জাপানের ইতিহাস: পুরাণ থেকে জাতিসত্ত্বা/কামাকুরা যুগ

এই অধ্যায়টি কামাকুরা যুগ (কামাকুরা জিদাই, ১১৮৫–১৩৩৩) নিয়ে আলোচনা করে। এই সময়কাল জাপানের মধ্যযুগে প্রবেশের সূচনাবিন্দু যা প্রায় ৭০০ বছর ধরে চলবে মেইজি পুনর্গঠনের আগ পর্যন্ত। এই যুগে জাপানের শাসনভার ছিল কামাকুরা শোগুনদের হাতে। ১১৯২ সালে মিনামোতো নো ইয়োরিতোমো কামাকুরায় আনুষ্ঠানিকভাবে কামাকুরা শোগুনশাহি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সমুদ্রযুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী তাইরা গোত্রকে পরাজিত করে জেমপেই যুদ্ধের অবসান ঘটান এবং শোগুনশাহি শুরু করেন।
কামাকুরা যুগের অবসান ঘটে ১৩৩৩ সালে। সেই বছর আশিকাগা তাকাউজি, নিট্তা ইয়োশিসাদা এবং কুসুনোকি মাসাশিগে একত্রে শোগুনতন্ত্র ধ্বংস করে সম্রাট গো-দাইগোর অধীনে সাময়িকভাবে রাজকীয় শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
শোগুনতন্ত্র ও হোজো রিজেন্সি
[সম্পাদনা]কামাকুরা যুগ ছিল জমিভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের সময়। সেইসঙ্গে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি একটি বিশেষায়িত যোদ্ধা শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। রাজন্যদের (ভূমিপতিদের) প্রয়োজন ছিল অনুগত অধীনস্থদের, যাদের পুরস্কার হিসেবে জমিদান করা হতো। এই জমির মালিকরা স্থানীয়ভাবে সামরিক শাসন চালাত। এই ধরনের শাসনব্যবস্থাকে সামন্ততন্ত্র বলা হয়।
যখন মিনামোতো ইয়োরিতোমো তার ক্ষমতা সুসংহত করতে সক্ষম হন তখন তিনি কামাকুরায় নিজ পরিবারের বাসভবনে একটি নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তার সরকারকে ডাকতেন বাকুফু (তাঁবু সরকার) নামে। কিন্তু যেহেতু সম্রাট তাকে প্রাচীন উচ্চ সামরিক উপাধি "সেই তাই-শোগুন" প্রদান করেন তাই পশ্চিমা সাহিত্যতে এই সরকারকে প্রায়শই শোগুনতন্ত্র নামে অভিহিত করা হয়। ইয়োরিতোমো ফুজিওয়ারা পরিবারের ঘরোয়া শাসনের ধাঁচ অনুসরণ করেন। তিনি প্রশাসনিক বোর্ড হিসেবে "মান্দোকোরো" অনুগতদের বোর্ড "মোঞ্চুজো" এবং অনুসন্ধান বোর্ড "সমুরাই-দোকোরো" গঠন করেন। তিনি জাপানের মধ্য ও পশ্চিম অঞ্চলের ভূসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পর সেখানে তদারকি কর্মকর্তা এবং প্রদেশগুলিতে কনস্টেবল নিয়োগ করেন। শোগুন হিসেবে ইয়োরিতোমো নিজেই ছিলেন তদারক কর্মকর্তা ও প্রধান কনস্টেবল। তবে কামাকুরা শোগুনতন্ত্র জাতীয় শাসনব্যবস্থা ছিল না। যদিও তারা বিস্তৃত জমির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল, তবুও সেই নিয়োজিত তদারকদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ ছিল। এই শাসনব্যবস্থা উত্তর ফুজিওয়ারা বংশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যায় কিন্তু কখনোই পুরো উত্তর বা পশ্চিম জাপান সম্পূর্ণভাবে সামরিক দখলে আনতে পারেনি। তবে ১১৮৯ সালে উত্তর ফুজিওয়ারার চতুর্থ নেতা ফুজিওয়ারা নো ইয়াসুহিরা ইয়োরিতোমোর হাতে পরাজিত হন এবং উত্তর জাপানের শতবর্ষব্যাপী সমৃদ্ধি শেষ হয়ে যায়। পুরনো রাজদরবার তখনও কিয়োটোতে অবস্থান করছিল এবং তাদের নিজের কর্তৃত্বাধীন ভূমির উপরে দখল বজায় রেখেছিল, অথচ নতুন সামরিক পরিবারগুলো ক্রমে কামাকুরার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিল।
