চর্যাপদ/ভাষা
বাংলা ভাষার সর্বপ্রাচীন নিদর্শন হিসেবে চর্যাপদের ভাষাগত মূল্য অপরিসীম। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর আবিষ্কৃত চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়, কাহ্নপাদ ও সরোজবজ্রের দোহাকোষ ও ডাকার্ণব পুথির সব-কটির ভাষাই প্রাচীন বাংলা মনে করেছিলেন। পরে অবশ্য ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ফলে প্রমাণিত হয়েছে যে, শুধু প্রথমোক্ত পুথিটির ভাষাই বাংলা, অন্যগুলি লেখা হয়েছিল অপভ্রংশ ভাষায়।
চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা: প্রমাণ
[সম্পাদনা]চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বা মধ্য ভারতীয় কোনও আর্য ভাষা নয়; বরং ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে প্রচলিত অপভ্রংশ ভাষা থেকে উদ্ভূত একটি নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা। তাই পূর্ব ভারতে প্রচলিত অসমীয়া, ওড়িয়া, মৈথিলী ও হিন্দি ভাষার পণ্ডিতেরাও এটিকে নিজের নিজের ভাষার আদি রূপ বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানী ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রথম ভাষাবিজ্ঞানের বিচারে চর্যাপদকে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন বলে প্রমাণ করেন।
চর্যাপদের ভাষা যে প্রাচীন বাংলা তার সপক্ষে কয়েকটি ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ তুলে ধরা যেতে পারে:
- শব্দরূপে বাংলা ভাষার বিশিষ্ট বিভক্তির ব্যবহার। যেমন:
- তৃতীয়াতে তেঁ (তে) [সুখ দুখেতেঁ নিচিত মরিআই — পদসংখ্যা ১];
- চতুর্থীতে রে (রঁ) [সো করউ রসরসাণেরে কংখা — পদসংখ্যা ২২];
- ষষ্ঠীতে এর (র) [করণ পাটের আস — পদসংখ্যা ১; হরিণা হরিণীর নিলয় না জানী — পদসংখ্যা ৬];
- সপ্তমীতে ত, এ ইত্যাদি [সাঙ্কমত চড়িলে — পদসংখ্যা ৫; দুহিল দুধ কি বেণ্টে ষামায় — পদসংখ্যা ৩৩]।
- মাঝেঁ, অন্তরে, দিআঁ, সাঙ্গে ইত্যাদি অনুসর্গের ব্যবহার। যেমন:
- কোড়ি মাঝেঁ একু — পদসংখ্যা ২;
- তোহার অন্তরে — পদসংখ্যা ১০;
- চারিবাসে গড়িলরে দিআঁ চঞ্চালী — পদসংখ্যা ৫০;
- দুজ্জন সাঙ্গে অবসরি জাই — পদসংখ্যা ৩২।
- ধাতুরূপে বাংলা ভাষার বিশিষ্ট বিভক্তির ব্যবহার। যেমন:
- ভবিষ্যৎকালে ‘ইব’ [জই তুম্হে লোঅ হে হোইব পারগামী — পদসংখ্যা ৫; কাহ্নু কহি গই করিব নিবাস – পদ সংখ্যা ৭]
- অতীতকালে ‘ইল’ [কানেট চৌরি নিল অধরাতি — পদসংখ্যা ২; সসুরা নিদ গেল — পদসংখ্যা ২]
- অসমাপিকায় ‘ইআ’, ‘ইলে’ [মাঅ মারিআ কাহ্ন ভইঅ কবালী — পদসংখ্যা ১১; সাঙ্কমত চড়িলে--পদসংখ্যা ৫]
- থাকা অর্থে (substantive) 'আছ্' ও 'থাক্' ধাতুর ব্যবহার। যেমন:
- জইসনে অছিলেস তইসন অচ্ছ (যেমন ছিলে তেমনি থাকো) — পদসংখ্যা ৩৭;
- গুরুবঅণ বিহারে রে থাকিব তই ঘুণ্ড কইসে — পদসংখ্যা ৩৯।
- বিভিন্ন বাগ্-বিধির ব্যবহার। যেমন:
- যুক্ত ক্রিয়াপদের ব্যবহার [কহন ন জাই — পদসংখ্যা ২০; পার করেই—পদসংখ্যা ১৪; আহার কএলা — পদসংখ্যা; নিদ গেলা — পদসংখ্যা ২ ইত্যাদি];
