বিষয়বস্তুতে চলুন

জাপানের ইতিহাস: পুরাণ থেকে জাতিসত্ত্বা/সংঘর্ষকালীন রাজ্য যুগ

উইকিবই থেকে

সেনগোকু যুগ (সেনগোকু জিদাই) বা জাপানের ইতিহাসে যুদ্ধবিগ্রহের যুগ ছিল একটি অস্থির সময়। এই সময়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং প্রায় নিরবচ্ছিন্ন সামরিক সংঘর্ষ চলেছিল। এই যুগ আনুমানিক ১৫শ শতকের মাঝামাঝি থেকে ১৭শ শতকের শুরু পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। "সেনগোকু" নামটি জাপানি ইতিহাসবিদরা চীনের ইতিহাসে যুদ্ধরত রাজ্য যুগ এর অনুরূপ এক সময়ের ইঙ্গিত করে ব্যবহার করেন। চীনের ঐ সময় যেমন একীকরণের দিকে ধাবিত হয়েছিল, তেমনি জাপানের সেনগোকু যুগও একসময়ে তোকুগাওয়া শোগুনতন্ত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতার একীকরণে গিয়ে শেষ হয়।যদিও আশিকাগা শোগুনতন্ত্র কামাকুরা বাকুফুর কাঠামো বজায় রেখেছিল এবং ১২৩২ সালে হোজো কর্তৃক প্রণীত জোএই বিধিমালার ভিত্তিতে এক যোদ্ধা সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল তবে তারা অনেক দাইমিওর আনুগত্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে যেসব দাইমিওর অঞ্চল কিয়োটো থেকে দূরে ছিল, তারা এই সরকারের প্রতি অনুগত ছিল না। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ার ফলে অর্থনীতি বিকশিত হতে থাকে এবং বাজার ও বাণিজ্যিক শহর গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রার ব্যবহার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কৃষিতে উন্নতি এবং ছোট আকারের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের ফলে সমাজের বিভিন্ন স্তরে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। ১৫শ শতকের শুরু থেকেই ভূমিকম্প ও দুর্ভিক্ষের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে চরম দুর্ভোগে ফেলেছিল। ঋণের বোঝা ও করের ভারে ক্লান্ত কৃষকেরা মাঝে মাঝেই সশস্ত্র বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়ত। ১৪৬৭ থেকে ১৪৭৭ সালের মধ্যে সংঘটিত ওনিন যুদ্ধ যা মূলত আর্থিক সংকট এবং শোগুন উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধের কারণে শুরু হয়েছিল সাধারণভাবে সেনগোকু যুগের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। হোসোকাওয়া বংশের "পূর্বাঞ্চলীয়" বাহিনী এবং ইয়ামানা বংশের "পশ্চিমাঞ্চলীয়" বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। কিয়োটো শহর ও তার আশপাশে এই যুদ্ধ প্রায় ১১ বছর ধরে চলে এবং পরে তা জাপানের অন্যান্য প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ে।

গেকোকুজো

[সম্পাদনা]

এই বিশৃঙ্খলার ফলে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। সারা জাপানে স্থানীয় শাসকরা বা দাইমিওরা সেই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসে। এই ক্ষমতা পরিবর্তনের সময় অনেক পুরনো প্রভাবশালী বংশ যেমন তাকেদা এবং ইমাগাওয়া যারা কামাকুরা ও মুরোমাচি শাসনামলে ক্ষমতায় ছিল। তারা নিজেদের প্রভাব আরও বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়। তবে অনেক বংশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে যোগ্য অধস্তনদের দ্বারা তারা ক্ষমতা হারায়। এই ধরনের সামাজিক মেধানির্ভর পরিবর্তন যেখানে দক্ষ অধস্তনেরা দুর্বল অভিজাতদের উৎখাত করে সেটিকে বলা হয় গেকোকুজো , যার অর্থ "নিম্নপদস্থ ব্যক্তি ঊর্ধ্বতনকে জয় করে"।এর অন্যতম প্রাথমিক উদাহরণ ছিল হোজো সওউন যিনি অপেক্ষাকৃত সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন এবং ১৪৯৩ সালে ইজু প্রদেশে ক্ষমতা দখল করেন। সওউনের অর্জনের ভিত্তিতে, পরবর্তী হোজো বংশ কানতো অঞ্চলে একটি বড় শক্তি হিসেবে টিকে ছিল যতদিন না তোয়োতোমি হিদেয়োশি সেনগোকু যুগের শেষদিকে তাদের দমন করেন। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো হোসোকাওয়া বংশকে মিওশি বংশের প্রতিস্থাপন, শিবা বংশকে ওদা বংশের স্থান দখল এবং টোকি বংশকে সাইতো বংশের উৎখাত। এই সময়ে সুসংগঠিত ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলিও রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করে। তারা কৃষকদের একত্রিত করে দাইমিওদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়। বৌদ্ধ সত্য নিখুঁত ভূমি মতবাদের ভিক্ষুরা বহু ইক্কু-ইক্কি গঠন করে। এর মধ্যে সবচেয়ে সফলটি ছিল কাগা প্রদেশে যা প্রায় একশ বছর পর্যন্ত স্বাধীনভাবে টিকে ছিল।

