আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/রামমোহন, বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমারের অবদান
ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যেই চিঠিপত্র ও দলিল-দস্তাবেজে বাংলা গদ্যসাহিত্যের সূচনা ঘটেছিল। উনিশ শতকের সূচনায় শ্রীরামপুরের খ্রিস্টান মিশনারি ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত ও মুন্সিদের হাতে আধুনিক বাংলা গদ্যের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। এরপর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই বাংলা গদ্যসাহিত্যের অসাধারণ উন্নতি ইতিহাসবিদদের বিস্ময় উৎপাদন করে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধে, গল্পে, উপন্যাসে, সমালোচনায় ও রম্যরচনায় বাংলা গদ্য এতটাই উন্নত হয়ে উঠেছিল যে, এমন অল্প সময়ের মধ্যে এই ধরনের উন্নতি বিশ্বের অন্যান্য ভাষার গদ্যসাহিত্যে বিরল। যাঁদের প্রতিভার দানে বাংলা গদ্যের সাহিত্যিক সৌষ্ঠব ক্রান্তিলগ্নে উপনীত হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে প্রধান হলেন রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দত্ত। এই তিন মনীষীই বিভিন্ন দিক থেকে বাংলা গদ্যকে সম্পূর্ণ হয়ে ওঠার পথে পরিচালনা করেছিলেন।
রাজা রামমোহন রায় ছিলেন যুগন্ধর পুরুষ। তিনি কুড়ি বছরের পরিশ্রমে বাঙালি জাতির জন্য অনাগত কালের জয়বার্তা বহন করে এনেছিলেন। বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে রামমোহন এনেছিলেন এক অভূতপূর্ব বিপ্লব। দেশে তখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন। খ্রিস্টান মিশনারিরা হিন্দুধর্মকে আক্রমণ করে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য তৎপর। এমনই এক সময়ে রামমোহন দৃঢ় হস্তে লেখনী ধারণ করে প্রবন্ধ-পুস্তিকা ও সাময়িকপত্রের সাহায্যে বাঙালি জাতিকে আত্মস্থ হওয়ার পথ দেখিয়েছিলেন। তিনি সাহিত্যসাধনার জন্য গদ্যচর্চা করেননি। তাঁর রচনা ছিল সমাজ সংস্কার, ধর্মসংস্কার ও মিশনারিদের অপপ্রচারের প্রত্যুত্তর দানের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাই তিনি গদ্যভাষার শৈল্পিক সৌন্দর্যের বদলে ঋজুতা ও প্রাঞ্জলতার দিকেই মন দিয়েছিলেন। বাংলা গদ্যকে সরল ও সহজবোধ্য করে তোলার জন্য অনেকে তাঁকে বাংলা গদ্যের জনক বলেছেন। কিন্তু গদ্যভাষার শিল্পিত ও প্রসাধিত রূপায়ণের পরিবর্তে বলিষ্ঠতা ও বিষয়নিষ্ঠার দিকেই তাঁর অনুরাগ ছিল বেশি। বেদান্তের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা, গায়ত্রীর ব্যাখ্যা, রক্ষণশীল সমাজ ও মিশনারিদের বিরুদ্ধে বিতর্কমূলক রচনা সব কিছুতেই তিনি নিরাভরণ গদ্যের বলিষ্ঠ সৌন্দর্য প্রকাশ করেছেন। বাগাড়ম্বর বর্জন ও পরিমিতিবোধ তাঁর রচনার উল্লেখযোগ্য গুণ। বাংলা গদ্যকে তিনি ‘গ্রানিট স্তর’-এর উপর প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁর প্রভাবে গৌরমোহন বিদ্যালঙ্কার, কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ গদ্যশিল্পীরা গদ্যসাহিত্যের সমৃদ্ধিসাধন করেন।
