ইন্দ্রিয়তন্ত্র/মাকড়সা
মাকড়সার দর্শনতন্ত্র
[সম্পাদনা]ভূমিকা
[সম্পাদনা]যদিও কিছু উন্নত প্রজাতির মাকড়সার দর্শনতন্ত্রের উপর অত্যন্ত উপর কয়েক দশক ধরে বিস্তৃতভাবে গবেষণা করা হয়েছে তবুও "প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা" বা "জ্ঞান" এই ধরনের শব্দ সাধারণত মাকড়সা নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো না। বরং মাকড়সাকে ঐতিহ্যগতভাবে সাধারণ সহজাত প্রবৃত্তিনির্ভর প্রাণী হিসেবে চিত্রিত করা হতো। ধারণা করা হতো, তারা তাদের দর্শনতন্ত্রের তথ্যকে নির্দিষ্টভাবে কোনো ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রক্রিয়া না করে পূর্বনির্ধারিত প্যাটার্নে প্রক্রিয়া করা হতো। যদিও এখনো অধিকাংশ মাকড়সার ক্ষেত্রে এটি সত্য কারণ তারা মূলত দৃষ্টির পরিবর্তে স্পর্শের অনুভূতির মাধ্যমে পরিবেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে কিছু প্রজাতির মাকড়সা আশ্চর্যজনকভাবে বুদ্ধিদীপ্তভাবে চোখ ব্যবহার করে। শরীরের তুলনায় সীমিত আকারের হলেও মাকড়সার চক্ষুগঠন ও দৃষ্টিগত প্রক্রিয়া অত্যন্ত দক্ষভাবে কাজ করে।[১] সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে দৃষ্টিগত সংকেত ব্যবহারে মাকড়সা অত্যন্ত সূক্ষ্ম দক্ষতা দেখায়। যেমন, সল্টিসিডি গোত্রের দৃষ্টিনির্ভর লাফানো মাকড়সাগুলো শিকারের উপর নিজের দেহের দৈর্ঘ্যের প্রায় ৩০ গুণ দূরত্বে লাফিয়ে পড়ে। আবার লাইকোসিডি গোত্রের নেকড়ে মাকড়সা সম্ভাব্য সঙ্গীর শরীরের অসমতা চাক্ষুষভাবে শনাক্ত করতে পারে। এমনকি রাতচর প্রাণী Cupiennius salei যারা মূলত অন্যান্য সংবেদনশীল অঙ্গের ওপর নির্ভর করে, বা রাত্রিকালীন শিকারি ডিনোপিস যারা ছোট জাল ছুঁড়ে শিকার ধরার জন্য বিখ্যাত তাদের দৃষ্টিগত ব্যবস্থাও অত্যন্ত উন্নত। এই ধরনের আবিষ্কার শুধু মুগ্ধ করার মতোই নয়, বরং রোবটিক্স এবং কম্পিউটারনির্ভর চিত্র বিশ্লেষণের মতো বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নতুন অনুপ্রেরণাও জোগাচ্ছে।
মাকড়সার শারীরিক গঠনের সাধারণ রূপ
[সম্পাদনা]
মাকড়সার শরীর মূলত দুটি প্রধান খণ্ডে বিভক্ত: প্রোসোমা ও অপিস্টোসোমা। এদের যথাক্রমে শেফালোথোরাক্স ও উদর বলা হয়। সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও সংবেদনশীল অঙ্গ, যেমন চোখ, প্রোসোমায় থাকে। আর্থ্রোপোডদের যৌগিক চোখের পরিবর্তে আধুনিক মাকড়সার চোখ হলো "ওসেলি" (সরল চোখ, যেখানে একটি লেন্সের নিচে তরলভর্তি গহ্বর এবং নিচে একটি রেটিনা থাকে)। মাকড়সাদের সাধারণত ছয় বা আটটি ওসেলি থাকে যেগুলো প্রোসোমার কারাপেসের ওপর তিন বা চারটি সারিতে বিন্যস্ত থাকে। সর্বমোট ৯৯% মাকড়সার আটটি চোখ থাকে। বাকি ১% প্রজাতির অধিকাংশের ছয়টি চোখ থাকে। ছয় চোখবিশিষ্ট মাকড়সাদের "প্রধান চোখ" থাকে না যেগুলো নিচে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
চোখের জোড়াগুলোর নাম: অ্যান্টেরিয়র মিডিয়ান আই, অ্যান্টেরিয়র ল্যাটারাল আই, পোস্টেরিয়র মিডিয়ান আই এবং পোস্টেরিয়র ল্যাটারাল আই। সামনে মুখোমুখি থাকা বড় প্রধান চোখগুলো হলো অ্যান্টেরিয়র মিডিয়ান আই। এগুলো মাকড়সাকে সর্বোচ্চ স্থানিক রেজোলিউশন প্রদান করে যদিও এগুলোর দৃষ্টির পরিধি খুব সীমিত। ছোট কিন্তু সামনে তাকানো চোখ হলো অ্যান্টেরিয়র ল্যাটারাল আই। এদের দৃষ্টির ক্ষেত্র মাঝারি এবং রেজোলিউশনও মাঝারি মানের। পেছনের দুটি জোড়া চোখ তুলনামূলকভাবে পার্শ্ববর্তী, মাধ্যমিক চোখ। এদের দৃষ্টির পরিধি অনেক বেশি। এই চোখগুলো খুব আলো কম থাকলেও ভালো কাজ করে। মাকড়সা গতি শনাক্ত করতে তাদের মাধ্যমিক চোখ ব্যবহার করে। আর আকৃতি ও বস্তু শনাক্ত করতে প্রধান চোখ ব্যবহার করে। পোকামাকড়ের দৃষ্টির বিপরীতে, দৃষ্টিনির্ভর মাকড়সার মস্তিষ্ক প্রায় সম্পূর্ণভাবে দৃষ্টির জন্য উৎসর্গীকৃত। এটি শুধুমাত্র অপটিক নার্ভ গ্রহণ করে এবং মূলত অপটিক গ্যাংলিয়া ও কিছু সংযোগকেন্দ্র নিয়ে গঠিত। এই মস্তিষ্ক বস্তুগত গতি চিনে ফেলতে পারে। এমনকি তা আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে সেই বস্তুকে সঙ্গী, প্রতিদ্বন্দ্বী কিংবা শিকার হিসেবে শ্রেণিবিন্যস্ত করতে পারে যেমন একটি নির্দিষ্ট কোণে থাকা পায়ের রেখাচিত্র দেখে। এই ধরনের উদ্দীপনার ফলে মাকড়সা কখনো প্রণয় বা কখনো হুমকিস্বরূপ আচরণ প্রদর্শন করে।
মাকড়সার চোখ
