তড়িৎ ও চুম্বক/স্থির তড়িৎ/তড়িৎ বিভব
স্থিতিশীল অবস্থায় দুটি বিন্দুর মধ্যে বিদ্যমান বিভব এর পার্থক্যই হলো বিভব পার্থক্য। এর একক হলো ভোল্ট (Volt বা V)।
বিভব কী?
বিভব বোঝার জন্য আমাদের একটি বলের দ্বারা কাজ সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে।
বৈদ্যুতিক বিভব কে আমরা মহাকর্ষীয় বিভবের সাথে তুলনা করতে পারি।
আমরা একটি ভারী বস্তু বরফের ওপর দিয়ে সহজেই সরাতে পারি, কারণ এখানে মহাকর্ষ বলের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয় না। কিন্তু আমরা যখন উল্লম্বভাবে কোনো ভারী বস্তু তুলতে চাই, তখন অনেক কষ্ট করতে হয়, কারণ তখন মহাকর্ষ বলের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়। প্রথম ক্ষেত্রে মহাকর্ষ বল কাজ করে না, কারণ গতিপথ অনুভূমিক। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মহাকর্ষ বল কাজ করে, কারণ গতিপথ উল্লম্ব।
একটি সরলরেখায় চলন্ত বস্তুর উপর কোনো বল f কাজ করলে, সেই বলের কাজ W হলে, বল ভেক্টর f ও সরণ ভেক্টর d-এর স্কেলার গুণফল:
W = f·d = fdcosθ
যেখানে θ হলো বল ভেক্টর f এবং সরণ ভেক্টর d-এর মধ্যবর্তী কোণ। f এবং d হলো ভেক্টরগুলোর মান।
মহাকর্ষ বল উল্লম্ব। অনুভূমিক সরণের ক্ষেত্রে বল কোনো কাজ করে না,কারণ cos ৯০°=০। একটি ভর m-কে h উচ্চতায় তোলার সময় মহাকর্ষ বলের কাজ হয়:
W = -mgh
বল দ্বারা কৃতকাজ হলো শক্তি। যদি θ > ৯০° হয়, তাহলে cos θ < 0 এবং W < 0 হবে। এই ক্ষেত্রে বলের দ্বারা কাজের মান ঋণাত্মক হয়, কারণ বস্তুটির সরণ বলের বিপরীত দিকে । এই হারানো শক্তি বস্তুর গতিশক্তি হতে পারে। বস্তুর গতি v কমে যায় কারণ বল বস্তুটিকে ধীর করে দেয়। যদি θ < ৯০° হয়, তাহলে cos θ > 0 এবং W > 0 হয়। তখন বল দ্বারা কাজের মান ধনাত্মক হয়, কারণ বল বস্তুটিকে ঠেলে এবং ত্বরান্বিত করে, ফলে বস্তু শক্তি অর্জন করে।
আন্তর্জাতিক একক পদ্ধতিতে (MKSA – মিটার, কিলোগ্রাম, সেকেন্ড, অ্যাম্পিয়ার), শক্তির একক হলো জুল (J)। একটি বস্তুকে এক নিউটন বলের বিপরীতে এক মিটার সরাতে প্রয়োজন হয় যে পরিমান কাজ করতে হয় সেটাই ১ জুল।
১ J = ১ N × ১ m = ১ N·m
পৃথিবীর পৃষ্ঠে অভিকর্ষজ ত্বরণ ৯.৮ নিউটন, যা প্রায় ১০ নিউটনের সমান। তাই এক জুল শক্তি প্রায় একটি ১ কেজি ভরের বস্তুকে দশ সেন্টিমিটার ওপরে তুলতে পারে।
যখন কোনো চলমান বস্তুর পথ একটি বক্র রেখা হয়, তখন আমরা বলের কাজ হিসাব করি সেই বক্র পথ অনুসরণকারী ভাঙা রেখাগুলোর ভিত্তিতে। যদি প্রতিটি খণ্ডের দৈর্ঘ্য ক্রমশ ছোট হয়, তবে ভাঙা রেখাটি আসল বক্র রেখার আরও কাছাকাছি হয়। প্রতিটি খণ্ডে বলের কাজের যোগফলের সীমা গ্রহণ করে আমরা মোট কাজ নির্ণয় করি।
স্কেলার গুণফলের সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি ঢালু রেখাংশ AB তে মহাকর্ষ বল g এর দ্বারা কাজ সমান g(hA - hB), যেখানে hA - hB হলো রেখাংশের দুই প্রান্তের উচ্চতার পার্থক্য। এখন, যদি A এবং C এর উচ্চতার পার্থক্য হয়:
hA - hC = (hA - hB) + (hB - hC)
