ইন্দ্রিয়তন্ত্র/অক্টোপাস
অক্টোপাস: সংবেদন ও চলন ব্যবস্থা
[সম্পাদনা]ভূমিকা
[সম্পাদনা]অক্টোপাস হলো অপ্রাইমেটদের মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় একটি প্রাণী। এই অমেরুদণ্ডীর সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো এর বাহুর মাধ্যমে চলাচল। অক্টোপাস এর বাহু যেকোনো দিকে চালাতে পারে। এর চলাচলের মাত্রা প্রায় অসীম। ফলে বাহুর নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জটিল। অক্টোপাসের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক শুধু বাহুকে একটি আদেশ দেয় আর সেই কাজ কীভাবে করতে হবে তার সম্পূর্ণ নির্দেশনা বাহুর ভেতরেই থাকে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে অক্টোপাস তাদের বাহুর নিয়ন্ত্রণের জটিলতা কমানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থির প্যাটার্নে বাহু নাড়াচাড়া করে। গবেষকেরা বোঝার জন্য পরীক্ষা করে দেখেছেন বাহুগুলোর নিজস্ব 'চিন্তা' করার ক্ষমতা আছে কিনা। তারা একটি অক্টোপাসের বাহুর স্নায়ু শরীরের অন্যান্য স্নায়ু এবং মস্তিষ্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তারপর বাহুর ত্বক চুলকিয়ে ও উদ্দীপিত করে। দেখা যায় এই বাহুর আচরণ একটি সম্পূর্ণ সুস্থ অক্টোপাসের বাহুর মতোই। এ থেকে বোঝা যায় যে মস্তিষ্ক কেবল একটি ‘চল’ আদেশ দিলেই যথেষ্ট। এরপর বাহু নিজে থেকেই বাকিটা করে ফেলতে পারে।
এই অধ্যায়ে আমরা অক্টোপাসের সংবেদন পদ্ধতি এবং এই অপ্রাইমেট প্রাণীর সংবেদন-চলন পদ্ধতি নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করবো।
অক্টোপাস: বুদ্ধিমান অপ্রাইমেট
[সম্পাদনা]
অক্টোপাসের দুটি চোখ এবং চার জোড়া বাহু রয়েছে। এগুলো দ্বিপার্শ্বীয় সুষম গঠনবিশিষ্ট। এর মুখ বাহুগুলোর কেন্দ্রে অবস্থিত এবং মুখে একটি শক্ত ঠোঁট থাকে। অক্টোপাসের শরীরে কোনো অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক কঙ্কাল থাকে না (তবে কিছু প্রজাতির দেহে ম্যান্টলের ভেতরে খোলসের একটি ক্ষয়িষ্ণু অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে)। এজন্য তারা খুব সংকীর্ণ জায়গার মধ্য দিয়ে সহজেই চুইয়ে যেতে পারে। অক্টোপাস অমেরুদণ্ডীদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও আচরণগতভাবে সবচেয়ে নমনীয় প্রাণীদের অন্যতম।
অক্টোপাসের বাহুর চলাফেরাই এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে বাহু বাড়ানোর জন্য, অক্টোপাসের স্নায়ুতন্ত্র একটি ধারাবাহিক মোটর কমান্ড তৈরি করে যা বাহুকে লক্ষ্যবস্তুর দিকে নিয়ে যায়। বাহুর নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জটিল, কারণ এটি যেকোনো দিকে চলতে পারে এবং এর চলাফেরার সীমা কার্যত অসীম। স্বেচ্ছাচালিত চলাচলের জন্য মূল মোটর প্রোগ্রামটি বাহুর স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যেই থাকে।[১]
অক্টোপাসের বাহু চলন
[সম্পাদনা]অক্টোপাসের সংবেদন-চলন ব্যবস্থাটি একটি স্তরক্রমিক সংগঠনের মাধ্যমে গঠিত। এতে মস্তিষ্ক কেবল বাহুকে একটি আদেশ পাঠায়। আর কীভাবে কাজটি করতে হবে সেই পদ্ধতিটি বাহুর ভেতরে নিজেই থাকে। অক্টোপাস তাদের বাহু ব্যবহার করে হাঁটে, শিকার ধরে, অপ্রয়োজনীয় বস্তু ফেলে দেয় এবং আশপাশের পরিবেশ থেকে বিভিন্ন যান্ত্রিক ও রাসায়নিক তথ্য সংগ্রহ করে।
