বিষয়বস্তুতে চলুন

জাপানের ইতিহাস: পুরাণ থেকে জাতিসত্ত্বা/বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপান

উইকিবই থেকে

এই অধ্যায়ে ১৯৫২ সালে মিত্রশক্তির দখল শেষ হওয়ার পরের সময়কালটি তুলে ধরা হয়েছে। এই সময়ে, জাপান আবারও বিশ্বব্যাপী একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। পাশাপাশি এটি একটি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবেও গড়ে ওঠে।

দখল পরবর্তী রাজনীতি

[সম্পাদনা]

সান ফ্রান্সিসকো চুক্তির শর্ত কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ১৯৫২ সালের ২৮ এপ্রিল মিত্রশক্তির দখলের অবসান ঘটে। এই চুক্তির মাধ্যমে জাপান তার সার্বভৌমত্ব ফিরে পায়। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যে সব এলাকা জাপানের দখলে ছিল, তার অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলে। এর মধ্যে ছিল কোরিয়া, তাইওয়ান এবং সাখালিন। এছাড়াও, মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ ও মার্শাল দ্বীপপুঞ্জসহ প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু ক্ষুদ্র দ্বীপের উপর জাপানের নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। যেগুলো আগে জাতিপুঞ্জের অধীনে জাপান পরিচালনা করত। নতুন এই চুক্তি জাপানকে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা জোটে অংশগ্রহণের স্বাধীনতাও দেয়। একই দিনে, জাপান সান ফ্রান্সিসকো চুক্তি স্বাক্ষরের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করে। এতে শিগেরু ইয়োশিদা ও হ্যারি ট্রুম্যান এমন একটি দলিলে স্বাক্ষর করেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীকে জাপানে ঘাঁটি বজায় রাখার অনুমতি দেয়।

জাপান পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ফিরে পাওয়ার আগেই, সরকার প্রায় ৮০,০০০ ব্যক্তিকে পুনর্বাসিত করে। এদের অনেকেই পূর্বের রাজনৈতিক বা সরকারি পদে ফিরে যান। এরপর সামরিক ব্যয় সীমিতকরণ এবং সম্রাটের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এর ফলে অক্টোবর ১৯৫২ সালের প্রথম দখল-পরবর্তী নির্বাচনে লিবারেল পার্টির আসন সংখ্যায় বড় ধরনের পতন ঘটে। কয়েক দফা সামরিক বাহিনীর পুনর্গঠনের পর, ১৯৫৪ সালে একটি বেসামরিক পরিচালকের অধীনে আত্মরক্ষা বাহিনী গঠন করা হয়। এই সময়ে স্নায়ুযুদ্ধের বাস্তবতা এবং কাছাকাছি কোরিয়ায় চলমান গরম যুদ্ধ জাপানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, সাম্যবাদ দমন এবং সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলন নিরুৎসাহিত করার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। এসব উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল স্পষ্ট।

দলগুলোর বারবার বিভাজন ও একের পর এক সংখ্যালঘু সরকার গঠনের কারণে রক্ষণশীল শক্তিগুলো একত্রিত হয়। তারা লিবারেল পার্টি (জিয়ুতো) এবং জাপান ডেমোক্রেটিক পার্টি (নিপ্পন মিনশুতো) যা পূর্বের ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে গঠিত হয়েছিল একত্র করে ১৯৫৫ সালের নভেম্বর মাসে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (জিয়ু-মিনশুতো; এলডিপি) গঠন করে। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এই দলই ক্ষমতায় ছিল। এরপর একটি নতুন সংখ্যালঘু সরকার তাদের প্রতিস্থাপন করে। এলডিপির নেতৃত্বে ছিলেন সেইসব অভিজাত ব্যক্তি যারা জাপানকে পরাজয় ও দখলকাল অতিক্রম করতে সহায়তা করেছিলেন। এই দলে যোগ দেন সাবেক আমলারা, স্থানীয় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, পেশাজীবী, কৃষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়পাস ব্যক্তিরা। ১৯৫৫ সালের অক্টোবর মাসে, সমাজতান্ত্রিক দলগুলো একত্রিত হয়ে জাপান সোশালিস্ট পার্টি গঠন করে। এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এর ঠিক পরেই জনপ্রিয়তা অর্জন করে কোমেইতো (স্বচ্ছ সরকার পার্টি), যা ১৯৬৪ সালে গঠিত হয়। এটি ছিল সোকা গাক্কাই (মানবিক মূল্য সৃষ্টির সমাজ) নামক বৌদ্ধ মতাদর্শভিত্তিক সংগঠনের রাজনৈতিক শাখা। কোমেইতো জাপানি ঐতিহ্যগত বিশ্বাসকে গুরুত্ব দেয় এবং শহুরে শ্রমিক, গ্রাম থেকে আসা বাসিন্দা ও বহু নারীকে আকর্ষণ করে। জাপান সোশালিস্ট পার্টির মতো, কোমেইতো-ও ধাপে ধাপে জাপান-যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তির সংশোধন ও বিলুপ্তির পক্ষে অবস্থান নেয়।

