ইন্দ্রিয়তন্ত্র/পতঙ্গ/দিকনির্ণয়
পোকামাকড়ের দিকনির্দেশনায় স্থানীয় স্মৃতি
[সম্পাদনা]কিছু পোকামাকড় আশ্চর্যজনকভাবে কোনো স্থানের স্মৃতি ধরে রাখার সক্ষমতা দেখায়। গরম পরিবেশে কেঁচোরা একটি শীতল স্থানের অবস্থান খুঁজে নিতে পারে। পরজীবী বোলতা (Argochrysis armilla) মনে রাখতে পারে আরেকটি হাইমেনপটেরা (Ammophila pubescens) তার প্রাকৃতিক বাসা খুঁড়েছিল কিনা যাতে সেই বাসায় ডিম পেড়ে তার লার্ভা খেতে পারে। অন্য মৌমাছিদের বাসায় ফিরে যাওয়ার পথ সহজ করতে Partamona batesi একটি অনন্য আচরণ গড়ে তুলেছে। তারা সাদা নদীর বালু জোড়া লাগিয়ে একটি চোখে পড়ার মতো প্রবেশদ্বার তৈরি করে। এই ভিন্ন ভিন্ন আচরণগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় হলো এই পোকামাকড়রা তাদের আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা রাখতে পারে এবং সেই অনুযায়ী চলাচল করতে পারে। স্থানীয় স্মৃতির প্রকাশ ঘটে এমন পোকামাকড়দের আচরণে, যারা কেন্দ্রীয় স্থানভিত্তিক খাদ্য অনুসন্ধান করে। কোনো খাদ্যপূর্ণ স্থানের অবস্থান মনে রাখা, বাসায় ফিরে আসা, অথবা জলের প্রবাহ বা বাতাসের মধ্যে নির্দিষ্ট অবস্থান ধরে রাখা এসবের জন্য অবস্থান মনে রাখার ক্ষমতা খুব গুরুত্বপূর্ণ [5]।
সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত সামাজিক মৌমাছি ও পিঁপড়াদের নিয়ে মূলত আচরণগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়েছে। এসব গবেষণায় সাধারণত সরল পরিবেশ ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে চিহ্ন বা দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যপট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে স্মৃতিভিত্তিক তিন ধরনের দিকনির্দেশনা প্রক্রিয়া চিহ্নিত করা হয়েছে [5]। এই তিনটির মধ্যে দুটি পরিবেশের দৃশ্য মনে রাখার উপর নির্ভর করে। আর তৃতীয়টি একটি অভ্যন্তরীণ হিসাবরক্ষক ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে কাজ করে, যা বাসা থেকে কোনো নির্দিষ্ট স্থানের দিকে একটি ভেক্টর তৈরি করে [2][3][4][5][7][12][13] :
- অ্যালাইনমেন্ট ইমেজ-ম্যাচিং পদ্ধতিতে পরিচিত পথে চলার সময় স্মৃতিতে থাকা দৃশ্যের সঙ্গে বর্তমান দৃশ্যের মিল খোঁজা হয় [5][10]।
- পজিশন ইমেজ-ম্যাচিং একটি সাধারণ দিকনির্দেশনা পদ্ধতি। এটি তখন ব্যবহৃত হয় যখন গন্তব্যের অবস্থান জানা থাকে কিন্তু যাত্রার পথটি নতুন হয় [1][5][13]।
- পাথ ইন্টিগ্রেশন পদ্ধতিটি ব্যবহার করা হয় যখন চারপাশের পরিবেশ অজানা হয় অথবা পথচলা হয় কোনো বৈশিষ্ট্যহীন দৃশ্যপটের মধ্য দিয়ে। এই ক্ষেত্রে পোকামাকড়টি দূরত্ব ও দিক পরিমাপ করে একটি ভেক্টর তৈরি করে [2][5]।
