চর্যাপদ/ধর্মতত্ত্ব
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সাধনসংগীতও বটে। সুতরাং ধর্মতত্ত্বকে বাদ দিয়ে এর আলোচনা বা ব্যাখ্যা আদৌ সম্ভব নয়। চর্যাগীতিগুলির ধর্মমত এবং সেই ধর্মমতের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে এখনও আলোচনার যথেষ্ট অবকাশ আছে। কোনও কোনও সমালোচক চর্যাগীতির আলোচনায় এগুলির অন্তর্নিহিত ধর্মতত্ত্বের বিষয়টিকে বাদ দিতে চেয়েছেন। তাঁদের মতে চর্যাপদ সাহিত্যের নিদর্শন, সুতরাং এর সাহিত্যিক দিকটিই শুধুমাত্র বিচার্য। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও চর্যাপদের ধর্মের স্বরূপটিকে তান্ত্রিক বা সহজিয়া বৌদ্ধ বলে স্বীকার করেও মন্তব্য করেন, “যাঁহারা সাধন ভজন করেন তাঁহারাই সেই কথা (ধর্মের গূঢ়তত্ত্ব) বুঝিবেন, আমাদের বুঝিয়া কাজ নাই। আমরা সাহিত্যের কথা কহিতে আসিয়াছি, সাহিত্যের কথাই কহিব।” (‘মুখবন্ধ’, হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সম্পাদিত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা, ১৩২৩ বঙ্গাব্দ, পৃ. ৮) ড. সুকুমার সেনও অনুরূপ মতই প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এ-কথা ভুললে চলবে না যে, বাঙালির সাহিত্যসাধনা, সংগীতসাধনা ও ধর্মসাধনা চিরকাল একই পথ ধরে চলে এসেছে। বাঙালি ধর্মসাধনার অঙ্গ হিসেবে সংগীতসাধনা করে, এবং সংগীতসাধনার মাধ্যমেই চলে তার সাহিত্যসাধনা। পরবর্তীকালের মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব ও শাক্ত পদাবলি ইত্যাদির মধ্যে দিয়েও ধর্ম, সংগীত ও সাহিত্যের যে ত্রিবেণী-সংগমের ঐতিহ্য চলে এসেছে তার সূচনা এই চর্যাগীতিগুলিতেই। সুতরাং চর্যাপদগুলির আলোচনায় সেগুলির অন্তর্নিহিত ধর্মসাধনার আলোচনা অপরিহার্য।
অবশ্য চর্যাগীতিগুলির ধর্মমতের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য আলোচনায় কিছু কিছু মতপার্থক্য থাকাও স্বাভাবিক। শুধুমাত্র ভাষার বিচারে কোনও বিশেষ ধর্মের স্বরূপ সহজে ধরা পড়ে না। অদ্বয়, নির্বাণ, অবিদ্যা ইত্যাদি শব্দ ভারতীয় দর্শনের নানা শাখায় পাওয়া যায়। ইয়াই শুধু কয়েকটি শব্দের বিচার না করে মূল বিষয়বস্তুটি বিশ্লেষণ করার দরকার। মণীন্দ্রমোহন বসু তাঁর সম্পাদিত চর্য্যাপদ গ্রন্থে চর্যাগীতিগুলির ধর্মমতের বিশেষ স্বরূপ নির্ধারণের চেষ্টা না করে বিভিন্ন ধর্মদর্শনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখমাত্র করেছেন। বিশেষত তিনি একে ধর্ম বা সাধনপদ্ধতির দিক থেকে বিচার না করেই বলেছেন যে, চর্যাগীতিগুলির মধ্যে দার্শনিক তত্ত্বই বেশি পরিস্ফুট হয়েছে। কিন্তু সেই দার্শনিক তত্ত্বকে তিনি স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য, জাতি ইত্যাদির আলোচনায় সুসংবদ্ধ আকারে প্রকাশ করেননি। একমাত্র ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত তাঁর ইংরেজি গ্রন্থ দ্বয় অবস্কিওর রিলিজিয়াস কাল্টস ও ইন্ট্রোডাকশন টু তান্ত্রিক বুদ্ধিজম-এ চর্যাগীতির ধর্মমতের বিশদ আলোচনা করেছেন। ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচীও কয়েকটি ইংরেজি নিবন্ধে অন্য প্রসঙ্গে এ সম্পর্কে ধারাবাবিকভাবে না হলেও কিছু মূল্যবান আলোচনা করেছেন। তাই বাংলা ভাষায় চর্যাগীতির ধর্মমত নিয়ে সেইরকম পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনার অবকাশ রয়েই গিয়েছে।
ভারতীয় ধর্মসাধনায় সমন্বয়ের সুর এবং বিশেষ করে বিভিন্ন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্যের কথা স্মরণ রেখেও নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, চর্যাগীতিগুলির ধর্মমত তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম বা সহজিয়া বৌদ্ধধর্ম। চর্যাগীতিগুলিতে ব্যবহৃত পরিভাষাগুলি বৌদ্ধধর্মের, কিন্তু তার আবরণে যে তত্ত্ব ও সাধনপ্রণালী বর্ণিত হয়েছে তা তন্ত্রোক্ত। এই তান্ত্রিক পদ্ধতি গ্রহণে চর্যাগীতির সাধককবিদের যে মনোভাব প্রবলভাবে প্রকাশিত হয়েছে তা সহজিয়া লক্ষণাক্রান্ত। অন্যান্য সহজিয়া ধর্মের সঙ্গে চর্যাগীতির ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি ও সাধনপ্রণালীর সাদৃশ্যের কারণও এই মনোভাবের সাদৃশ্য। সুতরাং চর্যাপদের ধর্মমত হল বৌদ্ধধর্মের আবরণে ও তার মূল ভিত্তির উপর সহজিয়া মনোভাব প্রসূত তান্ত্রিক সাধনপদ্ধতি। বৌদ্ধধর্ম পরিবর্তনের একটি বিশেষ স্তরে তন্ত্রের প্রভাবে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের জন্ম দেয় এবং তারই একটি বিশেষ পর্বের বিশেষ ধর্মসাধনার নিদর্শন বহন করে চর্যাগীতিগুলি। চর্যাপদের আলোচনা প্রসঙ্গে তাই তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের বিবর্তনের ইতিহাসটিও উল্লেখনীয়।
তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি ও বিবর্তন
[সম্পাদনা]গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর বৌদ্ধ সংঘে মতভেদ
[সম্পাদনা]গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর তাঁর উপদেশের মূল সূত্রগুলির ব্যাখ্যাপ্রসঙ্গে তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্যদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। এই মতভেদ দূর করার জন্য একাধিকবার বৌদ্ধ সংগীতিরও আয়োজন করা হয়। কথিত আছে, বৈশালীতে আহূত দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতিতে এই মতভেদ অত্যন্ত প্রবল হয়ে ওঠে এবং প্রতিবাদীরা অপর একটি সংগীতি আহ্বান করে নিজেদের মহাসাংঘিক আখ্যা দেন। এইভাবে প্রাচীন থেরবাদ সম্প্রদায় ও পরবর্তী প্রতিবাদী সম্প্রদায়ের মধ্য বিরোধের প্রেক্ষিতে দু’টি পৃথক সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। প্রাচীনপন্থীরা হীনযানী এবং নব্যপন্থীরা মহাযানী নামে অভিহিত হন। মহাযান এই দিক থেকে বৌদ্ধদর্শনের ক্রমোন্নতির একটি স্তরকে নির্দেশ করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আধুনিক গবেষকেরা অবশ্য হীনযান ও মহাযান মতের এই কালগত পার্থক্য স্বীকার করেন না। মহাযান মতবাদগুলি প্রাচীন পালি ত্রিপিটকে ইতস্তত ছড়ানো ছিল। কিন্তু তা সুসংবদ্ধ রূপ পেতে কিছুটা সময় লেগেছিল।
হীনযান ও মহাযান: অর্হত্ব ও বুদ্ধত্ব