[সম্পাদনা]যদিও মাকড়সার চোখকে "ক্যামেরা চোখ" বলা হয় তবে এরা স্তন্যপায়ী প্রাণী বা অন্য কোনো প্রাণীর চোখের মতো নয়। এত ছোট শরীরে উচ্চ রেজোলিউশনের চোখ ফিট করানোর জন্য কীটপতঙ্গের যৌগিক চোখ বা মানুষের গোলাকার চোখ কোনওটাই উপযোগী নয়। মাকড়সার চোখে থাকা ওসেলি হলো একটি উন্নততর অপটিক্যাল সমাধান কারণ যৌগিক চোখে লেন্সের প্রতিবিম্ব বিকৃতির কারণে রেজোলিউশন সীমিত হয়ে পড়ে। একটি মাকড়সার চোখের জায়গায় যদি সমমানের রেজোলিউশনের যৌগিক চোখ বসানো হয় তবে তা মাকড়সার প্রসোমায় ফিটই হবে না। ওসেলি ব্যবহারের ফলে কিছু মাকড়সার স্থানিক সূক্ষ্মতা স্তন্যপায়ী প্রাণীর চেয়েও কাছাকাছি, যা একটি বিশাল পার্থক্য সত্ত্বেও সম্ভব হয়েছে যেমন লাফানো মাকড়সার চোখে কয়েক হাজার ফোটোরিসেপ্টর থাকে। যেখানে মানুষের রেটিনায় থাকে ১৫ কোটিরও বেশি ফোটোরিসেপ্টর।
প্রধান চোখ
[সম্পাদনা]
অধিকাংশ মাকড়সার দেহে থাকা অ্যান্টেরিয়র মিডিয়ান চোখ কে বলা হয় প্রধান চোখ। নিচের চিত্রে এই চোখের গঠন এবং উপাদানসমূহ দেখানো হয়েছে এবং এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে লাফানো মাকড়সা পোর্টিয়া (সালটিসিডি পরিবারভুক্ত) এর প্রধান চোখের মাধ্যমে যেটি তার উচ্চ স্থানিক সূক্ষ্মতা এবং দৃষ্টিনির্ভর আচরণের জন্য বিখ্যাত। যদিও এর শরীরের দৈর্ঘ্য মাত্র ৪.৫ থেকে ৯.৫ মিমি।
যখন কোনো আলোকরশ্মি প্রধান চোখে প্রবেশ করে তখন তা প্রথমে একটি বড় কর্নিয়াল লেন্সের মধ্য দিয়ে যায়। এই লেন্সটির ফোকাল দৈর্ঘ্য অনেক বেশি ফলে এটি দূরের বস্তুকেও বড় করে দেখাতে পারে। এই দুটি প্রধান চোখের কর্নিয়াল লেন্স মিলে প্রায় ৯০° পর্যন্ত সামনে দেখা যায়। তবে এই রকম সূক্ষ্ম রেটিনা যদি ব্যবহৃত হতো তাহলে তা একটি চোখের মধ্যে ফিট করানো যেত না। এর চমকপ্রদ সমাধান হলো একটি ছোট, লম্বা রেটিনা, যেটি একটি সরু টিউবের শেষে একটি দ্বিতীয় লেন্সের (একটি অবতল গর্ত) পেছনে অবস্থান করে। কর্নিয়াল লেন্স এবং দীর্ঘ টিউবের এই মিলনে তৈরি হয় টেলিফটো সিস্টেমের মতো একটি গঠন, ফলে প্রধান চোখ জোড়া অনেকটা দূরবীনের মতো কাজ করে।
সালটিসিডি মাকড়সা চারটি স্তরের রেটিনায় পর্যায়ক্রমে আলো ধারণ করে, যেখানে স্তরগুলো একটার পেছনে আরেকটা সাজানো (মানুষের চোখে রেটিনা একটিই স্তরে থাকে)। এই গঠন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বেশি ফোটোরিসেপ্টর রাখতে সাহায্য করে এবং রঙ চেনার সুবিধাও দেয়, কারণ লেন্স সিস্টেম আলোকরশ্মিকে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিভক্ত করে (ক্রোম্যাটিক অ্যাবেরেশন)। বিভিন্ন রঙের আলো ভিন্ন ভিন্ন স্তরে ফোকাস হয়, যেগুলো রেটিনার স্তরগুলোর অবস্থানের সঙ্গে মিলে যায়। সালটিসিডি মাকড়সারা তাদের প্রধান চোখ দিয়ে সবুজ (স্তর ১ – ~৫৮০ nm, স্তর ২ – ~৫২০-৫৪০ nm), নীল (স্তর ৩ – ~৪৮০-৫০০ nm) এবং অতিবেগুনি (স্তর ৪ – ~৩৬০ nm) রঙ শনাক্ত করতে পারে। তবে আকার ও গঠন বোঝার জন্য মূলত শেষের দুটি স্তর (স্তর ১ ও ২) ব্যবহৃত হয়, কারণ এখানেই রিসেপ্টর কোষগুলো ঘনবসতিপূর্ণ।
মানুষের চোখের মতো স্তর ১ এ একটি কেন্দ্রীয় অংশ থাকে যেটিকে বলা হয় “ফোভিয়া” যেখানে রিসেপ্টর কোষগুলোর মধ্যে দূরত্ব প্রায় ১ মাইক্রোমিটার। এটি সর্বোত্তম হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ টেলিফটো অপটিক্যাল সিস্টেম যেভাবে ছবি উপস্থাপন করে তাতে এই রেজোলিউশন যথেষ্ট। এর চেয়ে ঘন রিসেপ্টর বসালে পরস্পরের মধ্যে কোয়ান্টাম পর্যায়ের হস্তক্ষেপ হয়ে যাবে ফলে ছবির গুণমান কমে যাবে। এমন চোখের ক্ষমতা নিয়ে পোর্টিয়া যে কোনো পোকামাকড়ের চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্মভাবে দেখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ড্রাগনফ্লাই Sympetrum striolatus এর দৃষ্টির সূক্ষ্মতা ০.৪°, কিন্তু পোর্টিয়া এর তা ১০ গুণ বেশি ০.০৪°, অথচ চোখের আকার অনেক ছোট। মানুষের চোখের সূক্ষ্মতা ০.০০৭°, যা পোর্টিয়াএর চেয়ে মাত্র ৫ গুণ ভালো। এই সূক্ষ্ম দৃষ্টিশক্তির ফলে পোর্টিয়া ২০০ মিমি দূর থেকে মাত্র ০.১২ মিমি দূরত্বে অবস্থিত দুটি বস্তুকে আলাদা করে চিনতে পারে। অন্য সালটিসিডি মাকড়সার চোখের স্থানিক সূক্ষ্মতাও পোর্টিয়া এর থেকে খুব বেশি পিছিয়ে নেই।[২][৩][৪]
প্রধান চোখের রেটিনায় চলাচল
[সম্পাদনা]এই অসাধারণ দৃষ্টিশক্তির পেছনে রয়েছে একটি সীমাবদ্ধতা। পোর্টিয়া মাকড়সার প্রতিটি প্রধান চোখের রেটিনা মাত্র ২-৫° কোণের মধ্যেই দেখতে পারে এবং ফোভিয়া দেখতে পারে মাত্র ০.৬°। এই সীমাবদ্ধতার কারণ হলো প্রধান রেটিনার আকৃতি বুমেরাং এর মতো লম্বাটে, যা উল্লম্বভাবে প্রায় ২০° এবং অনুভূমিকভাবে মাত্র ১° যেখানে রিসেপ্টর সারি থাকে ছয়টি। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে লাফানো মাকড়সারা চোখের টিউব সরিয়ে দৃশ্যের পুরো ছবি দেখে। তাদের চোখে থাকে ছয়টি পেশি যেগুলো চোখের টিউবের বাইরের অংশে যুক্ত থাকে এবং মানুষের চোখের মতোই অনুভূমিক, উল্লম্ব এবং ঘূর্ণন এই তিনটি দিকেই নড়াচড়া করতে পারে। প্রধান রেটিনা অনুভূমিক ও উল্লম্বভাবে প্রায় ৫০° পর্যন্ত এবং ঘূর্ণনের ক্ষেত্রেও এই পরিমাণে ঘোরাতে পারে।