১৯৭০ এর দশকের শেষ দিকে কোমেইতো ও ডেমোক্রেটিক সোশালিস্ট পার্টি পারস্পরিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা চুক্তি মেনে নেয়। এমনকি ডেমোক্রেটিক সোশালিস্ট পার্টি একটি সীমিত পরিসরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গঠনের পক্ষেও সমর্থন জানায়। জাপান সোশালিস্ট পার্টিকেও তাদের পূর্বের কঠোর সামরিকবিরোধী অবস্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র জাপানের উপর চাপ অব্যাহত রাখে, যাতে তারা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট জাতীয় উৎপাদনের (GNP) ১ শতাংশের বেশি করে। এই নিয়ে ডায়েটে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। তবে বিরোধিতা মূলত সংখ্যালঘু দল বা জনগণ থেকে নয়, বরং অর্থমন্ত্রণালয়ের বাজেট সচেতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকেই আসে।

প্রধানমন্ত্রী তানাকা কাকুয়েইকে ১৯৭৪ সালে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে পদত্যাগ করতে হয়। পরবর্তীতে লকহিড ঘুষ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে ১৯৭৬ সালে গ্রেপ্তার করে স্বল্প সময়ের জন্য কারাগারে পাঠানো হয়।

১৯৭০ এর দশকের শেষ দিকে এলডিপির বিভক্ত রাজনীতি ডায়েটে ঐক্যমতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে ১৯৮০ সালের জুন মাসের নির্বাচনের ঠিক আগে প্রধানমন্ত্রী ওহিরা মাসায়োশির হঠাৎ মৃত্যুতে দলের প্রতি সহানুভূতি ভোট দেখা যায়। এর ফলে নতুন প্রধানমন্ত্রী সুজুকি জেনকো কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান। কিন্তু খুব শীঘ্রই তিনি এক পাঠ্যবই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। অনেকের মতে, বইটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আগ্রাসনকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। এই ঘটনা এবং গুরুতর আর্থিক সমস্যার কারণে সুজুকির মন্ত্রিসভা পতনের মুখে পড়ে, যেটি গঠিত হয়েছিল এলডিপির বিভিন্ন গোষ্ঠীর সমন্বয়ে ।

