দর্শনের সাথে পরিচয়/অতিভৌতিকতা কী?
অতিভৌতিকতা নামক দার্শনিক শাখাটি বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে। আমাদের অস্তিত্ব এবং এই মহাবিশ্বের মৌলিক প্রশ্নগুলো এই শাখাতেই উঠে আসে। উদাহরণস্বরূপ আমরা সময়কে যেভাবে অনুভব করি তা কি সত্যিই বাস্তব না কি এটা শুধুই এক ধরনের ভ্রান্তি? সমস্ত কিছুতেই কি এমন কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য থাকে যা থাকা আবশ্যক? কোনো কিছুর অস্তিত্ব মানে আসলে কী? কোনো বিমূর্ত বিষয় যেমন একটি সংখ্যা কিংবা ম্যান্ডেলব্রট সেট তা কি এই মহাবিশ্বের মতো করেই অস্তিত্ব রাখে? গুণাবলি বলতে আমরা আদৌ কী বোঝাই? মানুষ বলতে আসলে কী বোঝানো হয়? নিজস্ব সত্তা বলতে কী বোঝায়? আমাদের কি সত্যিই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে?
এই কঠিন প্রশ্নগুলো যেগুলো নিজের মধ্যেই কিছু পূর্বধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারায় প্রায়ই ছুঁয়ে যাওয়া হয়। তবে এগুলো একই বিষয় নয়। যেমন, সময়ের আচরণ বোঝাতে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব, এনট্রপি ইত্যাদি ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এই পদার্থবৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো কেবল দেখা বা মাপা ঘটনাগুলোর আচরণ ব্যাখ্যা করে। এগুলো সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করা যায় পরীক্ষার মাধ্যমে। অথচ অতিভৌতিকতা আমাদের পর্যবেক্ষণের বাইরে গিয়ে প্রশ্ন তোলে। এটি বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ এবং তা থেকে কী কী ফলাফল আসতে পারে সেসব নিয়ে চিন্তা করে।
ফলে এই শাখাটি অনেক সময় কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ যখন কোনো প্রশ্নের উত্তর যাচাই করার কোনো উপায় থাকে না তখন আমরা কিভাবে বুঝব তা সত্যি না মিথ্যা? একমাত্র উপায় হলো যুক্তির কঠোর ব্যবহার। নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্নে এটি আমাদের কিছু দৃষ্টিভঙ্গি বাতিল করতে সাহায্য করতে পারে যেমন কোনো মতবাদ যদি একটি বিপরীত যুক্তির সৃষ্টি করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেশিরভাগ সময় অতিভৌতিকতা আমাদের কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারে না। আমাদের করতে হয় একটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে কিছু মূল ধারণা গ্রহণ করা। তারপর এসব থেকে কী কী ফলাফল আসতে পারে তা বিশ্লেষণ করা। যদি এতে কোনো বিরোধ ধরা পড়ে তাহলে সেই ধারণাসমূহ বাদ দেওয়া যায়। কিন্তু কোনো বিরোধ না থাকলেও তা সত্য এটি প্রমাণ হয় না। এভাবে আমরা অনেকগুলো সম্ভাব্য আত্মসংগত এবং পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারি। প্রতিটির প্রতি কতটুকু আস্থা রাখা যায় সেটিও নির্ধারণ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, হতে পারে আপনি এই লেখাটি পড়ছেন, আপনি শুধু এক টুকরো মস্তিষ্ক যেটি এক ধরনের কৃত্রিম তরলে ভাসছে এবং একটিমাত্র সিমুলেশনের মধ্যে বন্দী। এই ধারণাটি হয়তো আত্মসংগতভাবে সঠিক হতে পারে। কিন্তু জ্ঞানতত্ত্ব থেকে আমরা যা শিখেছি তা প্রয়োগ করে আমরা এটিকে সত্য হওয়ার খুব কম সম্ভাবনা দিতে পারি যদিও একে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এমনটাও অসম্ভব নয় যে যেসব প্রশ্ন আজকে স্পষ্টভাবে অতিভৌতিকতার অন্তর্ভুক্ত সেগুলো ভবিষ্যতে পদার্থবিজ্ঞানের আওতায় চলে আসবে। যেমন এক সময় ভাবা হতো যে সব বস্তু ক্ষুদ্র কণার তৈরি এই ধারণা ছিল অতিভৌতিক। কিন্তু যখন মানুষ এমন যন্ত্র আবিষ্কার করল যা এই ক্ষুদ্র কণাগুলোর অস্তিত্ব নির্ধারণ করতে পারে তখন পরমাণু তত্ত্ব অতিভৌতিকতা থেকে সরে এসে পদার্থবিজ্ঞানে স্থান পেল। অতএব অতিভৌতিকতা সবসময়ই একধরনের "সীমানার রেখায়" অবস্থান করে। এর অনেক কিছু ভবিষ্যতে পদার্থবিজ্ঞানে পরিণত হতে পারে।