শক্তিশালী সূচনার পরও, ইয়োরিতোমো তার পরিবারের নেতৃত্ব স্থায়িভাবে সুসংহত করতে ব্যর্থ হন। মিনামোতো গোত্রের মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক কোন্দল চলে আসছিল যদিও ইয়োরিতোমো বেশিরভাগ প্রতিদ্বন্দ্বীকে দমন করেছিলেন। ১১৯৯ সালে হঠাৎ মৃত্যুর পর তার পুত্র মিনামোতো নো ইয়োরিই শোগুন ও মিনামোতো বংশের নামমাত্র প্রধান হন। কিন্তু ইয়োরিই পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য যোদ্ধা পরিবারদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন। তেরো শতকের গোড়ার দিকে হোজো তোকিমাসা নামে হোজো বংশের একজন সদস্য যিনি তাইরা বংশের একটি শাখা ছিলেন এবং ১১৮০ সালে মিনামোতোদের সঙ্গে জোট বেঁধেছিলেন, শোগুনের জন্য একজন রিজেন্ট হিসেবে নিয়োজিত হন। এই রিজেন্টকে সেই সময় "শিক্কেন" বলা হতো। পরবর্তীতে তোকুসো ও রেনশো নামেও শক্তিধর পদ সৃষ্টি হয় এবং প্রায়ই শিক্কেন একইসঙ্গে তোকুসো ও রেনশোও হতেন। হোজোদের শাসনে শোগুন হয়ে ওঠেন একমাত্র নামমাত্র শাসক যার হাতে প্রকৃত কোনো ক্ষমতা থাকত না।
সম্রাটের রক্ষক (শোগুন) নিজেই যখন কেবলমাত্র প্রতীকী একজন শাসকে পরিণত হন, তখন কিয়োটো ও কামাকুরার মধ্যে টানাপোড়েন দেখা দেয়। ১২২১ সালে ক্লোয়েস্টার্ড সম্রাট গো-তোবা ও দ্বিতীয় রিজেন্ট হোজো ইয়োশিতোকির মধ্যে জোক্যু যুদ্ধ শুরু হয়। হোজো বাহিনী সহজেই যুদ্ধ জয় করে এবং রাজদরবার সরাসরি শোগুনশাহির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। শোগুনের কনস্টেবলরা তখন আরও বেশি প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্জন করে। রাজদরবারকে প্রতিটি কাজের জন্য কামাকুরার অনুমতি নিতে বাধ্য করা হয়। যদিও রাজদরবার রাজনৈতিক ক্ষমতা হারায় তবুও তারা বিস্তৃত ভূমির মালিকানা ধরে রাখে।
হোজো রিজেন্সির সময় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সাফল্য অর্জিত হয়। ১২২৫ সালে তৃতীয় রিজেন্ট হোজো ইয়াসুতোকি ‘স্টেট কাউন্সিল’ গঠন করেন যা অন্যান্য সামরিক ভূস্বামীদের ন্যায়বিচার ও আইন প্রণয়নের সুযোগ দেয়। হোজো রিজেন্ট এই কাউন্সিলের নেতৃত্ব দিতেন, এবং এটি ছিল যৌথ নেতৃত্বের একটি সফল রূপ। ১২৩২ সালে জাপানের প্রথম সামরিক আইনসংহিতা ‘গোসেইবাই শিকিমোকু’ প্রণীত হয়। এটি রাজকীয় শাসনব্যবস্থা থেকে সামরিকভিত্তিক সমাজে রূপান্তরের এক গভীর প্রতিফলন। তখন কিয়োটোর আইনি প্রথাগুলো ছিল ৫০০ বছর পুরোনো কনফুসীয় মতবাদের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু নতুন এই আইনসংহিতা ছিল অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ। এটি তদারক কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদের কর্তব্য নির্ধারণ করে জমির বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় নির্দেশ করে এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নিয়ম স্থাপন করে। এই আইন ছিল সংক্ষিপ্ত, পরিষ্কার ও কার্যকর। যারা এর শর্ত ভঙ্গ করত, তাদের জন্য শাস্তির বিধান ছিল। এই আইন পরবর্তী ৬৩৫ বছর কার্যকর থাকে।