ওদা নোবুনাগার উত্থান

[সম্পাদনা]
ওদা নোবুনাগা

১৬শ শতকের শেষার্ধে বেশ কিছু দাইমিও এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে তারা মুরোমাচি বাকুফুকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারত বা একেবারে উৎখাত করত। ১৫৬০ সালে ইমাগাওয়া ইয়োশিমোতো বাকুফু উৎখাতের চেষ্টা করেন। তিনি রাজধানীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন কিন্তু ওকেহাজামা যুদ্ধে ওদা নোবুনাগার হাতে পরাজিত হয়ে অপমানজনকভাবে শেষ হয় তার অভিযান। ১৫৬২ সালে, নোবুনাগার পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত তোকুগাওয়া বংশ ইমাগাওয়া বংশের প্রভাব থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবং নোবুনাগার সঙ্গে জোট বাঁধে। এই জোটের ফলে নোবুনাগার পূর্ব দিকের এলাকা আগ্রাসনের হাত থেকে নিরাপদ থাকে। এরপর তিনি পশ্চিম দিকে তার বাহিনী পাঠান। ১৫৬৫ সালে, মাতসুনাগা ও মিওশি বংশের একটি জোট ষড়যন্ত্র করে ত্রয়োদশ আশিকাগা শোগুন আশিকাগা ইয়োশিতেরুকে হত্যা করে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে তারা দ্রুত ক্ষমতা দখল করে নিজেদের অবস্থান বৈধ করতে পারেনি। শেষমেশ ১৫৬৮ সালে তারা ইয়োশিতেরুর চাচাতো ভাই আশিকাগা ইয়োশিহিদেকে নতুন শোগুন হিসেবে বসাতে সক্ষম হয়। তবে তারা কিয়োটোতে প্রবেশ করতে পারেনি এবং সম্রাটের কাছ থেকে স্বীকৃতি পায়নি। এর ফলে শোগুন উত্তরাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এরপর বাকুফুর কিছু অনুগত যাদের নেতৃত্বে ছিলেন হোসোকাওয়া ফুজিতাকা, ওদা নোবুনাগার সঙ্গে আলোচনায় বসেন। তারা আশিকাগা ইয়োশিআকিকে যিনি ইয়োশিতেরুর ছোট ভাই, শোগুন হিসেবে বসানোর জন্য নোবুনাগার সাহায্য চান।

ওদা নোবুনাগা বহু বছর ধরে এই ধরনের একটি সুযোগের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি উত্তরের ওমি প্রদেশে আসাই বংশের সঙ্গে জোট গড়ে তোলেন এবং পার্শ্ববর্তী মিনো প্রদেশ জয় করেন। এরপর তিনি কিয়োটোর দিকে অগ্রসর হন। দক্ষিণ ওমিতে রোক্কাকু বংশকে পরাজিত করার পর তিনি মাতসুনাগা বংশকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন এবং মিওশি বংশকে সেতসু প্রদেশে পিছু হটতে বাধ্য করেন। এরপর তিনি রাজধানীতে প্রবেশ করেন এবং সম্রাটের কাছ থেকে ইয়োশিআকির জন্য আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় করেন। ইয়োশিআকি হন ১৫তম আশিকাগা শোগুন।