এই তিনটি পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করে পোকামাকড় তার সংবেদী ইনপুটের সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত সংবেদী ইনপুটের স্মৃতিকে তুলনা করে। এই ইনপুটগুলোর মধ্যে যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়, তা “আউটপুট ভেক্টর”-এ রূপান্তরিত হয় যা কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে নির্দেশ করে [4][5]। যে পরিস্থিতি থাকে তার উপর নির্ভর করে সব প্রক্রিয়া একসঙ্গে দরকার হয় না। বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা পাওয়া সম্ভব হয় এই তিনটি প্রক্রিয়ার মিলিত এবং পরিপূরক কার্যকারিতার মাধ্যমে [4][5]।
অ্যালাইনমেন্ট ইমেজ-ম্যাচিং
[সম্পাদনা]অ্যালাইনমেন্ট ইমেজ-ম্যাচিং হলো স্মৃতির সঙ্গে দৃষ্টির তুলনা করার সবচেয়ে প্রাথমিক পদ্ধতি। এটি তখন ব্যবহৃত হয় যখন কোনো পরিচিত পথে চলাচল করা হয়। এই অবস্থায়, চোখে যা দেখা যায় তা স্মৃতিতে থাকা চিত্রের সঙ্গে তুলনা করে মিলিয়ে নেওয়া হয় [10]।
ভরের আংশিক অবস্থান, প্রান্তের অভিমুখ এবং খণ্ডবিভাজন
[সম্পাদনা]লেন্ট ও তাঁর সহকর্মীরা কাঠের পিঁপড়ার (Formica rufa) আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন একটি কৃত্রিম পরিবেশে। তাঁরা মূল দৃশ্যপট এবং পরিবর্তিত দৃশ্যপটে পিঁপড়াগুলোর চলার পথের তুলনা করেন। গবেষণায় দেখা যায় পিঁপড়ারা কোন দিক বেছে নেবে তা নির্ধারণে তারা বিভিন্ন রকম আচরণ প্রদর্শন করে। এই আচরণগুলোর মধ্যে একটি হলো আকৃতির ভরের কেন্দ্র নির্ণয় করার পিঁপড়ার পূর্বপরিচিত ক্ষমতা। গবেষণায় দেখা যায় পিঁপড়ারা “ভরের আংশিক অবস্থান” (Fractional Position of Mass বা FPM) ব্যবহার করে নিজেদের অভিমুখ নির্ধারণ করে। এটি এমন একটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি যা কয়েক মিটার দূর থেকেও কাজ করে। FPM হলো একটি নির্দিষ্ট দিক যেদিকে পিঁপড়াটি অগ্রসর হয়। এটি আকৃতির বাম ও ডান পাশের ক্ষেত্রফলের অনুপাতে বর্ণনা করা হয় (চিত্র ১)। আরও দেখা গেছে পোকামাকড়রা স্থানীয় চাক্ষুষ বৈশিষ্ট্য যেমন কোনো আকৃতির তির্যক প্রান্ত শনাক্ত করে এবং সেগুলোকে দৃষ্টির স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে অভিমুখ নির্ধারণ করে [8][10]। এছাড়া পিঁপড়ারা জটিল দৃশ্যগুলোকে খণ্ডবিভাজন করে এবং প্রতিটি খণ্ডের জন্য আলাদা করে FPM নির্ণয় করে। তবে যদি দৃশ্যটি সহজ হয়। তখন পুরো ছবির জন্য একটি মাত্র FPM নির্ণয় করা হয় [10]।
সর্বোত্তম দিকনির্দেশনার জন্য দেখা যায় যে পিঁপড়ারা প্রথমে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য দিয়ে নিজেদের অভিমুখ নির্ধারণ করে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পিঁপড়ারা সম্ভবত তাদের দেখার ক্ষেত্র খণ্ডবিভাজন করে এবং প্রতিটির জন্য উপযুক্ত FPM হিসাব করে। যদি তারা মূল পথ থেকে সরে যায়, তবে দেহের দিক পরিবর্তন তারা করে হঠাৎ বাঁক নেয়ার মতো আচরণের মাধ্যমে [10]। পরীক্ষায় দেখা গেছে, কাঠের পিঁপড়ারা প্রায় প্রতি তিন সেকেন্ডে এমন সমন্বয় করে এবং প্রয়োজনে ৭০ ডিগ্রি পর্যন্ত দিক সংশোধন করে [5]।