[সম্পাদনা]হীনযান ও মহাযান বৌদ্ধধর্মের মূল পার্থক্য ধর্মানুশীলনের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে। হীনযানপন্থীদের দৃষ্টি ছিল কিছুটা সংকীর্ণ। বুদ্ধ-প্রদর্শিত সদ্ধর্ম পালনের মাধ্যমে ধর্মের পথে পুণ্য অর্জনেই তাঁরা তৎপর হতেন, বুদ্ধত্বলাভের আশা করতেন না। তাঁদের বলা হত ‘শ্রাবকযান’। অবশ্য হীনযানপন্থীদের মধ্যে একটি দল বুদ্ধত্বলাভের উচ্চাশা পোষণ করতেন বটে, কিন্তু তা করতেন কেবল নিজেরই জন্যই। তাঁদের বলা হত ‘প্রত্যেকবুদ্ধযান’। মহাযানপন্থীদের আদর্শ ছিল অপেক্ষাকৃত উদার। শুধু নিজের জন্য বুদ্ধত্বলাভের প্রয়াসকে তাঁরা তুচ্ছ জ্ঞান করতেন। বুদ্ধ যেমন সমগ্র বিশ্বের জন্য জন্ম-জন্মান্তরে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, এঁরাও সেইরকম পরোপকারের মধ্যে দিয়ে আত্মোৎসর্গ করে বোধিসত্ত্ব অবস্থা লাভ এবং তার ভিতর দিয়ে বুদ্ধত্বলাভকেই আদর্শ জ্ঞান করতেন। এই বুদ্ধত্বলাভ শুধু নিজের জন্য নয়, সকল বিশ্বের জন্য এক প্রচেষ্টা। এইভাবেই হীনযানপন্থীদের অর্হত্ব আদর্শের স্থলে মহাযানপন্থীরা স্থাপন করলেন বুদ্ধত্বের আদর্শ। এই-ক্ষেত্রে মহাযানপন্থীদের বোধিসত্ত্ব অবস্থার কল্পনাটিও লক্ষণীয়। তাঁরা মনে করেন, জগতের প্রতিটি জীবের মধ্যে সম্যক-সম্বুদ্ধত্বের সম্ভাবনা বর্তমান এবং শূন্যতা ও করুণার অভিন্নতায় প্রতিষ্ঠিত বোধিচিত্ত লাভের মধ্য দিয়ে যে বোধিসত্ত্ব অবস্থা লাভ হয় তার ভিতর দিয়েই প্রত্যেকে ক্রমে বুদ্ধত্ব লাভ করতে পারেন। মহাযানপন্থীরা ব্যক্তিগত জীবনের আদর্শ হিসেবে বোধিসত্ত্বাবস্থা লাভকেই কাম্য বলে মনে করেন। বোধিচিত্ত লাভ করাই বোধিসত্ত্বাবস্থায় উন্নীত হওয়া। জাগতিক কোনও বস্তুর নিজস্ব কোনও ধর্ম বা স্বরূপ নেই—প্রত্যেকেই তার বর্তমান স্বরূপের জন্য অন্য কোনও স্বরূপের উপর নির্ভরশীল, সুতরাং অস্তিত্বহীন—এই জ্ঞানই শূন্যতাজ্ঞান। আবার শুধু নিজের মুক্তির জন্য চেষ্টা নয়, পরোপকার ও তার মধ্যে দিয়ে জাগতিক সকলের মুক্তির জন্য চেষ্টাই করুণা। “শূন্যতাকরুণাভিন্নং বোধিচিত্তম্”—অর্থাৎ, জগৎ-সংসারের শূন্যতা স্বরূপের জ্ঞান ও বিশ্বব্যাপী করুণা, এই দুইয়ের অভিন্নাবস্থাই বোধিচিত্ত। এই অবস্থালাভই বোধিসত্ত্বাবস্থা লাভ, এর মধ্যে দিয়েই ক্রমে বুদ্ধত্বলাভই মহাযানপন্থীদের লক্ষ্য।
ত্রিকায় পরিকল্পনা
[সম্পাদনা]বুদ্ধের ত্রিকায় পরিকল্পনাও মহাযানপন্থীদের একটি বৈশিষ্ট্য। মহাযানপন্থীরা ঐতিহাসিক বুদ্ধে বিশ্বাস করতেন না। তাঁদের ত্রিকায় পরিকল্পনায় বুদ্ধ তিন প্রকার। যথা: ধর্মকায়, নির্মাণকায় ও সম্ভোগকায়।
- ধর্মকায়: বুদ্ধ যখন পারমার্থিক সত্য অবলম্বন করেন, তখন তিনি ধর্মকায়ে বিচরণ করেন। এই ধারণাটি অদ্বৈত বেদান্তের নির্গুণ ব্রহ্মের ধারণার অনুরূপ।
- নির্মাণকায়: বুদ্ধ যখন সাধারণ মানুষের জন্য সূত্রাদি দান করেন, তখন তিনি নির্মাণকায়ে বিচরণ করেন।
- সম্ভোগকায়: বুদ্ধ যখন বোধিসত্ত্বদের কাছে ধর্মের গূঢ় অর্থ ব্যক্ত করেন, তখন তিনি বিচরণ করেন সম্ভোগকায়ে।
পারমিতানয় ও মন্ত্রনয়
[সম্পাদনা]মহাযানপন্থীরা প্রত্যেক জীবের বুদ্ধত্বের জন্য বোধিসত্ত্বাবস্থালাভকেই কাম্য বলে মনে করতেন। এই বোধিসত্ত্বাবস্থাকে স্থায়ী করার জন্য প্রথম যুগের মহাযান ধর্মগুরুরা কয়েকটি ‘পারমিতা’র অনুশীলনকেই উপায় বলে মনে করতেন। ‘পারমিতা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ পূর্ণতা প্রাপ্তি। করুণা, মৈত্রী ইত্যাদি পরম গুণের অনুশীলনই মহাযান মতে পারমিতার অনুশীলন। সকল জীবের মধ্যে বুদ্ধত্ব কল্পনা, সকল জীবের মুক্তির জন্য পরোপকার ও আত্মোৎসর্গ এবং পন্থা হিসেবে মৈত্রী, করুণা ইত্যাদির অনুশীলন মহাযান মতটিকে রীতিমতো জনপ্রিয় করে তোলে। এই জনপ্রিয়তার জন্যই মহাযান মতের মধ্যে নানা বিচিত্র উপাদান প্রবেশ করতে শুরু করে এবং এইভাবে প্রবেশ করে তন্ত্রমতও। অবশ্য মহাযান মতের জনপ্রিয়তাই তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তির কারণ নয়। পরবর্তীকালে মহাযান মতের মধ্যেই আগেকার পারমিতানয় বা পারমিতাযানের মধ্যে একটি মন্ত্রনয় বা মন্ত্রযানের উদ্ভব ঘটে। পূর্ববর্তী ধর্মগুরুরা যেমন মনে করতেন পারমিতার অনুশীলনই বুদ্ধত্বলাভের উপায়, মন্ত্রনয়ের আচার্যেরাও তেমনই মনে করতেন যে মন্ত্র-উপাদানই বুদ্ধত্বলাভের উপায়। এই মন্ত্রযানই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মে বিভিন্ন তন্ত্রানুগামী সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করে এবং তখন থেকেই বৌদ্ধধর্মের মধ্যে প্রকৃষ্টভাবে তান্ত্রিকতার সূত্রপাত হয়।
তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের বিবর্তন
[সম্পাদনা]বৌদ্ধধর্ম প্রবর্তনের বহু আগে থেকেই ভারতে তন্ত্র প্রচলিত ছিল। এমনকি অথর্ববেদেও তান্ত্রিক আচার লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তীকালে শৈব, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ ইত্যাদি ধর্মের সঙ্গে মিশে শৈবতন্ত্র, বৈষ্ণবতন্ত্র, বৌদ্ধতন্ত্র ইত্যাদি বিভিন্ন নামে তা নামাঙ্কিত হয়। বৌদ্ধতন্ত্রের প্রচলন প্রথম কে করেন তা নির্ণয় করা কঠিন। অনেকের মতে গৌতম বুদ্ধ স্বয়ং বৌদ্ধতন্ত্রের প্রবর্তক। অন্য মতে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে অসঙ্গ বৌদ্ধতন্ত্র প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর মহাযান সূত্রালংকারে ‘পরাবৃত্তি’ বলে যে তান্ত্রিক পারিভাষিক শব্দের উল্লেখ আছে, তা থেকেই স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে অসঙ্গের সময় থেকেই বৌদ্ধতন্ত্রের প্রথম সূত্রপাত। অসঙ্গ তাঁর মতকে যোগাচারবাদ বলে উল্লেখ করেছেন। তা থেকেও বোঝা যায় যে, তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল। অবশ্য অসঙ্গের যোগাচার ও পরবর্তী তন্ত্রযানগুলি কোনও অর্থেই অভিন্ন নয়।