- প্রবচন-জাতীয় শব্দসমষ্টির ব্যবহার [অপণা মাংসে হরিণা বৈরি — পদসংখ্যা ৬; হাথেরে কাঙ্কাণ মা লেউ দাপণ — পদসংখ্যা ৩২; বরসুণ গোহালী কিমো দুঠ বলন্দেঁ — পদসংখ্যা ৩৯; হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী — পদসংখ্যা ৩৩]।
চর্যাপদের উপর অন্যান্য ভাষার দাবির যৌক্তিকতা বিচার
[সম্পাদনা]চর্যাপদ প্রকাশিত হওয়ার পর এর ভাষা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। বিজয়চন্দ্র মজুমদার মনে করেন, চর্যাপদের ভাষায় বাংলা, ওড়িয়া ও মৈথিলী ভাষার প্রভাব থাকলেও তা মূলত হিন্দি ভাষা। রাহুল সাংকৃত্যায়নও এই ধারণাই পোষণ করতেন। আবার কোনও কোনও গবেষক এই ভাষাকে ওড়িয়া, অসমীয়া ও মৈথিলী ভাষার প্রাচীনতম রূপ বলে দাবি করেন। অথচ চর্যাপদ যে বাংলা ভাষারই সুস্পষ্ট রূপ তা ভাষাবৈজ্ঞানিক বিচারে প্রমাণিত, এবার অন্যান্য ভাষার দাবিগুলির যৌক্তিকতা বিচার করা যাক।
চর্যাপদ ও অসমীয়া ভাষা
[সম্পাদনা]চর্যাগীতির ভাষাকে অসমীয়া ভাষার আদি রূপ বলেও দাবি করা হয়। অসমীয়া পণ্ডিতেরা অসমীয়াকে পৃথক ভাষা বলে গণ্য করলেও, ভাষাতত্ত্বের বিচারে খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতক পর্যন্ত এই ভাষা বাংলা ভাষার সঙ্গে এক হয়েই ছিল। তারপর দুই শাখা পৃথক হয়ে যায়। যদিও প্রাচীনকাল থেকেই কামরূপে একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। মাতৃতান্ত্রিকতা, শাক্তাচার ও স্ত্রীজাতির প্রাধান্য ছিল এই সংস্কৃতির বিশেষত্ব। ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকা ধরে এই অঞ্চলে ভোট-চীনীয় ও তিব্বতী-বর্মী গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করেছে। তার ফলে এখানকার ভাষাতেও অনেকটা স্বাতন্ত্র্য এসে গিয়েছিল। এখনও অসমে গারো, নাগা, ভুটিয়া, খাসিয়া প্রভৃতি উপজাতি বাস করে। অহোম জাতিগোষ্ঠীর আধিপত্যের ফলে কামরূপের নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘অসম’ নাম প্রচলিত হয়েছে এবং অসমীয়া ভাষাও পৃথক লক্ষণে চিহ্নিত হয়েছে। তবু পূর্ববঙ্গের সঙ্গে অসমের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়নি। পূর্ববঙ্গের কবি নারায়ণদেবের পদ্মাপুরাণ এখনও অসমে সুকনানী পদ্মাবতী নামে পরিচিত। পূর্ববঙ্গের ভাষার সঙ্গেও অসমের ভাষার অনেক মিল। ভাষাগত এই মিলের সূত্রেই চর্যাগীতির উপর অসমীয়াদের দাবি। ‘-র’ প্রত্যয় দ্বারা ষষ্ঠী বিভক্তির, ‘-ত’ প্রত্যয় দ্বারা সপ্তমী বিভক্তির এবং ‘-ইল’ ও ‘-ইব’ প্রত্যয় দ্বারা যথাক্রমে অতীত ও ভবিষ্যৎকালের ক্রিয়াগঠনে অসমীয়া ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার মিল আছে। চর্যার ভাষাতেও এই লক্ষণ আছে (হরিণা হরিণীর নিলঅ ণ জানী — পদসংখ্যা ৬; বাটত মিলিল মহাসুখ গঙ্গা — পদসংখ্যা ৮)। কিন্তু ‘-র’ বা ‘-ত’ বিভক্তি যোগের ফলে বাংলা শব্দে যে রূপান্তর ঘটে, অসমীয়ায় তা ঘটে না। স্বরান্ত শব্দে বাংলার প্রবণতা ‘-এর’ বিভক্তির