বিষয়বস্তুতে চলুন

ইন্দ্রিয়তন্ত্র/মাছ/পার্শ্বরেখা

উইকিবই থেকে

পার্শ্বরেখা অঙ্গ দ্বারা স্পর্শ অনুভূতি

[সম্পাদনা]

মাছ হলো বৈচিত্র্যময় জলজ প্রাণী। মাছের প্রজাতির সংখ্যা ৩২,০০০-রও বেশি, যা তাদেরকে কশেরুকাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী করে তুলেছে।

একটি হাঙরের পার্শ্বরেখা সংবেদন অঙ্গ প্রদর্শিত হয়েছে।

বেশিরভাগ মাছের সংবেদন অঙ্গ অত্যন্ত উন্নত। দিনের আলোতে বসবাসকারী মাছের চোখ রঙ দেখার সক্ষমতা রাখে। কিছু মাছ অতিবেগুনি আলোও দেখতে পারে। মাছের ঘ্রাণশক্তিও অত্যন্ত উন্নত। যেমন ট্রাউটের মাথায় "ন্যারিস" নামক বিশেষ ছিদ্র থাকে, যা দিয়ে তারা পানিতে থাকা সামান্য রাসায়নিক নির্ণয় করতে পারে। মহাসাগর থেকে আগত অভিবাসী স্যামন এই ঘ্রাণ ব্যবহার করে তাদের নিজস্ব নদী সনাক্ত করে, কারণ তারা সেই নদীর গন্ধ মনে রাখে। বিশেষ করে মাটিতে থাকা মাছের ঠোঁট ও বার্বেল অংশে স্পর্শ সংবেদন অনেক বেশি থাকে। তাদের স্বাদগ্রাহী কলাও সেখানে থাকে। এই সংবেদন তারা খাদ্য অনুসন্ধানে ব্যবহার করে, বিশেষ করে মেঘাচ্ছন্ন বা অস্বচ্ছ পানিতে।

মাছের শরীরের উভয় পাশে এবং মাথায় একটি পার্শ্বরেখা ব্যবস্থা থাকে, যা "লেটারাল লাইন সিস্টেম" নামে পরিচিত। এটি একটি স্পর্শ সংবেদন অঙ্গ, যা পারিপার্শ্বিক জলের নড়াচড়া ও কম্পন শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।

কার্যপ্রণালী

[সম্পাদনা]

মাছ এই পার্শ্বরেখা অঙ্গ ব্যবহার করে শিকার ও শিকারীর উপস্থিতি টের পায়, পানির স্রোতের পরিবর্তন বুঝে, নিজেদের অভিমুখ নির্ধারণ করে এবং দলে সাঁতার কাটার সময় সংঘর্ষ এড়ায়।

Coombs এবং অন্যান্যরা দেখিয়েছেন [1] যে এই সংবেদন অঙ্গ মাছকে শিকার শনাক্ত ও লক্ষ্যস্থির করতে সাহায্য করে। এমনকি অন্ধ করে দিলেও মাছ কাঁপা ধাতব বল কিংবা শিকারের দ্বারা সৃষ্ট নড়াচড়া শনাক্ত করতে পারে। তবে যদি কobalt chloride প্রয়োগ করে এই সংবেদন বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে শিকার নির্ধারণ করার সক্ষমতা অনেক কমে যায়।

পিচার এবং তার সহকর্মীরা ১৯৭৬ সালে দেখান যে, চোখে দেখে না এমন মাছ দলবদ্ধভাবে সাঁতার কাটতে পারে, কিন্তু যাদের পার্শ্বরেখা অঙ্গ বিকল, তারা তা পারে না [2]।

শারীরবৃত্তীয় গঠন

[সম্পাদনা]

