চর্যাপদ/সামাজিক পটভূমি
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ আধ্যাত্মিক সাধনসংগীত। তা সত্ত্বেও এই গানগুলির মধ্যে সেকালের জীবনযাত্রা ও বাস্তব সমাজব্যবস্থার যে পুঙ্খানুপুঙ্খ ছবি পাওয়া যায়, তা আধ্যাত্মিক সাহিত্যে তো বটেই, সম্ভব প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের খুব কম নিদর্শনেই পাওয়া গিয়েছে। এই দিক থেকে চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র স্থানের অধিকারী। সব ধরনের সাহিত্যেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমাজের প্রতিফলন থাকে এবং কোনও বিশেষ যুগের সাহিত্যকর্ম থেকে সে-যুগের সমাজব্যবস্থা ও জনমানসের একটি ছবিও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু আধ্যাত্মিক সাধনসংগীতের প্রধান উদ্দেশ্য যেখানে তত্ত্ব ব্যাখ্যা, সেখানে কবির দৃষ্টি কেমন করে এতটা বাস্তবমুখী ছিল তা ভাবলে বিস্মিত হতেই হয়। চর্যার সাধকেরা অবশ্য ছিলেন সহজ-সাধক; তাঁরা জীবনের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলিকে ধ্বংস করার পরিবর্তে তার অভিমুখ পরিবর্তিত করে সত্য লাভের মত পোষণ করতেন। তবু এ-কথা মানতেই হয় যে, সহজ-সাধনার ভিত্তি সাধারণত মায়াবাদ এবং চর্যাকারেরাও দার্শনিক দিক থেকে মায়াবাদীই ছিলেন। এমতাবস্থায় নিজেদের ধর্মতত্ত্ব ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে চর্যাকারেরা তৎকালীন সমাজের বাস্তব জীবনযাত্রার যে-সব রূপকল্প ব্যবহার করেছিলেন, তা বিস্ময়করই বটে।
ঐতিহাসিক পটভূমি
[সম্পাদনা]চর্যাপদের সামাজিক পটভূমি আলোচনা করতে হলে প্রথমেই এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি আলোচনা করে নেওয়া প্রয়োজন। চর্যাগুলির রচনাকাল সঠিকভাবে নির্ণয় করা না গেলেও, বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে গবেষকেরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, এগুলি খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে রচিত হয়েছিল। এই সময়টি ছিল বাংলা পাল সাম্রাজ্যের অবনতি থেকে সেন রাজাদের রাজত্বের যুগ। পাল, কম্বোজ, সেন ও বর্মণ রাজাদের ধর্মীয় পরিচয় পৃথক পৃথক হলেও সামাজিক দিক থেকে অন্তত একটি বিষয়ে তাঁরা সকলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একটি বিশেষ ব্যবস্থাকে স্থায়ী করে গিয়েছেন—বাংলার বর্ণবিন্যাস প্রথা, অর্থাৎ উচ্চতর ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় বর্ণের প্রতিষ্ঠা এবং নিম্নতর হাড়ি, ডোম, শবর ইত্যাদি অন্ত্যজ জাতিগুলির সামাজিক অবদমন। এই বর্ণবিন্যাস একদিনে ঘটেনি, বরং দীর্ঘদিনের ঘাতপ্রতিঘাতের ফলেই এই ব্যবস্থা পাকা হয়েছিল। তাই এই সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা প্রয়োজন।