যেসব মাকড়সা দৃষ্টিভিত্তিক সংকেত ভালোভাবে ব্যবহার করে, তারা প্রধান চোখের রেটিনা নড়াচড়া করে দুটি উপায়ে এক, “স্যাকেড” বা আকস্মিক নড়াচড়া, যাতে ফোভিয়া চলমান বস্তুতে স্থির হয় (যাকে বলে “ট্র্যাকিং”); দুই, “স্ক্যানিং”, যাতে দৃশ্যের গঠন শনাক্ত করা যায়। বর্তমানে ধারণা করা হয়, মাকড়সারা চোখের টিউব সরিয়ে জটিল নড়াচড়ায় পুরো দৃশ্য পর্যায়ক্রমে স্ক্যান করে, যা তাদের সীমিত মস্তিষ্ক ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক তথ্য বিশ্লেষণ করতে সহায়তা করে।
স্বতঃস্ফূর্ত রেটিনা নড়াচড়াকে বলা হয় “মাইক্রোস্যাকেড”, যেটি মূলত অ্যান্টেরিয়র মিডিয়ান চোখের ফোটোরিসেপ্টর কোষগুলোকে স্থির চিত্রে অভ্যস্ত হওয়া থেকে বিরত রাখে। কিউপিয়েনিয়াস মাকড়সাদের চোখে থাকে চারটি চোখের পেশি দুটি ডোরসাল এবং দুটি ভেন্ট্রাল। তারা প্রায় ২° থেকে ৪° কোণে ডোরসো-মিডিয়াল দিকে প্রায় ৮০ মিলিসেকেন্ড সময়ে মাইক্রোস্যাকেড করে (যখন তাদের দেহ স্থিরভাবে ধরা থাকে)। কিউপিয়েনিয়াস এর রিসেপ্টর কোষের মাঝে যে গড় দূরত্ব থাকে, তা প্রায় ৩°, যা মাইক্রোস্যাকেড কোণের সঙ্গে মিলে যায় এবং এই গঠনের কার্যকারিতা বোঝায়। অন্যদিকে, যান্ত্রিক উদ্দীপনার মাধ্যমে রেটিনার চলন (যেমন হাওয়ার ঝাপটা দেওয়া) অনেক বড় হতে পারে, যেখানে নড়াচড়া হয় প্রায় ১৫° পর্যন্ত। এমন উদ্দীপনা চোখের পেশির ক্রিয়াকলাপ বাড়িয়ে দেয় স্বাভাবিক অবস্থায় ১২ ± ১ Hz থেকে বেড়ে ৮০ Hz পর্যন্ত। তবে দুটি প্রধান চোখ একসাথে কখনোই সক্রিয়ভাবে নড়ে না, এবং তারা একই দিকে ঘোরে এমনও দেখা যায় না। এই দুই প্রক্রিয়া স্বতঃস্ফূর্ত মাইক্রোস্যাকেড এবং সক্রিয় “পিয়ারিং” একত্রে মাকড়সাকে শুধুমাত্র প্রধান চোখ ব্যবহার করেই স্থির চিত্র শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করতে সহায়তা করে, শরীর না নাড়িয়েই। তবে মাকড়সার চোখের দর্শনক্ষমতা নির্ধারণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সেটি হলো ভিন্ন ভিন্ন দূরত্বে থাকা বস্তুগুলোকে একসাথে ফোকাসে রাখা। মানুষের চোখে এটি সমাধান করা হয় অ্যাকমোডেশনের মাধ্যমে অর্থাৎ লেন্সের আকার পরিবর্তন করে। কিন্তু সালটিসিডি মাকড়সারা ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে। তাদের রেটিনার প্রথম স্তরের (লেয়ার-১) আলোকসংবেদী কোষগুলো একটি “সিঁড়ির মতো” কাঠামোতে সাজানো থাকে। যেগুলো লেন্স থেকে ভিন্ন ভিন্ন দূরত্বে অবস্থান করে।
ফলে কোনো বস্তু চোখের সামনে কয়েক সেন্টিমিটার কিংবা কয়েক মিটার দূরেও থাকুক না কেন তার ছবি রেটিনার লেয়ার-১ এর এই সিঁড়ির কোনো না কোনো অংশে স্পষ্টভাবে ফোকাস হয়। এর পাশাপাশি সালটিসিডি চোখের কর্নিয়াল লেন্স না নাড়িয়েও চোখের টিউবগুলোকে এক পাশ থেকে অন্য পাশে দুলিয়ে নিতে পারে। এর মাধ্যমে প্রতিটি রেটিনার সিঁড়ির মতো গঠন কর্নিয়াল লেন্সের ছবির ওপর দিয়ে একটানা চালানো হয়। ফলে একে একে বস্তুটির স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়।
এই পদ্ধতিতে মাকড়সার দৃষ্টিশক্তি সত্যিই চমকপ্রদ। পোর্টিয়া’র মতো লাফিয়ে শিকার করা মাকড়সাগুলো ২ সেন্টিমিটার থেকে অসীম দূরত্ব পর্যন্ত যেকোনো বস্তুকে সঠিকভাবে ফোকাস করতে পারে। বাস্তবে তারা প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার দূর পর্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখতে সক্ষম। তবে এমন ছোট চোখ দিয়ে উচ্চমানের ছবি পাওয়ার জন্য যে জটিল স্ক্যানিং প্রক্রিয়া প্রয়োজন তা সম্পন্ন করতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লাগে (প্রায় ১০–২০ সেকেন্ডের মতো)। এই সীমাবদ্ধতার কারণে পোর্টিয়ার মতো মাকড়সাদের পক্ষে বড় শিকারিদের যথেষ্ট দ্রুত চেনা কঠিন হয়। ফলে পাখি, ব্যাঙ কিংবা অন্যান্য শিকারিদের কাছে তারা সহজেই শিকারে পরিণত হয়।[৫][৬]
দূরত্ব নির্ধারণে অস্পষ্ট দৃষ্টি