বৌদ্ধধর্মের মধ্যে যে মন্ত্র-উপাদানের প্রবেশ থেকে তান্ত্রিকতার সূত্রপাত তা প্রথমে ‘ধারণী’ (অর্থাৎ, এটির দ্বারা ধারণ করা হয়) উপাদান রূপেই প্রবেশ করে। ধারণী থেকে মন্ত্র এবং তারপরই মুদ্রা-উপাদান এর মধ্যে প্রবেশ করে এবং আস্তে আস্তে মণ্ডল, অভিক্ষেপ, এমনকি যৌনাচারমূলক যোগসাধনের পদ্ধতি সহ তন্ত্রের অন্যান্য উপাদান প্রবেশ করে এটিকে পরিপূর্ণ তান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিবর্তিত করে। তখন এর নাম হয় বজ্রযান। এই বজ্রযান আবার ক্রিয়াতন্ত্র, চর্যাতন্ত্র, যোগতন্ত্র, অনুত্তরতন্ত্র ইত্যাদি নানা শাখায় বিভক্ত হয়। তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মকে আবার অন্য উপায়েও বজ্রযান, কালচক্রযান, সহজযান ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। তবে বিভিন্ন নামে নামাঙ্কিত হলেও এগুলি ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের নাম নয়, বরং তন্ত্রযানেরই সামান্য পৃথক ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ মাত্র।
তবে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি ও বিবর্তনের ইতিহাস শুধুমাত্র বৌদ্ধধর্মের মধ্যেই অনুসন্ধান করলে চলবে না। তন্ত্রের বিভিন্ন উপাদানগুলি এর মধ্যে বিদ্যমান বলে তন্ত্রের মূল সূত্রগুলি আলোচনা করে মহাযান বৌদ্ধধর্ম সেটির বিভিন্ন উপাদান সমেত কীভাবে তান্ত্রিকতায় পরিবর্তিত হয়ে গেল এবং চর্যাপদে সেই তান্ত্রিকতার কতটা প্রভাব পড়েছিল তার আলোচনাও প্রয়োজন।
তন্ত্রতত্ত্ব
[সম্পাদনা]পারমার্থিক সত্য লাভের কার্যকরী পন্থা
[সম্পাদনা]ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন শাখায় পারমার্থিক সত্যের স্বরূপ আলোচিত হয়েছে। কিন্তু সেই সত্য লাভ করার কোনও কার্যকরী পন্থাই দর্শনের কোনও শাখায় নির্দেশ করা হয়নি। তন্ত্র দার্শনিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও পারমার্থিক সত্য লাভের কার্যকরী পন্থা নির্দেশ করাই এই শাস্ত্রের লক্ষ্য। তন্ত্রে তাই বুদ্ধিগ্রাহ্য দার্শনিক আলোচনা অপেক্ষা কার্যকরী সাধনপদ্ধতিই বেশি আলোচিত হয়েছে।
শিব-শক্তির মিলিতাবস্থা
[সম্পাদনা]তন্ত্রের মতে, পারমার্থিক সত্যের দুই রূপ: নিবৃত্তিরূপ পুরুষ বা শিব এবং প্রবৃত্তিরূপ প্রকৃতি বা শক্তি। পারমার্থিক সত্য অদ্বয় স্বরূপে পুরুষ-প্রকৃতি, অর্থাৎ শিব-শক্তির মিলিতাবস্থা। এই মিথুন বা মিলিতাবস্থাই জীবের কাম্য। শিবের সঙ্গে মিলিতাবস্থায় শক্তিই এই বিশ্বের সৃষ্টিপ্রবাহের কারণ। কিন্তু পরস্পর নিরপেক্ষভাবে এদের কারও কোনও প্রভাবই নেই। সংসার-প্রবৃত্তি স্বরূপ শক্তির প্রভাবে ক্রমে প্রবৃত্তি অর্থাৎ পরিবর্তনের পথে চলেছে; তাকে প্রত্যাবৃত্ত করে নিবৃত্তির পথে পরিচালিত করা এবং নিবৃত্তি-স্বরূপ শিবের সঙ্গে অদ্বয়ভাবে যুক্ত করানোই মুক্তিকামী জীবের কাজ।
দেহপ্রাধান্য ও কায়সাধনা
[সম্পাদনা]তন্ত্রমতে দেহই সকল সত্যের আধার—দেহই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিমূর্তি; দেহের মধ্যেই চন্দ্রসূর্য, পাহাড়পর্বত, নদনদী, জীবপ্রবাহ; এর মধ্যেই শিবশক্তি। শিবশক্তির যে মিলন তান্ত্রিকদের কাম্য তারও অনুসন্ধান করতে হয় এই দেহের মধ্যেই এবং তাঁদের মিলন ঘটানোর স্থানও এই দেহ। এই দেহকে যন্ত্র করে এর মধ্যে শিবশক্তির মিলন ঘটাতে পারলে পারমার্থিক সত্যলাভ সহজ হয়। তন্ত্রে আমাদের দেহস্থ মেরুদণ্ডটিকে বলা হয়েছে মেরুপর্বত। এই মেরুপর্বতের সর্বনিম্নে অবস্থিত দক্ষিণ মেরুতে মূলাধার চক্রে কুণ্ডলিনী অবস্থায় শক্তি অর্থাৎ কুলকুণ্ডলিনী নিদ্রিতা। একে জাগ্রত করে ঊর্ধ্বমুখী করে স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ, আজ্ঞা ইত্যাদি ক্রমে মেরুপর্বতের উপর অবস্থিত বিভিন্ন চক্রের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গিয়ে সর্বোপরি উত্তর মেরুতে সহস্রার পদ্মে অবস্থিত নিবৃত্তিরূপী শিবের সঙ্গে মিলিত করে দেওয়াই তন্ত্রসাধনার লক্ষ্য। শক্তিকে যত ঊর্ধ্বগামিনী করা যাবে তান্ত্রিক সাধকও ততই প্রজ্ঞা ও কল্যাণের আদর্শে উদ্ভাসিত হবেন। এইভাবে দেহের মধ্যেই সকল সত্য এবং তা উপলব্ধির উপায়ও দেহেই অবস্থিত—এই ধারণার ভিত্তিতে তন্ত্রে পারমার্থিক সত্য লাভের কার্যকরী পন্থা হিসেবে দেহের প্রাধান্য ও কায়সাধনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
দেহের বাঁদিকে অবস্থিত ইড়া ও ডানদিকে অবস্থিত পিঙ্গলা নাড়ী দুটিকে যথাক্রমে শিব ও শক্তি অর্থাৎ নারী ও পুরুষ হিসেবে ধরে এদের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত প্রাণ ও অপান বায়ুকে দেহমধ্যস্থ নাড়ী সুষূম্না পথে পরিচালিত করে সহস্রারে প্রেরণ করতে পারলেই অদ্বয় সত্য লাভ করা হয় বলে হঠযোগে বর্ণনা করা হয়েছে। কায়সাধনার এই পদ্ধতিটি তান্ত্রিকদের মধ্যেও প্রচলিত।
সাধনসঙ্গিনী
[সম্পাদনা]তন্ত্রসাধনার আরও একটি দিক আছে। তন্ত্রমতে প্রতি নারী ও পুরুষের মধ্যেই শিব ও শক্তি বিরাজমান। তাই শিবশক্তির মিলিতাবস্থা বলতে তন্ত্রে রক্তমাংসের নারীপুরুষের মিলনকেও বোঝানো হয়েছে। এই মিলন কিন্তু পার্থিব প্রবৃত্তির তাড়নায় কামলালসা চরিতার্থ করার জন্য নয়। তন্ত্রকারেরা নারীপুরুষের মিলনাদর্শের বিকৃতির সম্ভাবনা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তাই এই দুরূহ তন্ত্রাচার যারা পালন করবে, তারা যদি হীন উদ্দেশ্যে তা করে তবে তার শাস্তি হিসেবে কঠিনতম নরকভোগের শাস্তিও নির্দেশ করেছিলেন তাঁরা।
মহাযানী ধ্যানধারণার তান্ত্রিকতায় পরিবর্তন
[সম্পাদনা]মহাযান বৌদ্ধধর্ম যখন তন্ত্রের সংস্পর্শে এল অথবা অতিরিক্ত জনপ্রিয়তার কারণে যখন মহাযান মতে তান্ত্রিক ধ্যানধারণা প্রবেশ করল, তখন ধীরে ধীরে মহাযানী ধ্যানধারণাগুলিও তান্ত্রিকতায় রূপান্তরিত হতে লাগল। পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপেই মহাযান মতের শূন্যতার ধারণাটি পরিণত হল বজ্রের ধারণায়। জগৎ-সংসারের শূন্যতা-স্বভাব যেন বজ্রের মতোই, শূন্যতা তাই বজ্র। বজ্রযানে আচার-অনুষ্ঠান সব কিছুই বজ্র বা বজ্রচিহ্নিত; মূলদেবতাও বজ্রসত্ত্ব। এই বজ্রসত্ত্বের কল্পনা আবার বোধিচিত্তের কল্পনার সঙ্গে অভিন্ন হয়ে গিয়েছে। বোধিচিত্ত শূন্যতা ও করুণার মিলিতাবস্থা। সহজযানে শূন্যতা ও করুণা যথাক্রমে প্রজ্ঞা ও উপায়ে (অর্থাৎ প্রকৃতি ও পুরুষে) পরিণত হয়েছে এবং এদের মিলিতাবস্থা অর্থাৎ বোধিচিত্তের বর্ণনা করতে গিয়ে তাকে পরম সুখময় অদ্বয় অবস্থা বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