তাহলে, A থেকে Z পর্যন্ত যেকোনো পথে মহাকর্ষ বলের কাজ সবসময়ই g(hA - hZ) এর সমান হবে। এটি শুধুমাত্র প্রান্তদ্বয়ের উচ্চতার পার্থক্যের উপর নির্ভর করে, পথের উপর নয়। সুতরাং, পৃথিবীর পৃষ্ঠে মহাকর্ষ বলের ক্ষেত্রে:
সিদ্ধান্ত: মহাকর্ষ বল দ্বারা কাজ পথের উপর নির্ভর করে না।
যদি আমরা ঘর্ষণকে উপেক্ষা করি, তাহলে একটি রোলার কোস্টারে চলমান বস্তুর গতিশক্তি তার প্রাথমিক অবস্থা থেকে মহাকর্ষ বলের কাজের সমান হয়। এটি কেবল উচ্চতার পার্থক্য h-এর উপর নির্ভর করে, পথের উপর নয়।
একটি বল দ্বারা কাজ পথের উপর নির্ভর করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ঘর্ষণ বলের কাজ বেশি হয় যদি বস্তুর চলার পথ বেশি হয়।
যখন কোনো বল ক্ষেত্র এমন হয় যে দুটি বিন্দুর মধ্যে বল দ্বারা কাজ পথের উপর নির্ভর করে না, তখন আমরা একটি বিভব সংজ্ঞায়িত করতে পারি। এটি সংজ্ঞায়িত করা হয় একটি বিন্দুকে শুন্য বিভব নির্ধারণ করে। তারপর স্থানীয় প্রতিটি বিন্দুর বিভব নির্ধারণ করা হয় ঐ বিন্দু থেকে শূন্য বিভব বিন্দু পর্যন্ত একটি একক বস্তুর উপর বলের কাজের মাধ্যমে। মহাকর্ষ বলের ক্ষেত্রে একক বস্তু হিসেবে একটি একক ভরের বস্তুকে ধরা হয়। বৈদ্যুতিক বলের জন্য, একক বস্তু হচ্ছে একটি একক বৈদ্যুতিক চার্জবিশিষ্ট কণিকা। বিভব সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত হয় কারণ বল দ্বারা কাজ পথের উপর নির্ভর করে না।
ধরি, WXY হলো X বিন্দু থেকে Y বিন্দুতে একটি একক বস্তুকে সরাতে বলের কাজ, VX হলো X বিন্দুতে বিভব এবং O হলো শূন্য পটেনশিয়াল বিন্দু। V এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, VA = WAO এবং VB = WBO। তাহলে, VA - VB = WAO - WBO। আবার, WAO = WAB + WBO। তাই VA - VB = WAB। অর্থাৎ, দুটি বিন্দুর মধ্যে বিভব পার্থক্য সর্বদা ঐ দুটি বিন্দুর মধ্যে একক বস্তুর সরণের দরুণ কৃত কাজের সমান হয়।
দুটি বিন্দুর মধ্যে বৈদ্যুতিক বিভব হলো ঐ দুটি বিন্দুর মধ্যে একক চার্জ সরাতে বৈদ্যুতিক বলের দ্বারা কাজ। স্থির অবস্থায়, বৈদ্যুতিক বলের দ্বারা কাজ পথের উপর নির্ভর করে না, তাই এই বল একটি বিভব থেকে উদ্ভূত হয়।
বৈদ্যুতিক চার্জের একক হলো কুলম্ব (C)। এক ভোল্ট (V) হলো প্রতি কুলম্ব-এ এক জুল (J) শক্তি। অর্থাৎ, এক কুলম্ব চার্জকে এক জুল শক্তি দিতে যেই বিভব পার্থক্য প্রয়োজন, সেটিই এক ভোল্ট।
১ V = ১ J/C
যখন একটি ধাতব তারের দুই প্রান্তে বৈদ্যুতিক পার্থক্য প্রয়োগ করা হয়, তখন ঐ তার দিয়ে বৈদ্যুতিক প্রবাহ চলে, যা মূলত ইলেকট্রনের প্রবাহ। ইলেকট্রনগুলি বৈদ্যুতিক বল দ্বারা ত্বরান্বিত হয়, কিন্তু তাদের গড় গতিশক্তি বাড়ে না, কারণ তারা ধাতব পদার্থ দ্বারা ধীর হয়ে যায়। তারা যেই শক্তি অর্জন করে, তা ধাতুকে উত্তপ্ত করে হারিয়ে ফেলে, যাকে জুল প্রভাব বলে । বৈদ্যুতিক আলো আবিষ্কৃত হয়েছিল একটি ধাতব তারে বৈদ্যুতিক প্রবাহ পাঠিয়ে সেটিকে সাদা উত্তাপে গরম করার মাধ্যমে। কোনো পদার্থের বৈদ্যুতিক রোধ এটি ইলেকট্রন বা আয়নকে কতটা ধীর করে—তার মান পরিমাপ করে ।