অতিভৌতিকতার সংজ্ঞা
[সম্পাদনা]আমরা অতিভৌতিকতা সম্পর্কে একটি ধারণা দিয়েছি বটে, কিন্তু একে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন। এই শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হতে পারে "পদার্থবিজ্ঞানের পরবর্তী", তবে এর চেয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে গেলেই বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রাচীনকালে গ্রিক দর্শনিক আন্দ্রোনিকাস অফ রোডস এর সম্পাদিত অ্যারিস্টটলের রচনাগুলোর মধ্যে পদার্থবিদ্যা বিষয়ের পরে যেসব বিষয় ছিল, সেগুলোকে বোঝাতেই মেটা এবং ফিজিক্স মিলিয়ে শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। তাই সম্ভবত এর প্রকৃত অর্থ বোঝার জন্য আমাদের দেখা উচিত, অতিভৌতিকতা কী নয়। নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব, কিংবা কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে অধিকাংশ কাজ—এসব স্পষ্টভাবে অতিভৌতিকতা নয়। এসব তত্ত্ব নির্দিষ্ট কিছু দেখা যায় এমন ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে এবং পরীক্ষার মাধ্যমে এসব সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করা যায়।
ধর্মও অতিভৌতিকতা নয়। ধর্ম একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাসের ভিত্তিতে গঠিত, যেটি হয়তো এই বিশ্ব সম্পর্কে কিছু ব্যাখ্যা দিতে পারে কিংবা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে। তবে তা যুক্তির ভিত্তিতে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিকে কর্তৃত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করে। অন্যদিকে অতিভৌতিকতা, যেহেতু তা দর্শনের একটি শাখা, প্রতিটি প্রশ্নের ক্ষেত্রে যুক্তি এবং বিবেচনার সাহায্যে বিভিন্ন বিকল্প ব্যাখ্যাকে বিশ্লেষণ করে। এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা দেখা দেয়। অতিভৌতিকতা অনেক সময় ধর্মীয় বিষয়ের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সক্রেটিস এই ধরনের একটি সংঘর্ষের শিকার হয়েছিলেন।
এসব বিষয় আমাদের কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে। এবং এই সীমারেখার মধ্যে থেকেই আমরা অতিভৌতিকতাকে ভালোভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি।
অতিভৌতিকতা আসলে সেই শাখা যা ব্যাখ্যা করতে চায়—বস্তুজগতে জিনিসপত্র যেমন আছে, কেন আছে। এর প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো অস্তিত্ব হিসেবে অস্তিত্ব। অর্থাৎ, কোনো কিছু যেহেতু আছে—তাই তা কীভাবে আছে। তবে এটি কোনো কিছুর দৈহিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে না। বরং, এটি এমন মৌলিক নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করে, যেগুলো আমাদের এই প্রাকৃতিক জগতের ঐক্যবদ্ধ রূপ সৃষ্টি করেছে। এই কারণে বলা যায়, "অশুভ আসলে অস্তিত্বহীন"—এই বক্তব্যটি অতিভৌতিক, কারণ এটি 'অশুভ' নামক একটি বিষয়কে 'সৎ' বা 'শুভ' এর বিপরীতে দেখছে। অন্যদিকে, "সবকিছু পরমাণু দিয়ে গঠিত, যা ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন দ্বারা গঠিত"—এই বক্তব্যটি অতিভৌতিক নয়। এটি বরং পদার্থবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়।