শূন্যতা ও করুণা মহাযান বৌদ্ধধর্মের তত্ত্ব ও সাধনার মূল কথা। জগৎ-সংসারের শূন্যতা-স্বভাব উপলব্ধিই পরমজ্ঞান বা প্রজ্ঞা এবং বোধিচিত্তলাভের পন্থা হিসেবে বিশ্বমৈত্রী বা করুণাই উপায়। এই প্রজ্ঞা (শূন্যতা) ও উপায় (করুণা) ক্রমে নারী ও পুরুষ রূপে কল্পিত হলেন। অবশ্য এখানে সাধারণ তান্ত্রিক ধারণার সঙ্গে বৌদ্ধতন্ত্রের ধারণায় একটু প্রভেদ আছে। সাধারণ তান্ত্রিক ধারণায় নারীই শক্তি এবং বিশ্বসংসারের মূলে সেই শক্তিই সক্রিয়; অন্যদিকে পুরুষ নির্গুণ, নিষ্কল, নিষ্ক্রিয় ও নিবৃত্তিস্বরূপ। কিন্তু বৌদ্ধতন্ত্রে উপায় বা পুরুষই সক্রিয়, অন্যদিকে পরমজ্ঞান প্রজ্ঞা বা প্রকৃতি নিষ্ক্রিয়। এইভাবে পুরুষ-প্রকৃতি ধারণা প্রবেশ করাতে তান্ত্রিকতাও অতি সহজে ও সার্থকভাবে মহাযান মতে প্রবেশ করার সুযোগ পেল। এই প্রজ্ঞা-উপায়ের মিলিতাবস্থা বোধিচিত্ত তাই শিবশক্তির মিলিতাবস্থা অদ্বয় (যুগনদ্ধ) বলে পরিকল্পিত হল।
কায়সাধনার প্রাধান্য তন্ত্রসাধনার একটি বৈশিষ্ট্য। ইড়া-পিঙ্গলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত প্রাণ ও অপান বায়ুকে সুষূম্নাপথে প্রবাহিত করে মস্তিষ্কস্থ সহস্রার পদ্মে প্রেরণই তন্ত্রসাধকের কাম্য। বৌদ্ধতন্ত্রেও প্রজ্ঞা ও উপায় যথাক্রমে ইড়া ও পিঙ্গলার সঙ্গে অভিন্ন হয়ে গিয়েছে এবং ললনা-রসনা, চন্দ্র-সূর্য, রবি-শশী, ধমন-চমন ইত্যাদি বিভিন্ন নামে নামাঙ্কিত হয়েছে। মধ্যনাড়ী সুষূম্না বৌদ্ধতন্ত্রে অবধূতিকা নামে পরিচিত এবং এর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বোধিচিত্ত তান্ত্রিক চক্রের সাদৃশ্যে পরিকল্পিত নির্মাণচক্র থেকে উদ্ভূত হয়ে ধর্মচক্র, সম্ভোগচক্র ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে মস্তিষ্কস্থ মহাসুখচক্রে (পদ্মে) উন্নীত হয়। এইভাবে তন্ত্রোক্ত দেহসাধনা কিছুটা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বৌদ্ধতন্ত্রেও প্রাধান্য লাভ করে।
তন্ত্রের অদ্বয়ই বৌদ্ধতন্ত্রের যুগনদ্ধ। প্রজ্ঞা ও উপায়ের মিলিত রূপই যুগনদ্ধ। এই যুগনদ্ধকে মাঝে মাঝে আবার ‘সমরস’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। অবশ্য সমরস বলতে অদ্বয় অবস্থা উপলব্ধির ফলস্বরূপ যে অনুভূতি, অর্থাৎ মহাসুখাবস্থাকেও বোঝানো হয়েছে।
বৌদ্ধধর্মের লক্ষ্য নির্বাণ। এই ধর্মের উৎপত্তি দুঃখের ধারণা থেকে এবং এই ধর্মের শেষ কথা সেই দুঃখের নিবৃত্তি। তাই নির্বাণ যে স্বভাবতই সুখময় হবে, এই ছিল সাধারণের ধারণা। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাণ যে পরম-অনুভূতি তার স্বরূপ অনিবর্চনীয়। কিন্তু সাধারণের কাছে এবং বহু পালি গ্রন্থকারের কাছে নির্বাণ সুখময় বলেই প্রতিভাত হয়েছিল। তন্ত্রের অদ্বয় অবস্থার অনুভূতিও মহাসুখের। পরবর্তীকালে এই দুই ধারণা এক হয়ে গিয়েছে। নির্বাণের সুখময় অনুভূতি, যুগনদ্ধের সমরসরূপ সুখৈকানুভূতির সঙ্গে এক হয়ে গিয়ে বৌদ্ধতন্ত্রের লক্ষ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
চর্যাপদে উল্লিখিত সাধনপদ্ধতি
[সম্পাদনা]চর্যাগীতিগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, তন্ত্রোক্ত কায়সাধনা, ত্রিনাড়ী ও দেহের মধ্যস্থিত নানা প্রকারের চক্র ও পদ্ম পরিকল্পনা, দেহের মধ্যেই শিবশক্তির মিলিত অদ্বয় অবস্থা অথবা দেহের বাইরে সাধনসঙ্গিনীর সঙ্গে মিলনের পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে মহাসুখ লাভ ইত্যাদি তান্ত্রিক ধ্যানধারণা ও সাধনপদ্ধতিগুলি বৌদ্ধধর্মের কাঠামো ও নিজস্ব পরিভাষার আবরণে অতি স্পষ্টভাবেই প্রকাশিত হয়েছে।
চর্যাগীতিতে কায়সাধনা ও ত্রিনাড়ী পরিকল্পনা
[সম্পাদনা]চর্যাগীতিগুলিতে এই কায়সাধনা, দেহপ্রাধান্য ও ত্রিনাড়ী পরিকল্পনা কখনও স্পষ্টভাবে, কখনও বা রূপক ইত্যাদির মাধ্যমে হেঁয়ালিতে বর্ণিত হয়েছে। কখনও নৌকা বাওয়ার বর্ণনা, কখনও ইঁদুরের রূপক, কখনও বা মাতাল হাতি, আবার কখনও বাদ্যযন্ত্রের রূপকের মধ্যে দিয়ে এই তত্ত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। এগুলি বিশ্লেষণ করলে সর্বত্রই যোগসাধনার পদ্ধতির কথাই পাওয়া যায়। প্রতিটি ছবিই বহন করে গুহ্য তন্ত্রসাধনার ইঙ্গিত। প্রথম চর্যাতেই বলা হয়েছে: “ধমণ-চমণ বেণি পাণ্ডি বইঠা” (ধমন ও চমন এই যুক্ত পিড়ির উপর বসে)। এই ধমন-চমন বৌদ্ধতন্ত্রের পরিভাষায় ইড়া-পিঙ্গলা ছাড়া আর কিছুই নয়। ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষূম্না চর্যাগীতিগুলির মধ্যে বারবার ভিন্ন ভিন্ন নামে উল্লিখিত হয়েছে। তন্ত্রের ইড়া বা মহাযানী বৌদ্ধদের প্রজ্ঞা বৌদ্ধতন্ত্রে এসে ললনা, চন্দ্র, শশী, অপান, ধমন, আলি, নাদ, গঙ্গা, গ্রাহক, ‘এ’ ইত্যাদি নাম নিয়েছে। অন্যদিকে তন্ত্রের পিঙ্গলা বা মহাযানীদের উপায় বৌদ্ধতন্ত্রে অবহিত হয়েছে রসনা, সূর্য, রবি, প্রাণ, চমন, কালি, বিন্দু, যমুনা, গ্রাহ্য, ‘’বং’ ইত্যাদি নামে। মধ্যনাড়ী সুষূম্না বা বৌদ্ধতন্ত্রের অবধূতী বা অবধূতিকা চর্যাগীতিতে অভিহিত হয়েছে শুণ্ডিনী, ডোম্বী, চণ্ডালী, নৈরামণি, সহজ সুন্দরী ইত্যাদি নামে। পূর্বে উদ্ধৃত পংক্তিটিতেও ধমন-চমন যুক্ত পিড়ির উপর বসা আসলে ইড়া-পিঙ্গলার প্রাণ ও অপান বায়ুকে সুষূম্না পথে পরিচালিত করার ইঙ্গিতই বহন করছে।
তৃতীয় চর্যাগীতিতে অনুরূপ এক প্রক্রিয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়:
এক সে শুণ্ডিণি দুই ঘরে সান্ধঅ।
চীঅণ বাকলঅ বারুণী বান্ধঅ।।
সহজে থির করি বারুণী সান্ধ।
জেঁ অজরামর হোই দিঢ় কান্ধ।।
অর্থাৎ, “এক শুণ্ডিণী (অবধূতিকা) দুইকে (বাম ও দক্ষিণ নাড়ী দুটিকে অথবা টীকানুযায়ী ‘চন্দসূর্যৌ বাম-দক্ষিণৌ… দ্বৌ’) ঘরে (মধ্যমায় বা মধ্যনাড়ীতে) প্রবেশ করান। চিকণ (অবিদ্যামল শূন্য) বাকল দ্বারা [সুখপ্রমোদ স্বরূপ] বারুণী বা বোধিচিত্তকে বন্ধন করেন। [বোধিচিত্তরূপ] বারুণী সহজানন্দে প্রবেশ করেন, যার দ্বারা অজর ও অমর হয়ে [সাধক] দৃঢ়স্কন্ধ (যোগদেহ) লাভ করে।” এখানেও অবধূতিকা কর্তৃক বাম ও দক্ষিণ নাড়ী দুটিকে মধ্যপথে পরিচালনা এবং পরে চিত্তের মহাসুখ স্বরূপ সহজানন্দ লাভের ইঙ্গিত অত্যন্ত সুস্পষ্ট।
আবার পঞ্চম চর্যাগীতিতে কথিত হয়েছে:
ভবণই গহণ গম্ভীর বেগেঁ বাহী।
দুআনতে চিখিল মাঝে ন থাহী।।
ধামার্থে চাটিল সাঙ্কম গঢ়ই।
পারগামী লোঅ নিভর তরই।।...