স্থানিক নির্দেশক ও দিগন্তদৃশ্য
[সম্পাদনা]একটি নির্ভরযোগ্য চিহ্নের বৈশিষ্ট্য হলো তা যেন একাধিক যাত্রায় উপলব্ধ থাকে এবং বিভিন্ন আলো পরিস্থিতিতেও দৃশ্যমান হয় (চিত্র ২)। গ্রাহাম ও চেং প্রস্তাব করেছেন যে, আকাশরেখা একটি নির্ভরযোগ্য চিহ্ন হিসেবে কাজ করে। আকাশরেখা প্রোফাইল হলো এমন কোনো বস্তু যা মাটিতে অবস্থিত এবং আকাশের পটভূমিতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয় [7]। তাঁদের গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছিল তথাকথিত “জিরো ভেক্টর” পিঁপড়া। জিরো ভেক্টর পিঁপড়া হলো সেইসব পিঁপড়া, যাদের বাসায় প্রবেশের ঠিক আগে ধরে নেওয়া হয়েছে। ফলে তাদের দিকনির্দেশনা ভেক্টর শূন্য থাকে এবং স্থানান্তরের পর শুধুমাত্র চাক্ষুষ সংকেতের উপর নির্ভর করেই চলতে হয়। গ্রাহাম ও চেং পরীক্ষা করেন কীভাবে এই পিঁপড়াগুলো স্থানান্তরের পরও সফলভাবে নিজেদের বাসায় ফিরে যায়। তাঁরা এই আচরণ একটি কৃত্রিম দৃশ্যপটে এবং বিভিন্ন দিক সরানো সংস্করণেও পরীক্ষা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, পিঁপড়ারা তাদের দিক পরিবর্তন করে ভুল আকাশরেখা অনুযায়ী, যা প্রমাণ করে তারা অভ্যন্তরীণ দিকনির্দেশনা ছাড়াও কাজ করতে পারে [7]।

অন্য গবেষকেরা সবসময় দৃশ্যমান আকাশরেখাকে অন্যান্য চিহ্ন থেকে আলাদা করে দেখেন। উইস্ট্রাচ ও তাঁর সহকর্মীরা লক্ষ্য করেন যে পিঁপড়া (Melophorus bogati) কেবলমাত্র চিহ্ন ব্যবহার করে দিকনির্দেশনা পায় এমন নয়। কারণ পিঁপড়ার চোখের রেজোলিউশন খুব কম, যা প্রাকৃতিক দৃশ্যপটকে সরল করে ফেলে। এজন্য ধারণা করা হয়, পিঁপড়ারা প্যানোরামা বা আকাশরেখা ব্যবহার করে প্রাথমিক অভিমুখ নির্ধারণ করে [12]।
পজিশনাল ইমেজ-ম্যাচিং
[সম্পাদনা]পজিশনাল ইমেজ-ম্যাচিং হলো দৃষ্টিস্মৃতির একটি সাধারণ এবং ব্যাপক ব্যবহার। এটি অ্যালাইনমেন্ট ইমেজ-ম্যাচিং-এর তুলনায় আরও উন্নত। কারণ এটি অপরিচিত স্থান থেকে নতুন পথ হয়ে পরিচিত গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে, যদি আশেপাশে কিছু পরিচিত উপাদান থাকে [5]। জটিল পরিবেশে পিঁপড়ারা তাদের অভ্যন্তরীণ দিকনির্দেশনা ভেক্টর এবং আশেপাশের চিহ্নের উপর নির্ভর করে। তবে যদি তারা পরিচিত পরিবেশে থাকে এবং পর্যাপ্ত চিহ্ন থাকে, তাহলে তারা অভ্যন্তরীণ ভেক্টর উপেক্ষা করে এবং স্মৃতিতে থাকা দৃশ্যের উপর ভিত্তি করে চলাচল করে [1][13]। এই পদ্ধতি যে পিঁপড়ারা ব্যবহার করে, তা প্রমাণিত হয়েছে এক রোবটের মাধ্যমে, যা ইমেজ-ম্যাচিং করে এবং পিঁপড়ার মতোই আচরণ প্রদর্শন করে [11]।
