চর্যাপদ/সাহিত্যমূল্য
সাহিত্যমূল্য নির্ধারণে অসুবিধা: ভাষার দুর্বোধ্যতা ও বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যাগম্যতা
[সম্পাদনা]বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন হিসেবে চর্যাপদের উল্লেখ সর্বদাই করা হয়, কিন্তু এই গানগুলির সাহিতিক মূল্য কতখানি তার নির্ভুল বিচার এখন আর সম্ভব নয়। কারণ যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যের ভাবে ও ভাষায় পরিবর্তন আসে, এবং অনেক সময়েই তা কোনও কোনও সাহিত্যকৃতির সাহিত্যিক মূল্য নিরূপণে বাধাস্বরূপ হয়ে পড়ে। চর্যাগীতিগুলির ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।
হাজার বছর আগে যে ভাষা সদ্য অপভ্রংশের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এক সম্পূর্ণ নতুন ভাষার অঙ্কুর রূপে দেখা দিয়েছিল, তা আধুনিক কালের বাঙালিদের কাছেও এক ব্যাখ্যাগম্য ভাষা। ভাষার এই দুর্বোধ্যতার জন্যই এর রসাস্বাদনে ব্যাঘাত ঘটে। সাধারণ পাঠকের মনে আবেদন সৃষ্টির ক্ষমতা ও তাদের মনে রসবোধকে জাগিয়ে তুলে অনুভূতির অন্য এক জগতে পৌঁছে দেওয়াই সাহিত্যের কাজ। এইভাবে সহৃদয় হৃদয়বেদ্য হয়ে ওঠার জন্য কবির মন ও পাঠকের মনের সমতা প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ কবির মনে সৃষ্ট ভাববস্তুর সংস্কার পাঠকের মনে যদি না থাকে তবে সেই কাব্য পাঠকের মনে আবেদন সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়। এখানেই কাব্যবিশেষের কোনও এক বিশেষ যুগে খ্যাতির অধিকার থাকা সত্ত্বেও পরে সেই খ্যাতি নষ্ট হওয়ার কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। স্থায়ীভাবগুলি সম্পর্কে বক্তব্য যাই হোক না কেন, মানুষের মনের সঞ্চারীভাবগুলি সঞ্চরণশীল। যুগে যুগে তা পরিবর্তিত হয়।
মানুষের মনের স্থায়ী রসের বীজ ও সাহিত্যের স্থায়িত্বের কথা একেবারে অস্বীকার না করলেও এ-কথা মানতেই হয় যে, বিশ্বের কোনও সাহিত্যকৃতিই চিরকার সমানভাবে রস সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়। তার অন্যতম কারণ, কেবলমাত্র স্থায়ীভাবই রস সৃষ্টির কারণ নয়। যে বিভাব, অনুভাব, সঞ্চারী সহযোগে রসসৃষ্টি হয়ে থাকে, সেগুলির সম্পর্কে মানুষের ধারণা পালটায় এবং স্থায়ীভাব স্থায়ী হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য ভাবগুলির পরিবর্তনশীলতার জন্য রসোপলব্ধি সম্পূর্ণ ব্যাহত না হলেও ক্ষুণ্ণ হয়। তাই চর্যাগীতির রস তৎকালীন পাঠকবর্গের মনে যতখানি ছিল আজ আর কিছুতেই তা সম্যক উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তাছাড়া চর্যাগীতিগুলির ভাষা দুর্বোধ্য এবং এর বিষয়বস্তু বা তত্ত্ব ব্যাখ্যাসাধ্য, যা চর্যাপদের রসোপলব্ধির পথে বাধাস্বরূপ। কাব্য দুর্বোধ্য ও ব্যাখ্যাসাধ্য হলে তা সাধারণ পাঠকের থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য। চর্যাপদের তত্ত্বও অতীতে যাই হোক না কেন, আজ রীতিমতো ব্যাখ্যাসাধ্য। সুতরাং এদিক থেকেও সহজে রসোপলব্ধির সম্ভাবনা অনেক কম।