সাঙ্কমত চড়িলে দাহিণ বাম মা হোহী।
নিয়ড্ডি বোহি দূর মা জাহি।।
অর্থাৎ, “ভবনদী গহন গম্ভীর বেগে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর দুই তীর কর্দমাক্ত, মাঝখানে ঠাঁই নেই। ধর্মার্থে চাটিল সাঁকো গড়ল। পারগামী লোকে নিশ্চিন্তে পার হয়ে গেল। সাঁকোতে চড়ে বাঁয়ে-ডাইয়ে যেয়ো না। বোধি নিকটেই আছে, দূরে যেয়ো না।” আপাতদৃষ্টিতে এখানে ভবসংসারকে নদীস্রোতের সঙ্গে তুলনা এবং মধ্যপথ অবলম্বনের নির্দেশ ইত্যাদি বৌদ্ধদর্শনের তাত্ত্বিক বর্ণনা বলেই মনে হয়। বস্তুত পদটিতে বৌদ্ধদর্শনের কাঠামোটি সার্থকভাবে রূপায়িত হয়েছে। কিন্তু তাকে ছাপিয়ে এই পদে তান্ত্রিক সাধনপদ্ধতির ইঙ্গিতও সুস্পষ্ট। ভবনদী বলতে এখানে দেহের মধ্যস্থিত নাড়ীগুলিকে বোঝানো হয়েছে। এই নদীর দুই তীর কর্দমাক্ত অর্থাৎ বাঁদিক ও ডানদিকের দুই তীর বিষয়াসক্তির দিকে নিয়ে যায়। মধ্যপথ গভীর অর্থাৎ পরম সত্য গভীর। সাঁকো সংবৃতি ও পারমার্থিক বোধিচিত্তের মিলন বোঝায়। যখন কেউ সাঁকোতে চড়ে অর্থাৎ সংবৃতি বোধিচিত্তকে পারমার্থিক বোধিচিত্তে পরিণত করার সাধনায় নিযুক্ত হয়, তখন যেন সে বাঁদিকে বা ডানদিকে না যায়, অর্থাৎ মধ্যনাড়ীর মধ্যে দিয়েই পরম সত্য লাভে তৎপর থাকে।
সপ্তম চর্যাগীতিতে কাহ্নপাদ বলেছেন: “আলিএঁ কালিএঁ বাট রুন্ধেলা। তা দেখি কাহ্ন বিমণ ভইলা।।” অর্থাৎ, “আলি ও কালি (ইড়া ও পিঙ্গলা) পথ (সুষূম্না অর্থাৎ মধ্যপথ বা অবধূতী মার্গ) রুদ্ধ করল; তা দেখে কাহ্ন বিমন হলেন।” অষ্টম চর্যাগীতিতে বলা হয়েছে: “বাম দাহিণ চাপী মিলি মিলি মাঙ্গা। বাটত মিলিল মহাসুহ সাঙ্গা।।” অর্থাৎ, “বাঁদিকে-ডানদিকে চেপে পথে সঙ্গে মিলে মিলে [বিরমানন্দের পথে যখন] চললাম, তখন পথেই মহাসুখের সঙ্গ মিলল।”
আবার নবম চর্যাগীতিতে বলা হয়েছে:
এবং কার দৃঢ় বাখোড় মোড়িউ।
বিবিহ বিআপক বান্ধন তোড়িউ।।
কাহ্নু বিলসঅ আসব মাতা।
সহজ নলিনীবন পইসি নিবিতা।।
অর্থাৎ, “‘এ’ ও ‘বং’ (চন্দ্র ও সূর্য নাড়ী) দৃঢ় স্তম্ভ দুটিকে মর্দিত করে এবং বিবিধ বিপাকের বন্ধন ছিন্ন করে কাহ্নু সহজানন্দ রূপ পদ্মবনে প্রবেশ করে আসবমত্ত হলেন।” ব্যাপক অর্থে, দুই নাড়ীর উপর প্রভাব বিস্তার করে সেগুলিকে প্রকৃতি দোষ থেকে মুক্ত করে আয়ত্ত্বে এনে কাহ্নপাদ মহাসুখ স্বরূপ পদ্মবনে প্রবেশ করলেন। আবার একাদশ চর্যাগীতিতে তিনি বলেছেন: “আলি কালি ঘণ্টা নেউর চরণে। রবি শশী কুণ্ডল কিউ আভরণে।” অর্থাৎ, “আলি-কালিকে চরণের ঘণ্টা নূপুর এবং রবি-শশীকে [কানের] কুণ্ডল করা হল।” এর মাধ্যমে আলি-কালি, রবি-শশী অর্থাৎ দুই দিকের দুই নাড়ীর উপর পূর্ণ প্রভাব বিস্তারের কথা বলা হয়েছে।
ডোম্বীপাদও তাঁর একটি পদে (পদসংখ্যা ১৪) এই দুই নাড়ীকে মধ্যপথে প্রবেশ করানোর কথা বলেছেন:
গঙ্গা জউনা মাঝেঁ রে বহই নাঈ।
তহিঁ বুড়িলি মাতঙ্গি পোইআ লীলেঁ পার করেই।।...
চান্দ সূজ্জ দুই চকা সিঠি সংহার পুলিন্দা।
বাম দাহিণ দুই মাগ ন রেবই বাহতু ছন্দা।
অর্থাৎ, “গঙ্গা-যমুনার মধ্যপথে নৌকা প্রবাহিত হয়। সেখানে নিমজ্জিত সহজানন্দ প্রমত্তাঙ্গী ডোম্বী সন্তানকে অন্য পারে নিয়ে যায়।… চন্দ্র-সূর্য দুই চাকা; সৃষ্টি-সংহারের অদ্বয় অবস্থা মাস্তুল। বাঁয়ে-ডাইনে দুই পথ দেখা যাচ্ছে না, আনন্দে নৌকা বাও।” এখানে চন্দ্র-সূর্য ও গঙ্গা-যমুনা বলতে বাম ও দক্ষিণের নাড়ী দুটিকেই বোঝানো হয়েছে। শান্তিপাদও পঞ্চদশ চর্যাগীতিতে বলেছেন: “বাম দাহিণ দো বাট চ্ছাড়ী সান্তি বুলেথেউ সংকেলিউ।” অর্থাৎ, “বাম দক্ষিণ দুই পথ ছেড়ে শান্তি ঘুরে বেড়ান।”
সপ্তদশ চর্যাগীতিতে বীণাপাদ লিখেছেন:
সুজ লাউ শশি লাগেলি তান্তী।
অণহা দাণ্ডী একি কিঅত অবধূতী।।...
আলি কালি বেণি সারি সুণিআ।
গঅবর সমরস সান্ধি গুণিআ।।
অর্থাৎ, “সূর্যকে লাউ ও শশীকে তন্ত্রী করে এবং অবধূতীকে দণ্ড করে [বীণাপাদ একটি বীণা করেছেন]। আলি-কালির যুক্ত সুর শুনে হস্তীশ্রেষ্ঠ [চিত্ত] সমরসে প্রবিষ্ট হল।” এখানে সূর্য ও চন্দ্র স্পষ্টতই বাম ও দক্ষিণের দুই নাড়ী। সরহপাদও ৩২ সংখ্যক পদে বলেছেন: “বাম দাহিণ জো খাল বিখলা। সরহ ভণই বাপা উজুবাটা ভইলা।।” অর্থাৎ, “বাম দক্ষিণে খাল বিখাল; সহজ পথই নিরাপদ পথ।”
চর্যাগীতিতে দেহতত্ত্ব
[সম্পাদনা]একাধিক চর্যায় দেহের প্রাধান্যের কথা আছে। তন্ত্রে দেহকে যেমন সকল সত্যের আধার বলে বর্ণনা করা হয়েছে, চর্যাগীতিগুলিতেও অনুরূপ বক্তব্যই লক্ষ্য করা যায়। ১১ সংখ্যক চর্যায় কাহ্নপাদ বলেন: “কাহ্ন কপালী যোগী পইঠ অচারে। দেহ নঅরী বিহরই একাকারেঁ।।” অর্থাৎ, কাহ্ন কাপালিক যোগী হয়েছেন এবং যোগাচারে প্রবেশ করেছেন। তিনি অদ্বয়ভাবে দেহনগরীর মধ্যেই বিহার করছেন।
কয়েকটি চর্যায় দেহকে নৌকা করে সাধনার কথা বলা হয়েছে। ৩৮ সংখ্যক চর্যায় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিরূপ এই দেহনৌকাকে জগৎ-সংসারে বেয়ে চলার কথা বলা হয়েছে এইভাবে:
কাঅ ণাবড়ি খাণ্টি মন কেড়ুয়াল।
সদ্গুরু বঅণে ধর পতবাল।।
চীঅ থির করি ধরহুরে নাই।
আণ উপায় পার ণ জাই।।
অর্থাৎ, “ভবসাগরের মধ্যে দেহ হল নৌকা, খাঁটি মন হল দাঁড়। সদ্গুরুর বচনে হাল ধরো। চিত্ত স্থির করে নৌকা ধরো, অন্য উপায়ে পারে যাওয়া যাবে না।” আবার ১৩ সংখ্যক চর্যায় পাওয়া যায়: “তিশরণ ণাবী কিঅ অঠক মারী। ণিঅ দেহ করুণা শূণমে হেরী।।” অর্থাৎ, “ত্রিশরণ দেহকে নৌকা করে অষ্ট মহাসিদ্ধিকে মেরে দেহনৌকাকে শূন্য করুণার অদ্বয় অবস্থার ভিতর ভাসমান দেখছে।”
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দেহের ভিতরেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, এই দেহেই সাধনা, এখানেই পরমসিদ্ধি—এই তত্ত্বটি তান্ত্রিক। মধ্যযুগে ভারতীয় সাধনার ধারায় এই তত্ত্বটি বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। বৌদ্ধ দোহাগুলিতেও এই তত্ত্বটি স্থান পেয়েছে:
এত্থুসে সুরসরি জমুণা এত্থুসে গঙ্গা সাঅরু।
এত্থু পআগ বণারসি এত্থুসে চন্দ দিবাঅরু।।
ক্খেত্তূপীঠ উপপীঠ এত্থু মইঁ ভমই পরিঠ্ঠও।
দেহা সরিসঅ তিত্থ মইঁ সুহ অণ্ণ ণ দীঠ্টও।।