দিগন্তদৃশ্যের উচ্চতা, দৃশ্যমান দিকনির্ণয় এবং মিসম্যাচ গ্রেডিয়েন্ট ডিসেন্ট
[সম্পাদনা]উইস্ট্রাচ ও তাঁর সহকর্মীরা আরও তিনটি ভিউ-ম্যাচিং কৌশল প্রস্তাব করেছেন। প্রথমত, তাঁরা বলেন যে, পিঁপড়ারা বর্তমান স্থানের আকাশরেখার উচ্চতা স্মৃতিতে থাকা গন্তব্যস্থানের আকাশরেখার সঙ্গে তুলনা করে। যদি বর্তমান আকাশরেখা বেশি হয়, তাহলে পিঁপড়াকে সামনে দিকে এগোতে হয়। আর যদি আকাশরেখা কম হয়, তাহলে পিঁপড়াকে তার বর্তমান অভিমুখ থেকে সরে যেতে হয় (চিত্র ৩)। এই মডেলটি সাধারণভাবে নির্ভরযোগ্য হলেও দুটি দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত, দুটি দৃশ্যের মধ্যে উচ্চতার পার্থক্য স্পষ্ট হতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্মৃতির দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা করতে হলে পিঁপড়ার অবস্থান অবশ্যই সেই একই দিকনির্দেশনায় হতে হবে। এটি সম্ভব হয় ভূচৌম্বক বা সৌর কম্পাসের মাধ্যমে। তাই আকাশরেখার উচ্চতা তুলনা নতুন স্থানে আনুমানিক দিক নির্ধারণে সহায়ক হলেও গন্তব্যের কাছাকাছি হলে তেমন কার্যকর নয় [13]।

দ্বিতীয়ত, তাঁদের মতে পিঁপড়াদের একটি ভিজ্যুয়াল কম্পাস রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন হয় বাসার চারপাশ থেকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে স্মৃতিতে দৃশ্য ধারণ করা। যদি পিঁপড়া কোনো অচেনা স্থানে পড়ে, তাহলে সে বর্তমান দৃশ্যকে স্মৃতির দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা করে সবচেয়ে মিল পাওয়া দৃশ্যটি নির্বাচন করে এবং সেখান থেকে দিক নির্ধারণ করে। এই মডেলকে সমর্থন করে Ocymyrmex পিঁপড়াদের শেখার হাঁটার পর্যবেক্ষণ যেখানে তারা বাসার দিকে মুখ করে হাঁটে। আকাশরেখার উচ্চতা তুলনার তুলনায় এই পদ্ধতিতে সঠিক অভিমুখ নির্ধারণ সহজ হয়, কারণ স্মৃতির দৃশ্যগুলো শুরুতেই বাসার দিকে মুখ করা অবস্থায় ধারণ করা। তবে যদি সেই দৃশ্যটি সবচেয়ে ভালো মিল না খায়, তাহলে পিঁপড়া সম্পূর্ণ ভুল পথে চলে যেতে পারে। অর্থাৎ পরিচিত পথে ভিজ্যুয়াল কম্পাস একটি নির্ভরযোগ্য কৌশল, কিন্তু অচেনা স্থান থেকে বাসার পথ খুঁজতে গেলে এটি ততটা কার্যকর নয় [13]।
তৃতীয় প্রস্তাবিত প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় "মিসম্যাচ গ্রেডিয়েন্ট ডিসেন্ট", যা পিপঁড়ের দিক নির্ধারণে সাহায্য করে। এতে দেখা যায়, পিপঁড়ে যে দৃশ্য দেখছে এবং আগে যে দৃশ্য মনে রেখেছে, সেই দুটি দৃশ্যের মধ্যে ক্রমাগত তুলনা চলতে থাকে। এই প্রক্রিয়া কাজ করতে হলে পিপঁড়েকে তিন-মাত্রিক তথ্যের প্রয়োজন হবে, যা ল্যান্ডস্কেপের উপর তির্যকভাবে চলাফেরা করে সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু পিপঁড়ের ক্ষেত্রে এমন চলাফেরা দেখা যায় না। তাই ধারণা করা হয়, শুধু মিসম্যাচ গ্রেডিয়েন্ট ডিসেন্ট ব্যবহারে পিপঁড়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না [13]।