রামমোহনের অব্যবহিত পরেই বাংলা গদ্যকে শিল্পসম্মত রূপ দেওয়ার দায়িত্বও গ্রহণ করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি বাংলা গদ্যকে গৌরবের আসনে বসিয়ে জাতির আত্মপ্রকাশের পথ খুলে দেন। বিদ্যাসাগরের রচনায় বুদ্ধির প্রখরতা ও মনীষার দীপ্তির তুলনায় হৃদয়ধর্মের কোমলতা বেশি। সুকুমারমতি শিক্ষার্থীদের সামনে রেখেই তিনি গদ্যচর্চায় হাত দিয়েছিলেন। পাঠ্যপুস্তক রূপেই তিনি বাসুদেব চরিত ও বেতাল পঞ্চবিংশতি রচনা করেন। তাঁর অধিকাংশ রচনাই অনুবাদমূলক। সংস্কৃত ও ইংরেজি সাহিত্য থেকে শিক্ষামূলক ও হৃদয়ধর্মের অনুকূল গ্রন্থ তিনি অনুবাদের জন্য বেছে নেন। গদ্যভাষাকেও হৃদয়গ্রাহী করে তোলার জন্য শিল্পসম্মত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ভাষাকে ভাবানুগত করার জন্য তিনি যথাস্থানে যতিবিন্যাস করে ভাষার মধ্যে সুষমার সঞ্চার ঘটান। সেই ভাষা শুধু বিতর্কমূলক গদ্য-প্রবন্ধেই নয়, হৃদয়ানুভূতির প্রকাশক রম্যরচনারও উপযোগী হয়েছিল। আসল কথা, গল্প লেখার ভাষা তিনি উদ্ভাবন করেছিলেন। শকুন্তলা-র ভাষা লঘুভার ও নাটকীয় সংলাপে পরিপূর্ণ। আবার সীতার বনবাস-এ দেখা যায় তৎসম শব্দের শ্রুতিমধুর সমাবেশ এবং সাধু গদ্যের চরম উৎকর্ষ। পরবর্তীকালে কথাসাহিত্যের সমৃদ্ধির মূলে বিদ্যাসাগরের গদ্যরীতির দান অনেকখানি। এই কারণে তাঁকেই যথাযথভাবে বাংলা গদ্যের জনক বলা যেতে পারে।
বিদ্যাসাগরের সমসাময়িক তথা তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন বিশিষ্ট যুক্তিবাদী জ্ঞানতপস্বী। চিন্তার ক্ষেত্রে তিনি চপলতা বা ভাবালুতাকে কখনও প্রশ্রয় দেননি, যুক্তি ও মননশীলতাকেই গ্রহণ করেছিলেন ধ্রুব আদর্শ রূপে। মানবজীবনে জ্ঞানার্জনের বৃত্তিকেই প্রাধান্য দিতেন তিনি। তাঁর গদ্যরচনায় তাই জ্ঞানের গভীরতা ও ওজস্বিতা দেখা যায়। বাংলা গদ্যে শব্দগত জৌলুস সৃষ্টি করে ভাষাকে গম্ভীর ও উন্নত ভাবপ্রকাশের উপযোগী করতে চেয়েছিলেন তিনি। ভূগোল, পদার্থবিদ্যা, ধর্মনীতি, বাহ্যবস্তুর সহিত মানবপ্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় প্রভৃতি গ্রন্থে এবং তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-য় প্রকাশিত বহু প্রবন্ধে তিনি ভাষাকে কোথাও তরল বা লঘু হতে দেননি। প্রচুর তৎসম শব্দ, সমাসবদ্ধ পদ এবং মিশ্র ও জটিল বাক্যের বেড়াজাল রচনা করে পাণ্ডিত্যের ব্যাপকতা দেখাতেন। অক্ষয়কুমার শ্রুতিমধুর বা সহজে উচ্চার্য ভাষা ব্যবহার করতেন না। কিন্তু তাঁর ভাষার ভিত্তি ছিল সুদৃঢ়। এই ভিত্তির উপর জ্ঞানচর্চার প্রাসাদ নির্ভয়ে গঠন করেছিলেন তিনি।
রামমোহন বাংলা গদ্যে এনেছিলেন সাবলীলতা। অক্ষয়কুমার দিয়েছিলেন সৌষ্ঠব, গাম্ভীর্য ও ধ্বনিবৈচিত্র্য। বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে করে তুলেছিলেন ছন্দময়, সুসংহত ও মধুর। মতবাদ প্রতিষ্ঠায় ও জ্ঞানানুশীলনের ক্ষেত্রে রামমোহন ও অক্ষয়কুমারের ভাষা আদর্শ রূপে গৃহীত হয়েছিল। পরবর্তীকালের প্রাবন্ধিকেরা অক্ষয়কুমারের ভাষার কাঠামো অবলম্বন করেছিলেন। আবার কথাসাহিত্যে ‘বিদ্যাসাগরী’ ভাষাই প্রতিষ্ঠিত হয়। এই তিন মনীষী বাঙালি জাতির জন্য নতুন করে গদ্যসাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রস্তুত করেন। তাই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অভ্যুদয় ত্বরান্বিত হয়।