যা অনুমান করা যায়, সেই সময়কার সাহিত্যও অস্থির সময়ের প্রতিফলন বহন করেছিল। ‘হোজোকি’ নামক রচনা বৌদ্ধ ধর্মের অনিত্যতা ও মানবজীবনের নিরর্থকতার ধারণার মাধ্যমে সেই সময়ের অস্থিরতা বর্ণনা করে। ‘হেইকে মনোগাতারি’ গ্রন্থে তাইরা বংশের উত্থান ও পতনের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে যেখানে যুদ্ধ ও সামুরাইদের বীরত্বগাথা রয়েছে। পাশাপাশি সাহিত্যিক ধারা হিসেবে কবিতার সংকলনও চলমান ছিল যার মধ্যে অন্যতম ‘শিন কোকিন ওয়াকাশু’। এই সংকলনের ২০ খণ্ড ১২০১ থেকে ১২০৫ সালের মধ্যে রচিত হয়।
বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার
[সম্পাদনা]অস্থিরতা ও সহিংসতার সময়ে মানুষের মাঝে ক্রমবর্ধমান হতাশা মোক্ষের অনুসন্ধানকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। কামাকুরা যুগে জাপানে বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখা যায়। এই সময় দুইটি নতুন ধর্মীয় গোষ্ঠী জোদো শু ও জেন অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। মাউন্ট হেইয়ের মঠগুলো তখন রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল কিন্তু তারা মূলত তাদের তত্ত্বগত শিক্ষায় গভীরভাবে নিমগ্ন থাকা ব্যক্তিদেরকেই আকর্ষণ করত। অপরদিকে শিংগন সম্প্রদায় ও তার গূঢ় আচার এখনও কিয়োটোর অভিজাত পরিবারগুলোর মধ্যে সমর্থন পেত। এই সময় টেনদাই সম্প্রদায় ত্যাগ করে অনেক ভিক্ষু নিজেরাই নতুন বৌদ্ধ ধর্মীয় গোষ্ঠী গঠন করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
- হোনেন জোদো শু (জাপানি পিওর ল্যান্ড বৌদ্ধ ধর্ম) সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা।
- শিনরান হোনেনের শিষ্য এবং জোদো শিনশু সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা।
- ইপ্পেন জি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা, যিনি আমিদা বুদ্ধের প্রতি উৎসর্গিত উচ্ছ্বসিত নৃত্যের মাধ্যমে ভক্তির উপর জোর দেন।
- দোগেন সোতো জেন সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা।
- এইসাই রিনজাই জেন সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা।
- নিছিরেন নিছিরেন সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা, যিনি "লোটাস সূত্র" এর প্রতি ভক্তিকে মূল ভিত্তি করেন।
পুরনো বৌদ্ধ সম্প্রদায়গুলো যেমন শিংগন, টেনদাই এবং নারা যুগের প্রাচীন ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোও কামাকুরা যুগজুড়ে তাদের অস্তিত্ব বজায় রাখে এবং কিছুটা নবজাগরণও ঘটে। তবে নতুন কামাকুরা ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পুরনো গোষ্ঠীগুলো কিছুটা ছায়ায় পড়ে যায়। কারণ এই নতুন ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো কামাকুরা সরকারের নতুন নেতৃত্ব ও তাদের সামুরাইদের মাঝে সমর্থন লাভ করেছিল।
মোঙ্গল আক্রমণ
[সম্পাদনা]মোঙ্গলদের দুটি আক্রমণ প্রতিহত করা জাপানের ইতিহাসে ছিল একাধিক যুগান্তকারী ঘটনা। চীনের তাং রাজবংশের পতন এবং হেইয়ান দরবারের অন্তর্মুখী মনোভাবের কারণে নবম শতকের মাঝামাঝি সময়ে জাপান-চীন সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীকালে চীনের দক্ষিণ সঙ রাজবংশের সঙ্গে কিছু বাণিজ্যিক যোগাযোগ বজায় থাকলেও জাপানি জলদস্যুরা সমুদ্রপথকে বিপজ্জনক করে তোলে। এই সময় শোগুনশাহির বিদেশনীতি নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। তারা চীন ও গোরিয়ো (কোরিয়া) রাজ্যের বার্তা উপেক্ষা করত। এমন সময় ১২৬৮ সালে বেইজিং এ মোঙ্গলদের নতুন