জাপানের ইতিহাস: পুরাণ থেকে জাতিসত্ত্বা/তাইশো যুগ
তাইশো যুগ (তাইশো জিদাই?, "মহান ন্যায়পরায়ণতার যুগ") বা তাইশো যুগকাল হল জাপানের ইতিহাসের একটি সময়কাল, যা ৩০ জুলাই, ১৯১২ থেকে ২৫ ডিসেম্বর, ১৯২৬ পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি তাইশো সম্রাটের শাসনামলের সাথে মিলে যায়। নতুন সম্রাট শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলেন। এই কারণে রাজনীতিতে পুরনো অভিজাত প্রবীণ রাষ্ট্রনায়কদের (জেনরো) হাত থেকে ক্ষমতা সরে এসে জাপানের জাতীয় সংসদ (ডায়েট) ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে পৌঁছায়। তাই, এই সময়টিকে জাপানে "তাইশো গণতন্ত্র" নামে পরিচিত একটি উদারপন্থী আন্দোলনের যুগ হিসেবে ধরা হয়। এই যুগটিকে সাধারণত তার আগের বিশৃঙ্খল মেইজি যুগ এবং পরবর্তী সামরিকতন্ত্রে চালিত শোয়া যুগের প্রথম দিক থেকে পৃথক বিবেচনা করা হয়।
মেইজি যুগের উত্তরাধিকার
[সম্পাদনা]৩০ জুলাই, ১৯১২ সালে মেইজি সম্রাট মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর যুবরাজ ইয়োশিহিতো জাপানের নতুন সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন, যার মাধ্যমে শুরু হয় তাইশো যুগ। মেইজি যুগের শেষ দিকে সরকার দেশীয় এবং বিদেশি ক্ষেত্রে ব্যাপক বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা কর্মসূচি হাতে নেয়। এতে সরকারি ঋণের সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং ঋণ পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষিত ছিল না।
মেইজি যুগে যে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব দেখা গিয়েছিল, তা এই যুগেও অব্যাহত ছিল। কোবায়াশি কিওচিকা পাশ্চাত্য চিত্রকলার ধারা গ্রহণ করেন, যদিও তিনি উকিও-এ শৈলীতেও কাজ চালিয়ে যান। ওকাকুরা কাকুজো ঐতিহ্যবাহী জাপানি চিত্রকলায় আগ্রহ ধরে রাখেন। মোরি ওগাই ও নাতসুমে সোসেকি পাশ্চাত্যে অধ্যয়ন করেন এবং মানুষের জীবন সম্পর্কে আরও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন।
১৮৬৮ সালের মেইজি পুনরুদ্ধার থেকে উদ্ভূত ঘটনাগুলো শুধু দেশীয় ও বৈদেশিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণই করেনি যার মাধ্যমে জাপান অন্যান্য এশীয় দেশের মতো উপনিবেশে পরিণত হয়নি বরং এই সময়টিতে একটি নতুন বৌদ্ধিক আলোড়নও দেখা দেয়। তখন গোটা বিশ্বেই সমাজতন্ত্র নিয়ে আগ্রহ ছিল এবং শহুরে শ্রমিক শ্রেণি গঠিত হচ্ছিল। সার্বজনীন পুরুষ ভোটাধিকার, সমাজকল্যাণ, শ্রমিক অধিকার এবং অহিংস প্রতিবাদ ছিল সেই প্রাথমিক বামপন্থী আন্দোলনের মূল আদর্শ। তবে, সরকার বামপন্থী কর্মকাণ্ড দমন করায় আরও চরমপন্থী পদক্ষেপ দেখা দেয় এবং এই দমন আরও বাড়ে। এর ফলে ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় জাপান সমাজতান্ত্রিক পার্টি (নিপ্পন শাকাইতো) ভেঙে যায় এবং সমগ্র সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
তাইশো যুগের শুরুতেই ১৯১২–১৩ সালে ঘটে তাইশো রাজনৈতিক সংকট, যা পূর্বের আপসহীন রাজনীতিকে বাধাগ্রস্ত করে। যখন সাইওনজি কিনমোচি সামরিক বাজেট কমানোর চেষ্টা করেন, তখন সেনা মন্ত্রী পদত্যাগ করেন এবং এর ফলে রিক্কেন সেইউকাই সরকার ভেঙে পড়ে। ইয়ামাগাতা আরিতোমো এবং সাইওনজি দুজনেই নতুন করে দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং জেনরো গোষ্ঠীও কোনও সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়। মন্ত্রিসভাকে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে পরিচালনার ঘটনায় জনরোষ দেখা দেয় এবং কাতসুরা তারোর তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সিদ্ধান্তে আরও বেশি প্রতিবাদ উঠে আসে। ফলে জেনরো রাজনীতির অবসানের দাবিও জোরালো হয়। পুরনো অভিজাতদের বিরোধিতা সত্ত্বেও, রক্ষণশীল গোষ্ঠী ১৯১৩ সালে নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করে, যার নাম ছিল রিক্কেন দোশিকাই। এই দলটি ১৯১৪ সালের শেষ দিকে সেইউকাই দলের তুলনায় পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৩ সালে ইয়ামামোতো গননোহিওয়ে কাতসুরার স্থলাভিষিক্ত হন। এরপর ১৯১৪ সালের এপ্রিল মাসে ওকুমা শিগেনোবু ইয়ামামোতোর স্থলাভিষিক্ত হন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও চীনে আধিপত্য