তবে নোবুনাগার লক্ষ্য ছিল না মুরোমাচি বাকুফুকে সেবা করা। বরং তিনি কানসাই অঞ্চলে নিজের দখল আরও শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দেন। প্রতিদ্বন্দ্বী দাইমিও অনমনীয় বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং শত্রুভাবাপন্ন বণিকদের প্রতিরোধ তিনি নির্মমভাবে দমন করেন। দ্রুতই তিনি একজন কঠোর ও অদম্য শত্রু হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলের সহায়তায় তিনি অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করেন। তিনি মন্দির ও বণিক সংগঠনের ঐতিহ্যগত একচেটিয়া অধিকার বাতিল করে বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা দূর করেন এবং উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে শুরু করেন উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থা যা পরিচিত ছিল রাকুইচি-রাকুজা নামে।

১৫৭৩ সালের মধ্যে তিনি উত্তর সীমান্তে হুমকি সৃষ্টি করা আসাকুরা ও আজাই বংশের জোট ধ্বংস করেন। কিয়োটোর কাছের হিয়েই পর্বতে অবস্থিত তেনদাই বৌদ্ধদের সামরিক গোষ্ঠীকেও নিশ্চিহ্ন করেন। এছাড়া তাকেদা শিংগেন যখন টোকুগাওয়া বংশকে পরাজিত করে ওদার অঞ্চলে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ঠিক তখনই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান। ফলে, নোবুনাগা একটি বড় সংঘাত এড়াতে সক্ষম হন।


তাকেদা শিংগেনের মৃত্যুর পরেও কিছু শক্তিশালী দাইমিও রয়ে গিয়েছিলেন যারা নোবুনাগার প্রতিরোধ করতে পারতেন। কিন্তু তারা কেউই কিয়োটোর এত কাছে ছিলেন না যে রাজনৈতিকভাবে হুমকি হতে পারেন। ফলে, ওদা বংশের অধীনে জাপান একীভূত হওয়াটা তখন সময়ের ব্যাপার বলে মনে হচ্ছিল।

নোবুনাগার শত্রু কেবল অন্যান্য সেনগোকু দাইমিও নয় বরং জোদো শিনশু মতবাদের অনুসারী ইক্কু-ইক্কি আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরাও ছিলেন। তাদের নেতা ছিলেন কেনন্যো। নোবুনাগা টানা দশ বছর ধরে তার দুর্গ আক্রমণ করলেও কেনন্যো তা সহ্য করে টিকে ছিলেন। একাদশ বছরে নোবুনাগা অবশেষে কেনন্যোকে বহিষ্কার করেন। তবে কেনন্যোর উসকানিতে হওয়া বিদ্রোহ নোবুনাগার এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি করে। এই দীর্ঘ সংঘাত পরিচিত ছিল ইশিয়ামা হোঙ্গানজি যুদ্ধ নামে।

বৌদ্ধ ধর্মকে দমন করার জন্য নোবুনাগা খ্রিষ্টধর্মকে সমর্থন দেন। ইউরোপ থেকে আসা ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে জাপানে অনেক নতুন সংস্কৃতি প্রবেশ করে। এর মধ্যে ছিল নতুন খাদ্যদ্রব্য, চিত্রাঙ্কনের নতুন পদ্ধতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং নতুন মুদ্রণ প্রযুক্তি।

জাপানের একীকরণ

[সম্পাদনা]

প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের পর ওয়ারি প্রদেশের (বর্তমান আইচি প্রিফেকচার) একজন সাধারণ সামন্তপ্রভু ওদা নোবুনাগা জাপানের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করেন। কিন্তু ১৫৮২ সালে তাঁরই একজন জেনারেল আকেচি মিৎসুহিদে বিশ্বাসঘাতকতা করে নোবুনাগাকে হত্যা করেন। এই ঘটনার ফলে নোবুনাগার অন্যতম বিশ্বস্ত জেনারেল তোয়োতোমি হিদেয়োশি যিনি একজন সাধারণ আশিগারু (পদাতিক) থেকে উঠে এসেছিলেন, তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পান। হিদেয়োশি বাকি সামন্তপ্রভুদের নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং যদিও তাঁর সাধারণ জন্মের কারণে তিনি "সেই তাইশোগুন" উপাধি লাভে অযোগ্য ছিলেন তিনি "কাম্পাকু" (প্রধান উপদেষ্টা) হিসেবে শাসন করেন। ১৫৯২ সালে তাঁর সৎ ভাই তোয়োতোমি হিদেনাগার মৃত্যুর পর, হিদেয়োশি তাঁর ভাগ্নে তোয়োতোমি হিদেতসুগুকে কামপাকু হিসেবে নিয়োগ দেন।