[সম্পাদনা]সম্প্রতি এক অপ্রত্যাশিত আবিষ্কারে গবেষকরা বিস্মিত হন যখন দেখা যায় যে লাফিয়ে শিকার করা মাকড়সারা তাদের লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার পর লাফ দেওয়ার আগমুহূর্তে দূরত্ব নির্ধারণে এক ধরনের “অস্পষ্ট দৃষ্টি” কৌশল ব্যবহার করে। মানুষ যেখানে দ্বিনেত্রদৃষ্টি বা মাথা নাড়িয়ে অথবা অতিস্বনক প্রতিফলনের মাধ্যমে গভীরতা নির্ধারণ করে সেখানে এই মাকড়সারা তাদের প্রধান চোখ দিয়েই এই কাজটি সম্পন্ন করে। অন্যান্য সালটিসিডির মতো Hasarius adansoni প্রজাতির প্রধান চোখেও রয়েছে চারটি রেটিনা স্তর। নিচের দুটি স্তরে থাকে সবুজ আলোর প্রতি সংবেদনশীল ফটোরিসেপ্টর কোষ। তবে সবুজ আলো সবসময়ই স্পষ্টভাবে ফোকাস হয় কেবল নিচের স্তরে (লেয়ার-১)। কারণ এটি অভ্যন্তরীণ লেন্সের উপযুক্ত দূরত্বে অবস্থান করে। আর দ্বিতীয় স্তর (লেয়ার-২) মূলত নীল আলো ফোকাস করার উপযোগী হলেও এখানে কোনো নীল-সংবেদনশীল কোষ থাকে না। ফলে সেখানে পড়ে একটি অস্পষ্ট সবুজ ছবি। মজার বিষয় হলো বস্তুটি যত কাছে থাকে দ্বিতীয় স্তরে ছবিটি তত বেশি অস্পষ্ট হয়। একই সময়ে, সিঁড়ি আকৃতির কাঠামোর জন্য প্রথম স্তরে ছবিটি থাকে সর্বদা স্পষ্ট। এই দুই স্তরের ছবির তুলনা করে মাকড়সারা একটি নির্দিষ্ট চোখ ব্যবহার করেই দূরত্ব নির্ধারণে সক্ষম হয়। এই কৌশল পরীক্ষিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। গবেষণায় মাকড়সাগুলোকে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সবুজ আলো এবং লাল আলোতে শিকার লক্ষ্য করে লাফ দেওয়ানো হয়। দেখা যায় যে যখন তারা সবুজ আলো ব্যবহার করতে পারে না তখন তারা বারবার দূরত্ব নির্ধারণে ব্যর্থ হয় এবং শিকারকে মিস করে ফেলে।
গৌণ চোখ
[সম্পাদনা]
বস্তুর গঠন বিশ্লেষণ ও পার্থক্য নির্ধারণের জন্য দায়ী, প্রধান চোখের বিপরীতে মাকড়সার গৌণ চোখগুলো কাজ করে চলাচল শনাক্তকারী হিসেবে। এই চোখগুলোর সঙ্গে কোনো চোখের পেশি যুক্ত থাকে না তাই দৃশ্য বিশ্লেষণে এগুলোর সক্ষমতা সীমিত। মাকড়সার দেহের কারাপেসে গৌণ চোখের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। এই চোখগুলো প্রায় ৩৬০° পরিসরে চলমান বস্তু শনাক্ত করতে পারে যা প্রাণীটিকে প্যানোরামিক দৃষ্টি দেয়। অ্যান্টেরিয়র এবং পোস্টেরিয়র ল্যাটারাল চোখ (অর্থাৎ গৌণ চোখগুলো) একটি মাত্র ধরনের দৃষ্টিকোষ ধারণ করে, যেগুলোর সর্বোচ্চ তরঙ্গদৈর্ঘ্য সংবেদনশীলতা থাকে প্রায় ৫৩৫–৫৪০ ন্যানোমিটার সবুজ আলোর প্রতি। গৌণ চোখের সংখ্যা ও বিন্যাস বিভিন্ন মাকড়সা পরিবারের মধ্যে বা এমনকি একই পরিবারের ভেতরেও ভিন্ন হতে পারে। এদের গঠনও ভিন্ন: বড় গৌণ চোখে কয়েক হাজার র্যাবডোমিয়ার (রেটিনার আলোক-সংবেদনশীল অংশ) থাকতে পারে। এগুলো রাতচরা মাকড়সা বা শিকারি প্রজাতিকে সাহায্য করে কম আলোতেও ভালোভাবে দেখতে। অন্যদিকে ছোট গৌণ চোখে কয়েকশ র্যাবডোমিয়ার থাকতে পারে এবং এগুলো কেবল মৌলিক গতিশীলতা শনাক্ত করতে পারে। প্রধান চোখগুলো যেখানে বাইরের দিকে (র্যাবডোমিয়ার আলোর দিকে মুখ করা) থাকে, সেখানে গৌণ চোখগুলো থাকে উল্টোভাবে র্যাবডোমিয়ার থাকে আলোর বিপরীত দিকে মুখ করে। এটা মানুষের চোখসহ কশেরুক প্রাণীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। কিউপিয়েনিয়াস সেলেই প্রজাতির ওপর ব্যাপক গবেষণায় দেখা গেছে যে গৌণ চোখের অনুভূমিক দিকের রেজোল্যুশন সবচেয়ে বেশি। ফলে মাকড়সারা অনুভূমিক গতিবিধি ভালোভাবে বুঝতে পারে। যদিও উল্লম্ব গতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয় কারণ এরা “সমতল জগত” এ বাস করে।
লাফিয়ে শিকার করা মাকড়সার ল্যাটারাল চোখের প্রতিক্রিয়া সময় তুলনামূলকভাবে ধীর প্রায় ৮০ থেকে ১২০ মিলিসেকেন্ড। এই সময় নির্ধারণ করা হয়েছে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে যেখানে ৩° আকৃতির একটি বর্গাকৃতির উদ্দীপক চোখের সামনে দিয়ে গিয়েছিল। উদ্দীপকের সর্বনিম্ন চলার দূরত্ব ছিল ১°/সেকেন্ড গতিতে ০.১°, ৯°/সেকেন্ডে ১° এবং ২৭°/সেকেন্ডে ২.৫°। অর্থাৎ, মাকড়সার গৌণ চোখের আলোকসংবেদক কোষের মাঝখানের কৌণিক দূরত্বের এক দশমাংশ গতিতে চললেও তা শনাক্ত করতে পারে। তবে উদ্দীপকের আকার মাত্র ০.৫° হলে প্রতিক্রিয়া আসতে দীর্ঘ সময় লাগে। যা বোঝায় এটি মাকড়সার দৃষ্টিসীমার একেবারে শেষ প্রান্ত।
রাতচর মাকড়সাদের গৌণ চোখে সাধারণত র্যাবডোমিয়ারের পেছনে এক ধরনের স্ফটিক স্তর থাকে, যাকে বলা হয় ট্যাপেটাম। এটি আলো প্রতিফলিত করে আবার রিসেপ্টরগুলোতে পাঠায়, ফলে চোখের সংবেদনশীলতা বাড়ে। ট্যাপেটামযুক্ত গৌণ চোখের অ্যাপারচার f/0.58 পর্যন্ত হতে পারে যার ফলে অতি অল্প আলোতেও দৃষ্টি বজায় থাকে। তাই রাতের বেলা টর্চলাইটের আলো পড়লে সহজেই এই চোখগুলোর কারণে মাকড়সার অবস্থান বোঝা যায়।[৭][৮]
কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র এবং মস্তিষ্কে দৃষ্টিশক্তি প্রক্রিয়াকরণ