দিকে; এমনকি ই- বা ঈ-কারান্ত শব্দে ষষ্ঠী বিভক্তির শেষে পদগঠনেও ‘-এর’ দিকেই ঝোঁক থাকে। চর্যাগীতিতে সেই লক্ষণ বিদ্যমান (রুখের তেন্তুলি — পদসংখ্যা ২; ডোম্বীএর সঙ্গে — পদসংখ্যা ১৯ প্রভৃতি)। অসমীয়া ভাষায় ‘-এর’ বিভক্তির এমন প্রয়োগ পাওয়া যায় না। ভবিষ্যতের ‘-ইব’ প্রত্যয়ের ব্যাপারে অসমীয়া ভাষায় উত্তম পুরুষে ‘-ইম’ হয়ে যায় ‘-ম’। চর্যাতেও এইরকম দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় (মারমি ডোম্বী লেমি পরাণ — পদসংখ্যা ১০)। কিন্তু ভবিষ্যৎ বোঝাতে উত্তম পুরুষে ‘-মি’, ‘-মু’ প্রত্যয়ের ব্যবহার পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় অঞ্চলের ভাষাতেও দেখা যায়। যেমন: “এক এক করি মুই দিমু নিজ প্রাণ। জগতে দোসর নাম না লইমু আন।।” (দৌলত কাজী) কিংবা “শুনিয়া অদ্বৈত হয় ক্রোধ অবতার। সংহারিমু সব বলি করয়ে হুঙ্কার।।” (বৃন্দাবনদাস) অসমীয়া ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গিয়ে দেবেন্দ্রনাথ বেজবরুয়া বলেন, ‘ন’ অক্ষরটি অসমীয়া ভাষাতে ক্রিয়াপদের পূর্বে ব্যবহৃত হয়, বাংলা পরে বসে। চর্যাগীতিতেও ‘ন’-এর ব্যবহার ক্রিয়াপদের পূর্বেই হয়েছে অনেক জায়গায় (ন জীবমি — পদসংখ্যা ৪, ণ জাণী — পদসংখ্যা ৬, ন বুঝসি — পদসংখ্যা ১৫)। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বাংলা গদ্যেই শুধু ক্রিয়ার পরে ‘না’ বসে। কবিতায় তা অনেক ক্ষেত্রেই বিপরীত, এবং চর্যাগীতিও আসলে কবিতা। কাজেই চর্যাগীতিতে যেখানে ক্রিয়ার আগে ‘ন’ বসেছে সেখানে তা সর্বত্র অসমীয়া তা বলা যায় না। তাছাড়া বাংলা গদ্যেও ‘না’ সবসময়ই অসমাপিকা ক্রিয়ার পূর্বে (যেমন: “না গিয়ে কি করবে?”) এবং সম্ভাবনাসূচক বাক্যে পূর্বকালীন ক্রিয়াপদের পূর্বে (যেমন: “যদি সে না যায়, তবে তুমি যেও।”) বসে। তাছাড়া ‘-বিলাক’ পরসর্গ যোগে বহুবচনের পদ গঠন অসমীয়া ভাষার একটি বৈশিষ্ট্য; যা চর্যাপদে একেবারেই নেই। মহাপ্রাণ বর্ণের যে দুর্বল উচ্চারণ অর্থাৎ খ-ঘ স্থলে ক-গ, ছ-ঝ ছলে চ-জ অসমীয়া ভাষায় লক্ষ্য করা যায় (“জলচর স্থলচর জাকে জাকে পক্ষী” — মাধবকন্দলী, বন্দুলী<বন্ধুলী, চকু<চক্ষু), চর্যার ভাষায় তাও একেবারেই নেই। কাজেই দু-একটি বিষয়ে চর্যাপদের ভাষার সঙ্গে অসমীয়া ভাষার মিল থাকলেও, সামগ্রিকভাবে এটি বাংলা ভাষারই লক্ষণে লক্ষণান্বিত।
চর্যাপদ ও ওড়িয়া ভাষা
[সম্পাদনা]ওড়িয়া ভাষার প্রধান বিশেষত্ব মূর্ধন্য ধ্বনির বিশুদ্ধ উচ্চারণ। এই ভাষায় ‘ণ’-এর উচ্চারণ ‘ড়ঁ’-এর মতো। এই কারণেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কুক্কুরীপাদ রচিত দ্বিতীয় পদটিতে ‘গাইড়’, ‘সমাইড়’ শব্দগুলি লক্ষ্য করে এটিকে ওড়িয়া পদ বলেছেন। কিন্তু ড. সুকুমার সেন প্রমাণ করেছেন যে, এ দুটির বিশুদ্ধ পাঠ হবে যথাক্রমে ‘গাইউ’ ও ‘সমাইউ’। কাজেই ধ্বনিবিচারের দিক থেকে ওড়িয়ার দাবি টেকে না। শব্দগঠনের দিক থেকে ‘-র’ বিভক্তি দিয়ে ষষ্ঠীর পদগঠন এবং ‘-ইল’, ‘-ইব’ প্রত্যয় দ্বারা যথাক্রমে