১৯৮২ সালের নভেম্বর মাসে নাকাসোনে ইয়াসুহিরো প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি একজন রক্ষণশীল রাজনীতিক ছিলেন এবং তানাকা ও সুজুকি গোষ্ঠীর সমর্থনপুষ্ট ছিলেন। তিনি পূর্বে প্রতিরক্ষা সংস্থার মহাপরিচালক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। ১৯৮৪ সালের নভেম্বরে নাকাসোনেকে আবারও এলডিপির সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তার প্রথম মেয়াদে মন্ত্রিসভা জনমত জরিপে অস্বাভাবিকভাবে ৫০ শতাংশ ইতিবাচক সাড়া পায়। বিপরীতে, বিরোধী দলগুলোর জনপ্রিয়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রবেশ করার সময় নাকাসোনে ডায়েট ও জাতির মধ্যে একটি শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখেন। যদিও ১৯৮৩ সালে তানাকা ঘুষ কেলেঙ্কারিতে দোষী সাব্যস্ত হন, তবুও ১৯৮০ এর দশকের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত তিনি দলীয় কাঠামোর মাধ্যমে পর্দার আড়ালে শক্তিশালী প্রভাব বজায় রাখেন। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে চিন্তাশীল নাকাসোনের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা হিসেবেও ভূমিকা পালন করেন। অক্টোবর ১৯৮৭ সালে নাকাসোনের মেয়াদ শেষ হয়। তার দ্বিতীয় দুই বছরের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছিল। এটি ছিল আধুনিক জাপানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। নাকাসোনের অবসরের মাত্র ১৫ মাস আগে এলডিপি হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ৫১২টি আসনের মধ্যে ৩০৪টি জিতে তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তবে এমন শক্ত অবস্থান সত্ত্বেও সরকার নানা সংকটের মুখে পড়ে। জাপানের সম্পদমূল্য বুদবুদের কারণে জমির দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯৭৫ সালের পর সবচেয়ে বেশি হারে মূল্যস্ফীতি ঘটে। বেকারত্ব ৩.২ শতাংশে পৌঁছে রেকর্ড সৃষ্টি করে। দেউলিয়া হয়ে পড়ার ঘটনা বাড়ে এবং এলডিপির প্রস্তাবিত কর সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। ১৯৮৭ সালের গ্রীষ্মে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা দিলেও ২০ অক্টোবর, ১৯৮৭ তারিখে, যেদিন নাকাসোনে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকেশিতা নোবোরুকে তার উত্তরসূরি ঘোষণা করেন, সেদিনই টোকিওর শেয়ারবাজার ধসে পড়ে। এই সময়ে জাপানের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের যুদ্ধ-পরবর্তী উন্নয়নের এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়ায়, যার প্রভাব ১৯৯০ এর দশক পর্যন্ত চলতে থাকে।

অর্থনীতি

[সম্পাদনা]

এলডিপি সরকার জাপানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে জাপানি শিল্পকে বিদেশে প্রসারিত করতে উৎসাহিত করে। একই সঙ্গে বিদেশি কোম্পানিগুলোর জাপানে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। এই কৌশলগুলো এবং প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা মিলিয়ে জাপানের অর্থনীতি স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। ১৯৮০ সাল নাগাদ জাপানি গাড়ি ও ইলেকট্রনিকসসহ বহু পণ্য সারা বিশ্বে রপ্তানি হতে থাকে। শিল্প খাতে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই জাপান বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে পৌঁছে যায়। ১৯৯০-এর দশকে মন্দার মধ্যেও এই প্রবৃদ্ধির ধারা চলতে থাকে। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়ায়।

১৯৬৪ সালে টোকিও অলিম্পিক অনেকের মতে জাপানের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পুনরায় আবির্ভাবের প্রতীক। সেই সময়ে শিনকানসেন হাই স্পিড রেলসহ নানা উদ্ভাবনের মাধ্যমে যুদ্ধ-পরবর্তী উন্নয়ন বিশ্বকে দেখানো হয়।

১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষ ভাগ পর্যন্ত জাপানে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। তবে ১৯৭৩ সালে ওপেক চার গুণ তেলের দাম বাড়িয়ে দিলে জাপান তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাবিত হয়। কারণ তেলের জন্য জাপান প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানির উপর নির্ভরশীল ছিল। এর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো জাপানে মন্দা দেখা দেয়।

পররাষ্ট্রনীতি

[সম্পাদনা]

আর্থিক সমৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় অবস্থানের পাশাপাশি যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাপান বৈশ্বিক রাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করে।