অর্থাৎ, “এই দেহেই গঙ্গা ও যমুনা, এখানেই গঙ্গাসাগর; এখানেই প্রয়াগ, বারাণসী, এখানেই চন্দ্র, সূর্য, ক্ষেত্র, পীঠ, উপপীঠ; এর চারিদিকে ভ্রমণ করি আমি। এই দেহ-সদৃশ তীর্থে যে সুখলাভ হয়, এমন আমি কোথাও দেখিনি।” পরবর্তীকালে কবীর, দাদু প্রমুখের পদেও অনুরূপ দেহতত্ত্বের কথা পাওয়া যায়।
কায় ও চক্র পরিকল্পনা
[সম্পাদনা]বৌদ্ধতন্ত্র অনুযায়ী, পরম সত্য দেহের মধ্যেই বিদ্যমান। দেহের কোথায় ও কীভাবে তা বিদ্যমান এবং কীভাবেই তা উপলব্ধি করা যায়, সে আলোচনায় বৌদ্ধতন্ত্রে করা হয়েছে। বুদ্ধের ঐতিহাসিক অস্তিত্বে অবিশ্বাসী মহাযানপন্থীরা ত্রিকায় পরিকল্পনার মাধ্যমে বুদ্ধের তিনটি স্তরভেদের কথা প্রচার করেছিলেন। তাঁদের এই ত্রিকায় পরিকল্পনা তন্ত্রের ষট্চক্রের স্থান গ্রহণ করে। তন্ত্রে দেহের মধ্যে মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ ও আজ্ঞা নামে ছটি চক্রের কল্পনা করা হয়েছে। মূলাধার চক্রে অবস্থিত কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগ্রত করে ছটি চক্রের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত করে মস্তকস্থ সহস্রার পদ্মে শিবের সঙ্গে মিলিত করাই তান্ত্রিকদের কাম্য। বৌদ্ধতন্ত্রেও দেখা যায়, বোধিচিত্ত প্রথমে উৎপন্ন হয় নাভিদেশে নির্মাণচক্রে (নির্মাণকায়ে); সেখান থেকে তাকে ঊর্ধ্বমুখী করে হৃদয়ে স্থিত ধর্মচক্রে (ধর্মকায়ে) উন্নীত করতে হয় এবং তারপরে কণ্ঠে অবস্থিত সম্ভোগচক্রে (সম্ভোগকায়ে) তা উপনীত হয়। অবশ্য বৌদ্ধধর্মের ত্রিকায় পরিকল্পনা বৌদ্ধতন্ত্রে এসে কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। কারণ নির্মাণ, সম্ভোগ ও ধর্ম এই ক্রমানুসারে হৃদয়স্থিত চক্র হওয়া উচিত ছিল সম্ভোগচক্র এবং কণ্ঠস্থিত চক্র হওয়া উচিত ছিল ধর্মচক্র। তা না হয়ে হৃদয়ে ধর্মচক্র ও কণ্ঠে সম্ভোগচক্র হয়েছে। সে যাই হোক, এই তিন চক্রের সঙ্গে বৌদ্ধতন্ত্রে সহস্রার অনুকরণে আরেকটি কায় কল্পনা করে মহাসুখকায় বা মহাসুখচক্র (মহাসুখকমল) এই কায় পরিকল্পনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বৌদ্ধতন্ত্রের এই চারটি কায় পরিকপনার সঙ্গে মিশেছে পরম সত্য যে শূন্যস্বরূপ সেই শূন্যতার চারটি বিভাগ। পরম সত্যের অবস্থানের চারটি স্তর বা চক্র পরে তাই চার শূন্যের সঙ্গে এক হয়ে গিয়েছে।
সাধনসঙ্গিনী: চণ্ডালী, ডোম্বী, শবরী ইত্যাদি
[সম্পাদনা]বোধিচিত্তের দুটি রূপ—সংবৃতি ও পারমার্থিক। সংবৃতি বোধিচিত্তের স্বরূপ চঞ্চল ও নিম্নগ। তাকে ঊর্ধ্বগ করাই সাধনা। অবধূতিকার পথে প্রজ্ঞা ও উপায়কে মিলিত করে বোধিচিত্তকে জাগ্রত করে তাকে ক্রমে বিভিন্ন চক্রের মধ্যে দিয়ে সহজ চক্রে উন্নীত করলে সেই বোধিচিত্তই হয় পরমানন্দের কারণ মহাসুখ-স্বরূপ পারমার্থিক বোধিচিত্ত। এই মহাসুখই সহজ সুন্দরী, নৈরামণি, নৈরাত্মা। নাভিদেশে নির্মাণচক্রে তিনি চণ্ডালী, শবরী, ডোম্বী।
৪ সংখ্যক চর্যায় পাওয়া যায়: “খেপহুঁ জোইনি লেপ ন জাঅ। মণিকূলে বহিআ ওড়িআণে সমাঅ।।” যোগিনী স্বস্থানের যোগবশত মণিমূলে লিপ্ত হতে পারে না; মণিমূল বেয়ে গমন করে ঊর্ধ্বে। অর্থাৎ বোধিচিত্তের স্বস্থান হল মহাসুখচক্র। তাই তার প্রথম উৎপত্তি মণিমূলে হলেও তা ঊর্ধ্বগ হচ্ছে এবং মহাসুখকমলে প্রবেশ করছে।
২৭ সংখ্যক চর্যায় আছে:
অধরাতিভোর কমল বিকসিউ।
বতিস জোইনী তসু অঙ্গ উহ্লসিউ।।...
চলিঅ ষষহর গউ নিবাণেঁ।
কমলিনি কমল বহই পণালেঁ।।
অর্ধরাত্রি ভোর অর্থাৎ প্রজ্ঞাজ্ঞানাদি অভিষেকদানের সময়ে কমল অর্থাৎ উষ্ণীষ কমল বিকশিত হল; বত্রিশ যোগিনী অর্থাৎ ললনা-রসনা ইত্যাদি বত্রিশ নাড়ী আনন্দে উল্লসিত হল; শশধর অর্থাৎ চিত্ত নির্বাণে অর্থাৎ বজ্রশিখরাগ্রে বজ্রকায়ে প্রবিষ্ট হল; কমলিনী অর্থাৎ পরিশুদ্ধাবধূতিকা নৈরাত্মা কমলপ্রণালে অর্থাৎ মহাসুখের পথে প্রবাহিত হল।
শবরী আমাদের দেহের মধ্যেই উঁচু উঁচু পর্বতে বাস করেন: “উচাঁ উচাঁ পাবত তহি বসহি সবরী বালী”। দেহমধ্যস্থ এই উঁচু পর্বতের ব্যাখ্যাপ্রসঙ্গে টীকাকার বলেছেন: “যোগীন্দ্রস্যস্বকায়কঙ্কালদণ্ডমুন্নতং সুমেরু শিখরাগ্রে মহাসুখচক্রে”। ১০ সংখ্যক চর্যাতে আছে: “এক সো পদমা চৌষঠ্ঠ পাখুড়ী। তহিঁ চড়ি নাচঅ ডোম্বী বাপুড়ী।।” অর্থাৎ, “এক সে পদ্ম [তার] চৌষট্টি পাপড়ি; তাতে চড়ে নাচে ডোম্বী [ও] বাপুড়ী।” পদ্ম এখানে নির্মাণচক্র, তার উপর মহারাগ-আনন্দসুন্দর (কাহ্নপাদ) নৃত্য করছেন ডোম্বীর সঙ্গে। ইন্দ্রিয়াদি দ্বারা যাকে স্পর্শ করা যায় না, তিনি ‘অস্পর্শা’; তাই তিনি ডোম্বী। অনেক চর্যাতেই এই দেহমধ্যস্থ বিভিন্ন চক্রের বা পদ্মের কথা উল্লিখিত হয়েছে। যেমন: “সুন নৈরামণি কণ্ঠে লইআ মহাসুহে রাতি পোহাই” (শূন্যস্বরূপ নৈরাত্মাকে কণ্ঠে অর্থাৎ কণ্ঠস্থ সম্ভোগচক্রে নিয়ে রাত্রিযাপন করি); কিংবা “বিদুজন লোঅ তোরে কণ্ঠ ন মেলই” (বিজ্ঞ লোকেরা তোমাকে কণ্ঠে অর্থাৎ সম্ভোগচক্র থেকে বিচ্ছিন্ন করেন না) ইত্যাদি।
চর্যার এই শবরী, ডোম্বী, ডোম্বিনী, চণ্ডালী, যোগিনী, নৈরামণিই তন্ত্রোক্ত শক্তি। বৌদ্ধতন্ত্রে এই শক্তির উদ্ভব ও ঊর্ধ্বমুখে গমন ইত্যাদি বিষয়ে যে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়, তা থেকেই বোঝা যায় অন্তত তত্ত্বের দিক থেকে এই ডোম্বী, চণ্ডালী ইত্যাদিরা নরমাংসের দেহধারী সাধনসঙ্গিনী ছিলেন না, বরং এগুলি ছিল দেহমধ্যস্থ শক্তিরই বিভিন্ন নাম মাত্র। প্রজ্ঞা ও উপায়কে অবধূতী মার্গে প্রথম মিলিত করার মুহূর্তে মণিমূলে জাগ্রত এই শক্তিই চণ্ডালী, ডোম্বী ইত্যাদি নামে অভিহিত। ইনিই আবার যখন সম্ভোগচক্রে অবস্থান করেন, তখন অধিকাংশ চর্যায় অভিহিত হন নৈরামণি বা নৈরাত্মা নামে। আবার মহাসুখচক্রে উন্নীত হয়ে তিনিই হন সহজ সুন্দরী। এই শক্তি তন্ত্রমতে শিবের ঘরনী এবং বৌদ্ধতন্ত্রে এই সহজ সুন্দরী নৈরামণি বজ্রসত্ত্বের গৃহিনী। তা সত্ত্বেও কাব্যে অনেক স্থানেই সিদ্ধিকামী প্রেমিকা বা সাধনসঙ্গিনী রূপেও কল্পিতা হয়েছেন তিনি। এ-হেন প্রেমের পরিকল্পনা তাত্ত্বিকভাবে তন্ত্র-সমর্থিত না হলেও পরবর্তীকালে এর আগমন ঘটা অসম্ভব বা অস্বাভাবিক নয়। প্রেমের রূপক ও চিত্রাদির বর্ণনা থেকে ড. সুকুমার সেন প্রমুখ অনেকেই মনে করেন যে, তন্ত্রোক্ত শক্তি ‘চণ্ডালী’ ক্রমে বাস্তবের সাধনসঙ্গিনীতে পরিণত হয়েছিলেন।