অতীত ও ভবিষ্যতের ক্রিয়াগঠন ওড়িয়া ও বাংলা ভাষার সাধারণ বিশেষত্ব। কিন্তু অ-কারান্ত শব্দে বাংলায় ‘-র’ হয়ে যায় ‘-এর’। চর্যায় তার প্রচুর দৃষ্টান্তে আছে। ওড়িয়া ভাষায় ‘-র’ পরিবর্তিত হয় না; যেমন “শ্রাবণ মাসর কৃষ্ণা চৌথি”—এখানে অ-কারান্ত পদের পর ‘-র’ পরিবর্তিত হয়ে ‘-এর’ হয়নি। ওড়িয়া ভাষা বহুল পরিমাণে সংস্কৃতের অনুগামী, ফলে বর্তমানের ক্রিয়াপদের ‘-অন্তি’ বিভক্তির চিহ্ন ওড়িয়া ভাষায় সুরক্ষিত। যেমন: “সুলক্ষণে বরকন্যা করুছন্তি ভাব। শোভা পাইছন্তি দুঁহে রতি কামদেব।” চর্যাপদে ক্রিয়ার এই রূপটি খুব কমই পাওয়া যায় (নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী — পদসংখ্যা ১৭; ভণন্তি মহিণ্ডা — পদসংখ্যা ১৬)। ‘-রু’ চিহ্ন দিয়ে অপাদানের পদগঠন, ‘-মানে’ পরসর্গ যোগে বহুবচনের পদগঠন বাংলা ভাষায় নেই, চর্যাপদেও নেই। অথচ তা ওড়িয়া ভাষার বিশেষ লক্ষণ। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ধ্বনিবিজ্ঞানের দিক থেকে মাগধী অপভ্রংশ-সম্ভূত ভাষাগুলির মধ্যে ওড়িয়া সবচেয়ে বেশি রক্ষণশীল ও বাংলা সবচেয়ে প্রগতিশীল। চর্যাপদের ভাষাও ধ্বনিবিজ্ঞানের দিক থেকে যেভাবে সংস্কৃতের নিয়ম থেকে আত্মরক্ষা করেছে, তা একান্তই বাংলা ভাষার লক্ষণ।
চর্যাপদ এবং মৈথিলী ও হিন্দি ভাষা
[সম্পাদনা]চর্যাগীতির ভাষা মৈথিলী বলেও অনেকে দাবি করে থাকেন। পূর্বী হিন্দির সঙ্গে মৈথিলী ভাষার মিলের সাপেক্ষে মৈথিলী ও হিন্দির দাবি একসঙ্গে আলোচনা করা হল। বিশেষত সর্বনাম পদগুলির রূপে এবং ক্রিয়াপদের স্ত্রীলিঙ্গীকরণে পূর্বী হিন্দির সঙ্গে মৈথিলী ভাষার সাদৃশ্য দেখা যায়। তাছাড়া ‘-অল’, ‘-অব’ প্রত্যয় দিয়ে যথাক্রমে অতীত ও ভবিষ্যৎকালের ক্রিয়াগঠনের মিলও দেখা যায়। চর্যাগীতির ভাষায় ‘জো’, ‘সো’, ‘তো’, ‘মই’ প্রভৃতি সর্বনাম; ‘অইছন’, ‘জইসন’, ‘ঐছে’, ‘তৈছে’ প্রভৃতি সর্বনামীয় ক্রিয়া-বিশেষণ; ক্রিয়ার স্ত্রীলিঙ্গীকরণ (ভরিতী করুণা নাবী — পদসংখ্যা ৮, রাতি পোহাইলী — পদসংখ্যা ২৮) প্রভৃতির প্রয়োগ দেখা যায়। মৈথিলী ভাষায় আছে “কুলস্ত্রী সলজ্জ ভেলী”, “কইছনি নায়িকা” (বর্ণরত্নাকর)। মৈথিলী ভাষায় নিত্য বর্তমানের প্রথম পুরুষের ক্রিয়ায় ‘করই’, ‘ধরই’ এবং সম্ভ্রমে প্রথম পুরুষে ‘অছথি’, ‘হোথি’ রূপগুলি পাওয়া যায়। চর্যাগীতিতেও অনুরূপ প্রয়োগ আছে (ভণই লুই — পদসংখ্যা ১, চাটিল গঢ়ই — পদসংখ্যা ৫, ভণথি কুক্কুরীপা — পদসংখ্যা ২০)। তবু চর্যাগীতির ভাষাকে কয়েকটি কারণে সামগ্রিকভাবে মৈথিলী বা হিন্দি বলা চলে না। ‘-ক’, ‘-কো’ বিভক্তি যোগে ষষ্ঠীর পদগঠন এবং ‘-অল’, ‘-অব’ যোগে যথাক্রমে অতীতঙ্গো ভবিষ্যতের ক্রিয়াগঠন চর্যাপদের ভাষায় নেই; অথচ তা মৈথিলী ও হিন্দি উভয়েরই বিশেষ লক্ষণ। চর্যাপদের ভাষায় শৌরসেনী অপভ্রংশ ভাষার যে প্রভাব দেখা যায়, তার কারণ চর্যাপদের রচনাকালে এই ভাষা ছিল সমগ্র উত্তর ভারতের সাহিত্যিক ভাষা। সেই সূত্রের প্রাচীন বাংলা ভাষায় তার চিহ্ন থাকা খুবই স্বাভাবিক।