তবে একই বছরে হিদেয়োশি কোরিয়ায় অভিযান শুরু করেন যা ইমজিন যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ ১৫৯২ থেকে ১৫৯৮ সাল পর্যন্ত চলে যার মধ্যে ১৫৯৬ সালে একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি হয়। শেষ পর্যন্ত জাপান কোরিয়ার উপদ্বীপ দখল করতে ব্যর্থ হয়।

দেশের অভ্যন্তরে, হিদেয়োশি ও হিদেতসুগুর সম্পর্ক অবনতি ঘটতে থাকে। হিদেতসুগুর বিরুদ্ধে অনেক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে যা অন্যায্য বলে বিবেচিত হয়। ১৫৯৫ সালে, তাঁর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয় এবং হিদেয়োশির আদেশে তিনি কোয়া পর্বতে সেপ্পুকু করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে হিদেতসুগুর পরিবারকেও হিদেয়োশির আদেশে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় যা অনেক সামন্তপ্রভুর মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করে। এই ঘটনাগুলি সেকিগাহারার যুদ্ধের পর তোয়োতোমি বংশের কর্তৃত্বের পতনের দিকে নিয়ে যায়।

১৫৯৮ সালে হিদেয়োশির মৃত্যুতে তিনি কোনো যোগ্য উত্তরসূরি রেখে যাননি। ফলে দেশ আবার রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিমজ্জিত হয় এবং এই সুযোগে তোকুগাওয়া ইয়েয়াসু ক্ষমতা দখলের উদ্যোগ নেন।

সেকিগাহারা, এদো শোগুনাতের প্রতিষ্ঠা ও ওসাকা

[সম্পাদনা]

হিদেয়োশির মৃত্যুর আগে তিনি তোকুগাওয়া ইয়েয়াসু (কান্তো অঞ্চল), উকিতা হিদেইয়ে (বিজেন ও মিমাসাকা), মায়েদা তোশিইয়ে (কাগা ও এচু), উএসুগি কাগেকাতসু (ইওনেজাওয়া), মোরি তেরুমোতো (চোশু) এবং কোবায়াকাওয়া তাকাকাগেকে "পাঁচ প্রবীণ" পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেন। এই পরিষদ হিদেয়োশির পুত্র ও উত্তরসূরি তোয়োতোমি হিদেওরির পক্ষে রিজেন্ট হিসেবে শাসন করত। তবে ১৫৯৮ সালে হিদেয়োশির মৃত্যুর পর, পরিষদের মধ্যে সম্পর্ক অবনতি ঘটে এবং ১৫৯৯ সালে মায়েদা তোশিইয়ের মৃত্যুর পর দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দুইটি পক্ষ গঠিত হয়: "বুনচিহা" (যারা প্রশাসনিক শাসন চায়) এবং "বুন্দানহা" (যারা সামরিক শাসন সমর্থন করে)।

ইয়েয়াসু বুন্দানহা দলের সদস্য ছিলেন এবং তাঁর প্রভাব ছিল ব্যাপক। তিনি রাজনৈতিক বিবাহের মাধ্যমে জাপানজুড়ে জোট গঠন করেন, যার মধ্যে তাঁর পুত্র তাদাতেরুকে ডাতে মাসামুনের কন্যা ইরোহাহিমের সঙ্গে বিবাহ দেন। এই বিবাহগুলি পরিষদের সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন যে এই ধরনের বিবাহের জন্য পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন। সাওয়ায়ামা দুর্গের সামন্তপ্রভু ইশিদা মিৎসুনারি তখন তোয়োতোমি অনুগতদের নিয়ে একটি জোট গঠন করেন যার মধ্যে হিদেইয়ে, কাগেকাতসু এবং তেরুমোতো ছিলেন। তেরুমোতো ওসাকা দুর্গে অবস্থান করেন ফলে মিৎসুনারি মাঠের কমান্ডার হন। তবে মিৎসুনারি ও অন্যান্য তোয়োতোমি জেনারেলদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, যার মধ্যে কুমামোটো ডোমেইনের কাতো কিয়োমাসাও ছিলেন। এই বিভাজন ইয়েয়াসুকে অনেক সামন্তপ্রভুকে তাঁর পক্ষে টানতে সাহায্য করে।