ধর্মীয় আবেদনের সর্বজনীনতা বিচার
[সম্পাদনা]চর্যাগীতিগুলির ঐতিহাসিক তথা দার্শনিক ও ভাষাতাত্ত্বিক মূল্য যতখানি, সাহিত্যমূল্য ততখানি না হলেও তা যে একেবারেই নেই তা বলা চলে না। চর্যাপদ আধ্যাত্মিক সাধনসংগীত হলেও এর সর্বজনীন সাহিত্যমূল্য কিছু কমেনি; কারণ, চর্যাকারদের আধ্যাত্মিকতা সাম্প্রদায়িক আচার-অনুষ্ঠান বর্ণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাই তা মানুষের হৃদয়ে একটি সাহিত্যিক আবেদন রাখতেও সক্ষম হয়েছে।
চর্যাপদের দর্শন ও সাধনপদ্ধতি গুহ্য তান্ত্রিক সাধনার অনুরূপ। বিষয়টি জটিল এবং সর্বতোপ্রকারে চর্যাকারেরাও তা গোপন রাখার চেষ্টা করেছেন। প্রাচীনতার জন্য দুর্বোধ্য এই ভাষাকে তত্ত্ব ও গুহ্যতা আরও দুরূহ করে তোলায় চর্যাগীতির রসাস্বাদনে ব্যাঘাত ঘটে থাকে। কিন্তু যেহেতু এই সাধককবিরা ছিলেন দরিদ্র জনসাধারণের প্রতিনিধি, সেই হেতু দুরূহতার চেষ্টা সত্ত্বেও উপমা-উৎপ্রেক্ষায় এই ভাষা কিছুটা হলেও সহজ হয়ে উঠেছে। তাছাড়া দার্শনিক ও ধর্মীয় স্বরূপে চর্যাগীতিগুলি সহজিয়া সাধনার অন্তর্গত। সাধনার ক্ষেত্রে এই সহজিয়া ভাব রীতিমতো সর্বজনীন। প্রকৃতপক্ষে সহজিয়া ভাব বাঙালির জন্মগত। সুতরাং বাঙালির একান্ত পরিচিত এই সাধনার ধারা বাঙালির মনকে স্বাভাবিকভাবেই চর্যাপদের প্রতি আকৃষ্ট করে। চর্যাকার যখন বলেন:
কুলেঁ কুল মা হোইরে মূঢ়া উজুবাট সংসারা।
বাল ভিণ একু বাকু ণ ভুলহ রাজপথ কন্ধারা।।
মাআ মোহ সমুদারে অন্ত ন বুঝসি থাহা।
আগে নাব ন ভেলা দীসই ভান্তি ন পুছসি নাহা।।
অর্থাৎ, রে মূঢ়, কূলে কূলে ঘুরিস না, সংসার সোজা পথ। মূর্খ, তিলেক বাঁকে ভুলিস না, রাজপথ কানাতে ঘেরা। মায়ামোহ-স্বরূপ সমুদ্রের অন্তও বুঝিস না, থইও পাস না। সামনে ভেলা দেখা যায় না, তবু ভুল করেও নাথকে (গুরু) জিজ্ঞাসা করিস না।—তখন সহজ বৈরাগ্যের সহজ আবেদন পাঠকের মনকে আপ্লুত করে। সেইরকম কবি যখন বলেন, “অনুভব সহ মা ভোলরে জোঈ”—তখন তার সহজ আবেদনে আধুনিক পাঠকের অন্তরও সাড়া দিয়ে ওঠে।
ব্যবহৃত রূপকল্পগুলির সাহিত্যমূল্য: চিত্রসৌন্দর্য, জীবনযাত্রার বাস্তব ছবি ও দুঃখবর্ণনা
[সম্পাদনা]আধ্যাত্মিকতা চর্যাগীতির উদ্দেশ্য হলেও এই গানগুলিতে এমন অনেক রূপকল্প ব্যবহৃত হয়েছে যার আবেদন পাঠকচিত্তের চিরকালীন রসের ভূমিতে। এইরকম কয়েকটি ছবিতে আমরা শিকার, নৌকা বাওয়া, শুঁড়িখানা ইত্যাদি তৎকালীন জীবনের কিছু বাস্তব পরিচয় পাই। যেমন, নদীপ্রবাহ ও নদী পাওয়ার হওয়ার এই বর্ণনা:
ভবনই গহণ গম্ভীর বেগেঁ বাহী।
দু আন্তে চিখিল মাঝে ন থাহী।।
ধামার্থে চাটিল সাঙ্কম গঢ়ই।
পারগামী লোঅ নিভর তরই।। ইত্যাদি
অথবা
গঙ্গা জউনা মাঝেঁ রে বহই নাঈ।
তহি বুড়িলী মাতঙ্গী পোইআ লীলেঁ পার লরেই।...