[সম্পাদনা]স্নায়ুবিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো মাকড়সার কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (CNS) সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞান এখনো সীমিত। বিশেষ করে দৃষ্টিনির্ভর আচরণে CNS কীভাবে কাজ করে তা খুব কমই জানা গেছে। সব মাকড়সার মধ্যে কিউপিয়েনিয়াস প্রজাতির CNS সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে। যদিও সেটিও মূলত গঠনতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে।
এই প্রাণীদের স্নায়ুতন্ত্র শরীরের বিভাজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলেও তা পুরো শরীরজুড়ে ছড়ানো নয়। বরং এটি অত্যন্ত ঘন ও কেন্দ্রীভূত। CNS গঠিত দুটি যুগ্ম ও অপেক্ষাকৃত সরল নার্ভ কোষগুচ্ছ (গ্যাংলিয়া) দ্বারা, যা মাকড়সার পেশি ও সংবেদনশীল অঙ্গের সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুর মাধ্যমে কাজ করে। মাথার সামনে ও পেছনের সেগমেন্টে অবস্থিত এই গ্যাংলিয়াগুলোর সংযোগেই গঠিত হয় মস্তিষ্ক। এই মস্তিষ্ক প্রোসোমার প্রায় পুরোটাজুড়ে থাকে, কিন্তু উদর অংশে কোনো গ্যাংলিয়া থাকে না। মাকড়সার মস্তিষ্কে শুধু চোখ থেকেই সরাসরি সংবেদনশীল তথ্য আসে। অন্য কোনো অঙ্গ থেকে সরাসরি তথ্য আসে না যা পোকামাকড় ও ক্রাস্টেসিয়ানদের ক্ষেত্রে ভিন্ন। আটটি অপটিক নার্ভ সামনে থেকে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে এবং সেগুলোর সংকেত প্রক্রিয়াজাত হয় দুইটি অপটিক লোবের মাধ্যমে। যে মাকড়সাগুলো দৃষ্টিনির্ভর আচরণ করে (যেমন লাফিয়ে শিকার করা প্রজাতি) তাদের ক্ষেত্রে অপটিক গ্যাংলিয়া মস্তিষ্কের প্রায় ৩১% অংশ দখল করে থাকে। কিউপিয়েনিয়াস এর ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ২০%। অন্যদিকে নেফিলা বা ইফিবোপাস প্রজাতির ক্ষেত্রে এটি মাত্র ২%।
প্রধান ও গৌণ চোখের আলাদা আলাদা কার্যক্রম মস্তিষ্কেও বজায় থাকে। প্রত্যেক চোখের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা ভিজ্যুয়াল পথ যার মধ্যে রয়েছে দুটি ভিন্ন নিউরোপিল অঞ্চল, যা আলাদা কাজ করে। ফলে মাকড়সারা দুটি চোখ থেকে আসা তথ্য আলাদাভাবে ও সমান্তরালে প্রক্রিয়াজাত করে। গৌণ চোখ বিশেষভাবে অনুভূমিক গতিবিধি শনাক্ত করতে সক্ষম আর প্রধান চোখ বস্তুর গঠন ও গঠনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।
একই মস্তিষ্কে দুটি দৃষ্টিশক্তি ব্যবস্থা
[সম্পাদনা]যদিও প্রধান ও গৌণ চোখের কার্যক্রম মাকড়সার মস্তিষ্কে আলাদা দেখা যায়, তবে এই দুই দৃষ্টিশক্তি ব্যবস্থার মধ্যে আকস্মিক পারস্পরিক সম্পর্কও দেখা গেছে। এক গবেষণায় কিউপিয়েনিয়াস প্রজাতির প্রধান চোখের পেশির কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, যখন কোনো গৌণ চোখ তাদের দৃষ্টিসীমায় চলন্ত বস্তু শনাক্ত করে, তখন প্রধান চোখের পেশিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাড়া দেয়। এই পরীক্ষায় মাকড়সাকে একটি সাদা চেম্বারে রেখে, ছোট ছোট কালো দণ্ড চলাচলের মাধ্যমে উদ্দীপনা দেওয়া হয়। দেখা যায়, এমনকি প্রধান চোখে কালো রঙ লাগানো থাকলেও, গৌণ চোখ দিয়ে চলাচল শনাক্ত হলেই প্রধান চোখের পেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তবে গৌণ চোখ ঢেকে দিলে এই প্রতিক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে, প্রধান চোখের পেশি কেবল গৌণ চোখ থেকে আসা তথ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এছাড়াও, প্রধান চোখ চলাচল শনাক্ত করতে সক্ষম নয়। এই দায়িত্ব একমাত্র গৌণ চোখের।
আরেকটি পরীক্ষায় ডুয়াল-চ্যানেল টেলিমেট্রিক পদ্ধতিতে কিউপিয়েনিয়াস এর চোখের পেশির কার্যকলাপ রেকর্ড করা হয়। এতে দেখা যায়, মাকড়সা চলার দিকের দিকে “ইচ্ছাকৃতভাবে” তাকিয়ে থাকে। চলার আগে, চলার সময় ও পরে প্রধান চোখের আইপ্সিল্যাটারাল (একই পাশের) রেটিনা চলার দিক অনুসরণ করে সরে যায়, যেখানে বিপরীত পাশের রেটিনা স্থির থাকে। এটি আলো থাকুক বা না থাকুক, সব অবস্থায় ঘটে, যা ইঙ্গিত দেয় যে এই আচরণ মাকড়সার মস্তিষ্ক থেকে স্বেচ্ছায় পরিচালিত হয়।
প্রধান চোখ ব্যবহার করে গঠন চেনার প্রক্রিয়া
[সম্পাদনা]
লাফানো মাকড়সাগুলোর গঠন ও আকৃতি চেনার ক্ষমতা একটি স্ক্যানিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয় বলে মনে করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় সামনে-মধ্যবর্তী চোখের রেটিনার জটিল ঘূর্ণন (ঘূর্ণনগত আন্দোলন) ও স্থানান্তরের সমন্বয়ে দৃশ্যপট পর্যালোচনা করা হয়। “প্রধান চোখের রেটিনার গতি” অংশে বর্ণিত হয়েছে, মাকড়সার রেটিনা সরু এবং বুমেরাং আকৃতির। এটি সরল রেখার মতো বৈশিষ্ট্য চিনে নিতে পারে যখন এটি দৃশ্যের উপর দিয়ে সরে যায়। নতুন কোনো লক্ষ্য পর্যবেক্ষণের সময় চোখ দুটি এক ধরণের নির্দিষ্ট কৌশলে সেটি স্ক্যান করে। এটি ধীরে ধীরে একপাশ থেকে অন্যপাশে ৩ থেকে ১০ ডিগ্রি প্রতি সেকেন্ড গতিতে চলে এবং ±২৫ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘূর্ণায়মান হয়। অনুভূমিক এবং ঘূর্ণনগত রেটিনার এই গতি বিভিন্ন কোণে অবস্থিত রেখা শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এই পদ্ধতিকে টেমপ্লেট মিলানোর মতো ভাবা যায়, যেখানে টেমপ্লেটটি লম্বাটে এবং যখন রেটিনা দৃশ্যের কোনো সরল রেখার সাথে মিলে যায় তখন একটি শক্তিশালী স্নায়বিক সাড়া সৃষ্টি করে। এতে কোনো জটিল প্রক্রিয়া ছাড়াই সরল রেখা শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
