তড়িৎ ও চুম্বক/চুম্বকত্ব

চুম্বকত্ব পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা যা পদার্থে চুম্বকীয় ক্ষেত্রের (Magnetic Field) সৃষ্টি, প্রভাব ও তার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করে। এটি তড়িৎচৌম্বকত্বের (Electromagnetism) একটি উপাংশ, যেখানে বৈদ্যুতিক চার্জের গতি ও চুম্বকীয় বলের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়। চুম্বকত্বের ভিত্তি হল বৈদ্যুতিক চার্জের গতি এবং কণিকাগুলোর(প্রধানত ইলেকট্রনের) ঘূর্ণন (spin)।
চুম্বকত্বের সবচেয়ে প্রাচীন ও পরিচিত উদাহরণ হলো প্রাকৃতিক চুম্বক (lodestone বা magnetite)। হাজার বছর আগে থেকেই মানুষ লক্ষ্য করেছিল যে এই পাথর কিছু লৌহজাত বস্তু যেমন লোহা বা ইস্পাতকে আকর্ষণ করে। পরবর্তীতে এটি জানা যায় যে চুম্বকত্ব আসলে পদার্থের আণবিক গঠনের উপর নির্ভর করে এবং এই গঠনই কোনো পদার্থকে চুম্বকীয় বা অচুম্বকীয় করে তোলে।
চুম্বকত্ব দুই ধরনের হতে পারে — স্থায়ী (Permanent) ও অস্থায়ী (Temporary)। স্থায়ী চুম্বক এমন বস্তু যা দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব চুম্বকত্ব ধরে রাখতে পারে (যেমন লোডস্টোন বা শক্ত চুম্বক)। অস্থায়ী চুম্বক সাধারণত বিদ্যুৎ প্রবাহের মাধ্যমে চুম্বকীয় হয়ে ওঠে (অর্থাৎ ইলেকট্রোম্যাগনেট বা তড়িৎ চুম্বক), এবং প্রবাহ বন্ধ হলে তাদের চুম্বকত্বও শেষ হয়ে যায়। চুম্বকত্বের চারটি প্রধান শ্রেণি রয়েছে:
- ডায়াম্যাগনেটিক (Diamagnetic): যে পদার্থ চুম্বকীয় ক্ষেত্র থেকে দুর্বলভাবে বিমুখ হয় (যেমন: তামা, সিসা)।
- প্যারাম্যাগনেটিক (Paramagnetic): যে পদার্থ চুম্বকীয় ক্ষেত্রে সামান্য আকৃষ্ট হয় (যেমন: অ্যালুমিনিয়াম)।
- ফেরোম্যাগনেটিক Ferromagnetic): যে পদার্থ শক্তভাবে চুম্বকীয় ক্ষেত্র আকর্ষণ করে ও নিজে চুম্বক হতে পারে (যেমন: লোহা, নিকেল, কোবাল্ট)।
- অ্যান্টিফেরোম্যাগনেটিক ও ফেরিম্যাগনেটিক পদার্থ—যেগুলোর চৌম্বক ক্ষেত্রের অভ্যন্তরে পারস্পরিক বিপরীত চৌম্বক মুহূর্ত থাকে।
আধুনিক প্রযুক্তিতে চুম্বকত্বের ব্যবহার বহুবিধ। তড়িৎচালিত মোটর, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার, হার্ড ডিস্ক ড্রাইভ, এমআরআই (MRI) যন্ত্র, ও বিভিন্ন সেন্সরে চুম্বকীয় প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। এছাড়া চৌম্বকীয় পদার্থের গবেষণা পদার্থবিজ্ঞানের অত্যাধুনিক শাখা যেমন কোয়ান্টাম মেকানিক্স, স্পিনট্রনিক্স (Spintronics), ও অতিপরিবাহিতা বা সুপারকন্ডাকটিভিটি-তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চুম্বকত্ব বোঝার জন্য আমাদের বৈদ্যুতিক চার্জ, লরেঞ্জ বল (Lorentz Force), চৌম্বক ক্ষেত্রর রেখাচিত্র, ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ (Maxwell’s Equations) ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে ধারণা থাকতে হয়। চুম্বকত্ব ও বিদ্যুৎ একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত—একটি চলমান চার্জ চুম্বকীয় ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারে এবং পরিবর্তিত চৌম্বক ক্ষেত্র আবার বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারে, এই ধারণা থেকেই তড়িৎ চুম্বকের ভিত্তি গঠিত হয়েছে।
পঠিতব্য বিষয়
[সম্পাদনা]- চুম্বক
- তড়িৎ প্রবাহে সৃষ্ট চৌম্বকক্ষেত্র
- চল তড়িৎ এ কুলম্বের সূত্র
- দৈর্ঘ্য সংকোচন ও কুলম্বের সূত্র দ্বারা তড়িৎচৌম্বকীয় বল
- ভেক্টর গুনফল
- বায়োট সাভার্টের সূত্র
- লরেঞ্জ বল
- চৌম্বকের তড়িচ্চালক শক্তি
সূত্র
[সম্পাদনা]1. হ্যালিডে, রেসনিক ও ওয়াকার। ফান্ডামেন্টালস অব ফিজিক্স, উইলি পাবলিকেশন।
2. সেরওয়ে ও জুয়েট। ফিজিক্স ফর সায়েন্টিস্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স, সেনগেজ লার্নিং।
3. পারসেল ও মোরিন। ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড ম্যাগনেটিজম, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস।
4. জ্যাকসন, জন ডেভিড। ক্লাসিকাল ইলেকট্রোডাইনামিক্স, উইলি।