এই গবেষণাগুলো থেকে বোঝা যায় যে, দিক নির্ধারণে স্কাইলাইন উচ্চতার তুলনা বেশি কার্যকর। হাঁটার সময় মিসম্যাচ গ্রেডিয়েন্ট ডিসেন্ট পিপঁড়েকে বাসার দিক মনে রাখতে সাহায্য করে। আর যখন পিপঁড়ে বাসার কাছে পৌঁছায়, তখন ভিজ্যুয়াল কম্পাস তাকে বাসায় নিয়ে যেতে সাহায্য করে। বিভিন্ন মডেল একসঙ্গে কাজ করতে পারে, এবং এদের ভূমিকা সময় ও পরিবেশ অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে [13]। যদি উপরের কোনো প্রক্রিয়াই দিক নির্দেশ না করে, অর্থাৎ যদি পিপঁড়ে একেবারে নতুন পরিবেশে থাকে, তাহলে তারা একটি পদ্ধতিগত খোঁজ শুরু করে। এই খোঁজ শুরু হয় ছোট লুপ দিয়ে এবং সময়ের সাথে লুপের আকার ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে [13]।
স্থান পরিবর্তনের পর বিভ্রান্তি
[সম্পাদনা]গবেষণায় দেখা গেছে যে পিপঁড়েগুলো নির্দিষ্ট রুটে প্রশিক্ষিত তাদের বাসার সামনে তুলে নিয়ে আবার খাদ্যদানে ফেরত রেখে দিলে, তারা অল্প সময়ের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং দিকহীনভাবে হাঁটতে থাকে। মনে হয় এই সময়ে তারা বাসার দিকে ফেরার রুটের স্মৃতি উপেক্ষা করে। এটা স্পষ্ট যে রুটের পুনরাবৃত্তি পিপঁড়েকে বিভ্রান্ত করেছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে তাদের কি এপিসোডিক মেমোরি আছে যা বলে দেয় যে তারা এই রুট ইতিমধ্যে পেরিয়ে এসেছে কিনা [4]। তবে সবসময় বিভ্রান্তি দেখা যায় না বিশেষ করে জটিল পরিবেশে নয়। সম্ভবত পিপঁড়ে জটিল পরিবেশে তাদের দৃশ্য বিভাজন করে পর্যায়ক্রমে মনে রাখে। ফলে স্থানান্তরিত হওয়ার পর তারা ভাবে এখনো রুটের শেষ ধাপে পৌঁছায়নি। তাই তারা এখনো বাসার দিকে যাচ্ছে বলে ধরে নেয় [4]।
পথ একত্রীকরণ
[সম্পাদনা]পথ একত্রীকরণ এক ধরনের "ডেড-রেকনিং" যেখানে দিক, গতি ও সময় মাপার মাধ্যমে চলার পথের হিসাব রাখা হয় [2][5]। এর জন্য একটি 'অ্যাক্যুমুলেটর' বা সংগ্রাহক যন্ত্র প্রয়োজন যা পুরো ব্যবস্থার মূল অংশ [6]। এর মাধ্যমে পিপঁড়ে একটি দিক পায় যা তাকে বলে দেয় যে সে কোন দূরত্ব ও কোন দিকে গেছে, বাসার অবস্থান অনুসারে [5]। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে হলে একটি আউটপুট ভেক্টর তৈরি করতে হয়। এটি পাওয়া যায় বর্তমান অবস্থার ভেক্টরকে গন্তব্যের ভেক্টর থেকে বাদ দিলে [4][5]।
পথ একত্রীকরণ ভেক্টর তৈরি