লাফানো মাকড়সার এই দৃষ্টিশক্তি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি কম্পিউটার ভিশন অ্যালগরিদম তৈরি করা হয়েছে যা একই ধরনের টেমপ্লেট মিলানোর ভিত্তিতে দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করে। হাফের বিখ্যাত রূপান্তর অ্যালগরিদম চিত্র দৃশ্যমান সরল রেখাগুলো শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু এতে পুরো প্যারামিটার স্পেস বিশ্লেষণ করতে হয় বলে এর কার্যকারিতা সীমিত। অন্যদিকে লাফানো মাকড়সার ব্যবহৃত পদ্ধতিতে লিনিয়ার উইন্ডো ব্যবহার করে দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়, যাতে মানিয়ে নেওয়া যায় এমন অনুসন্ধান কৌশল ব্যবহার করা যায় এবং প্যারামিটার স্পেসের পূর্ণ বিশ্লেষণ করতে হয় না। এইভাবে সরল রেখা শনাক্ত করার সমস্যাকে এক ধরনের অপ্টিমাইজেশন সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা যায়, যার ফলে এটি কম্পিউটারের মাধ্যমে দক্ষভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। যদিও স্ক্যানিং নিয়ন্ত্রণকারী উপযুক্ত প্যারামিটার পরীক্ষামূলকভাবে খুঁজে বের করতে হয়, তবে লাফানো মাকড়সার দৃষ্টিশক্তির ভিত্তিতে তৈরি এই পদ্ধতিটি যথেষ্ট কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে, বিশেষ করে যখন সঠিকভাবে প্যারামিটার সেট করা যায়।[৯]
দৃষ্টিনির্ভর আচরণ
[সম্পাদনা]দৃশ্য লক্ষ্য পার্থক্য করার ক্ষমতা
[সম্পাদনা]
Cupiennius salei নামক প্রজাতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে তারা সামান্য ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিসংক্রান্ত লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। যদিও এই প্রজাতি প্রধানত শিকার ধরা ও প্রজননে যান্ত্রিক সংবেদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। যখন মাকড়সাটির সামনে ২ মিটার দূরত্বে দুটি লক্ষ্য বস্তু উপস্থাপন করা হয় তখন তার চলার পথ নির্ভর করে সেই বস্তুর চেহারার ওপর। যদি দুটি লক্ষ্য একেবারে একই রকম হয় যেমন উলম্ব দণ্ড, তাহলে কিউপিয়েনিয়াস কোনো নির্দিষ্ট পছন্দ দেখায় না। কিন্তু উলম্ব দণ্ড এবং হেলানো দণ্ড বা V-আকৃতির লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পছন্দ করতে বলা হলে, মাকড়সাটি উলম্ব দণ্ডের দিকেই বেশি আকৃষ্ট হয়।
ভিন্ন লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে মাকড়সাটিকে অবশ্যই প্রধান চোখ খোলা রাখতে হয়। যদিও যেকোনো চোখ ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা যায়, কিন্তু লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করতে হলে প্রধান চোখ খোলা থাকা আবশ্যক। এর মানে অনেক মাকড়সার সামনে পাশের চোখ শুধু নড়াচড়া শনাক্ত করতেই নয় বরং আরও জটিল কাজেও সক্ষম। তবে যদি সব চোখ বন্ধ করে দেওয়া হয় তাহলে মাকড়সাটি সম্পূর্ণ এলোমেলো পথে হাঁটে।
কিন্তু কিউপিয়েনিয়াস কে যদি পুরোপুরি অন্ধকারে রাখা হয় তাহলে শুধু এলোমেলোভাবে চলাই নয় বরং হাঁটার ধরনেও পরিবর্তন আসে। তখন এটি আট পায়ের বদলে ছয় পায়ে হাঁটে এবং সামনের দুই পা অ্যান্টেনা বা অনুভূতির সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করে, যেন একজন অন্ধ মানুষ লাঠি ব্যবহার করে হাঁটে। আশপাশ অনুভব করার জন্য সামনের পা দুটি ওপর-নিচ ও পাশ থেকে পাশে নাড়ে। এই আচরণ শুধু সামনের পা জোড়ার ক্ষেত্রেই দেখা যায় এবং এটি একমাত্র দৃষ্টিসংক্রান্ত সংকেত দ্বারা প্রভাবিত হয়, যেমন যখন সাধারণ কক্ষের আলো বন্ধ করে অপরিচিত ইনফ্রারেড আলো চালু করা হয়।
লাফানো মাকড়সার দৃষ্টিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ
[সম্পাদনা]লাফানো মাকড়সা চোখ দিয়ে কোনো কিছু চলতে দেখার পর কী আচরণ করবে তা তিনটি বিষয়ে নির্ভর করে তা হলো লক্ষ্যবস্তুর আকার, গতি ও দূরত্ব। যদি লক্ষ্যবস্তু মাকড়সার নিজের চেয়ে দ্বিগুণ বড় হয় তাহলে এটি সেই বস্তুর কাছে যায় না এবং যদি বস্তুটি তার দিকে এগিয়ে আসে তাহলে পালিয়ে যায়। যদি লক্ষ্যবস্তুর আকার উপযুক্ত হয় তাহলে তার গতি বিশ্লেষণ করে সেকেন্ডারি চোখের মাধ্যমে। যদি লক্ষ্যবস্তুর গতি ৪ ডিগ্রি/সেকেন্ড-এর বেশি হয়, তাহলে লাফানো মাকড়সা সেটিকে তাড়া করে এবং এ কাজে সামনে পাশের চোখ সাহায্য করে। ধীরে চলা লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় এবং প্রধান (সামনে-মধ্যবর্তী) চোখ দিয়ে সেটি শিকার কিনা অথবা একই প্রজাতির অন্য মাকড়সা কিনা তা নির্ধারণ করে। এই পর্যবেক্ষণে ওপরের সরল রেখা শনাক্তকরণ পদ্ধতিই ব্যবহার করে বলে মনে হয়, যাতে লক্ষ্যবস্তুর পা আছে কিনা বোঝা যায়। যতক্ষণ লক্ষ্যবস্তু সঠিক বৈশিষ্ট্যসহ চলতে থাকে, লাফানো মাকড়সা সাধারণত সেটিকে শিকার হিসেবে ধরে নেয়। তবে পুরুষ মাকড়সাগুলো সম্ভাব্য সঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি বেছে বেছে সিদ্ধান্ত নেয়।
সম্ভাব্য সঙ্গী শনাক্তকরণ
[সম্পাদনা]গবেষণায় দেখা গেছে একটি কেন্দ্রীয় বিন্দুকে ঘিরে পাশে পা-সদৃশ আকৃতি আঁকা হলে লাফ দেওয়া মাকড়সারা প্রণয় প্রদর্শন করে। এটি বোঝায় যে লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সরলরৈখিক গঠন শনাক্ত করতে লাফ দেওয়া মাকড়সারা দৃষ্টিভিত্তিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে। পাশাপাশি কোন মাকড়সা তার সঙ্গী বলে বিবেচিত হবে তা নির্ভর করে উভয় মাকড়সার লিঙ্গ, পরিপক্বতা এবং প্রজননের সময়কাল ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। মাদী ওলফ মাকড়সা Schizocosa ocreata প্রমাণ করেছে যে তারা সঙ্গী নির্বাচনের সময় পুরুষের গৌণ যৌন বৈশিষ্ট্যের অসমতা শনাক্ত করতে পারে। সম্ভবত ভবিষ্যৎ প্রজন্মে বিকাশগত জটিলতা এড়াতেই তারা এটি করে। পুরুষ মাকড়সার সামনের পায়ে থাকা সুস্পষ্ট ব্রিসল (লোমশ অংশ) যা প্রণয় সংকেতে ব্যবহৃত হয় তা মাদী মাকড়সা নির্বাচনে প্রভাব ফেলে। যদি কোনও পুরুষ মাকড়সার পা হারানোর পর তা পুনরায় গজায় ফলে এই অঙ্গগুলোর অসমতা দেখা যায়। তবে মাদীরা সাধারণত এমন পুরুষদের প্রতি আগ্রহ হারায়।[১০]
গৌণ চোখ দ্বারা পরিচালিত শিকার
[সম্পাদনা]লাফ দেওয়া মাকড়সার শিকার ধরার কৌশল অনেকটা পাখির পেছনে বিড়ালের পেছনে লাগার মতো। যখন গৌণ চোখের দৃষ্টিসীমায় কিছু নড়াচড়া করে তখন মাকড়সা তার বড় এবং সামনের মুখোমুখি প্রধান চোখ দুটি সেদিকে ঘুরিয়ে আনে। এরপর এটি লক্ষ্যবস্তুকে সঙ্গী, প্রতিদ্বন্দ্বী বা শিকার হিসেবে শনাক্ত করে। অত্যন্ত ছোট এবং কম স্পষ্ট কালো বিন্দুও ধীরে বা দ্রুত গতিতে নড়লে এই দৃষ্টি অনুসরণ আচরণ শুরু হয়। কিউপিয়েনিয়াস প্রজাতির মতো লাফ দেওয়া মাকড়সারাও তাদের গৌণ চোখ ব্যবহার করে শুধু নড়াচড়া নয় বরং আরও জটিল কাজও করতে পারে। শুধুমাত্র গৌণ চোখ খোলা রেখে প্রধান চোখ ঢেকে দিলে মাকড়সারা তখনও সম্পূর্ণ শিকার ধরা আচরণ দেখায়। এটি প্রমাণ করে যে লাফ দেওয়া মাকড়সার সামনের পাশের চোখগুলো তাদের দৃষ্টিনির্ভর আচরণের সবচেয়ে বহুমুখী উপাদান। গতি শনাক্ত করার পাশাপাশি গৌণ চোখে এমন স্থানিক স্পষ্টতাও রয়েছে যা পূর্ণাঙ্গ শিকার প্রক্রিয়া পরিচালনায় সক্ষম।
শিকারের “মুখ শনাক্তকরণ”
[সম্পাদনা]
লাফ দেওয়া মাকড়সারা দৃষ্টিভিত্তিক সংকেত ব্যবহার করে শিকার শনাক্ত করে এবং বুঝে ফেলে যে সেটি তাদের নিজের প্রজাতির (সালটিসিড) নাকি অন্য প্রজাতির। এই কাজে তারা প্রধান চোখ ব্যবহার করে। সালটিসিড শিকারের বড় প্রধান চোখ তাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে কাজ করে। Portia fimbriata নামের একটি লাফ দেওয়া মাকড়সা এই সংকেত পেলে খুব ধীরে হাঁটে, এর প্যাল্পগুলো শরীরের সঙ্গে লুকিয়ে রাখে এবং সামনে কিছু দেখলে একদম স্থির হয়ে যায়। এই আচরণ শুধু তখনই দেখা যায় যখন শিকার সালটিসিড হিসেবে শনাক্ত হয়। এক গবেষণায় এই মাকড়সার সামনে কম্পিউটার-তৈরিকৃত ত্রিমাত্রিক প্রতিচ্ছবি (লিউর) উপস্থাপন করা হয়। এতে প্রধান চোখের আকৃতি পরিবর্তন করা হয়েছিল। যেসব লিউরে দুইটি বড় প্রধান চোখ ছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে মাকড়সা ছদ্মচাল আচরণ দেখিয়েছে। কিন্তু যেসব লিউরে প্রধান চোখ ছিল না বা ছোট ছিল সেখানে আচরণ ভিন্ন হয়েছে। একটি চোখবিশিষ্ট লিউর বা দুটি বড় গৌণ চোখবিশিষ্ট লিউরও মাকড়সার ছদ্মচাল চালু করেছে, যা সালটিসিড শনাক্ত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। তবে যদি একটি চোখ মাঝখানে থাকে (সাইক্লপসের মতো) তাহলে মাকড়সা কমবার স্থির থাকে। যদি চোখ চৌকো আকৃতির হয়, তাহলে সেগুলো সাধারণত সালটিসিড হিসেবে শনাক্ত হয় না। এর মানে হলো, প্রধান চোখের কিনারার আকৃতিও সালটিসিড শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।[১১]