বৌদ্ধ তন্ত্রগ্রন্থ হেবজ্রতন্ত্রে মন্ত্র উপাদান সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, অধিকারীভেদে মন্ত্র ভিন্ন ভিন্ন; সুতরাং মন্ত্র নিরূপণের জন্য কুলনির্ণয়ের প্রয়োজন। বৌদ্ধতন্ত্রের পঞ্চ কুল: বজ্র, পথ, কর্ম, তথাগত ও পদ্ম। এগুলির আবার অন্য নামও ছিল: ডোম্বি, নটী, রজকী, ব্রাহ্মণী ও চণ্ডালী। কুলের এ-হেন নামকরণ সাধনসঙ্গিনীর পর্যায়ভেদ থেকেও হওয়া সম্ভব; অথবা হয়তো এই নামগুলি কুলভেদে সাধনসঙ্গিনী ভেদের কথাই ইঙ্গিত করে। ড. নীহাররঞ্জন রায়ও চণ্ডীদাসের সাধনসঙ্গিনী রজকিনীর প্রসঙ্গে তাঁকে চণ্ডীদাসের সাধনার কুলজ্ঞাপক মনে করেছেন।
তন্ত্রের শক্তি পরিকল্পনা বিকৃত হয়ে দেহধারী সাধনসঙ্গিনীতে পরিণত হয়েছিল। তাই এমনও হতে পারে যে, বৌদ্ধ তান্ত্রিকদের ক্ষেত্রেও অনেকের বাস্তব সাধনসঙ্গিনী ছিল এবং যে-সব পদে এই প্রেম, সুরত ইত্যাদির কথা আছে, (১৮, ১৯, ২০ ইত্যাদি সংখ্যক চর্যা), সেগুলিই তার ইঙ্গিত বহন করছে। অবশ্য তত্ত্বের দিক থেকে যে এই বাস্তব সাধনসঙ্গিনীর ধারণাটির প্রতি কোনও সমর্থন ছিল না, এ-কথাও মনে রাখতে হবে।
মহাসুখ
[সম্পাদনা]চর্যায় মহাসুখ ধারণাটিরও বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। এই মহাসুখ আনন্দময় অবস্থা। প্রজ্ঞা ও উপায়ের মিলিতাবস্থাতেই মহাসুখের উৎপত্তি। বোধিচিত্ত যখন নির্মাণচক্রে অবস্থান করে তখন যে আনন্দ তা শুধুই আনন্দ। ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী এই আনন্দকে বলেছেন ‘প্রথমানন্দ’। এরপর বোধিচিত্তের ধর্মচক্রে, সম্ভোগচক্রে ও শেষে মহাসুখচক্রে উপস্থিতিতে যে যে আনন্দ তা যথাক্রমে পরমানন্দ, বিরমানন্দ ও সজজানন্দ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বোধিচিত্তের উৎপত্তির পর চিত্তের বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে দিয়ে গমনের জন্য কর্মমুদ্রা, ধর্মমুদ্রা, মহামুদ্রা ও সময়মুদ্রা নামে চারটি মুদ্রা আছে। এর সঙ্গে বিচিত্র, বিপাক, বিমর্দ ও বিলক্ষণ নামে চারটি মানসিক অবস্থা বা ক্ষণের বর্ণনাও পাওয়া যায়। ড. সুকুমার সেন সম্ভবত এগুলির সঙ্গে যুক্ত করে আনন্দের শ্রেণিবিভাগের সময় নামকরণ করেছেন বিচিত্রানন্দ, বিপাকানন্দ, বিরমানন্দ ও সহজানন্দ। আবার ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত শ্রীকালচক্রতন্ত্র, হেবজ্রতন্ত্র ইত্যাদি গ্রন্থের উদাহরণ দেখিয়ে আনন্দের শ্রেণিবিভাগ করেছেন আনন্দ, পরমানন্দ, বিরমানন্দ ও সহজানন্দ নামে।
মহাসুখ বা সহজানন্দে যোগীর অবস্থা কীরকম হয় তারও দীর্ঘ বর্ণনা বৌদ্ধতন্ত্রে পাওয়া যায়। এই মহাসুখাবস্থায় ইন্দ্রিয়গুলি যেন ঘুমিয়ে পড়ে, মন যেন অভ্যন্তরে প্রবেশ করে, সমস্ত চেষ্টা নষ্ট হয়, দেহ যেন মহাসুখে মুর্চ্ছিত হয়। এই অবস্থায় উপনীত হলে সমস্ত মায়িক জগতের উপলব্ধি নষ্ট হয়, আত্মপর ভেদ লুপ্ত হয়, ভবমোহ ঘুচে যায়, শূন্যতাজ্ঞান লাভ হয়। সাধক তখন প্রমত্তের ন্যায় অবস্থান করেন। ৩৬ সংখ্যক চর্যায় পাওয়া যায়:
ঘুমই ন চেবই স পর বিভাগা।
সহজ নিদালু কাহ্নিল লাঙ্গা।।
চেঅণ ণ বেঅণ ভর নিদ গেলা।
সঅল মুকল করি সুহে সুতেলা।।
অর্থাৎ, “কাহ্নু সহজ নিদ্রায় অভিভূত; তিনি আত্মপর ভেদ করছেন না। তাঁর চেতনা বেদনা কিছুই নেই; সব কিছু থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সুখে নিদ্রাভিভূত আছেন।”
৪২ সংখ্যক চর্যায় পাওয়া যায়: “চিঅ সহজে সুন সংপুন্না। কান্ধ বিয়োএ মা হোহি বিসন্না।।” (চিত্ত সহজ দ্বারা শূন্য সম্পূর্ণ, স্কন্ধ বিয়োগ দ্বারা আর বিষণ্ণ হোয়ো না।) ৯ সংখ্যক চর্যায় আছে: “কাহ্নু বিলাসঅ আসব মাতা। সহজ নলিনি বণ পইসি নিবিতা।” (কাহ্নু সহজরূপ নলিনীবনে প্রবেশ করে আসবমত্তের ন্যায় বিলাস করছেন)। ১৬ সংখ্যক পদে পাওয়া যায়: “মহারসপানে মাতেলরে তিহুঅণ সএল উএখী। পঞ্চ বিসঅ নায়করে বিপখ কোবি ন দেখি।।” (মহারস অর্থাৎ সহজানন্দ পানে মত্ত চিত্ত ত্রিভুবনে সকল উপেক্ষা করে; পঞ্চ বিষয়ের নায়ক হয়ে অর্থাৎ নিজেই বজ্রসত্ত্ব হয়ে কাউকেই শত্রু দেখে না।) আবার ৩০ সংখ্যক চর্যায় দেখা যায়:
উইএ গঅণ মাঝেঁ অদভূআ।
পেখরে ভুসুকু সহজ সরুআ।।
জাসু সুণন্তে তুটই ইন্দিআল।
নিহুরে নিঅমন দে উলাস।।
অর্থাৎ, “গগনে আশ্চর্য সহজানন্দ উদিত হয়েছে, দেখো ভুসুকু সহজ স্বরূপ। তা দেখে সমস্ত ইন্দ্রিয়জাল ছিন্ন হয়, মন আনন্দে মত্ত হয়।” এইরকম উদাহরণ চর্যাপদে প্রচুর পাওয়া যায়।
গোপনীয়তা ও গুরুবাদ
[সম্পাদনা]গোপনীয়তা তন্ত্রের তত্ত্ব ও সাধনপদ্ধতির অপরিহার্য অঙ্গ তথা বৈশিষ্ট্য। তন্ত্রতত্ত্ব অতি গুহ্য; তা অদীক্ষিতের কাছে প্রকাশ্য নয়। কেবল দীক্ষিত সাধকই গুরুর কাছ থেকে এই তত্ত্ব লাভ করে তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন বলে মনে করা হয়। এই কারণেই তন্ত্রে গুরুবাদের প্রাধান্য। এই গুরুপ্রাধান্য চর্যাগীতিগুলিতে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। তত্ত্ব ও সাধনপদ্ধতি সেখানে বর্ণিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সবার উপরে আছে গুরুর উপর নির্ভরশীল হওয়ার কথা। যেমন: “লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জান” (লুই বলছে, গুরুকে জিজ্ঞাসা করে জানো); “জই তুহ্মে লোঅ হোইব পারগামী। পুচ্ছতু চাটিল অনুত্তর সামী।” (যদি তোমরা কেউ পারগামী হও, অনুত্তর স্বামী চাটিলকে জিজ্ঞাসা করো)। ৩৫ সংখ্যক পদে এই গুরু আবার বজ্রযানের প্রভাবে হয়েছেন বজ্রগুরু: ৩৫ সংখ্যক পদে এই গুরু আবার বজ্রযানের প্রভাবে হয়েছেন বজ্রগুরু: “বাজুলে দিল মো লক্খ ভণিআ” (বজ্রগুরু আমাকে লক্ষ্য বলে দিয়েছেন)। গুরুবাদের এ-হেন উল্লেখ চর্যাপদে প্রচুর দেখা যায়।
চর্যাকারদের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]সহজিয়া