[সম্পাদনা]ভেক্টর তৈরি করতে হলে কীটের একটি সূচনাবিন্দু দরকার হয়। এই মডেলে বাসাকেই উৎসবিন্দু হিসেবে ধরা হয় এবং তাকে শূন্য ধরে নেওয়া হয় [6]। ভেক্টরের দিক নির্ধারণ করতে হয় বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ সংকেত অনুযায়ী। বাহ্যিক সংকেত হলো সূর্য কম্পাস, বড় কোনো নিদর্শন বা মেরুকৃত আলো [3]। আর অভ্যন্তরীণ সংকেত যেমন পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের অনুভূতি তখন কাজে লাগে যখন বাহ্যিক কিছু থাকে না [2][3][5]। মৌমাছিরা চলার সময় চোখের সামনে দৃশ্য পরিবর্তনের গতি (অপটিক ফ্লো) দিয়ে দূরত্ব মাপে। পিপঁড়ে এই দূরত্ব নির্ধারণ করে পায়ের চলার অনুভূতি থেকে [2][5]।
নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যবিহীন পরিবেশে পিপঁড়ে সম্পূর্ণরূপে পথ একত্রীকরণের উপর নির্ভর করে
[সম্পাদনা]পিপঁড়ের দিকনির্দেশনার এই গাণিতিক পদ্ধতি তাকে অজানা পরিবেশেও চলাচলে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে তারা বৈশিষ্ট্যহীন পরিবেশ পেরিয়ে বাসায় ফিরে যেতে পারে [5]। কোলেট এবং তার সহকর্মীরা একটি সহজ পরীক্ষা করেন যেখানে প্রমাণ মেলে যে পিপঁড়ে সম্পূর্ণরূপে পথ একত্রীকরণের উপর নির্ভর করে। পিপঁড়ে যখন বাসায় ফেরে, তখন তাদের হঠাৎ করে পরিচিত বা অপরিচিত স্থানে সরিয়ে দেওয়া হয়। উভয় ক্ষেত্রেই তারা তাদের পথ ধরে চলতে থাকে, যতক্ষণ না তারা এমন স্থানে পৌঁছে যেখানে তাদের মতে বাসা থাকার কথা। কেবল তখনই তারা খোঁজাখুঁজি শুরু করে [6]।

পথ একত্রীকরণ একটি গাণিতিক ও বৌদ্ধিক চ্যালেঞ্জ
[সম্পাদনা]বর্তমান অবস্থান ট্র্যাক করার জন্য অ্যাক্যুমুলেটরের পাশাপাশি, পিপঁড়েদের এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন যা গন্তব্যের পথ একত্রীকরণ ভেক্টর সংরক্ষণ করতে পারে। চলার সময় তাদের চারটি বিষয় মনে রাখতে হয়: বর্তমান পথ একত্রীকরণের অবস্থা, গন্তব্যের অবস্থা, তুলনাকারীর ফলাফল এবং আউটপুট ভেক্টর। এই নির্দেশক ব্যবস্থা ভেক্টর গণনার উপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও, এখনো কোনো স্নায়বিক প্রক্রিয়া জানা যায়নি, যা এটি পরিচালনা করতে পারে [6]।
পথ একত্রীকরণের দুটি প্রধান মডেল
[সম্পাদনা]পথ একত্রীকরণের জন্য দুটি প্রধান মডেল আছে। প্রথমটি বলে, অ্যাক্যুমুলেটর ক্রমাগত আপডেট হয়। দ্বিতীয়টি বলে, মাঝে মাঝে অ্যাক্যুমুলেটর আপডেট হয়। ক্রমাগত আপডেট মডেলে দেখা যায়, পিপঁড়ে বাসা ছাড়ার সময় যে অবস্থা ছিল, ফিরে আসার সময়ও সেই অবস্থা থাকতে হবে। তাই এটি "ইন-বাউন্ড" সিস্টেম। অন্যদিকে, ইন্টারমিটেন্ট আপডেট মডেলে অ্যাক্যুমুলেটর বাসা থেকে বেরোনোর সময় ও ফিরে আসার জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর সময় রিসেট হয়। তখন কম্পাসের দিক উল্টে যায় এবং পিপঁড়ে বিপরীত ভেক্টরের দিকে হাঁটে। তাই এই পদ্ধতি "আউট-বাউন্ড"। গবেষণায় দেখা গেছে, দ্বিতীয় মডেলটি বেশি সম্ভব, কারণ এতে সামান্য ভুলের সুযোগ থাকে, যা বাস্তব পরিস্থিতির সাথে বেশি মানানসই [6]।