শাসনব্যবস্থা স্থাপনের সংবাদ জাপানে পৌঁছায়। মোঙ্গল নেতা কুবলাই খান জাপানকে নতুন ইউয়ান রাজবংশের প্রতি কর প্রদান করতে বলেন এবং তা না করলে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দেন। এমন হুমকিতে অভ্যস্ত না হওয়ায় কিয়োটোর পক্ষ থেকে জাপানের দেবতুল্য উত্সের কূটনৈতিক যুক্তি তুলে ধরা হয়। মোঙ্গলদের দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয় কোরিয়ান দূতদের ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রতিরক্ষার প্রস্তুতি শুরু করা হয়।
আরও কয়েকবার ব্যর্থভাবে অনুরোধ জানানোর পর ১২৭৪ সালে প্রথম মঙ্গোল আক্রমণ সংঘটিত হয়। ৬০০ র বেশি জাহাজে চড়ে মঙ্গোল, চীনা এবং কোরীয় বাহিনীর সম্মিলিত ২৩,০০০ সৈন্য হাকাতা বন্দরের দিকে অগ্রসর হয়। এদের হাতে ছিল গুলতি, আগুন ছোড়া অস্ত্র ও ধনুক-তীর। যুদ্ধের সময় এই সৈন্যরা ঘন ঘন অশ্বারোহী বাহিনীর আকারে আক্রমণ করত। অন্যদিকে জাপানি সামুরাইরা একে একে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের মতো যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত ছিল।উত্তর কিউশুর হাকাতা এলাকায় স্থানীয় জাপানি বাহিনী মূল ভূখণ্ডের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একদিনের যুদ্ধের পরই হঠাৎ এক প্রবল টাইফুন এসে পড়ে এবং শত্রু বাহিনী সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়। কুবলাই খান বুঝতে পারেন যে পরাজয়ের কারণ সেনাবাহিনীর দুর্বলতা নয় বরং প্রকৃতির রোষ। তাই তিনি ১২৮১ সালে দ্বিতীয়বার আক্রমণের নির্দেশ দেন। সাত সপ্তাহ ধরে উত্তর-পশ্চিম কিউশুতে যুদ্ধ চলতে থাকে। এরপর আবার একটি টাইফুন এসে মঙ্গোল নৌবহর ধ্বংস করে দেয়।
যদিও শিন্তো পুরোহিতেরা এই দুই পরাজয়কে "দেবতা প্রদত্ত বায়ু" বা কামিকাজে বলে ব্যাখ্যা করেন। যেটিকে স্বর্গের পক্ষ থেকে জাপানের প্রতি বিশেষ আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হয় এই আক্রমণ শোগুনদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। চীনের হুমকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে আশঙ্কা জাপানে ছিল তা আরও দৃঢ় হয়। তবে এই বিজয় জাপানি যোদ্ধাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে। তারা নিজেদের যুদ্ধদক্ষতার প্রতি এক শ্রেষ্ঠত্ববোধ পোষণ করতে শুরু করে যা ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। এই বিজয় শোগুনতন্ত্রকে আরও মূল্যবান বলে প্রমাণ করে।
মঙ্গোল যুদ্ধ জাপানের অর্থনীতির উপর বিশাল চাপ ফেলে। ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষার জন্য নতুন কর আরোপ করতে হয়। যুদ্ধের সময় যারা মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে সাহায্য করেছিল তারা পুরস্কার বা জমির আশা করেছিল। কিন্তু দেওয়ার মতো কিছু ছিল না। এতে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। সেইসঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত দায়ভার শোগুনতন্ত্রকে দুর্বল করে তোলে। এর সঙ্গে উত্তরাধিকার সূত্রে জমি ভাগ হওয়ার ফলে জমির মালিকেরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ঋণদাতার উপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়। রনিনদের (স্বাধীন সামুরাই যাদের প্রভু নেই) ঘুরে বেড়ানো শোগুনতন্ত্রের স্থিতিশীলতাকে আরও হুমকির মুখে ফেলে।