[সম্পাদনা]বার্লিন যখন ইউরোপীয় যুদ্ধ (যা পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নামে পরিচিত হয়) নিয়ে ব্যস্ত, সেই সুযোগে চীনে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে জাপান ২৩ আগস্ট, ১৯১৪ সালে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর তারা দ্রুত চীনের শানডং প্রদেশে জার্মানির লিজকৃত এলাকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা, ক্যারোলাইন ও মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়। ৭ নভেম্বর, জার্মান গোলাবারুদের ঘাটতির কারণে ঘিরে রাখা কিংতাও শহর জাপানের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
যেহেতু পাশ্চাত্যের মিত্ররা ইউরোপে যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তাই জাপান জানুয়ারি ১৯১৫-এ চীনের কাছে বিখ্যাত একুশ দফা দাবি পেশ করে। এতে জার্মানির দখলকৃত অঞ্চল, মানচুরিয়া এবং অন্তর্দেশীয় মঙ্গোলিয়ায় আরও প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি, চীনের একটি বড় খনি ও ধাতব শিল্প কমপ্লেক্সের যৌথ মালিকানা, তৃতীয় কোনও শক্তির কাছে উপকূলীয় এলাকা লিজ বা হস্তান্তর বন্ধ, এবং নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণের দাবি জানানো হয়। এই সব দাবি পূরণ হলে চীন কার্যত জাপানের অধীনস্থ রাষ্ট্রে পরিণত হত। তবে, চীনা সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার ধীরগতি, চীনে ব্যাপক বিরুদ্ধ প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখে জাপান শেষ পর্যায়ের দাবি তুলে নেয় এবং ১৯১৫ সালের মে মাসে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চীনের উত্তরাঞ্চলসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে জাপানের আধিপত্য আরও মজবুত হয় আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে। ১৯১৬ সালে রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি মানচুরিয়া ও অন্তর্মঙ্গোলিয়ায় জাপানের প্রভাব আরও জোরদার করে। ১৯১৭ সালে ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের চীন ও প্রশান্ত মহাসাগরের দখলকৃত অঞ্চলকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯১৭ ও ১৯১৮ সালের মধ্যে নিশিহারা ঋণ (বেইজিংয়ে নিযুক্ত নিশিহারা কামেজোর নামে নামকরণ) চীন সরকারকে সহায়তা করলেও, এতে চীন আরও বেশি জাপানের ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। যুদ্ধের শেষ দিকে জাপান ইউরোপীয় মিত্রদের জন্য অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখে। এতে জাপানের শিল্প খাত বহুমুখীকরণ লাভ করে, রপ্তানি বাড়ে এবং জাপান প্রথমবারের মতো ঋণগ্রহীতা থেকে ঋণদাতা দেশে রূপান্তরিত হয়।
রাশিয়ায় রাজতান্ত্রিক শাসনের পতন ও ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব পরবর্তী সাইবেরিয়ার বিশৃঙ্খলার ফলে এশিয়ায় জাপানের শক্তি আরও বেড়ে যায়। এই সুযোগ কাজে লাগাতে চেয়ে জাপান সেনাবাহিনী সাইবেরিয়া দখলের পরিকল্পনা করে, যার পরিসীমা লেক বাইকাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এ জন্য জাপানকে চীনের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে হয়, যাতে চীনা ভূখণ্ড দিয়ে জাপানি সেনাদের যাতায়াত সম্ভব হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রকে বিরক্ত না করতে সেনা প্রেরণ সীমিত করা হয়, তবুও ৭০,০০০-এর বেশি জাপানি সেনা ১৯১৮ সালে মিত্র বাহিনীর সাইবেরিয়া অভিযানে যোগ দেয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী মিত্র শক্তির অংশ হিসেবে জাপান এশিয়ায় প্রভাব ও প্রশান্ত মহাসাগরের ভূখণ্ড দখলে বড় সুযোগ পায়। প্রায় সম্পূর্ণভাবে অসামরিক সরকারের বাইরে থেকে সম্রাটীয় জাপানি নৌবাহিনী জার্মানির মাইক্রোনেশীয় উপনিবেশগুলো দখল করে।