১৯৫০-এর দশকে জাপান বহু দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের ভূমিকা পুনঃনির্ধারণ করে। যেমন ১৯৫৬ সালে জাপান জাতিসংঘে যোগ দেয়া এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল যা জার্মানির সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্গঠন করতে সাহায্য করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও ১৯৫৫ সালে জার্মানির সঙ্গে জাপান নতুনভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলে। যা মূলত অর্থনৈতিক বিনিময়কে কেন্দ্র করে ছিল।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাপানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয় ১৯৬০ সালে। যখন জাপান-যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তির সংশোধন হয়। নতুন চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় জাপানের সামরিক রক্ষাকর্তা হিসেবে ভূমিকা পালন করতে থাকে। এতে জাপানজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ, রাস্তার বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক উত্তাল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। চুক্তিটি ডায়েটে অনুমোদনের এক মাস পরেই মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে। এরপর রাজনৈতিক অস্থিরতা কমে যায়। পরবর্তী কয়েক বছরে পারমাণবিক অস্ত্র এবং নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদ হলেও, ১৯৭২ সালে ওকিনাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দখল থেকে জাপানের সার্বভৌমত্বে ফিরে আসে এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধ ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে জাপানিদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হতে শুরু করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান গণচীন প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। যখন সেই জাতীয়তাবাদী সরকার তাইওয়ানে নির্বাসনে যায় তখনও তাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে। এই নীতির ফলে ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চীনের গণপ্রজাতন্ত্রী জাপানের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। পরে যখন চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হতে শুরু করে, তখন ১৯৭১ সালে বেইজিংয়ের সঙ্গে হঠাৎ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন (যা 'পিং-পং কূটনীতি' নামে পরিচিত) জাপানকে চমকে দেয়। এরপর ১৯৭২ সালে টোকিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা শুরু হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক সমস্যাসঙ্কুল ছিল। তবে ১৯৫৬ সালের ১৯ অক্টোবর একটি যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরিত হয়, যা যুদ্ধের অবসান এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। প্রধান বিরোধের বিষয় ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে থাকা অঞ্চল, যেগুলো জাপান 'উত্তর অঞ্চল' হিসেবে চিহ্নিত করে। এই এলাকাগুলো হলো কুরিল দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণের দুটি দ্বীপ এতোরোফু ও কুনাশিরি এবং শিকোতান ও হাবোমাই দ্বীপপুঞ্জ (হোক্কাইডোর উত্তর-পূর্বে)। এই দ্বীপগুলো জাপানের আত্মসমর্পণের পরপরই সোভিয়েত ইউনিয়ন দখল করে।

প্রধানমন্ত্রী তানাকা কাকুয়েই (১৯৭২–৭৪) সরকারের সময়ে জাপান একটু দৃঢ়তর হলেও নীরবভাবে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করে। তানাকার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের নেতাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যদিও সেগুলোর ফলাফল ছিল মিশ্র। ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড সফরের সময় জনরোষ ও দাঙ্গার সম্মুখীন হন। যা দীর্ঘদিনের জাপানের বিরুদ্ধ মতামতের প্রতিফলন ছিল।

প্রধানমন্ত্রী ইয়াসুহিরো নাকাসোনে ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের মধ্যে একাধিক সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত করা। জাপানের প্রতিরক্ষা বিষয়ে নাকাসোনের কঠোর মনোভাব কিছু মার্কিন কর্মকর্তার কাছে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পায়। তবে জাপান ও অন্যান্য এশীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে তা জনপ্রিয় ছিল না। জাপানকে "অডুব্ব ডুবে না যাওয়া বিমানবাহী রণতরী" হিসেবে বর্ণনা করা, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ উল্লেখ করা, এবং সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধনের আহ্বান জানানোর মতো মন্তব্য দেশে ও বিদেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তারপরও ১৯৮০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জাপানের আত্মরক্ষাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তি কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।