গৃহযুদ্ধ ও কামাকুরা শোগুনতন্ত্রের পতন
[সম্পাদনা]হোজো পরিবার তখন দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বড় বড় অভিজাত পরিবারগুলোর মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিয়োতো রাজদরবারকে দুর্বল করতে বাকুফু একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করে। দুইটি প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যিক বংশ "দক্ষিণ দরবার" বা জুনিয়র লাইন এবং "উত্তর দরবার" বা সিনিয়র লাইন ওলটপালটভাবে সিংহাসনে বসতে থাকে।এই ব্যবস্থা কিছু সময় পর্যন্ত চললেও শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ দরবারের গো-দাইগো সম্রাট হন। গো-দাইগো শোগুনতন্ত্র উৎখাত করে রাজশক্তি পুনরুদ্ধার করতে চান। তিনি প্রকাশ্যে কামাকুরার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং নিজের ছেলেকে উত্তরসূরি ঘোষণা করেন। ১৩৩১ সালে শোগুনতন্ত্র তাকে নির্বাসনে পাঠায়। কিন্তু তার অনুগতরা বিশেষ করে কুসুনোকি মাসাশিগে বিদ্রোহ শুরু করেন। এই বিদ্রোহে আশিকাগা তাকাউজি নামের একজন কনস্টেবল শোগুনদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাকাউজিকে গো-দাইগোর বিদ্রোহ দমন করতে পাঠানো হয়েছিল কিন্তু তিনি বিপক্ষে চলে যান। একই সময়ে নিট্টা ইয়োশিসাদা নামের আরেকজন পুর্বাঞ্চলীয় নেতা বিদ্রোহ করেন এবং শীঘ্রই শোগুনতন্ত্র ভেঙে পড়ে। হোজো পরিবার পরাজিত হয়। এই সম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘটনাকে বলা হয় কেনমু পুনরুদ্ধার। এটি পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হবে।
কামাকুরা যুগের সময়রেখা
[সম্পাদনা]- ১১৮৫: ইয়োরিতোমোর ভাই মিনামোতো ইয়োশিৎসুনে দাননৌরা যুদ্ধে সমুদ্রপথে প্রতিদ্বন্দ্বী তাইরা গোষ্ঠীকে পরাজিত করেন।
- ১১৯২: সম্রাট ইয়োরিতোমোকে শোগুন (সামরিক প্রধান) নিযুক্ত করেন। তিনি কামাকুরায় বাসভবন স্থাপন করেন এবং বকুফু সরকার চালু হয়।
- ১১৯৯: মিনামোতো ইয়োরিতোমো মৃত্যুবরণ করেন।
- ১২০৭: হোনেন ও তাঁর অনুসারীরা কিয়োতো থেকে নির্বাসিত বা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। এর ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবে 'পিওর ল্যান্ড' মতবাদ আরও বিস্তৃত হয়।
- ১২২১: জোক্যু বিদ্রোহে কামাকুরা বাহিনী রাজবাহিনীকে পরাজিত করে। এতে হোজো শাসকদের নেতৃত্বে কামাকুরা শোগুনতন্ত্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
- ১২২৭: দোগেন জেনজি সোদো জেন মতবাদ জাপানে প্রবর্তন করেন।
- ১২৩২: হোজো শাসকগণের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে 'জোঈ শিকিমোকু' আইন চালু হয়।
- ১২৭৪: কুবলাই খানের মঙ্গোল বাহিনী জাপান আক্রমণ করে। কিন্তু একটি টাইফুনে তারা পরাজিত হয়।
- ১২৭৪: নিছিরেনকে সাদো দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়।
- ১২৯৩: ২৭ মে সাগামি উপসাগর ও কামাকুরায় একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামি আঘাত হানে। এতে ২৩,০৩৪ জন প্রাণ হারান। এর আগে ১২৪১ ও ১২৫৭ সালেও একই এলাকায় ৭.০ মাত্রার ভূমিকম্প ও সুনামি হয়েছিল।
- ১৩৩৩: নিট্টা ইয়োশিসাদা কামাকুরা আক্রমণ ও ধ্বংস করেন, যার মাধ্যমে কামাকুরা শোগুনতন্ত্রের অবসান ঘটে।