৯ অক্টোবর, ১৯১৬ সালে তেরাউচি মাসাতাকে ওকুমা শিগেনোবুর স্থলাভিষিক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। ২ নভেম্বর, ১৯১৭ সালে ল্যানসিং-ইশি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে চীনে জাপানের স্বার্থ স্বীকার করে এবং "উন্মুক্ত দরজা নীতি" বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ১৯১৮ সালের জুলাইয়ে সাইবেরিয়া অভিযান শুরু হয়, যেখানে ৭৫,০০০ জাপানি সেনা পাঠানো হয়। ১৯১৮ সালের আগস্টে জাপানের শহর ও গ্রামগুলোতে চাল দাঙ্গা শুরু হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান: তাইশো গণতন্ত্র
[সম্পাদনা]যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাপান এক অভূতপূর্ব সমৃদ্ধির মুখ দেখে। ১৯১৯ সালে ভার্সাই শান্তি সম্মেলনে জাপান এক সামরিক ও শিল্পশক্তি হিসেবে অংশগ্রহণ করে এবং নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার "বিগ ফাইভ" বা পাঁচ প্রধান শক্তির অন্যতম হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। টোকিও জাতিসংঘের পরিষদে একটি স্থায়ী আসন পায় এবং শান্তিচুক্তিতে জার্মানির শানডংয়ে থাকা অধিকার জাপানের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে চীনে ব্যাপকভাবে জাপানবিরোধী দাঙ্গা ও রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়। একইভাবে, প্রশান্ত মহাসাগরের জার্মান নিয়ন্ত্রিত দ্বীপগুলোও জাপানের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
জাপান রুশ গৃহযুদ্ধের পরে মিত্র শক্তির হস্তক্ষেপে অংশ নেয় এবং ১৯২৫ সাল পর্যন্ত সেখানে থেকে যায়। যদিও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জাপানের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে ছোট ছিল এবং শান্তিচুক্তিতে জাতিগত সমতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়, তবুও যুদ্ধ শেষে জাপান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি প্রধান শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
উনিশ শতকের শুরু থেকেই গঠিত হয়ে আসা দুই-দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ণতা লাভ করে। এই সময়কেই বলা হয় "তাইশো গণতন্ত্র"। ১৯১৮ সালে হারা তাকাশি, যিনি সাইওনজির ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং সেইউকাই দলের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ছিলেন, জাপানের প্রথম সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি তার পূর্বের সরকারি যোগাযোগ, জীবিত জেনরোদের সমর্থন এবং পিয়ার্স পরিষদের সহায়তায় সরকার গঠন করেন। তার মন্ত্রিসভায় সেনামন্ত্রী হন তানাকা গিইচি, যিনি পূর্বতনদের তুলনায় বেসামরিক-সামরিক সম্পর্কের গুরুত্ব ভালোভাবে বুঝতেন।
তবে হারাকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। মুদ্রাস্ফীতি, যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস, বিদেশি চিন্তার আগমন এবং শ্রমিক আন্দোলনের উত্থান তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। তিনি পূর্বতন পন্থায় সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেন এবং সরকারে কাঠামোগত সংস্কার খুব একটা করেননি। নির্বাচনী আইন পরিবর্তন ও নতুন এলাকা বিভাজনের মাধ্যমে সেইউকাই দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করেন এবং সরকার-নিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেন।
তবে জনগণ ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ে। ঋণের বোঝা ও নির্বাচনী আইনের কারণে অসন্তোষ দেখা দেয়। ভোটারদের জন্য পুরনো করযোগ্যতা বাধা রাখা হয়েছিল। সার্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি ওঠে এবং পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার আহ্বান জানানো হয়। ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং পশ্চিমা চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত গণতন্ত্রবাদী, সমাজতন্ত্রী, কমিউনিস্ট ও নিঅরাজ্যবাদীরা ১৯১৯ ও ১৯২০ সালে বিশাল কিন্তু শান্তিপূর্ণ মিছিল করে সার্বজনীন পুরুষ ভোটাধিকারের দাবি তোলে। নতুন নির্বাচনে সেইউকাই আবারও জয়লাভ করে, যদিও এবার তাদের জয় ছিল খুবই সামান্য ব্যবধানে।