দৃষ্টিভিত্তিক বৈশিষ্ট্য দেখে লাফ দেওয়ার সিদ্ধান্ত
[সম্পাদনা]
ফিডিপ্পাস গণের মাকড়সাদের এমন পরীক্ষায় রাখা হয়েছিল যেখানে তাদের সামনে বাধা ছিল এবং অপর পাশে কিছু ভিজ্যুয়াল টার্গেট রাখা হয়েছিল। দেখা গেছে তারা সেই বাধা পার হবে কি না তা নির্ভর করে টার্গেটের দূরত্ব, আকার এবং রং ও গঠনের ওপর। মাকড়সারা দূরের লম্বা টার্গেটের দিকে যতবার গিয়েছে কাছের ছোট টার্গেটের দিকেও ততবার গিয়েছে। কারণ উভয় টার্গেটই তাদের চোখে একই আকারের দেখিয়েছে। যখন তাদের সামনে সাদা ও সবুজ ঘাস-সদৃশ টার্গেট রাখা হয়েছিল। তখন তারা বারবার সবুজটিই বেছে নিয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে টার্গেটের রঙের কনট্রাস্ট যাই হোক না কেন তারা সবুজকেই বেছে নিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে তারা রঙের পার্থক্য বোঝে এবং এটি শিকার ধরার ক্ষেত্রে ব্যবহার করে।[১২]
দৃষ্টিভিত্তিক সংকেতে ক্ষুদ্র আবাস শনাক্তকরণ
[সম্পাদনা]Psecas chapoda নামের একটি সালটিসিড মাকড়সা যা সাধারণত ব্রোমেলিয়াড গাছে বাস করে সেটিকে বিভিন্ন গাছের বাস্তব ও ছবির প্রতিকৃতি দেখিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা গেছে যে তারা দৃষ্টির মাধ্যমে গাছের পাতার বিন্যাস ও আকৃতি বিশ্লেষণ করে উপযোগী আবাস চিনতে পারে। কালো-সাদা ছবির মাধ্যমে রং বা গন্ধের প্রভাব বাদ দিয়ে কেবল আকার-আকৃতির ভিত্তিতে মাকড়সার পছন্দ নির্ধারণ করা হয়। এমনকি যখন শুধু ছবির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হয় তখনও Psecas chapoda পাতলা ও লম্বা পাতাবিশিষ্ট রোশেট-আকৃতির গাছ অন্যান্য গাছের চেয়ে বেশি পছন্দ করে। এটি প্রমাণ করে যে কিছু মাকড়সা প্রজাতি শুধুমাত্র গাছের গঠনগত বৈশিষ্ট্য দেখে ক্ষুদ্র আবাস নির্ধারণে সক্ষম।[১৩]
- ↑ F. G. Barth: A Spider´s World: Senses and Behavior. আইএসবিএন 978-3-642-07557-5, Springer-Verlag Berlin, Heidelberg. (2002)
- ↑ D. P. Harland, R. R. Jackson: 'Eight-legged cats' and how they see - a review of recent research on jumping spiders (Araneae: Salticidae). Department of Zoology, University of Canterbury (2000)
- ↑ A. Schmid: Different functions of different eye types in the spider Cupiennius salei. The Journal of Experimental Biology 201, 221–225 (1998)
- ↑ S. Yamashita, H. Tateda: Spectral Sensitivities of Jumping Spider Eyes. J. comp. Physiol. 105, 29-41 (1976)
- ↑ D. P. Harland, R. R. Jackson: Influence of cues from the anterior medial eyes of virtual prey on Portia fimbriata, an araneophagic jumping spider. The Journal of Experimental Biology 205, 1861–1868 (2002)
- ↑ A. Schmid, C. Trischler: Active sensing in a freely walking spider: Look where to go. Journal of Insect Physiology 57 p.494–500 (2011)
- ↑ D. B. Zurek, X. J. Nelson: Hyperacute motion detection by the lateral eyes of jumping spiders. Vision Research 66 p.26–30 (2012)
- ↑ D. B. Zurek, A. J. Taylor, C. S. Evans, X. J. Nelson: The role of the anterior lateral eyes in the vision-based behaviour of jumping spiders. The Journal of Experimental Biology 213, 2372-2378 (2010)
- ↑ F. M. G. da Costa, L. da F. Costa: Straight Line Detection as an Optimization Problem: An Approach Motivated by the Jumping Spider Visual System. In: Biologically Motivated Computer Vision, First IEEE International Workshop, BMVC 2000, Seoul, Korea (2000)
- ↑ G.W. Uetz, E. I. Smith: Asymmetry in a visual signaling character and sexual selection in a wolf spider. Behav Ecol Sociobiol (1999) 45: 87–93
- ↑ D. P. Harland, R. R. Jackson: Influence of cues from the anterior medial eyes of virtual prey on Portia fimbriata, an araneophagic jumping spider. The Journal of Experimental Biology 205, 1861–1868 (2002)
- ↑ R. R. Jackson, D. P. Harland: One small leap for the jumping spider but a giant step for vision science. THE JOURNAL OF EXPERIMENTAL BIOLOGY, JEB Classics p.2129-2132
- ↑ P. M. de Omena, and G. Q. Romero: Using visual cues of microhabitat traits to find home: the case study of a bromeliad-living jumping spider (Salticidae). Behavioral Ecology 21:690–695 (2010)