পাঞ্চ কেড়ুয়াল পড়ন্তে মাঙ্গে পিঠত কাচ্ছী বান্ধী।
গঅণ দুখোলেঁ সিঞ্চহু পাণী ন পইসই সান্ধি।। ইত্যাদি
কয়েকটি ছবিতে ভাষার ব্যবধান সত্ত্বে সর্বজনীন সাহিত্যমূল অস্বীকার করা যায় না। ছবিগুলি সৌন্দর্যের দিক থেকে যেমন উপভোগ্য, তেমনই এগুলির রসের আবেদনও অনবদ্য।
ণাণা তরুবর মৌলিল রে গঅণত লাগেলী ডালী।
একেলী সবরী এ বণ হিণ্ডই কর্ণ কুণ্ডল ব্রজধারী।।
তিঅ ধাউ খাট পড়িলা সবরো মহাসুখে সেজি ছাইলী।
সবরো ভুজঙ্গ ণৈরামণি দারী পেহ্ম রাতি পোহাইলী।
হিঅ তাঁবোলা মহাসুহে কাপুর খাই।
সুন নৈরামণি কণ্ঠে লইঅ মহাসুহে রাতি পোহাই।।
শবর-শবরীর মিলনের এই পরিপূর্ণ ছবি সত্যিই অনবদ্য। মিলনের পরিবেশ রচনা করেছে বনভূমিতে বসন্তের সমাগম—গাছে গাছে মুকুল ধরেছে, ডালপালা প্রসারিত হয়েছে আকাশে; এমন পরিবেশে মাথায় ময়ূরপুচ্ছ, গলায় গুঞ্জাফুলের মালা ও কানে কুণ্ডল কুণ্ডল পরে শবরী একাকিনী বনের মধ্যে বিচরণ করছে। শবর শয্যা রচনা করে প্রেমে অতিবাহিত করছে রাত্রি। এ ছবির আড়ালে আধ্যাত্মিক অর্থ যাই থাকুক না কেন, এর বাহ্য-সৌন্দর্য ও তার কাব্যরূপ পাঠককে মুগ্ধ করে।
আধ্যাত্মিক বিষয়বস্তু প্রকাশের জন্য যে-সব রূপকল্প ব্যবহৃত হয়েছে, সে-সব আমাদের জীবনের বহু-পরিচিত ছবি। আছে যুদ্ধযাত্রা ও বিবাহযাত্রার রূপকল্পও। এগুলি পরিপূর্ণ রস সৃষ্টি না করলেও পাঠকের হৃদয়ে যে রসাভাস দেয়, তা উচ্চমার্গের আবেদন সৃষ্টি করে। এইরকম কয়েকটি ছবিতে আছে শৃঙ্গারের আভাস:
জোইনি তঁই বিনু খনহিঁ ন জীবমি।
তো মুহ চুম্বি কমলরস পীবমি।।
অনুরূপ আরেকটি ছবিতে প্রেম নিবেদনের ভঙ্গিটিও বেশ সুন্দর:
নগর বাহিরে ডোম্বি তোহোরি কুড়িয়া
ছোই ছোই যাইসি ব্রাহ্মণ নাড়িয়া।।
আলো ডোম্বি তোএ সব করিব না সাঙ্গ
নিঘিণ কাহ্ন কাপালি জোই লাঙ্গ।।
এক সে পদমা চৌষঠ্ঠী পাখুড়ী।
তহিঁ চড়ি নাচঅ ডোম্বী বাপুড়ী।।
হালো ডোম্বী তো পুছমি সদভাবে
আইসসি জাসি ডোম্বী কাহরি নাবে।।...
