করবে। আর যেগুলোতে করে না তার অনেকগুলোই একসময় দর্শনের অঙ্গ ছিল যা পরিণত হয়ে এখন আলাদা শাস্ত্র হয়েছে। যেমন পদার্থবিজ্ঞান একসময় "প্রাকৃতিক দর্শন" নামে পরিচিত ছিল। তাছাড়া দার্শনিকেরা সাধারণত এমন প্রশ্ন তোলেন যেগুলো প্রায় প্রতিটি একাডেমিক শাস্ত্রকে স্পর্শ করে। আসলে দর্শনের একটি বড় ভূমিকা হলো অন্যান্য শাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করা যেমন সেই শাস্ত্রে গবেষণার নিয়মকানুন কিংবা তা অন্যান্য মানবিক চেষ্টার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত। সে কারণে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই অন্যান্য শাস্ত্রের "দর্শন" বিষয়ক কোর্স থাকে যা দার্শনিক ও ঐ নির্দিষ্ট শাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী। যদিও দর্শনের আগ্রহ অনেক বিস্তৃত তবুও এর অনুসন্ধানে কিছু সাধারণ ঐক্য রয়েছে...