চর্যাপদ ও শৌরসেনী অপভ্রংশ ভাষা
[সম্পাদনা]চর্যাপদের ভাষা নিঃসন্দেহে বাংলা হওয়া সত্ত্বেও এই ভাষায় শৌরসেনী অপভ্রংশ ভাষার যে কয়েকটি নিদর্শন নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছিল, সেগুলির উল্লেখও করা প্রয়োজন:
- কয়েকটি নিষ্ঠান্ত অতীতকালের (past participle) রূপ: ‘কিউ’, ‘বিআপিউ’, ‘গউ’, ‘অহারিউ’, ‘বিকসিউ’, ‘থাকিউ’, ‘বহিউ’ (অর্থাৎ ‘ক্ত’ প্রত্যয়ান্ত ‘কিঅ’, ‘বিআপিঅ’, ‘গঅ’ ইত্যাদি রূপ না হয়ে ‘ইউ’ বা ‘উ’ প্রত্যয়ান্ত রূপ হয়েছে);
- সর্বনাম: ‘জো’, ‘সো’, ‘জইস’, ‘তইস’, ‘জসু’, ‘তসু’ (অর্থাৎ প্রাচীন বাংলায় যে, কে, যা (হ), তা (হ) ইত্যাদি);
- সর্বনামীয় ক্রিয়া বিশেষণ ‘জিম’, ‘তিম’;
- সর্বনামীয় বিশেষণ ‘জৈসন’, ‘তৈসন’, ‘জৈসো’ ইত্যাদি।
সংখ্যায় খুব কম হলেও ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে এগুলিই চর্যাপদে প্রাপ্ত শৌরসেনী অপভ্রংশ ভাষার উদাহরণ। তবে এগুলির মধ্যে কয়েকটির প্রকৃত ভাষা-পরিচয় নিয়ে দ্বিমত আছে। যেমন, ‘জৈসনেঁ’, ‘তৈসনে’ ইত্যাদি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যেও আছে বলে এগুলিকে শৌরসেনী অপভ্রংশ ভাষা থেকে আগত শব্দের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য উদাহরণগুলিকেও খাঁটি শৌরসেনী অপভ্রংশ না বলে তার বিকৃতি শৌরসেনী অবহট্ঠ ভাষার রূপ বলা হয়। এছাড়া ‘ভণথি’ ও ‘বোলথি’-র মতো কয়েকটি শব্দ মৈথিলী ভাষা থেকে আগত বলে মনে করা হয়। এগুলি যদি ‘ভণন্তি’ ও ‘বোলন্তি’ থেকে উৎসারিত না হয়, তাহলে তা নিতান্তই লিপিকরের প্রমাদ; কারণ, চর্যাপদের অনুলিপি হয়েছিল নেপালে এবং সেখানে মৈথিলী ভাষার ব্যবহার ও চর্চা ছিল। সুতরাং এ-হেন দু-একটি মিশ্রণ হওয়া খুবই স্বাভাবিক।
প্রাচীন বাংলার ভৌগোলিক সীমা, বিভিন্ন অপভ্রংশ ভাষার পারস্পরিক সাদৃশ্য, শৌরসেনী অপভ্রংশ ভাষার আভিজাত্য ও বহুল প্রচার, নেপালে চর্যাপদের অনুলিখন ইত্যাদি নানা কারণে এর ভাষায় অন্যান্য অপভ্রংশ ভাষার কিছু প্রভাব থাকলেও তা যে বাংলা নয়, তা স্বীকার করা যায় না। আবার এমন কথাও বলা যায় না যে, এই ভাষা ব্রজবুলির মতো এক বিশ্র ও কৃত্রিম সাহিতিক ভাষা। কারণ অপর ভাষার সামান্য কিছু শব্দ এতে বিদ্যমান থাকলেও এই ভাষায় এমন কিছুই নেই যাকে বাংলা ব্যাকরণ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না।
চর্যাপদের ভাষা বাংলার প্রাচীনতম রূপ বলেই এর মধ্যে অপভ্রংশ (মাগধী বা অর্ধমাগধী বা শৌরসেনী) অথবা অপভ্রংশসন্ধির কিছু নিদর্শন রয়ে গিয়েছে। এর কারণ হিসেবে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, চর্যাপদের মাধ্যমেই সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে মাগধী অপভ্রংশ থেকে উদ্ভূত বাংলা ভাষার যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু বাংলা ভাষা তখনও সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। সেই-জন্য সাহিত্যিক বাংলার রূপ কী হবে সে-বিষয়ে পদকর্তারা নিশ্চিত ছিলেন না আর তাই ভাষার