জাপান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের আরেকটি বড় সমস্যা ছিল জাপানের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য উদ্বৃত্ত যা নাকাসোনের প্রথম মেয়াদে রেকর্ড পরিমাণে পৌঁছে যায়। যুক্তরাষ্ট্র জাপানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যেন তারা ইয়েনের মূল্য বাড়ায় এবং মার্কিন পণ্যের আমদানি সহজ করতে বাজার আরও উন্মুক্ত করে। জাপান সরকার নিজেদের মূল শিল্পগুলোকে সাহায্য ও সুরক্ষা দিয়ে প্রতিযোগিতায় অন্যদের তুলনায় সুবিধা নিচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। টোকিও এই সমস্যাগুলোর সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা নিজেদের শিল্প নীতি রক্ষা করে এবং বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা হ্রাসে খুবই অনিচ্ছুক ছিল। তারা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খুব অল্প কিছু চুক্তি করেছিল।

দখল-পরবর্তী সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগে জাপানে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব অব্যাহত থাকে, যার অনেকটাই আসে মার্কিন দখলদারিত্বের সময়ে। সেই সময় বহু এলাকায় মার্কিন সৈন্যদের উপস্থিতি ছিল সাধারণ ঘটনা। আমেরিকান সংগীত ও চলচ্চিত্র জনপ্রিয়তা পায়। এর ফলে এক নতুন জাপানি শিল্পী প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে, যারা পশ্চিমা ও স্থানীয় উভয় প্রভাবকে নিজেদের কাজে ব্যবহার করে।

এই সময় জাপান নিজেও সাংস্কৃতিক রপ্তানিকারক হিসেবে পরিচিত হতে শুরু করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণেরা জাপানি "কাইজু" (দানব চলচ্চিত্র), "অ্যানিমে" (কার্টুন), "মাঙ্গা" (কমিক বই) ও অন্যান্য আধুনিক জাপানি সংস্কৃতি গ্রহণ করতে শুরু করে। ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা ও ইউকিও মিশিমার মতো জাপানি সাহিত্যিকরা আমেরিকা ও ইউরোপে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। দখলদারিত্ব শেষে আমেরিকান সৈন্যরা দেশে ফিরে যান গল্প ও নানা সামগ্রী নিয়ে, আর পরবর্তী প্রজন্মের সৈন্যরা জাপান থেকে মার্শাল আর্টসহ অন্যান্য সংস্কৃতির ধারাও বহন করেন।

টাইমলাইন (১৯৫২ – ১৯৮৯)