সেকিগাহারার যুদ্ধের একটি এদো যুগের পর্দা

১৬০০ সালে উএসুগি কাগেকাতসু তোকুগাওয়া ইয়েয়াসুর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেন এবং আইজুতে একটি দুর্গ নির্মাণ শুরু করেন। ইয়েয়াসু তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চান কিন্তু কাগেকাতসু তা অস্বীকার করেন। কাগেকাতসুর উদ্দেশ্য ছিল ইয়েয়াসুকে ব্যস্ত রেখে মিৎসুনারিকে পশ্চিমে আক্রমণ করতে সুযোগ করে দেওয়া। তবে ইয়েয়াসু এটি পূর্বাভাস করেছিলেন এবং তিনি নিজে কাগেকাতসুর বিরুদ্ধে না গিয়ে মোগামি ইয়োশিয়াকি ও ডাতে মাসামুনেকে তোহোকু অঞ্চলে কাগেকাতসুর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে বলেন। ১৬০০ সালের ২১ অক্টোবর, ইশিদা মিৎসুনারির নেতৃত্বাধীন পশ্চিম বাহিনী ও তোকুগাওয়া ইয়েয়াসুর নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাহিনীর মধ্যে সেকিগাহারার যুদ্ধে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এই যুদ্ধ তোকুগাওয়া বাহিনীর নিরঙ্কুশ বিজয়ে শেষ হয়। যুদ্ধের পর, ১৬০৩ সালে, ইয়েয়াসু "সেই তাইশোগুন" উপাধি লাভ করেন এবং এদো (বর্তমান টোকিও) শহরে তোকুগাওয়া শোগুনাত প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিজয়ের মাধ্যমে, তোয়োতোমি বংশের অবশিষ্ট শক্তি ধ্বংস হয় এবং জাপানে তোকুগাওয়া শাসনের সূচনা হয়, যা পরবর্তী দুই শতাব্দী ধরে স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখে।

এদিকে, ইশিদা মিৎসুনারি অবশেষে তাঁর অভিযান শুরু করেন। ২৭ আগস্ট তিনি ফুশিমি দুর্গ অবরোধ করেন। তিনি আশা করেছিলেন, খুব দ্রুত এই দুর্গ জয় করবেন। কিন্তু অবরোধটি দশ দিন স্থায়ী হয়। দুর্গটি ৮ সেপ্টেম্বর পতন হয় এবং এর প্রতিরক্ষাকারীরা আত্মহত্যা করেন। যদিও মিৎসুনারি এই যুদ্ধে জয় পান, কিন্তু ইয়েয়াসুর বিরুদ্ধে সামগ্রিকভাবে সফল হওয়ার জন্য যে মূল্যবান সময়ের প্রয়োজন ছিল, তা তিনি হারিয়ে ফেলেন। মিৎসুনারি চেয়েছিলেন গিফু দুর্গকে একটি কৌশলগত অবস্থান হিসেবে ব্যবহার করে তোকুগাওয়া বাহিনীকে বিলম্বিত করবেন। কিন্তু ৩০ সেপ্টেম্বর দুর্গটি ইই নাওমাসা ও ফুকুশিমা মাসানোরি দখল করে নেন। যখন মিৎসুনারি জানতে পারেন যে তোকুগাওয়া ইয়েয়াসু ওসাকা দুর্গের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন, তখন তিনি তাঁর পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন এবং সেকিগাহারায় সরাসরি যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন।