আদর্শ হিসেবে তাঁরা সে-যুগে সাহিত্য-জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত তথা অভিজাত সমাজে সুপ্রচলিত নিকটতম প্রতিবেশী শৌরসেনী অপভ্রংশ ভাষাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। পদকর্তারা সেই ভাষা জানতেন; আর লিপিকরেরা তো প্রাচীন বাংলা অপেক্ষা শৌরসেনী প্রাকৃতই বেশি জানতেন। তাই কিছুটা পদকর্তাদের শৌরসেনী প্রাকৃত-জ্ঞানের কারণে আর কিছুটা লিপিকরদের ভুলের জন্যও চর্যাগীতির বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি শৌরসেনী প্রাকৃতের নিদর্শন থেকে যাওয়া অসম্ভব নয়।
ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত মনে করেন, চর্যাগীতির বিষয় আধুনিক বাঙালি-অধ্যুষিত ভূখণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কারণ সে-যুগে বৃহত্তর বাংলার ভৌগোলিক সীমা ছিল আরও বিস্তৃত। তাই বর্তমান বাংলার প্রতিবেশী অঞ্চলে প্রচলিত ভাষার কয়েকটি শব্দের আদিরূপও চর্যাগীতির মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। এই-ধরনের কয়েকটি অকিঞ্চিৎকর নিদর্শনের ভিত্তিতে কয়েকজন গবেষক চর্যাগীতিগুলিকে প্রাচীন ওড়িয়া বা প্রাচীন বিহারী ভাষাসমূহের নিদর্শন বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ভাষাবিজ্ঞানের বিচারে তাঁদের সকলের দাবিই খারিজ হয়ে যায়।
চর্যাপদের ভাষার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]- প্রাকৃতের সমীভূত যুক্তব্যঞ্জন সরল হয়েছে এবং পূর্ববর্তী হ্রসস্বর দীর্ঘ হয়েছে। পূর্বস্বরের দীর্ঘতা অবশ্য মাঝে মাঝে লেখায় প্রকাশ করা হয়নি। যেমন: মঝেঁ = মাঝেঁ>মঝ্ঝেন>মধ্যেন। এগুলি লিপিকরের ভুলও হতে পারে। যুক্তব্যঞ্জনে প্রথমটি নাসিক্য থাকলে পূর্ববর্তী স্বরটি সানুনাসিক হয়েছে। এখানেও লেখায় মাঝে মাঝে নাসিক্যধ্বনি বজায় আছে। যেমন: মন্তে, তন্তে, তান্তী ইত্যাদি।
- পদান্তের স্বরধ্বনি উচ্চারিত হত, তবে অনেক সময় ‘-ইঅ’ (‘-ইআ) যুক্তস্বরটি ‘ই’ (‘ঈ’)-তে পরিণত হয়েছে। ভণতি>ভণই, জ্বলিত>জলিঅ; আবার পুস্তিকা>পোত্থিআ>পোথী; বুঝিঅ>বুঝি; ভবিত>ভইঅ>ভই। পদান্ত ই-কারের জায়গায় অনেক জায়গাতেই লিপিতে ‘অ’ বা ‘য়’ লেখা হত; যেমন, খাই = খাঅ, খায়; জাই = জাঅ, জায় ইত্যাদি।
- য়-শ্রুতি ও ব-শ্রুতির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। যেমন, নিকটে>নিয়ড্ডি (=নিঅড্ডি); আয়াতি>আবই (=আআই) ইত্যাদি।
- উচ্চারণে হ্রস্ব ও দীর্ঘ স্বর, তিন স-কার, দুই ন-কার এবং জ-কার ও য-কারের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য ছিল না, যেমন এখনও নেই। লিপিতে একটি জায়গায় অপরটির ব্যবহার দেখেই তা অনুমান করা হয়।
রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]- চর্যাগীতিতে ক্লীবলিঙ্গ নেই। তবে স্ত্রীলিঙ্গ ও পুংলিঙ্গের ব্যবহারে আধুনিক বাংলা ভাষার চেয়ে কড়াকড়ি অনেক বেশি।
- কর্তা স্ত্রীলিঙ্গ হলে অতীতকালের ক্রিয়া প্রায়ই স্ত্রীলিঙ্গ হত; যেমন, লাগেলি আগি।