এই রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেই ১৯২১ সালে এক অসন্তুষ্ট রেলকর্মী হারাকে হত্যা করে। এরপর কয়েকজন অদলীয় প্রধানমন্ত্রী ও জোট সরকার আসে। বৃহত্তর ভোটারদের অংশগ্রহণ, বামপন্থীদের উত্থান এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে সমাজে যে পরিবর্তন আসছিল, তাতে ভয় পেয়ে সরকার ১৯২৫ সালে "শান্তি সংরক্ষণ আইন" পাশ করে। এই আইনে রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলুপ্তির যে কোনো চিন্তাকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
সংসদের ভাঙন ও জোট সরকারের অস্থিরতা থেকে বের হতে কেন্সেইকাই ও সেইউ হন্তো মিলে ১৯২৭ সালে রিক্কেন মিনসেইতো দল গঠন করে। এই দল সংসদীয় ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও বিশ্ব শান্তির পক্ষে ছিল। এরপর থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত সেইউকাই ও রিক্কেন মিনসেইতো পালাক্রমে ক্ষমতায় ছিল।
তবে রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও স্থিতিশীল সরকারের প্রত্যাশা সত্ত্বেও, অর্থনৈতিক সংকট সব দলকেই সমস্যায় ফেলে। খরচ কমানোর পরিকল্পনা ও জনগণের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য সরকার নানা প্রচেষ্টা চালায়। জনগণকে সম্রাট ও রাষ্ট্রের জন্য আত্মত্যাগের নৈতিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। যদিও ১৯২০-এর দশকের শেষভাগ ও ১৯৩০-এর দশকের শুরুর বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব জাপানে খুব একটা পড়েনি বরং জাপানি রপ্তানি এ সময়ে বেড়েছিল তারপরও জনগণের মধ্যে এক অসন্তোষ তৈরি হয়। ১৯৩০ সালে প্রধানমন্ত্রী হামাগুচি ওসাচির ওপর হামলা সেই অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে তোলে। হামাগুচি বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হন এবং পরের বছর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর বেশি দিন বাঁচেননি।
কমিউনিজম এবং এর প্রতিক্রিয়া
[সম্পাদনা]১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বলশেভিকদের বিজয়ের পর তারা বিশ্বব্যাপী বিপ্লবের আশা করে "কমিনটার্ন" প্রতিষ্ঠা করে। পূর্ব এশিয়ায় বিপ্লব ঘটাতে জাপানের গুরুত্ব তারা অনুধাবন করে এবং ১৯২২ সালের জুলাইয়ে জাপানে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করে। ১৯২৩ সালে এই পার্টির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল সামন্ততন্ত্রের অবসান, রাজতন্ত্র বিলুপ্তি, সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বীকৃতি এবং সাইবেরিয়া, সাখালিন, চীন, কোরিয়া ও তাইওয়ান থেকে জাপানি সেনা প্রত্যাহার।
এই ঘোষণার পর সরকার দলটির ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালায়। প্রতিক্রিয়ায় কিছু উগ্রপন্থী যুবরাজ হিরোহিতোর ওপর হামলার চেষ্টা চালায়। ১৯২৫ সালের "শান্তি সংরক্ষণ আইন" মূলত এই "বিপজ্জনক চিন্তা" রুখতেই করা হয়।
১৯২৫ সালে সাধারণ নির্বাচন আইনের মাধ্যমে ভোটের সুযোগ সম্প্রসারিত হলেও জাপান কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। ১৯২৮ সালের নতুন "শান্তি সংরক্ষণ আইন" আরও কঠোরভাবে কমিউনিস্টদের দমন করে। যেসব দল তারা প্রভাবিত করেছিল, সেগুলোকেও নিষিদ্ধ করা হয়। পুলিশ তখন সর্বত্র নজরদারি চালাত এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন দমনে ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। ১৯২৬ সালের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টিকে গোপনে চলতে বাধ্য করা হয়, ১৯২৯ সালের মাঝামাঝি পার্টির নেতৃত্ব ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং ১৯৩৩ সালের মধ্যে দলটি কার্যত ভেঙে পড়ে।