বাংলায় আর্যদের আগমনের পূর্বে বাস করত দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয়, অস্ট্রো-এশীয়, নিগ্রোটো ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা। এই জাতিগোষ্ঠীগুলির কোনওটিই সেকালে আর্য সংস্কৃতি গ্রহণ করেনি এবং উত্তর ভারতীয় আর্যদের মনে এদের সম্পর্কে যে সদর্প উন্নাসিকতা ছিল তা ঐতরেয় আরণ্যকে এদের প্রতি প্রযুক্ত ‘বয়াংসি’ ইত্যাদি শব্দেই স্পষ্ট প্রমাণিত হয়। আর্যগণ বাংলার এই প্রাগার্য জাতিগুলির আর্যীকরণের চেষ্টা অবিরাম চালিয়ে গিয়েছিল। এই প্রচেষ্টার সূত্রপাত হয়েছিল গুপ্তযুগে। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে সমুদ্রগুপ্তের রাজত্বকালে বাংলা গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত হয়। এরপর পাল রাজত্বকালে (৭৫০-১১২০ খ্রিস্টাব্দ) বাংলার শাসকবর্গ ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। অবশ্য সাংস্কৃতিকভাবে বাংলার আর্যীকরণের চেষ্টায় তাঁদের অবদানও নিতান্ত কম ছিল না। বৌদ্ধরা বেদবিরোধী হলেও তাঁরা বৈদিক সমাজব্যবস্থার বিরোধী ছিলেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং বৌদ্ধ পাল রাজত্বকালেই ব্রাহ্মণ্য স্মৃতিশাস্ত্রের প্রসার এবং সমাজে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ইত্যাদি বিভিন্ন বর্ণের প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক স্থান নির্দেশ ক্রমে সুস্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। এই যুগের অনেক লিপি ইত্যাদিতেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। দেবপালের (খ্রিস্টীয় নবম শতক) মুঙ্গের লিপিতে তাঁর পিতা ধর্মপাল (খ্রিস্টীয় অষ্টম-নবম শতক) সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তিনি ব্রাহ্মণাদি বর্ণগুলিকে নিজ নিজ শাস্ত্র-নির্দিষ্ট ধর্মে প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন। অন্যদিকে আমগাছি লিপিতে তৃতীয় বিগ্রহপালকে (খ্রিস্টীয় একাদশ শতক) ‘চাতুর্বর্ণ্য সমাশ্রয়’ অর্থাৎ বর্ণাশ্রমের আশ্রয়স্থল বলা হয়েছে। পরমসৌগত পাল রাজারা ব্রাহ্মণদের ভূমিদান করেছেন এমন প্রমাণও ভুরি ভুরি রয়েছে। গুপ্ত সম্রাটগণ এবং বিশেষত পাল সম্রাটেরা ধর্মের বিষয়ে বিশেষ উদার ছিলেন। ফলে তৎকালীন সমাজে এই উদারতাও কিছু পরিমাণে প্রতিফলিত হয়েছিল। অন্যদিকে আবার তন্ত্রের প্রভাবে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যধর্ম অত্যন্ত কাছাকাছি এসে পড়েছিল। ফলে একদিকে যেমন ধর্মসমন্বয়ের চেষ্টা ছিল, অন্যদিকে তেমনই ছিল বর্ণবিন্যাস দৃঢ়ীকরণের প্রচেষ্টাও। এই প্রচেষ্টা সার্থক হয়েছিল বর্মণ (খ্রিস্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতক) ও সেন রাজাদের (খ্রিস্টীয় একাদশ-ত্রয়োদশ শতক) শাসনকালে। এই দুই রাজবংশ বাংলায় এসেছিল যথাক্রমে কলিঙ্গ (বর্তমান ওডিশা) ও কর্ণাট (বর্তমান কর্ণাটক) অঞ্চল থেকে। বহিরাগত এই দুই রাজবংশই বাংলায় ব্রাহ্মণ্য ধর্ম এবং সমাজের আর্যীকরণ ও বর্ণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পৃষ্ঠপোষক। বিশেষত সেন বংশের শেষ দুই রাজা বল্লালসেন (১১৬০-১১৭৯ খ্রিস্টাব্দ) ও লক্ষ্মণ সেন (১১৭৯-১২০৬ খ্রিস্টাব্দ) নিজেরাই স্মৃতিশাস্ত্র রচনা করেছিলেন। তাই সেন আমলে স্মার্তসম্মত বর্ণব্যবস্থা সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।
সামাজিক বর্ণব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক শ্রেণিবিভাগ