- সম্বন্ধপদ বিশেষণ রূপে ব্যবহৃত হত এবং প্রয়োজন অনুসারে স্ত্রীলিঙ্গ হত; যেমন, কাহেরি শঙ্কা, হাড়েরি মালী।
- স্ত্রীলিঙ্গের সাধারণ বিশেষণও স্ত্রীলিঙ্গই হত; যেমন, নিশি অন্ধারী ইত্যাদি।
- শব্দরূপের ক্ষেত্রে একমাত্র ষষ্ঠী বিভক্তি ছাড়া স্ত্রীলিঙ্গ-পুংলিঙ্গে বিশেষ কোনও পার্থক্য ছিল না।
- দ্বিবচনের ব্যবহার নেই। একবচন ও বহুবচনে শব্দরূপে কোনও পার্থক্য নেই। বহুত্ব বোঝাতে সকল, সব, জন ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার হত; যেমন, সকল সমাহিঅ, বিদুজন লোঅ ইত্যাদি।
- বিভিন্ন কারকের জন্য বিভিন্ন কারক-বিভক্তি ব্যবহৃত হত। যেমন:
- তৃতীয়ায় এন>এঁ অথবা অন্ত>ত-এর সঙ্গে যুক্ত এঁ=তেঁ, তে, এতে ইত্যাদি;
- কৃত শব্দজাত ‘ক’ এবং তার সঙ্গে ‘এ’ যোগ করে দ্বিতীয়া-চতুর্থীর বিভক্তি গঠিত হত। কখনও রেঁ, রে; কখনও বা শুধু এ, আবার কখনও বিনা বিভক্তিতেই দ্বিতীয়া-চতুর্থীর পদ গঠিত হত।
- পঞ্চমীতে অনেক সময় সপ্তমীর বিভক্তি ব্যবহৃত হত। যেমন, জামে কাম কি কামে জাম।
- ষষ্ঠীতে কার্য, কর শব্দ থেকে উদ্ভূত ‘এর’, ‘অর’, ‘র’ বিভক্তি ব্যবহৃত হত।
- সপ্তমীতে ই<এ, -এ<অকে, হি<*ধি, ত<অন্ত এই বিভক্তিগুলির ব্যবহার ছিল। সপ্তমীতে বিভক্তি তৃতীয়ার সঙ্গে একাকার হয়ে সানুনাসিক রূপ নিত (এঁ, তেঁ ইত্যাদি)। সপ্তমীর বিভক্তিগুলির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি ছিল; কর্তৃকারক ছাড়া অন্যান্য বিভিন্ন কারকেও তা ব্যবহৃত হত।
- সর্বনামের রূপেও সাধারণত বিশেষ্যের বিভক্তিগুলির ব্যবহৃত হত। আহ্মে ও তুহ্মে বহুবচনে জাত হওয়া সত্ত্বেও একবচনেও ব্যবহৃত হত। মো (মম শব্দজাত) এবং মই ও তই (*ময়েন ও *ত্বয়েন অর্থাৎ ময়া ও ত্বয়া শব্দজাত) কর্তৃকারকেও ব্যবহৃত হত।
- বিভিন্ন কারক-বিভক্তি ছাড়াও বিনা, অন্তরে, মাঝ, দিয়া, (দিআ) ইত্যাদি অনুসর্গেরও ব্যবহার ছিল।
- পুরুষ অনুসারে ক্রিয়াপদের পার্থক্য ছিল।
- বর্তমান কালের জন্য উত্তম পুরুষে মি এবং অহম্ শব্দজাত হুঁ শব্দ যোগ করা হত; মধ্যম পুরুষে সি অথবা অনুজ্ঞায় -হ, -হু, -তু ইত্যাদি যোগ করা হত; প্রথম পুরুষে ক্রিয়াবিভক্তি ছিল -ই<তি এবং গৌরবে বহুবচনে হলে -ন্তি<-অন্তি।
- ভবিষ্যৎ কালের উত্তম পুরুষে তব্য শব্দজাত -ইব, মধ্যম পুরুষে -স্যসি শব্দজাত -হসি (মারিহসি, হোহিসি) এবং প্রথম পুরুষে -স্যতি শব্দজাত -হই>-হ যুক্ত হত।
- শুধু ‘ক্ত’ প্রত্যয়ান্ত করে অথবা তার সঙ্গে -ইল যোগ করেও অতীত কালের রূপ দেওয়া হত।
- অসমাপিকার ব্যবহার ছিল তিন প্রকার:
- ই, ইঅ বা ইআ যুক্ত করে: করি, পুচ্ছি, চড়ি, লইআ, ধরিঅ, মারিআ ইত্যাদি;
- ইলে যুক্ত করে: চঢ়িলে, ভইলে, বুঝিলে;
- অন্তে যুক্ত করে: পড়ন্তে, চাহন্তে ইত্যাদি।
