বিষয়বস্তুতে চলুন

ইন্দ্রিয়তন্ত্র/দৃষ্টিতন্ত্র/পুরাতন/সংবেদী অঙ্গ

উইকিবই থেকে

দৃষ্টিশক্তি, বা দেখার ক্ষমতা, নির্ভর করে চাক্ষুষ সংবেদী অঙ্গ বা চোখের উপর। বিভিন্ন প্রাণীর প্রয়োজনে চোখের গঠন ভিন্ন হয়ে থাকে, এবং এসব গঠন ভিন্ন ধরনের সক্ষমতা প্রদান করে, ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রতি সংবেদনশীল হয় এবং ভিন্ন মাত্রার তীক্ষ্ণতা প্রদান করে। এসব চোখ আলাদা আলাদা পদ্ধতিতে তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং ভিন্ন সংখ্যায় কার্যকর হয়। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক (EM) তরঙ্গ শনাক্ত ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা অধিকাংশ জীবের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, কারণ এটি তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। তবে যেসব পরিবেশে আলো অনুপস্থিত বা একেবারেই নেই, সেসব পরিবেশে দৃষ্টিশক্তির কোনও বাড়তি সুবিধা না থাকায় চোখের অঙ্গগুলোর অবনতি ঘটে এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায় (যেমন গুহাবাসী প্রাণী, বাদুড় ইত্যাদি)।

বিষয়টি আকর্ষণীয়ভাবে লক্ষণীয় যে, চাক্ষুষ সংবেদী অঙ্গসমূহ এমন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রতি সংবেদনশীল যা বায়ুমণ্ডল দিয়ে ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায় — এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যগুলোর পরিসরকে অপটিক্যাল উইন্ডো বলা হয় (প্রায় ৩০০ ন্যানোমিটার থেকে ১১০০ ন্যানোমিটার)। নিচের চিত্রে এটি দেখানো হয়েছে। আপনি লক্ষ্য করবেন যে আরও কিছু "উইন্ডো" রয়েছে, যেমন ইনফ্রারেড উইন্ডো, যা সাপের তাপ-ভিত্তিক "দৃষ্টিশক্তি" ব্যাখ্যা করে, এবং রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি (RF) উইন্ডো, যেটা কোনও পরিচিত জীব শনাক্ত করতে পারে না।

সময়ের সাথে সাথে বিবর্তন বিভিন্ন ধরনের চোখ তৈরি করেছে, এবং এর অনেকগুলোই বহুবার বিকশিত হয়েছে, যার ফলে এক ধরনের পরিবেশে বসবাসকারী ভিন্ন ভিন্ন প্রাণীর চোখে মিল পাওয়া যায়। তবে একটি মৌলিক বিষয় সব চোখেই অভিন্ন থাকে — তা হলো লাইট-সেন্সিটিভ প্রোটিন, যাকে বলা হয় অপসিন। এটি সব চোখেই ব্যবহৃত হয়।

চোখের বিভিন্ন গঠনকে সাধারণত নিচের শ্রেণিগুলোতে ভাগ করা যায়:

  • স্পট আই (বিন্দু চোখ)
  • পিট আই (গর্ত চোখ)
  • পিনহোল আই (সূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত চোখ)
  • লেন্স আই (লেন্সযুক্ত চোখ)
  • রিফ্র্যাকটিভ কর্নিয়া আই (বিভাজক কর্নিয়াযুক্ত চোখ)
  • রিফ্লেক্টর আই (প্রতিফলক চোখ)
  • কম্পাউন্ড আই (যৌগিক চোখ)

সবচেয়ে সাধারণ এবং সহজ গঠনের চোখের মাধ্যমে প্রাণী আশেপাশের আলো আছে কিনা তা বুঝতে পারে। সাধারণত এগুলো আলোক-সংবেদী কোষের একটি গুচ্ছ যা একই স্থানে অবস্থিত, এবং এগুলোকে স্পট আই, আই স্পট বা স্টেমা বলা হয়। যদি এগুলোর চারপাশে গহ্বর বা কোণ যুক্ত করা হয়, তবে প্রাণীটি আলো আসার দিক সম্পর্কে তথ্য পায় — যা চিত্র গঠনের জন্য অত্যাবশ্যক। এই ধরনের গঠনের চোখ, যাকে বলা হয় পিট আই, বর্তমানে ৯৫% এর বেশি প্রাণীর মধ্যে পাওয়া যায়।