অতিভৌতিক প্রশ্ন এবং পদার্থবৈজ্ঞানিক প্রশ্নের পার্থক্য
[সম্পাদনা]অতিভৌতিকতা দর্শনের একটি শাখা। তাই "অতিভৌতিকতা কী?" এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের বিজ্ঞান ও দর্শনের পার্থক্য নির্ধারণ করতে হয়। এই প্রসঙ্গে 'বিজ্ঞান' বলতে আমরা বুঝি পরীক্ষানির্ভর বা অপ্রায়োগিক বিজ্ঞান। পদার্থবিজ্ঞানে নতুন কোনো ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এটি প্রমাণযোগ্য হওয়া দরকার যাতে তা পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা যায়। কিন্তু দর্শনের ক্ষেত্রে বিশেষ করে অতিভৌতিকতায় এমন কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। এখানে আমরা কোনো বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করে তার মূল ধারণা বা প্রস্তাবনার দিকে চলে যাই। অতিভৌতিকতার চূড়ান্ত ধারণা হলো "অস্তিত্ব" আর প্রস্তাবনার ভিত্তি হলো "বিরোধবাদ নীতি"। উদাহরণস্বরূপ, যদি বলা হয় "সব কিছু আরও ছোট কণিকা দিয়ে গঠিত এবং এটি অসীম পর্যন্ত চলে যায়" তাহলে এটি পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। কারণ আমরা কখনোই এমন কোনো যন্ত্র বানাতে পারব না যা অসীমভাবে ক্ষুদ্র কিছু শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু অতিভৌতিকভাবে আমরা বলতে পারি বস্তুজগতের এমন একটি অসীম পশ্চাদক্রম সম্ভব নয়। তাই আমাদের অবশ্যই এমন একটি চূড়ান্ত বা ক্ষুদ্রতম কণার কথা ভাবতে হয় যার আর ভাঙা যায় না। কিন্তু তখন দার্শনিক আবার প্রশ্ন করতে পারেন" এই ক্ষুদ্রতম কণার প্রকৃতি কী?" কারণ যদি সেটা ক্ষুদ্রতম কণা হয় তাহলেও সেটা তো এখনো বস্তু। এইখানেই থেলিসের বিখ্যাত প্রশ্ন আসে" এই জগতের মূল উপাদান কী?" এটি একটি অতিভৌতিক প্রশ্ন পরীক্ষাধর্মী প্রশ্ন নয়। এই প্রশ্নই বিজ্ঞান ও দর্শনের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করেছে। অ্যারিস্টটল এই প্রশ্নের একটি উত্তর দেন। তিনি তাঁর "হাইলোমরফিক মতবাদ" এ বলেন সব ধরনের বস্তুগত বাস্তবতা গঠিত হয় দুটি মূল উপাদান থেকে প্রাইম ম্যাটার (যেমনটা আমরা জানি তেমন বস্তু নয়) এবং 'সাবস্ট্যানশিয়াল ফর্ম'।
অতিভৌতিকতা ধর্ম নয় কারণ ধর্মে বিশ্বাসই যুক্তিকে চালিত করে। আর অতিভৌতিকতায় যুক্তিই একমাত্র ভরসা। সারসংক্ষেপে, "অতিভৌতিকতা কী?" এই প্রশ্নের একটি উত্তর হতে পারে
অতিভৌতিকতা এমন একটি দর্শন নয় যা যুক্তি ও চিন্তার মাধ্যমে পদার্থিক ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে কিন্তু ধর্ম কিংবা বিজ্ঞানের বাইরে। বরং এটি একটি দার্শনিক বিজ্ঞান যা 'অস্তিত্ব', 'একতা', 'সত্য', 'মঙ্গল' এই জাতীয় অধিবাস্তব ধারণাগুলোর সঙ্গে কাজ করে। এর সহজতম রূপ হলো 'অস্তিত্ব হিসেবে অস্তিত্ব' নিয়ে আলোচনা। অতিভৌতিকতাকে ঠিকঠাক সংজ্ঞায়িত করতে না পারার মূল কারণ হলো এর বিষয়বস্তু 'অস্তিত্ব'। অস্তিত্বকে যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না শুধু বর্ণনা করা যায়।
সূত্র ও আরও পাঠের জন্য
[সম্পাদনা]
উইকিপিডিয়ায় metaphysics। ማጣቀሻ እና ተጨማሪ ንባቦች
উইকিপিডিয়ায় ዘይቤዎች।