বাক্যতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]- বাক্যের গঠন ও বাগ্বিধিগুলির ব্যবহারে আধুনিক বাংলার ধারা যে চর্যাপদের রূপ থেকেই আগত তা সহজেই অনুমান করা যায়। প্রাচীন কর্ম-ভাববাচ্যের প্রয়োগ ইত্যাদি কয়েকটি ক্ষেত্র বাদ দিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা ঘটেছে। অবশ্য চর্যাগীতিগুলি কবিতা; সুতরাং তা থেকে বাক্যরীতি স্পষ্টভাবে ধরা যায় না। কিন্তু যেটুকু অনুমান করা যায়, তাতেই দেখা যায় বাক্যগঠনের ভঙ্গিটি বাংলারই। যেমন: হরিণা হরিণীর নিলয় না জানী = হরিণ হরিণীর নিলয় না জানে ইত্যাদি।
সন্ধ্যাভাষা
[সম্পাদনা]চর্যাগীতির পদকর্তারা চর্যাপদের ভাষাকে বলেছেন ‘সন্ধ্যাভাষা’। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই সন্ধ্যাভাষার অর্থ করেছেন, “সন্ধ্যাভাষার মানে আলো আঁধারির ভাষা, কতক আলো কতক অন্ধকার; খানিক বুঝা যায়, খানিক বুঝা যায় না অর্থাৎ এই সকল উঁচু অঙ্গের ধর্ম কথার ভিতরে একটা অন্য ভাবের কথাও আছে। সেটা খুলিয়া ব্যাখ্যা করিবার নয়।” (মুখবন্ধ, হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সম্পাদিত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা, ১৩২৩ বঙ্গাব্দ, পৃ. 8) তন্ত্রশাস্ত্রের ভাষা এইরকম অস্পষ্ট; কারণ, তন্ত্রে উল্লিখিত ধর্ম কেবল দীক্ষিত ব্যক্তির জন্য, সাধারণের জন্য নয়। সাধারণের থেকে গোপন করার জন্যই ভাষার এই অস্পষ্টতা, আপাত অর্থের আড়ালে অন্য অর্থ।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ‘সন্ধ্যা’ শব্দের অর্থ ‘আলো আঁধারি’ অর্থাৎ দিন-রাতের সন্ধিক্ষণ মনে করলেও বিধুশেখর শাস্ত্রী মনে করেন যে, ‘সন্ধ্যা’ অর্থে (আভিপ্রায়িক বচন, নেয়ার্থ বচন)—অভীষ্ট অর্থ। অর্থাৎ এর অভীষ্ট অর্থ শুধু মর্মজ্ঞের কাছেই প্রকাশ্য অন্যের কাছে নয়। সম—✓ধা + ঙ—এইভাবে ব্যুৎপত্তি নির্ণয় করে তিনি অভিপ্রেত বা অভীষ্ট অর্থ বোঝাতে সন্ধ্যার পরিবর্তে ‘সন্ধা’ শব্দটি ব্যবহারের পক্ষপাতী হন। লক্ষণীয় এই যে, তান্ত্রিক পুথিগুলিতে সর্বত্রই ‘সন্ধ্যা’ বানানই ব্যবহৃত হয়েছে, ‘সন্ধা’ নয়। অভীষ্ট শব্দটির মধ্যেও “আপাত লক্ষ্য নয়” এমন একটা ইঙ্গিত আছে; তা থেকেই অস্পষ্টতার ভাবটি এসেছে এবং তার প্রভাবে অর্থ-সাদৃশ্যে বানানটিও সন্ধা থেকে সন্ধ্যাতে পরিণত হয়েছে, এও অসম্ভব নয়। আবার “সম্যক ধ্যায়তে অস্যাম ইতি সন্ধ্যা”; অর্থাৎ, যে অর্থ অনুধ্যান করে বুঝতে হয় তাই সন্ধ্যা অর্থ—এমনও হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
চর্যাগীতির ভাষার এই অস্পষ্টতা শুধু চর্যাগীতিরই বৈশিষ্ট্য নয়। মধ্যযুগীয় সাধক-কবিদের গানেও এই হেঁয়ালির ভাব আছে। উত্তর ভারতের কবীর, দাদু থেকে শুরু করে বাংলার বৈষ্ণব, বাউল, নাথপন্থী সকলের গানের ভাষাই কম-বেশি একই রকম উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও হেঁয়ালিতে ভরা।
গ্রন্থপঞ্জি
[সম্পাদনা]- চর্যাগীতি পরিচয়, সত্যব্রত দে, জিজ্ঞাসা, কলকাতা (১৯৬০),
- চর্যাগীতির ভূমিকা, জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী, ডি. এম. লাইব্রেরী, কলকাতা, (১৩৬২ বঙ্গাব্দ)
- হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সম্পাদিত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা (১৩২৩ বঙ্গাব্দ)