২১ অক্টোবর সেকিগাহারার যুদ্ধ শুরু হয়। ইশিদা মিৎসুনারির নেতৃত্বে ছিল পশ্চিম বাহিনী এবং তোকুগাওয়া ইয়েয়াসুর নেতৃত্বে ছিল পূর্ব বাহিনী। যুদ্ধ কিছুক্ষণের জন্য সমতা বজায় রাখে, উভয় পক্ষেই হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তোয়োতোমি হিদেয়োশির ভাগ্নে কোবায়াকাওয়া হিদেআকি, যিনি শুরু থেকেই বিশ্বাসঘাতকতার উদ্দেশ্যে মিৎসুনারির সঙ্গে ছিলেন, শেষ পর্যন্ত তোকুগাওয়া বাহিনীর পক্ষে চলে যান। তাঁর বাহিনী ওতানি ইয়োশিৎসুগুর অবস্থানে আক্রমণ শুরু করে। পরবর্তীতে ইয়োশিৎসুগু তাঁর একজন অনুচরকে অনুরোধ করেন তাঁকে শিরশ্ছেদ করতে। হিদেআকির এই বিশ্বাসঘাতকতার ফলে পশ্চিম বাহিনীর সম্মুখভাগ ভেঙে পড়ে। এদিকে ইই নাওমাসা শিমাজু বংশের সৈন্যদের ধাওয়া করার সময় আহত হন। কোনো সাহায্য না আসায় পশ্চিম বাহিনী সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। তবে মিৎসুনারি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে তাঁকে ধরা হয় এবং ৬ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

১৬০৩ সালে সম্রাট গো-ইয়োজেই তোকুগাওয়া ইয়েয়াসুকে শোগুন উপাধি প্রদান করেন। এর মাধ্যমে তোকুগাওয়া শোগুনাত প্রতিষ্ঠিত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য বিখ্যাত। ইয়েয়াসু পরে ১৬০৫ সালে নিজের ছেলে তোকুগাওয়া হিদেতাদার পক্ষে শোগুন পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তবে তিনি তখনও প্রকৃত ক্ষমতা নিজের হাতে রাখেন।

তবে ইয়েয়াসুর সামনে তখনও একমাত্র বড় প্রতিপক্ষ ছিলেন তোয়োতোমি হিদেয়োরি। ১৬১৪ সালে উভয়ের মধ্যে উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে, ইয়েয়াসু ১,৬০,০০০ সৈন্য নিয়ে ওসাকা দুর্গ অভিযানে যান। এর মধ্য দিয়ে ওসাকার অবরোধের প্রথম ধাপ, অর্থাৎ শীতকালীন অবরোধ শুরু হয়। দুর্গে প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ চললেও ওসাকা আত্মসমর্পণ করেনি।পরবর্তীতে উভয় পক্ষের মধ্যে এক অনিরাপদ চুক্তি হয়। কিন্তু পরের বছরই আবার লড়াই শুরু হয়। তেন্নোইজির যুদ্ধে পরাজয়, ওসাকা দুর্গে অগ্নিকাণ্ড এবং সানাদা ইউকিমুরার মৃত্যুর পর, হিদেয়োরি ও তাঁর মা দুর্গ জ্বলতে থাকা অবস্থায় সেপ্পুকু করেন। তাঁদের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে বহু অভিজাত ব্যক্তি আত্মহত্যা করেন এবং অবশেষে দুর্গ আত্মসমর্পণ করে। এর মাধ্যমে তোয়োতোমি বংশের অবসান ঘটে এবং তোকুগাওয়া শাসনের বিরুদ্ধে শেষ বড় প্রতিপক্ষ দূরীভূত হয়।

তোকুগাওয়া ইয়েয়াসু ১৬১৬ সালের ১ জুন ৭৩ বছর বয়সে মারা যান। তিনিই ছিলেন জাপানের শেষ মহান ঐক্যস্থাপক।

সেনগোকু যুগের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব

[সম্পাদনা]

জাপানের মহান ঐক্যস্থাপক

[সম্পাদনা]

অন্যান্য দাইম্যো

[সম্পাদনা]

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি

[সম্পাদনা]


জাপানের ইতিহাস

ভূমিকা
Prehistory through the Jomon Period – The Yayoi Period – The Kofun or Yamato Period – The Asuka Period – The Nara Period – The Spread of Buddhism in Japan – The Early Heian Period – The Middle Heian Period – The Late Heian Period – The Kamakura Period – The Kemmu Restoration – The Nanboku-chō Period – The Muromachi Period (Ashikaga) – The Warring States Period – The Azuchi–Momoyama Period – The Edo Period – The Meiji Restoration – The Meiji Period – The Taisho Period – The Rise of Militarism – World War II – The American Occupation of Japan – Post-War Japan – Japan Today
আরও পড়ুন