[সম্পাদনা]সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজব্যবস্থার এই পরিবর্তনও এক দীর্ঘ ইতিহাস। এই ইতিহাসের গতিও সর্বদা সরলরেখায় প্রবাহিত হয়নি। প্রাগার্য জাতিগুলিকে এক-একবার এক-একটি বর্ণে গ্রহণ করা হয়। কখনও একভাবে তাদের জাতি নির্ণয় করে কোনও এক গ্রন্থে তার বর্ণনা দেওয়া হয়; আবার হয়তো কখনও রাজরোষ বা অন্য কোনও কারণে তাদের বর্ণ, জাতি সবই পরিবর্তিত করে অন্য কোনও গ্রন্থে তাদের অন্যভাবে বর্ণনা করা হয়। রাজবংশগুলিও খেয়ালখুশি মতো নিজেদের বর্ণ পরিবর্তন করে। সেন রাজারা প্রথমে ছিলেন ব্রাহ্মণ, পরে হলেন ক্ষত্রিয়; তখন তাদের পরিচয় হল ব্রহ্মক্ষত্রিয়। প্রথম দিকে বর্ণবিন্যাসের এই প্রক্রিয়াটি না ছিল জন্মগত, না ছিল কর্মদক্ষতা বা পেশাভিত্তিক। ইচ্ছেমতো বিন্যস্ত করা হত বর্ণগুলিকে। কিন্তু উত্তর ভারতে প্রতিষ্ঠিত বর্ণব্যবস্থার প্রতি বাঙালির বহুকালের শ্রদ্ধার ফলে বাংলায় আর্যসংস্কৃতির প্রসারে এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা অর্জন করে। ক্রমে রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলায় ব্রাহ্মণেরা বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করে।
এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, সামাজিক পরিবর্তন কখনও অর্থনৈতিক পরিবর্তন নিরপেক্ষ নয়। বাংলার অর্থনৈতিক জীবনে ইতিমধ্যে একটি বিরাট পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল; বাণিজ্যপ্রধান বাংলা পরিণত হয়েছিল কৃষিপ্রধান বাংলায়। বাণিজ্যপ্রাধান্যের যুগে বিভিন্ন বণিক ও ধনোৎপাদক জাতিগুলি স্মৃতিশাস্ত্রের বিধান উপেক্ষা করেও কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্মান ধরে রেখেছিল। কিন্তু কৃষিপ্রাধান্যের যুগে তাদের সেই সম্মান নষ্ট হল এবং বিশেষভাবে অবহেলিত হল শ্রমিক শ্রেণি। ব্রাহ্মণ বর্ণের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এমন করেই অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সাফল্য লাভ করল।
অন্ত্যজ-অস্পৃশ্য শ্রেণি
[সম্পাদনা]বর্ণব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা বলতে সাধারণভাবে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চার বর্ণেরই প্রতিষ্ঠা বোঝায়। কিন্তু তৎকালীন বাংলায় এর ফলে ব্রাহ্মণ, শূদ্র ও অন্ত্যজ-অস্পৃশ্য এই তিন বর্ণেরই উদ্ভব ঘটে। বৃহদ্ধর্মপুরাণ মতে, ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য সব বর্ণই শূদ্র। অন্যান্য পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, শুধুমাত্র বর্ণব্যবস্থার চতুর্থ বর্ণটিই নয়, বরং উচ্চতর তিন বর্ণের যে-সব সদস্য বেদ-বিহর্গিত ধর্মমত গ্রহণ করেন অথবা তন্ত্রমত দ্বারা প্রভাবিত হন, তাঁদেরও শূদ্র বলে অভিহিত করা হয়। অর্থাৎ বাংলায় বর্ণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ইত্যাদি বর্ণের সামাজিক প্রতিষ্ঠা বর্ণগতভাবে বিশেষ কিছুই ছিল না। সকলেই শূদ্রের পর্যায়ে গৃহীত হয়েছিল। এই-সব উচ্চবর্ণ ছাড়াও অন্ত্যজ-অস্পৃশ্য বলে শূদ্রের নিচেও আরেকটি শ্রেণির অস্তিত্ব ছিল তখন, তার প্রমাণও বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রে পাওয়া যায়। সম্ভবত ধর্মের দিক থেকে এরা ছিল প্রত্যক্ষ বা প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ এবং অর্থনৈতিকভাবে এরা ছিল শ্রমিক শ্রেণির অন্তর্গত। সে-যুগের ডোম, শবর, চণ্ডাল শ্রেণিই সেই অন্ত্যজ-অস্পৃশ্য বর্ণ। চর্যায় এদের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা একদিকে এদের বৌদ্ধ ধর্মানুশীলন, অন্যদিকে আর্থিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এদের অবহেলিত বিপর্যস্ত অবস্থারই প্রমাণ। বর্মণ ও সেন রাজাদের বৌদ্ধ-নিপীড়নের কাহিনি সুবিদিত। বৌদ্ধ পাল রাজারা অনেক ব্রাহ্মণকে ভূমিদান করেছিলেন। কিন্তু সেন রাজাদের আমলের প্রাপ্ত লিপির একটিতেও বৌদ্ধদের ভূমিদানের কথা নেই। বরং সে-যুগে বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে অভিযানের অনেক কাহিনিই প্রচলিত আছে। রাজশক্তির বিরূপতায় এই বৌদ্ধরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা যে সহজেই হারিয়েছিল তা স্পষ্টই বোঝা যায়।
সামাজিক বৈষম্য
[সম্পাদনা]সমাজপতি ব্রাহ্মণেরা সমাজের নানা স্তরে নানা বিভেদ দৃষ্টি করে নিজেরাও সেই ভেদাভেদ থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি। নিজেদের মধ্যেও তাঁরা সৃষ্টি করেছিলেন বিভিন্ন স্তর, বিভিন্ন গাঞী। তবু তাদের হাতেই ছিল শাস্ত্রের বিধান রচনার ক্ষমতা এবং তার মধ্যেও ধরা পড়েছিল তাদের পক্ষপাতমূলক দৃষ্টির সুস্পষ্ট পরিচয়। স্মৃতিশাস্ত্রে এমন অনেক বিধানের উল্লেখ আছে, যেখানে দেখা যায় একই অপরাধে নিম্নবর্ণীয়রা যে শাস্তি পাচ্ছে, সেই অপরাধে ব্রাহ্মণের শাস্তি অনেক কম, অথবা একেবারেই নেই। সমাজের নানা বিধিনিষেধের আড়ালে ব্রাহ্মণ ও উচ্চশ্রেণির জনসাধারণের জন্য নানা ধরনের অন্যায়-আচরণের পথ প্রশস্ত রয়েছে। কিন্তু সামান্য অপরাধেও নিম্নবর্ণের লোকেদের পেতে হচ্ছে কঠোর শাস্তি।
চর্যাপদে জীবনযাত্রার ছবি ও উপাদান
[সম্পাদনা]সামাজিক বৈষম্য ও পক্ষপাত, উচ্চবর্ণের অন্যায় ও ব্যাভিচার, নিম্নবর্ণীয় অন্ত্যজদের সামাজিক প্রতিষ্ঠার অভাব ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়—এই আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেই চর্যাপদ রচিত হয়েছিল। সুতরাং সে-যুগের বিপর্যস্ত কোনোও সামাজিক শ্রেণি যদি সাহিত্য রচনা করে এবং তাতে যদি বাস্তব প্রতিফলন থাকে, তবে স্বভাবতই সেই ছবি হবে দুঃখময় অথবা কাল্পনিক দুঃখনিবৃত্তি ও মন-গড়া সুখের। চর্যাপদেও তাই হয়েছে। এই গানগুলিতে যে সমাজচিত্র ও বাস্তব জীবনযাত্রার আভাস পাওয়া যায়, তাতে একদিকে সমাজের এই বৈষম্যের ছবি, অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের দুঃখকষ্টে ভরা জীবনযাত্রার কখনও পূর্ণাঙ্গ, কখনও বা খণ্ডচিত্রই ফুটে উঠেছে।
বাসস্থান ও অস্পৃশ্যতা
[সম্পাদনা]সমাজ চিরকালই শ্রেণিবিভাজনে দীর্ণ। এই বিভাজিত সমাজের নানা স্তরের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যও তাই স্বাভাবিক। চর্যাপদের যুগেও সমাজের এই শ্রেণিবিভাজন অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এই সমাজে নিম্নবর্ণের মানুষেরাই সাধারণত ছিল অবজ্ঞার পাত্র তথা আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত। তাদের বাসস্থানও ছিল দূরে উচ্চবর্ণের মানুষের বাসস্থানের স্পর্শ বাঁচিয়ে। “নগর