প্যান-এশিয়ানবাদ ছিল ডানপন্থী রাজনীতি ও রক্ষণশীল সামরিক চেতনার একটি বৈশিষ্ট্য, যা মেইজি পুনর্গঠনের শুরু থেকেই ছিল। ১৮৭০-এর দশকে যুদ্ধপ্রবণ রাজনীতিতে এর বড় অবদান ছিল। কিছু অসন্তুষ্ট সাবেক সামুরাই ১৮৮১ সালে গঠিত গেনইওশা ও ১৯০১ সালে গঠিত কোকুরিউকাই (কালো ড্রাগন সংঘ) নামে গোয়েন্দা ও প্যান-এশিয়ান সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। এই সংগঠনগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সক্রিয় হয়, যুদ্ধপন্থা উসকে দেয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত প্যান-এশিয়ান মতবাদকে সমর্থন করে চলে।
বিশ্বযুদ্ধের পর তাইশো পররাষ্ট্রনীতি
[সম্পাদনা]চীনের জাতীয়তাবাদের উত্থান, রাশিয়ায় কমিউনিস্টদের বিজয় এবং পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এই তিনটি বিষয়ই যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানের পররাষ্ট্রনীতির জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সাইবেরিয়ায় চার বছরব্যাপী অভিযান এবং চীনে সক্রিয়তা, তার সঙ্গে দেশীয়ভাবে ব্যাপক ব্যয়বহুল কর্মসূচির কারণে জাপান যুদ্ধকালীন আয়ের প্রায় সবটুকুই হারায়। তাই, এশিয়ায় আধিপত্য অর্জনের জন্য জাপানকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক কৌশল, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের পথেই এগোতে হয়। এই লক্ষ্য অর্জনে জাইবাতসুদের বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এদিকে, উন্নয়নের জন্য জাপান যেসব পণ্য ও ঋণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করছিল, সেই যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশবাদ-বিরোধী নীতিই জাপানের জন্য বড় বাধা হয়ে ওঠে।
সামরিক কূটনীতিতে আন্তর্জাতিক মোড় বদলের সূচনা হয় ১৯২১–২২ সালের ওয়াশিংটন সম্মেলনে। এই সম্মেলনে একাধিক চুক্তির মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি নতুন আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা গঠিত হয়। জাপানের অর্থনৈতিক দুরবস্থা নৌবাহিনী সম্প্রসারণকে অসম্ভব করে তোলে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক প্রতিযোগিতার বদলে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার পথ বেছে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। জাপান চীনের গৃহযুদ্ধে নিরপেক্ষ মনোভাব গ্রহণ করে, চীনে নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা পরিত্যাগ করে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সঙ্গে মিলে চীনের আত্মউন্নয়নকে উৎসাহিত করে।
১৯২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত "চার জাতির দ্বীপপুঞ্জ চুক্তি" তে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স প্রশান্ত মহাসাগরে বর্তমান পরিস্থিতিকে স্বীকৃতি দেয়। এই চুক্তির মাধ্যমে জাপান ও ব্রিটেন তাদের পুরনো মৈত্রী চুক্তির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তিও ঘটায়। ১৯২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত "পাঁচ জাতির নৌ নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি"-তে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জাপান, ফ্রান্স ও ইতালির জন্য যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় (অনুপাতে ৫ : ৫ : ৩ : ১.৭৫ : ১.৭৫)। পাশাপাশি, বিদ্যমান যুদ্ধজাহাজ এবং নির্মাণাধীন জাহাজগুলোর আকার ও অস্ত্রসজ্জাও সীমিত করা হয়। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন সম্মত হয় যে, তারা সিঙ্গাপুর থেকে হাওয়াই পর্যন্ত কোনো নতুন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করবে না। এতে জাপানের নৌবাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরে তুলনামূলক স্বাধীনতা বৃদ্ধি পায়।