তুলো ডোম্বী হাউঁ কপালী
তোহোর অন্তরে মোএ ঘলিলি হাড়েরি মালী।। (পদসংখ্যা ১০)
অন্তেবাসী এই ডোম্বী-যোগিনীর প্রেমলাভের জন্য কী গভীর আকাঙ্ক্ষা। তার জন্য ত্যাগস্বীকারও কম নয়, “ডোম্বী, তোমার জন্য আমি নটসজ্জা ছাড়লাম, তোমার জন্য আমি হাড়ের মালা পর্যন্ত গলায় পরলাম। এখনও কি তোমার সঙ্গে আমার ‘সাঙ্গা’ হবে না?” ডোম্বী সেই আবেদনে সাড়া দিয়েছিল কিনা তা গানটিতে অনুল্লিখিত, কিন্তু যে গভীর আবেগের সঙ্গে এই আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছে, তার আবেদন অনস্বীকার্য।
দুঃখের বর্ণনায় কাব্যের আবেদন সর্বাধিক। সব দেশের কবিরাই এ-কথা উপলব্ধি করেছেন। চর্যাগীতির কবিরাও এই তত্ত্ব অবগত ছিলেন। তাঁদের গানেও তাই পাওয়া যায় দুঃখের বিবিধ অভিপ্রকাশ। কয়েকটি ছবি দুঃখপূর্ণ দৈনন্দিন জীবনের যে আভাস পাওয়া যায়, তা পাঠকচিত্তকে আর্দ্র করে কাব্যের পর্যায়ে উন্নীত হয়। একটি ছবিতে আছে নির্দয় দস্যুর দ্বারা ঘরবাড়ি লুণ্ঠিত হওয়ার পর নিদারুণ অসহায় অবস্থার বিবরণ। আরেকটি ছবিতে দূরে টিলার উপর প্রতিবেশীহীন নির্জনে অবস্থিত একটি ঘর, যেখানে অন্নাভাব সত্ত্বেও অতিথির আনাগোনা লেগেই আছে; এদিকে সংসারও দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। হাজার বছরের পুরোনো এই ছবি, কিন্তু দুঃখানুভূতির তীব্রতায় এর আবেদন চিরকালীন।
দুঃখানুভূতির তীব্রতা আরও বেশি করে লক্ষ্য করা যায় প্রথম পুত্রবতী এক দুঃখিনী নারীর উক্তিতে:
হাউঁ নিরাসী খমন সাঈঁ
মোহোর বিগোআ কহণ ন জাই।।
ফিটলেসু গো মা এ অন্তউড়ি চাহি।
জা এথু চাহমি সো এথু নাহি।।
পহিল বিআণ মোর বাসপূড়া।
নাড়ি বিআরন্তে সেব বাপূড়া।।
নারীর দুঃখপ্রকাশের একমাত্র আশ্রয়স্থল মা। মাকে সম্বোধন করে এই দুঃখপূর্ণ উক্তি। এ দুঃখও নারীজীবনের চরমতম দুঃখ: নারীত্বের পূর্ণতা মাতৃত্বে। সেই মাতৃত্বই আজ দুঃখের আঘাতে ব্যর্থ হতে বসেছে। এর চেয়ে নৈরাশ্য আর কী আছে! দুঃখের কথা আর কাকেই বা বলবে সে, বলবেই বা কোন মুখে। স্বামী তার বৈরাগী। বাসনার পুটলি এই প্রথম প্রসব, অথচ আঁতুর নেই, প্রয়োজন মতো কিছুই নেই। আধ্যাত্মিক অর্থ যাই হোক না কেন, নারীজীবনের এই দুঃখানুভূতির তীব্রতাই গানটির প্রাণ এবং কবিত্বের দিক থেকে তাই সমগ্র চর্যাপদে এই পদটির আসন অনেক উচ্চে।