মাছের শরীরের দুই পাশে মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত দুটি হালকা রেখা দেখা যায়, যেগুলিই পার্শ্বরেখা। এটি গঠিত "নিউরোমাস্ট" নামক মেকানোরিসেপ্টর কোষের দ্বারা। এগুলো কখনো চামড়ার ওপরে থাকে, আবার কখনো পার্শ্বরেখা নালিতে প্রোথিত থাকে। এই নালি হলো এক ধরনের মিউকাসে পূর্ণ গঠন, যা বাইরের জলের সঞ্চালনকে ভেতরে থাকা নিউরোমাস্ট পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। নিউরোমাস্ট গঠিত সূক্ষ্ম লোমযুক্ত সংবেদন কোষ দিয়ে, যেগুলো একটি জেলি জাতীয় কাপুলায় আবদ্ধ থাকে। এই কাপুলা হয় সরাসরি পানির সঙ্গে সংযুক্ত (গভীর সমুদ্রের মাছের ক্ষেত্রে), অথবা পার্শ্বরেখা নালির তরলে নিমজ্জিত। জলের চাপ পরিবর্তনে কাপুলা বাঁকে, যার ফলে অভ্যন্তরের লোম কোষগুলোও বাঁকে। সংবেদন কোষের এই লোম যদি ছোট দিকের দিকে বাঁকে, তবে স্নায়ু সংকেত কমে যায় (হাইপারপোলারাইজেশন), আর বড় দিকের দিকে বাঁকলে সংকেত বাড়ে (ডিপোলারাইজেশন)। এইভাবে চাপের তথ্য সংকেতরূপে রূপান্তরিত হয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়।

Rutilus rutilus মাছের পার্শ্বরেখার কিছু আঁশ (মাঝখানে)

পার্শ্বরেখা সংবেদন অঙ্গের গঠনের চিত্র

হাঙর ও রে মাছের ক্ষেত্রে কিছু নিউরোমাস্ট রূপান্তরিত হয়ে বিদ্যুৎ-গ্রাহক রূপে বিবর্তিত হয়েছে, যাদের বলা হয় **Ampullae of Lorenzini**। এরা সাধারণত মাথার চারপাশে বেশি থাকে এবং ০.০১ মাইক্রোভোল্ট পরিমাণ ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক পরিবর্তনও শনাক্ত করতে পারে [4]। এই সংবেদন ব্যবস্থার মাধ্যমে হাঙররা শিকারের পেশী সংকোচনের ফলে উৎপন্ন বৈদ্যুতিক সংকেত শনাক্ত করে দূর থেকে শিকার খুঁজে পেতে পারে, এমনকি অস্বচ্ছ পানিতে বা বালির নিচে লুকিয়ে থাকা অবস্থায়ও। এটি মনে করা হয় যে হাঙররা এই সংবেদন ব্যবহার করে অভিবাসন ও দিক নির্ধারণ করে, কারণ Ampullae of Lorenzini পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রও শনাক্ত করতে পারে।

সমবিকাশ (Convergent Evolution)

[সম্পাদনা]

সেফালোপড: স্কুইড, অক্টোপাস ও কাটলফিশের মাথা ও বাহুতে সিলিয়াযুক্ত ত্বকীয় কোষের রেখা থাকে, যা মাছের পার্শ্বরেখার অনুরূপ। কাটলফিশ (Sepia officinalis) এবং ব্রিফ স্কুইড (Lolliguncula brevis) এর উপর ইলেক্ট্রোফিজিওলজিকাল গবেষণায় দেখা গেছে এগুলো মাছের পার্শ্বরেখা ব্যবস্থার অনুরূপ কাজ করে [5]।

ক্রাস্টেসিয়ান: কিছু ক্রাস্টেসিয়ানের মধ্যে মাছের পার্শ্বরেখার অনুরূপ একটি ব্যবস্থা পাওয়া যায়। তবে এদের দেহে নয়, বরং দেহের সমান্তরালে রাখা লম্বা শুঁড়ে নিয়মিত ব্যবধানে সংবেদন কোষ থাকে, যা স্বাধীনভাবে নড়াচড়া করতে পারে [6]।

স্তন্যপায়ী প্রাণী: জলজ ম্যনেটির দেহে স্পর্শকাতর লোম থাকে, যা নগ্ন মোল র‍্যাটের সংবেদনশীল লোমের মতো। এগুলো মাছের পার্শ্বরেখার সঙ্গে তুলনা করা হয় এবং ম্যনেটির দুর্বল দৃষ্টিশক্তিকে সম্পূরকভাবে সাহায্য করে। তেমনি, হারবার সীলের গোঁফও পানির সূক্ষ্ম নড়াচড়া শনাক্ত করতে পারে, যদিও তা মাছের ব্যবস্থার তুলনায় কম সংবেদনশীল [7]।