চর্যাপদ/দুলি দুহি পিটা ধরণ না জাই
রাগ গবড়া
কুক্কুরীপাদানাম্
দুলি দুহি পিটা[১] ধরণ না জাই।
রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাঅ[২]।।
আঙ্গণ ঘরপণ সুণ ভো বিআতী।
কানেট চৌরি[৩] নিল অধরাতী। ধ্রু।।
সুসুরা[৪] নিদ গেল বহুড়ী জাগঅ।
কানেট চোরে নিল কা গই মাগঅ[৫]।। ধ্রু।।
দিবসই বহুড়ী কাউই[৬] ডরে ভাঅ।
রাতি ভইলেঁ কামরু জাঅ।। ধ্রু।।
অইসন[৭] চর্যা কুক্কুরীপাএঁ গাইউ[৮]।
কোড়ি মঝেঁ একু হিঅহিঁ[৯] সমাইউ[১০]।। ধ্রু।।
পাঠান্তর
[সম্পাদনা]- ↑ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহের মতে ‘পীঢ়া’
- ↑ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহের মতে ‘খাই’
- ↑ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহের মতে ‘চোরে’
ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচীর মতে ‘চৌরী’ - ↑ টীকায় আছে ‘সসুরা’
- ↑ পুথিতে ‘মাগঅই’ লিখে ‘ই’-তে বর্জন-চিহ্ন দেওয়া হয়েছে
- ↑ মূল: ‘কাড়ই’, বৃত্তি অনুসারে: ‘কাউই’
ড. বিধুশেখর শাস্ত্রীর মতে ‘কাড়ই’
ড. সুকুমার সেনের মতে “কায়কালপুরুষায়”; কালপুরুষ = কাক - ↑ টীকায় আছে ‘অইসনি’
- ↑ মূল: ‘গাইড’
- ↑ মূল: ‘একুড়ি অহি’
- ↑ মূল: সনাইড়
সরলার্থ
[সম্পাদনা]মাদি কচ্ছপকে দোহন করে পাত্রে [দুধ] ধরে না। গাছের তেঁতুল কুমিরে খায়। হে প্রসূতি, শোনো, আঙিনাকে ঘরে প্রবেশ করাও (অন্য ব্যাখ্যায় আঙিনাতেই ঘরসংসার অথবা ঘরের কাছে আঙিনা)। মাঝরাতে চোরে কর্ণভূষণ নিয়ে গেল। শ্বশুরকে নিদ্রা গেল, বউটি জাগে। কর্ণভূষণ চোরে নিল, কোথায় গিয়ে পাওয়া যায়? দিনের বেলা বউটি কাকের ভয়ে ভীত। রাত হলে কামরূপে (অর্থাৎ কামসেবার্থে) যায়। কুক্কুরীপাদ এমন চর্যা গান করেন, কোটির মধ্যে একটি হৃদয়েই তা প্রবেশ করে।
শব্দার্থ বিচার
[সম্পাদনা]দ্বিতীয় চর্যাটি আদ্যন্ত হেঁয়ালির ভাষায় রচিত। সাধারণ শব্দার্থের আড়ালে এটিতে তান্ত্রিক পারিভাষিক শব্দের অন্যতর অর্থটিই উদ্দিষ্ট হয়েছে।
- ‘দুলি’: মাদি কচ্ছপ; এখানে দুই বা দ্বৈতত্ব বুঝিয়েছে;
- ‘পিটা’: পীঠ; নাভিমূলে অবস্থিত মণিপুর চক্র বোঝানো হয়েছে;
- ‘রুখের’: গাছের; এখানে গাছ অর্থে দেহবৃক্ষ;
- ‘তেন্তলি’: তেঁতুল; এখানে বোধিচিত্ত বুঝিয়েছে;