[সম্পাদনা]চর্যায় উল্লিখিত ধর্মমত ও সাধনপদ্ধতি স্বরূপত যাই হোক, চর্যাকারদের ধর্মের একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল। মধ্যযুগের সাধনার সমন্বয়ের কথা মনে রেখে অনুসন্ধান করলে এই তান্ত্রিক মতের সঙ্গে অন্যান্য কিছু মতের সাদৃশ্য এবং অন্যান্য কয়েকটি ধর্মের প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। এই সমন্বয় ও সাদৃশ্যের মূল কারণ চর্যাকার সাধকদের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এঁরা ছিলেন সহজিয়া। এই সহজিয়াকে কোনও ধর্মসম্প্রদায় না বলে ধর্ম সম্পর্কে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিই বলা উচিত। আনুমানিক অষ্টম-নবম শতক থেকে সমগ্র মধ্যযুগ ধরে বাংলায় বিবর্তিত হতে থাকা বৌদ্ধধর্ম, কৌলধর্ম, নাথপন্থ, সহজিয়া বৈষ্ণবধর্ম ইত্যাদি সকল মত ও পথের মধ্যে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদি বিষয়ে যেমন সাদৃশ্য ছিল, তেমনই মিল ছিল এই মতগুলির দৃষ্টিভঙ্গিতে। প্রকৃত অর্থে এই প্রত্যেকটি মতের উপর সহজিয়া প্রভাবই এই সাদৃশ্যের মূল কারণ।
প্রতিবাদী মনোভাব: অনুষ্ঠানবাহুল্যে ও জ্ঞানমার্গে বিতৃষ্ণা
[সম্পাদনা]অন্যান্য সহজিয়াদের মতো বৌদ্ধ সহজিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল প্রচলিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদির প্রতি বিতৃষ্ণা। তাঁদের মতে, পরম সত্য লাভ আচার পালন বা জপতপ, শাস্ত্রচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পরম সত্য কেবল সহজ তত্ত্বে দীক্ষা ও যোগাভ্যাসের মধ্যে দিয়েই অন্তরে উদ্ভাসিত হয়। যোগাভ্যাসকেই তাঁরা মানুষের পক্ষে সবচেয়ে সহজ পন্থা মনে করতেন; কারণ, তাঁরা মনে করতেন কঠিন সংযম পালনের মধ্যে যে অস্বাভাবিকতা আছে তা মানুষকে রোগগ্রস্থ করে তোলে। সহজিয়ারা মানুষের সহজ স্বভাবকে পীড়িত না করে স্বভাবসম্মত পথেই সত্য উপলব্ধির নির্দেশ দিয়েছেন। অবশ্য তাতে নৈতিকতার অভাব ছিল না। আসলে সহজিয়ারা মানবিক প্রবৃত্তির উপরেই ধর্মসাধনার পন্থা নির্দেশ করেছেন; এই স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলিকে ধ্বংস না করে, শুধুমাত্র অবদমিত করেই এগুলির রূপান্তর ও উদ্গতির (sublimation) কথা বলেছেন তাঁরা। এই জন্যই তাঁরা সহজিয়া। তাঁদের ধর্ম একদিকে যেমন সহজ অর্থাৎ সরল; অন্যদিকে জীবনের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলির উপর প্রতিষ্ঠিত, তাই সহ-জ অর্থাৎ জন্মগত। চর্যার মধ্যেও এই প্রতিবাদী মনোভাব, আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি বিতৃষ্ণা এবং সহজ পথের প্রতি আসক্তি লক্ষ্য করা যায়। ৩৪ সংখ্যক চর্যায় পাওয়া যায়: “কিন্তো মন্তে কিন্তো তন্তে কিন্তোরে ঝাণ বাখাণে। অপইঠাণ মহাসুহলীলে দুলক্খ পরম নির্বাণে।।” (মন্ত্রে তন্ত্রে ধ্যান ব্যাখ্যানে কিছুই হয় না; মহাসুখলীলায় সুপ্রতিষ্ঠিত হতে না পারলে পরম নির্বাণ লাভ গয় না।) অথবা ১ সংখ্যক চর্যায় পাওয়া যায়: “সঅল সমাহিঅ কাহি করি অই। সুখ দুখেতে নিচিত মরি আই।।” (সকল সমাধি দ্বারা কী হবে; সুখে দুঃখে নিশ্চিত মরবে।) চর্যাকারের মূল সুরটি এই যে, জপতপ, মন্ত্রতন্ত্র, ধ্যানসমাধি কিছুরই প্রয়োজন নেই, সরল সহজ পথ ধরো; বোধি যখন কাছেই, তখন তার জন্য আবর্তিত পথেরও প্রয়োজন নেই, দূরে যাওয়ারও দরকার নেই; যাঁরা সহজ পথে গিয়েছেন তাঁরাই মুক্তিলাভ করেছেন। সহজ পথই যখন এঁদের কাব্য এবং আচার-অনুষ্ঠানে বিতৃষ্ণাই এঁদের স্বভাব, তখন জ্ঞানচর্চার পথও এঁরা পরিহার করবেন, এটাই স্বাভাবিক। বস্তুত সহজ স্বরূপ স্ব-সম্বেদ্য এবং শাস্ত্রপাঠাদির মাধ্যমে তা অবগত হওয়া যায় না বলেই ধারণা। তাই সহজিয়া মতে শাস্ত্রপাঠাদির কোনও সার্থকতাও নেই। ২৯ সংখ্যক চর্যায় আছে: “জাহের বাণ চিহ্ন রূপ ণ জাণী। সো কইসে আগম বেএঁ বখানী।।” (যার, অর্থাৎ সহজের, বর্ণচিহ্ন রূপ জানা যায় না, তার কথা আগমবেদ ইত্যাদিতে ব্যাখ্যা কীভাবে করে?) অথবা ৪০ সংখ্যক চর্যায় পাই:
জো মণ গোঅর আলজালা।
আগম পোথী ইষ্ট মালা।।
ভণ কইসে সহজ বোল বা জাঅ।
কাআ বাক চিঅ জসু ণ সামাঅ।।
অর্থাৎ, “আগমের পুথি, ইষ্টমালা ও সকল ইন্দ্রিয়গোচর বিষয়াদি ইন্দ্রজালতুল্য। সহজের ব্যাখ্যা করা যায় না। দেহ, বাক্য, চিত্ত কিছুই তাতে প্রবেশ করে না।”
সহজিয়াদের আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি বিরূপতা ও প্রতিবাদী মনোভাব অবশ্য বাংলার এক বিশেষ যুগেই প্রাধান্য লাভ করেছিল। এই মনোভাব কোনও নির্দিষ্ট ধর্মসম্প্রদায়ের নিজস্ব মনোভাব নয়। এটি তৎকালীন নানা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সাধারণ মনোভাব। শুধু বাংলাতেই নয়, বাংলার বাইরেও এই মনোভাব জৈনদের পাহুড দোহা, কবীর, দাদু প্রমুখের পদাবলির মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়। সেই হিসেবে দেখতে গেলে এই মনোভাব সর্বভারতীয় মনোভাবেরই বৈশিষ্ট্য। ভারতীয় ধর্মান্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বিবর্তনের কারণ হিসেবে এই প্রতিবাদী মনোভাবটিই চোখে পড়ে। বৈদিক সংহিতা, ব্রাহ্মণ শাস্ত্রাবলি থেকে আরম্ভ করে মধ্যযুগে সহজযানের উৎপত্তি, সব কিছুর পিছনেই সক্রিয় ছিল এই প্রতিবাদের মনোভাব।
সহজের অপর অর্থ
[সম্পাদনা]অবশ্য সহজ সম্পর্কে এই নেতিবাচক দিক ছাড়াও সহজিয়াদের সহজ সম্পর্কে একটি ইতিবাচক মনোভাবও ছিল। সহজিয়া মতে, পরম সত্যের স্বরূপই সহজ। এই সহজের বর্ণনা প্রসঙ্গে তাঁরা যা বলেছেন, তা উপনিষদ্-প্রতিপাদ্য পরব্রহ্ম ধারণার প্রায় সমতুল্য। কিন্তু তার সঙ্গে মিলে গিয়েছে আরও অনেক রূপ ও স্বরূপ। সহজ স্ব-সম্বেদ্য, অবর্ণনীয়, অনির্বচনীয়; তিনিই নির্বাণ, তথতা, তিনিই চতুষ্কোটি বিনির্মুক্ত পরম সত্য; আবার তিনিই বিজ্ঞপ্তি মাত্রতা। তিনি একদিকে বজ্রসত্ত্ব, অন্যদিকে আবার শূন্যতা-করুণার মিলিতাবস্থা মহাসুখ। সহজের পরিকল্পনায় এভাবেই বহু যুগের ধ্যানধারণার সম্মিলন লক্ষ্য করা যায়।