পথ একত্রীকরণ ও দৃশ্য-সাদৃশ্যের সমন্বয়
[সম্পাদনা]পূর্বে আলোচনা অনুযায়ী, পিপঁড়ে শুধু পথ একত্রীকরণের উপর নির্ভর করে না। পরিচিত রুটে চলার সময় তারা মূলত দৃশ্য সাদৃশ্য বা নিদর্শন মিলিয়ে দিক নির্ধারণ করে। এই দুটি পদ্ধতি আলাদা হলেও, একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে। পথ একত্রীকরণ দিয়ে হাঁটার সময় নতুন নিদর্শন শিখে নেওয়া যায়। আবার নিদর্শন মিলিয়ে চলার সময় চলার ভেক্টর মানানসই করে নেওয়া যায় [6]।
পথ একীকরণ ও গবেষণা
[সম্পাদনা]পতঙ্গের দিক নির্ধারণের কৌশল রোবট উন্নয়নের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি রোবট তৈরি হয়েছে যেগুলোর প্রধান নেভিগেশন পদ্ধতির একটি হিসেবে পথ একীকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। এই নীতিটি চালকবিহীন গাড়িতেও প্রয়োগ করা হয়[2][3][11]। ল্যামব্রিনোস এবং তার সহকর্মীরা “Sahabot” নামক একটি রোবট তৈরি করেছেন যা পথ একীকরণ এবং দৃশ্য মিলানোর ভিত্তিতে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করে [9]। খোলা এলাকা দিয়ে চলাচল করা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও যেসব পরিবেশ জটিল বা বিশৃঙ্খল সেখানে চলাচল এখনো গভীর গবেষণার বিষয় [2]। এই গবেষণা ক্ষেত্র শুধু যন্ত্রের উন্নয়নেই সাহায্য করে না। এটি মানুষের দিকনির্দেশনা বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। পথ একীকরণের নীতি অন্ধ মানুষ, ভারসাম্যজনিত সমস্যা রয়েছে এমন রোগী কিংবা তাত্ত্বিক গবেষণায়ও ব্যবহৃত হয় [2]।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি
[সম্পাদনা]সঠিক ও সাবলীল দিক নির্ধারণের জন্য, মনে রাখা এবং শেখার মধ্যে সম্পর্ক থাকতে হয়। পতঙ্গদের অবশ্যই লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান এবং সেখানে পৌঁছানোর পথ শেখা লাগে। এছাড়াও অন্য পতঙ্গদের কাছ থেকেও তারা রুট শিখতে পারে। এই ধরনের আচরণের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো সামাজিক মৌমাছি (Apis mellifera)[5]।
যদিও পতঙ্গরা তিনটি আলাদা দিক নির্ধারণ পদ্ধতি ব্যবহার করে। তবে মনে হয় তারা "কগনিটিভ ম্যাপ" বা মানসিক মানচিত্র তৈরি করতে পারে না। আসলে পথ একীকরণের প্রেক্ষিতে এটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে যে, সত্যিই এমন কোন মানচিত্র বিদ্যমান কি না [5]। তবে মনে রাখতে হবে পতঙ্গদের মধ্যে এমন একটি মানচিত্র অজানা কোনো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে থাকতে পারে [5]।
শেখা এবং কগনিটিভ ম্যাপ নিয়ে আলোচনা এখানে করা হয়নি তবে এগুলো ভবিষ্যতে বিশ্লেষণের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা][1] Akesson, S., & Wehner, R. (2002). Visual navigation in desert ants Cataglyphis \newblock fortis: are snapshots coupled to a celestial system of reference? J Exp Biol, \newblock 205(Pt 14), 1971-1978.
