বিষয়বস্তুতে চলুন

দর্শনের সাথে পরিচয়/জ্ঞানতত্ত্ব কী?

উইকিবই থেকে

'জ্ঞানতত্ত্ব' (epistemology) শব্দটি প্রাচীন গ্রিক ভাষা থেকে এসেছে: episteme অর্থ 'জ্ঞান' এবং প্রত্যয় -ology অর্থ 'বিজ্ঞান' বা 'গভীর অধ্যয়ন'। সোজা কথায়, জ্ঞানতত্ত্ব হলো জ্ঞানের নিজস্ব অধ্যয়ন বা অনুসন্ধান। একে প্রায়ই জ্ঞানের তত্ত্ব বলা হয়। জ্ঞানতত্ত্বীয় জ্ঞান বলতে বোঝানো হয় কেবল আমরা কী জানি তা নয়, বরং জানা মানে কী – সেটিই মূল অনুসন্ধান।

জ্ঞানতত্ত্বের উদ্দেশ্য হলো মানব জাতি কীভাবে পৃথিবীকে উপলব্ধি করে এবং সে সম্পর্কে কীভাবে জ্ঞান অর্জন করে, এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা। এর মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো:

  1. বহিঃজগৎ কি আছে? আমরা কীভাবে নিশ্চিত হতে পারি?
  2. স্মৃতি কীভাবে কাজ করে? আমরা কীভাবে জানি যে আমাদের স্মৃতিগুলো সত্য?
  3. অনুধাবনের প্রকৃতি কী? বর্তমান জ্ঞান ভবিষ্যৎ অনুধাবনে কতটুকু প্রভাব ফেলে?
  4. মানুষের কোন জ্ঞান জন্মগত এবং কোনটি জন্মের পরে শেখা হয়? কোন পূর্বধারণা ছাড়াই কি নতুন তথ্য আত্মস্থ করা যায়?
  5. অনুধাবনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক? এ ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সঠিক পদ্ধতি কী?

বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় একটি মৌলিক (সক্রেটীয়) পার্থক্য হলো: মতামত ধারণ করে বিশ্বাস, কিন্তু 'সত্য' ধারণ করে জ্ঞান। জ্ঞান সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিশ্চিত সত্য যা কখনোই মিথ্যা হতে পারে না (যদিও মতামত প্রায়শই মিথ্যা হতে পারে)। কার্ল পপার অনুসারে, সত্য আর অসত্যের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের একমাত্র উপায় হলো যাচাইকরণযোগ্য বক্তব্যকে পরীক্ষামূলকভাবে খণ্ডনযোগ্য করে তোলা। তবে প্লেটো এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন; তিনি বিশ্বাস করতেন সত্য কখনো খণ্ডনযোগ্য নয়।

তাহলে এখন জ্ঞানতত্ত্ব মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়: আমাদের জ্ঞান কোথা থেকে আসে? এবং আরো গভীরে যেতে চাইলে (যেমন অনেক দার্শনিকই গেছেন): মানব জ্ঞানের সীমা কোথায়? এ বিষয়ে জানতে হলে আধুনিক যুগের দুটি মুখ্য দার্শনিক প্রবাহ সম্পর্কে পড়া জরুরি: যুক্তিবাদ (Rationalism) এবং অভিজ্ঞতাবাদ (Empiricism)। যুক্তিবাদী চিন্তাবিদদের (যেমন দেকার্ত) মতে, সব জ্ঞান আসে যুক্তি থেকে এবং মানব মনই জ্ঞানের মূল উৎস। অপরদিকে, অভিজ্ঞতাবাদীরা (বিশেষ করে ব্রিটিশ চিন্তাবিদ বার্কলি, হিউম, লক) মনে করেন, মানুষের প্রকৃত জ্ঞান আসে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। অর্থাৎ মানব ইন্দ্রিয়ই হলো জানার প্রকৃত মাধ্যম।

আরও একটি ধর্মীয় ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো জ্ঞানকে (ঈশ্বরের) ঐশী প্রকাশ হিসেবে দেখা (যেমন ঈশ্বর তাঁর আত্মার মাধ্যমে বাইবেলের লেখকদের জ্ঞান দেন)। এখানে বিশ্বাস এবং জ্ঞানের মধ্যে বিভাজনরেখা কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। সেন্ট অগাস্টিন এই বিষয়ে যুক্তি ও বিশ্বাসের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন।

অনেক জ্ঞানতত্ত্ববীদদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলোর একটি হলো জ্ঞানের বিশ্লেষণ, অর্থাৎ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যে, "কেউ কোনো কিছু জানে বলার জন্য কী শর্ত পূরণ হতে হবে?" দীর্ঘদিন ধরে বেশিরভাগ দার্শনিক মনে করতেন: কিছু জানার জন্য আপনাকে সেটি বিশ্বাস করতে হবে, সেটি সত্য হতে হবে এবং সেই বিশ্বাসের জন্য যথাযথ যুক্তি থাকতে হবে। কিন্তু গেটিয়ার সমস্যা এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায় এবং এই প্রশ্নটি নতুন করে অনেকের চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে। এই ধরনের প্রশ্ন জ্ঞানতত্ত্বের সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নগুলোর মধ্যে পড়ে, যেখানে জ্ঞানের বিভিন্ন ধরন নিয়ে আলোচনা অপেক্ষাকৃত বিশেষায়িত প্রশ্ন।

তথ্যসূত্র এবং আরও পাঠ্য

[সম্পাদনা]