Pinhole eye

এই পদ্ধতির চূড়ান্ত রূপ হলো চোখের গহ্বরটি গভীর হয়ে গিয়ে একটি গহ্বর-আকৃতির গঠন লাভ করা। এতে করে চিত্রের তীক্ষ্ণতা বাড়ে, তবে উজ্জ্বলতা কমে যায়। অর্থাৎ তীক্ষ্ণতা ও উজ্জ্বলতার মাঝে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। এর একটি উদাহরণ হলো নটিলাস নামক জীব, যাদের চোখ পিনহোল ক্যামেরার মতো কাজ করে। তারা ছিদ্রের আকার পরিবর্তন করে চিত্রের রেজোলিউশন বাড়াতে বা কমাতে পারে, ঠিক ক্যামেরার মতো। এই সমস্যার সমাধান করতে চোখে লেন্স যুক্ত করা হয় — যেটি আলোকে কেন্দ্রীভূত করে চিত্র আরও পরিষ্কার করে তোলে। লেন্সের আকার ও অবস্থান পরিবর্তন এবং পিউপিল বা ছিদ্রের আকার নিয়ন্ত্রণ করে প্রাণী পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।

সবচেয়ে উন্নত রূপ হলো রিফ্র্যাকটিভ কর্নিয়া আই। এই গঠনে কর্নিয়ার ভিতরের তরলের অপটিক্যাল শক্তি চোখের মোট শক্তির দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি বহন করে, যার ফলে দেখা যায় অত্যন্ত পরিষ্কার চিত্র। অধিকাংশ স্থলচর প্রাণী, এমনকি মানুষও, এই ধরনের চোখের গঠন বহন করে। লেন্সের সংখ্যা, ফোটোসেন্সরের ঘনত্ব, ফোভিয়ার গঠন, পিউপিলের আকার ইত্যাদির মধ্যে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়, যা প্রাণীর টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়।

Refractive Cornea Eyes
বাজপাখির চোখ
ভেড়ার চোখ
বিড়ালের চোখ
মানব চোখ

লেন্স ভিত্তিক গঠনের একটি বিকল্প হলো প্রতিফলক চোখ। যেমন: কিছু মলাস্কে এই ধরনের চোখ দেখা যায়। এখানে লেন্স ব্যবহার না করে চোখের ভেতরে আয়না সদৃশ গঠন থাকে, যা আলো প্রতিফলিত করে একটি কেন্দ্রীয় স্থানে নিয়ে আসে — ঠিক যেন একটি প্যারাবোলা ডিশের মতো। যদিও কোনও প্রতিফলক চোখ এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ চিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানা যায়নি, তবে একটি মাছ প্রজাতি — স্পুকফিশ (Dolichopteryx longipes) — প্রতিফলক চোখকে লেন্সযুক্ত চোখের সঙ্গে ব্যবহার করে।

Compound eye

সবচেয়ে ভিন্ন গঠনের চোখ হলো যৌগিক চোখ, যা কীটপতঙ্গ ও জলচর অঙ্গজপ্রাণীতে পাওয়া যায়। এগুলো অনেকগুলো উপ-একক (ommatidia) নিয়ে গঠিত, প্রতিটি ইউনিটে থাকে একটি ফ্যাসেট বা সামনের পৃষ্ঠ, স্বচ্ছ কনিকা এবং আলোক-সংবেদী কোষ। প্রতিটি ওmmatidia পরস্পর থেকে রঞ্জক কোষ দ্বারা পৃথক থাকে, যাতে আলো যতটা সম্ভব সমান্তরালভাবে প্রবেশ করে। প্রতিটি ওমাটিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্য একত্রে একটি মোজাইক চিত্র তৈরি করে, যার রেজোলিউশন নির্ভর করে কতগুলো ওমাটিডিয়া রয়েছে তার উপর। উদাহরণস্বরূপ, যদি মানুষের চোখ কম্পাউন্ড আই হতো, তবে সমপর্যায়ের রেজোলিউশন পাওয়ার জন্য পুরো মুখ চোখে ঢেকে যেত।

উল্লেখযোগ্য যে, কম্পাউন্ড আই বা যৌগিক চোখেরও বিভিন্ন রূপ রয়েছে, তবে এ বিষয়ে আরও বিশদ আলোচনা এই লেখার আওতার বাইরে।

চোখ শুধু গঠনগতভাবেই নয়, সংখ্যাতেও পরিবর্তিত হয়। যেমন: মানুষ সাধারণত দুটি চোখ নিয়ে জন্মায়, কিন্তু মাকড়সার চোখের সংখ্যা বিভিন্ন হতে পারে — বেশিরভাগ প্রজাতির ৮টি চোখ থাকে। সাধারণত এই চোখগুলো আকারে ভিন্ন হয় এবং বিভিন্ন আকারের চোখের বিভিন্ন কাজ থাকে। যেমন: লাফ দেওয়া মাকড়সার সামনে বড় দুটি চোখ খুব ভালো দৃষ্টিশক্তি প্রদান করে, যা শিকার নির্ধারণে সাহায্য করে। বাকি ৬টি ছোট চোখের রেজোলিউশন কম, তবে এগুলো শত্রু থেকে বাঁচতে সাহায্য করে।