[2] Cheng, K., & Freas, C. A. (2015). Path integration, views, search, and matched filters: the contributions of Rudiger Wehner to the study of orientation and navigation. J Comp Physiol A Neuroethol Sens Neural Behav Physiol, 201(6), 517-532. doi:10.1007/s00359-015-0984-9
[3] Cheng, K., & Newcombe, N. S. (2005). Is there a geometric module for spatial orientation? Squaring theory and evidence. Psychon Bull Rev, 12(1), 1-23.
[4] Collett, M. (2014). A desert ant's memory of recent visual experience and the control of route guidance. Proc Biol Sci, 281(1787). doi:10.1098/rspb.2014.0634
[5] Collett, M., Chittka, L., & Collett, T. S. (2013). Spatial memory in insect navigation. Curr Biol, 23(17), R789-800. doi:10.1016/j.cub.2013.07.020
[6] Collett, M., & Collett, T. S. (2000). How do insects use path integration for their navigation? Biol Cybern, 83(3), 245-259. doi:10.1007/s004220000168
[7] Graham, P., & Cheng, K. (2009). Ants use the panoramic skyline as a visual cue during navigation. Curr Biol, 19(20), R935-937. doi:10.1016/j.cub.2009.08.015
[8] Harris, R. A., Graham, P., & Collett, T. S. (2007). Visual cues for the retrieval of landmark memories by navigating wood ants. Curr Biol, 17(2), 93-102. doi:10.1016/j.cub.2006.10.068
[9] Lambrinos, D., Moller, R., Labhart, T., Pfeifer, R., & Wehner, R. (2000). A mobile robot employing insect strategies for navigation. Robotics and Autonomous Systems, 30(1-2), 39-64. doi:Doi 10.1016/S0921-8890(99)00064-0
[10] Lent, D. D., Graham, P., & Collett, T. S. (2013). Visual scene perception in navigating wood ants. Curr Biol, 23(8), 684-690. doi:10.1016/j.cub.2013.03.016
[11] Moller, R. (2000). Insect visual homing strategies in a robot with analog processing. Biological Cybernetics, 83(3), 231-243. doi:Doi 10.1007/Pl00007973
[12] Wystrach, A., Beugnon, G., & Cheng, K. (2011). Landmarks or panoramas: what do navigating ants attend to for guidance? Front Zool, 8, 21. doi:10.1186/1742-9994-8-21
[13] Wystrach, A., Beugnon, G., & Cheng, K. (2012). Ants might use different view-matching strategies on and off the route. J Exp Biol, 215(Pt 1), 44-55. doi:10.1242/jeb.059584