- ‘কুম্ভীরে’: এখানে ‘কুম্ভীরে’ বা কুমিরে শব্দের অর্থ কুম্ভকযোগের দ্বারা;
- ‘আঙ্গন’: আঙিনা; এখানে বিরমানন্দের স্থান বুঝিয়েছে;
- ‘ঘর’: গুহ্য অর্থে মহাসুখচক্র;
- ‘বিআতি’ ও ‘বহুড়ী’: সাধারণ অর্থে প্রসূতি ও বধূ; গুহ্য অর্থে অবধূতিকা;
- ‘কানেট’: সাধারণ অর্থে কর্ণভূষণ; গুহ্য অর্থে প্রকৃতিদোষ;
- ‘চোর’: গুহ্য অর্থে সহজানন্দ;
- ‘রাতি’: সহজানন্দে বিলীন হওয়ার আগের মুহূর্ত বা নিবৃত্তি
- ‘দিবস’: প্রবৃত্তি বা চিত্তের জাগ্রতাবস্থা;
- ‘সসুরা’: সাধারণ অর্থে শ্বশুর, গুহ্য অর্থে শ্বাস;
- ‘কামরু’: গুহ্য অর্থে মহাসুখচক্র।
গূঢ়ার্থ
[সম্পাদনা]এই চর্যাটিতে কুম্ভক-যোগের মাধ্যমে সহজানন্দ উপভোগ করার কথা বর্ণিত হয়েছে। মুনিদত্তের টীকা অনুযায়ী এটির গূঢ়ার্থ নিম্নরূপ:
যারা অনভিজ্ঞ তারা মহাসুখপদ্ম দোহন করে অর্থাৎ চিত্তকে নির্বাণমার্গে চালিত করে বজ্রমণিরূপ পইঠায় ধারণ করতে পারে না অর্থাৎ সহজানন্দ উপভোগ করতে পারে না। কিন্তু গুরুর উপদেশে কুম্ভক-সমাধি দ্বারা দেহবৃক্ষ ফলস্বরূপ চিত্তকে নিঃস্বভাব করা যেতে পারে।
দেহরূপ ঘরের কাছেই অর্থাৎ উষ্ণীষপদ্মে মহাসুখের আঙিনা আছে। ওগো দুঃখনাশিনী অবধূতিকা, আমাকে সেখানে নিয়ে চলো। সেখানে মাঝরাতে অর্থাৎ প্রজ্ঞাজ্ঞান অভিষেকদানের সময়ে পূরক-রেচক ইত্যাদি বর্জিত কুম্ভক দ্বারা আমি স্থিরভাবে বায়ু ধারণ করে সহজানন্দ উপভোগ করতে পারব।
সেই সময়ে শ্বাসবায়ু স্থির হয়ে যখন অতীন্দ্রিয় আনন্দে প্রযুক্ত হয়, তখন ভববিকল্পাদি প্রজ্ঞালিত করে যোগীর পরিশুদ্ধ প্রকৃতিরূপিণী বধূ জেগে থাকে এবং সহজানন্দে পূরকাদি বায়ুপ্রবাহ রহিত হয়ে গ্রাহ্যগ্রাহকভাব তিরোহিত হয়, অর্থাৎ চিত্ত লয়প্রাপ্ত হয়। অতএব তখন প্রার্থনা করার কিছুই থাকে না।
চিত্তের জাগ্রত অবস্থায় যখন ইন্দ্রিয়াদি সতেজ অবস্থায় থাকে তখনই দিন। চিত্তই দৃশ্য দেখার কারণ। অতএব নিজ সংবৃত্তি দ্বারা এই জগৎ সৃষ্টি করে জগতের ভীষণ পরিণতি দেখে নিজেই ভীত হয়। কিন্তু প্রজ্ঞাজ্ঞানের উদয় হলে ইন্দ্রিয়াদির সুষুপ্তির কারণে চিত্ত পরিশুদ্ধ হয়ে নির্বিকল্পাকারে মহাসুখসঙ্গমে গমন করে।
এমন চর্যা কুক্কুরীপাদ গান করেন, যার তত্ত্ব এক কোটি যোগীর মধ্যে একজনের হৃদয়েই প্রবেশ করতে পারে।