[সম্পাদনা]
  • ১৯৫২: মিত্রবাহিনীর দখলদারিত্বের অবসান (২৮ এপ্রিল)।
  • ১৯৫৪: জাপান আত্মরক্ষাবাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • ১৯৫৫: লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) গঠিত হয়।
  • ১৯৫৬: জাপান জাতিসংঘে যোগ দেয়।
  • ১৯৬০: দেশজুড়ে শ্রমিক ধর্মঘট ও ছাত্র আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়।
  • ১৯৬৪: টোকিওতে অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয়। শিনকানসেন ট্রেন চলাচল শুরু করে।
  • ১৯৬৫: জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে মৌলিক সম্পর্কবিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শিন’ইচিরো তোমোনাগা পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
  • ১৯৬৮: পারমাণবিক রণতরী "এন্টারপ্রাইজ" বিতর্কের মধ্যে সাসেবোতে পৌঁছে। "ইটাই-ইটাই" রোগকে আনুষ্ঠানিকভাবে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ওগাসাওয়ারা দ্বীপপুঞ্জ জাপানের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে। ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। একজন ব্যক্তি পুলিশ সেজে ৩০ কোটি ইয়েন চুরি করে (২০০৩ সাল পর্যন্ত আটক নয়)।
  • ১৯৬৯: প্রধানমন্ত্রী আইসাকু সাতো ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এর বৈঠক। ওকিনাওয়া জাপানের নিয়ন্ত্রণে ফেরানোর তারিখ ১৯৭২ সালের জন্য নির্ধারণ করা হয়।
  • ১৯৭০: ওসাকায় বিশ্ব মেলা (এক্সপো ৭০) অনুষ্ঠিত হয়।
  • ১৯৭১: ইয়েনের মান পরিবর্তন করে ভাসমান বিনিময় হারে আনা হয়, যার ফলে স্বল্পমেয়াদী মন্দা দেখা দেয়।
  • ১৯৭২: ওকিনাওয়া জাপানের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে।
  • ১৯৮০: বার্ষিক গাড়ি উৎপাদন ১ কোটি ছাড়িয়ে যায়, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পর জাপান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গাড়ি উৎপাদক হয়ে ওঠে। ইয়োমিউরি জায়ান্টস-এর সাদাহারু ওহ খেলা থেকে অবসর নেন।
  • ১৯৮১: কেনিচি ফুকুই রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান।
  • ১৯৮২: তোহোকু শিনকানসেন ওমিয়া থেকে মোরিওকা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়।
  • ১৯৮৩: ইজু দ্বীপপুঞ্জের মিয়াকেজিমায় ওয়ামা আগ্নেয়গিরি উদ্গিরণ ঘটে। কিতোরা কোফুনে জেনবুর রঙিন চিত্র আবিষ্কৃত হয়। কাকুয়েই তানাকা চার বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
  • ১৯৮৪: মিষ্টির কোম্পানি ইজাকি গ্লিকোর সভাপতিকে অপহরণ করে ১০ বিলিয়ন ইয়েন ও ১০০ কেজি সোনার মুক্তিপণ দাবি করা হয়, তবে তিনি পালিয়ে আসেন। পরে একজন চাঁদাবাজ কোম্পানির পণ্য বিষাক্ত করার হুমকি দিয়ে ৬০ মিলিয়ন ইয়েন (পরে ১২০ মিলিয়ন ইয়েন) দাবি করে। অপরাধী ধরা পড়েনি। নতুন মুদ্রা চালু হয়, যাতে ১০,০০০ ইয়েন নোটে ফুকুজাওয়া ইউকিচি, ৫,০০০ ইয়েন নোটে ইনাজো নিতোবে ও ১,০০০ ইয়েন নোটে নাটসুমে সোসেকির ছবি ছাপা হয়।
  • ১৯৮৫: জাপানে প্রথম এইডস রোগী আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হয়। জাপান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১২৩ ওমিতাকা-ইয়ামায় দুর্ঘটনায় পড়ে, যাতে ৫২০ জন নিহত ও মাত্র ৪ জন বেঁচে যান—এই দুর্ঘটনা বিমান দুর্ঘটনায় সর্বাধিক প্রাণহানির রেকর্ড গড়ে।
  • ১৯৮৬: ইজু ওওশিমার মিহারায়ামা আগ্নেয়গিরি উদ্গিরণ ঘটে, তবে আগেই দ্বীপের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়।
  • ১৯৮৭: জাপান জাতীয় রেলওয়ে বেসরকারি খাতে যায় ও সাতটি কোম্পানিতে ভাগ হয়—ছয়টি আঞ্চলিক এবং একটি মালবাহী। অভিনেতা ইউজিরো ইশিহারা মারা যান।
  • ১৯৮৮: হোক্কাইডো ও হোনশুকে সংযুক্ত করা সেইকান টানেল নির্মিত হয়। মেরিটাইম সেল্ফ ডিফেন্স ফোর্স-এর সাবমেরিন "নাদাশিও" একটি মাছ ধরার জাহাজ "দাই ইচি ফুজিমারু"-র সঙ্গে ধাক্কা খায়।
  • ১৯৮৯: ৭ জানুয়ারি শোওয়া সম্রাট মারা যান। পরদিন আকিহিতো সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং নতুন যুগের নাম ঘোষণা করা হয়—"হেইসেই"।


জাপানের ইতিহাস

ভূমিকা
Prehistory through the Jomon Period – The Yayoi Period – The Kofun or Yamato Period – The Asuka Period – The Nara Period – The Spread of Buddhism in Japan – The Early Heian Period – The Middle Heian Period – The Late Heian Period – The Kamakura Period – The Kemmu Restoration – The Nanboku-chō Period – The Muromachi Period (Ashikaga) – The Warring States Period – The Azuchi–Momoyama Period – The Edo Period – The Meiji Restoration – The Meiji Period – The Taisho Period – The Rise of Militarism – World War II – The American Occupation of Japan – Post-War Japan – Japan Today
আরও পড়ুন