বাহিরেঁ ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ” (পদসংখ্যা ১০), “উঁচা উঁচা পাবত তহিঁ বসই সবরী বালী” (পদসংখ্যা ২৮) কিংবা “টালত মোর ঘর নাহি পরবেশী” (পদসংখ্যা ৩৩) ইত্যাদি পংক্তি থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, সেকালে এই-সব অন্ত্যজ দরিদ্র শ্রেণির ডোম, শবর ইত্যাদির বাসস্থান ছিল শহরের বাইরে, পর্বতচূড়ায় বা টিলায়। অবশ্য উচ্চবর্ণের মানুষের সঙ্গে এদের যে একেবারেই যোগাযোগ ছিল না তা নয়। অনেক সময় ডোম্বীকে দেখা গিয়েছে ব্রাহ্মণের মনোহরণের চেষ্টায়। তবে সম্ভবত সেটা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
জীবিকা
[সম্পাদনা]এই অন্ত্যজ-অস্পৃশ্য শ্রমিক শ্রেণির মানুষেরা ছিল দরিদ্র। তাদের যে কটি জীবিকার কথা চর্যাপদে আছে, সেগুলির কোনওটিই তেমন সম্মানজনক বা অর্থকরী নয়। এই মানুষদের বংশগত জীবিকা সম্ভবত তাঁত বোনা ও চাঙাড়ি তৈরি করা: “তান্তি বিকণঅ ডোম্বী আর ণা চঙ্গতা।” অপর বংশগত জীবিকা ছিল নৌকা বাওয়া ও সম্ভবত মাছ ধরা। অনেক চর্যাতেই নৌকার উৎপ্রেক্ষা ব্যবহৃত হয়েছে। নৌকা আধ্যাত্মিক অর্থে উদ্দিষ্ট হলেও বারবার নৌকা ও নদীর উল্লেখ সহজেই দেশের নদীমাতৃকতা ও তার আনুষঙ্গিক অবস্থার কথে মনে করিয়ে দেয়। ৮, ১৪, ১৪, ১৫, ৩৮ ইত্যাদি সংখ্যক অনেক পদেই নৌকা কী করে চালাতে হবে, কী করে কাছি উপড়ে গুণ টানতে হবে, কীভাবে জল সেঁচতে হবে তার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দুটি চর্যা প্রসঙ্গত উল্লেখ্য। ৮ সংখ্যক চর্যায় আছে: “খুণ্টি উপাড়ী মেলিলি কাচ্ছি। বাহ তু কামলি সদ্গুরু পুচ্ছি।।” ১৪ সংখ্যক চর্যায় পাওয়া যায়: “পাঞ্চ কেড়ুয়াল পড়ন্তে মাঙ্গে পিটত কাচ্ছীবান্ধী। গঅণ দুখোলেঁ সিঞ্চহু পাণী ন পইসই সান্ধি।।” এই দুই চর্যায় কাছি টানার যে নির্দেশে আছে তা সম্ভবত পূর্ববঙ্গীয় দড়াজাল। অধুনা বাংলাদেশে এখনও এইরকম দড়াজাল টেনে মাছ ধরা হয় এবং যে-সব শ্রমিকদের সাহায্যে এই জল টানানো হয় তাদের কামলি-ই বলা বলা হয়। চর্যাকারেদের জীবনের সঙ্গে নদীর যোগ যখন এমন ঘনিষ্ঠ তখন ধরেই নেওয়া যায় যে মাছধরা ছিল এঁদের অন্যতম জীবিকা।
শিকারের উল্লেখও দুটি চর্যায় পাওয়া যায়। ৬ সংখ্যক চর্যায় শিকার ধরার বর্ণনাটি বেশ বিস্তারিত; চার দিকে জাল পেতে হাঁক পেড়ে হরিণ শিকারের উল্লেখ পাওয়া যায় এটিতে।
এঁদের অন্যতম জীবিকা ছিল মদ চোয়ানো। ৩ সংখ্যক চর্যায় তার ইঙ্গিত সুস্পষ্ট: “এক সে শুণ্ডিনী দুই ঘরে সান্ধঅ। চীঅণ বাকলঅ বারুণীর বান্ধঅ।।”
২৬ সংখ্যক পদে পাওয়া যায় ধুনুরি বৃত্তির পরিচয়: তুলা ধুনি ধুনি আঁসুরে আঁসু।”
৫ ও ৪৫ সংখ্যক চর্যায় গাছ কাটার উল্লেখ পাওয়া যায়। কুঠার দিয়ে গাছ কাটার যে স্পষ্ট বর্ণনা আছে, তাতে মনে হয় এই শ্রমিক শ্রেণির তা ছিল অন্যতম জীবিকা।
এঁদের অপর এক জীবিকা ছিল নটবৃত্তি। নৃত্যগীত শুধু এঁদের অবসর বিনোদনের উপায়ই ছিল না, সম্ভবত জীবিকানির্বাহের উপায়ও ছিল। আর সেই নৃত্যগীতের কৌশলও ছিল বহু বিচিত্র। “এক সে পদুমা চৌষট্ঠী পাখুড়ী। তহি চড়ি নাচঅ ডোম্বী বাপুড়ী।।” (পদসংখ্যা ১০) চৌষট্টি দলযুক্ত পদ্মের উপর এই নৃত্যের কল্পনা থেকেই তৎকালীন বহু বিচিত্র নৃত্যকলার কথাই অনুমিত হয়।