একই দিনে স্বাক্ষরিত "নয় জাতির চুক্তি" তে বেলজিয়াম, চীন, নেদারল্যান্ডস ও পর্তুগালসহ মূল পাঁচ দেশ অংশ নেয়। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল প্রশান্ত মহাসাগরে যুদ্ধ প্রতিরোধ করা। এতে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলো চীনের স্বাধীনতা ও অখণ্ডতা স্বীকার করে, চীনে একটি স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। চীনে বিশেষ অধিকার দাবি না করাসহ অন্য জাতিগুলোর অবস্থান হুমকির মুখে না ফেলার অঙ্গীকার করা হয়। সব দেশের জন্য চীনে সমান বাণিজ্য ও শিল্পের সুযোগ সৃষ্টির নীতিও এতে উল্লেখ করা হয়। এই চুক্তির আওতায় জাপান শানডং থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে এবং সেখানে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অধিকার রেখে অন্যসব দাবি ত্যাগে সম্মত হয়। এছাড়াও, জাপান সাইবেরিয়া থেকেও সৈন্য প্রত্যাহার করে।
তাইশো গণতন্ত্রের অবসান
[সম্পাদনা]মোটের ওপর, ১৯২০-এর দশকে জাপান একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে এই সংসদীয় শাসনব্যবস্থা টিকে থাকতে পারেনি। এই সময়ে সামরিক নেতাদের প্রভাব ধীরে ধীরে বেড়ে যায়। এমন পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয় মেইজি সংবিধানের অস্পষ্টতা ও দুর্বলতার কারণে, বিশেষ করে সম্রাটের অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায়। এই গণতন্ত্রের সময় শেষ হওয়ার পর, জাপানের শাসনব্যবস্থা কার্যত সামরিক একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়।
সময়কাল
[সম্পাদনা]- ১৯১২: তাইশো সম্রাট সিংহাসনে আরোহণ করেন (৩০ জুলাই)। জেনারেল কাতসুরা তারো তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন (২১ ডিসেম্বর)।
- ১৯১৩: কাতসুরা পদত্যাগে বাধ্য হন এবং অ্যাডমিরাল ইয়ামামোতো গোনোহিও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন (২০ ফেব্রুয়ারি)।
- ১৯১৪: ওকুমা শিগেনোবু দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন (১৬ এপ্রিল)। জাপান জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ও মিত্রদের পক্ষ নেয় (২৩ আগস্ট)।
- ১৯১৫: জাপান চীনকে একুশ দফা দাবি পাঠায় (১৮ জানুয়ারি)।
- ১৯১৬: তেরাউচি মাসাতাকে প্রধানমন্ত্রী হন (৯ অক্টোবর)।
- ১৯১৭: ল্যানসিং-ইশি চুক্তি কার্যকর হয় (২ নভেম্বর)।
- ১৯১৮: সাইবেরিয়া অভিযান শুরু হয় (জুলাই)। হারা তাকাশি প্রধানমন্ত্রী হন (২৯ সেপ্টেম্বর)।
- ১৯১৯: কোরিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ১ মার্চ আন্দোলন শুরু হয় (১ মার্চ)।
- ১৯২০: জাপান জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।
- ১৯২১: হারা আততায়ীর হাতে নিহত হন এবং তাকাহাশি কোরেকিও প্রধানমন্ত্রী হন (৪ নভেম্বর)। হিরোহিতো রিজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন (২৯ নভেম্বর)। চার জাতির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় (১৩ ডিসেম্বর)।
- ১৯২২: পাঁচ জাতির নৌ নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় (৬ ফেব্রুয়ারি)। অ্যাডমিরাল কাতো তোমোসাবুরো প্রধানমন্ত্রী হন (১২ জুন)। জাপান সাইবেরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে (২৮ আগস্ট)।
- ১৯২৩: গ্রেট কান্তো ভূমিকম্পে টোকিও ধ্বংস হয় (১ সেপ্টেম্বর)। ইয়ামামোতো দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন (২ সেপ্টেম্বর)।
- ১৯২৪: কিয়োরা কেইগো প্রধানমন্ত্রী হন (৭ জানুয়ারি)। রাজপুত্র হিরোহিতো (ভবিষ্যতের সম্রাট শোওয়া) কুনি পরিবারের নাগাকো নিয়ো-র সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন (২৬ জানুয়ারি)। কাতো তাকাআকি প্রধানমন্ত্রী হন (১১ জুন)।
- ১৯২৫: সাধারণ নির্বাচন আইন পাস হয়, ২৫ বছরের ঊর্ধ্বে সব পুরুষ ভোটাধিকার লাভ করেন (৫ মে)। এছাড়া, শান্তি সংরক্ষণ আইনও পাস হয়। রাজকুমারী শিগেকো, হিরোহিতোর প্রথম কন্যা, জন্মগ্রহণ করেন (৯ ডিসেম্বর)।
- ১৯২৬: সম্রাট তাইশোর মৃত্যু হয়; হিরোহিতো সম্রাট হন (২৫ ডিসেম্বর)।