অক্টোপাসের বাহু কনুই মানুষের বাহুর মতো নয় কব্জি বা কাঁধের সন্ধি দিয়ে সীমিত নয়। তবে খাবার ধরার মতো লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাদের অবশ্যই এই আটটি অঙ্গকে সুনিপুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। অক্টোপাসের বাহু যেকোনো দিকে চলতে পারে কারণ এর চলাফেরার মাত্রা কার্যত অসীম। এই ক্ষমতা এসেছে বাহুর সারা জুড়ে ঘনভাবে ছড়িয়ে থাকা নমনীয় পেশি তন্তুর মাধ্যমে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অক্টোপাস বাহুর চলাচলের জটিলতা কমাতে নির্দিষ্ট ও পূর্বনির্ধারিত প্যাটার্নে চলাফেরা করে।[২] উদাহরণস্বরূপ বাহু বাড়ানোর সময় সব সময় একটি বাঁক তৈরি হয় যা বাহুর প্রান্তের দিকে এগিয়ে যায়। যেহেতু তারা সব সময় একই ধরণের নড়াচড়া করে বাহু বাড়ায় তাই এই প্যাটার্ন তৈরির আদেশ মস্তিষ্কে নয় বাহুর ভেতরেই সংরক্ষিত থাকে। এই প্রক্রিয়া নমনীয় বাহু নিয়ন্ত্রণকে আরও সহজ করে তোলে।
এই নমনীয় বাহুগুলো নিয়ন্ত্রিত হয় একটি অত্যন্ত জটিল প্রান্তিক স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে, যেখানে প্রতিটি বাহুতে 5 × 107 টি স্নায়ুকোষ ছড়িয়ে থাকে। এর মধ্যে 4 × 105 টি মোটর নিউরন, যেগুলো বাহুর অভ্যন্তরীণ পেশিগুলিকে উদ্দীপ্ত করে এবং স্থানীয়ভাবে পেশির কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। যখনই প্রয়োজন হয় অক্টোপাসের স্নায়ুতন্ত্র একটির পর একটি মোটর কমান্ড তৈরি করে। এই কমান্ডগুলো শক্তি এবং সংশ্লিষ্ট গতি সৃষ্টি করে, যার ফলে বাহু লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে। এই গতিবিধি সহজ হয় একটি নির্দিষ্ট পথে চলার মাধ্যমে। এই পথ তৈরি হয় ভেক্টর যোগফল এবং মৌলিক গতিবিধিগুলোর সংযোজনের মাধ্যমে। এজন্য অক্টোপাসের পেশিগুলোকে খুবই নমনীয় হতে হয়।
কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র
[সম্পাদনা]অন্যান্য অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের তুলনায় অক্টোপাস ও এ ধরনের প্রাণীদের (যেমন কাটলফিশ ও স্কুইড) তুলনামূলকভাবে বড় স্নায়ুতন্ত্র এবং আরও উন্নত মানসিক দক্ষতার রয়েছে। যদিও অক্টোপাসের মস্তিষ্কের গঠন মেরুদণ্ডী প্রাণীর মস্তিষ্কের মতো নয় তবুও এতে কিছু মিল রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতির ধরণ, ঘুমের ধরণ, ব্যক্তি চিনে রাখা এবং বস্তু পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা[৩]। অক্টোপাস সহজ গোলকধাঁধায় চলাচল করতে পারে এবং চেনা পরিবেশ চিহ্নিত করতে চোখের সংকেত ব্যবহার করতে পারে। আরও আশ্চর্যজনক হলো অক্টোপাস এমনকি তাদের বাহু ব্যবহার করে জারের ঢাকনা খুলে ভেতরের খাবার বের করতে পারে।
অক্টোপাস, কাটলফিশ এবং স্কুইড সকলেই সিফালোপড শ্রেণিভুক্ত, যেখানে অ্যামোনয়েড এবং অ্যারোস্টোনের মতো বিলুপ্ত প্রাণীরাও অন্তর্ভুক্ত। সিফালোপডদের বিবর্তনের সময় তাদের খোলস অন্তর্নিহিত হয়ে গেছে অথবা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। একই সঙ্গে আরও একটি পরিবর্তন ঘটেছে কিছু সিফালোপডের বুদ্ধিমত্তার পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। যদিও প্রাণীর বুদ্ধিমত্তার মাত্রা নির্ধারণ করা কঠিন, তবে এই প্রাণীরা বড় মাপের স্নায়ুতন্ত্র এবং বাহ্যত একটি মস্তিষ্কের মতো গঠন তৈরি করেছে। সাধারণ অক্টোপাসের দেহে প্রায় ৫০ কোটি স্নায়ুকোষ (নিউরন) থাকে, যা অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর সমান এবং কুকুরের কাছাকাছি[৪]। এই সংখ্যা অন্যান্য সব অমেরুদণ্ডী প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি।
অক্টোপাসের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা একটি সংক্ষিপ্ত গল্পে সহজেই বোঝানো যায়। একটি পানির ট্যাংকে বন্দি অক্টোপাস লক্ষ্য রাখছিল মানুষ তাকে লক্ষ্য করছে কি না। যখন দেখে কেউ খেয়াল করছে না, তখন সে সরে যায় এবং ট্যাংক থেকে পালাতে চেষ্টা করে। আলাস্কা প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী ডেভিড শিল এই ঘটনা জানান। এমনকি মানুষ মুখে মাস্ক পরলেও অক্টোপাস বুঝে ফেলে সে মানুষের উপস্থিতি আছে কি না[৪]।
অক্টোপাসের মস্তিষ্কের গঠন মেরুদণ্ডী প্রাণীর মস্তিষ্কের মতো নয়। অক্টোপাসের বেশিরভাগ স্নায়ুকোষ তার মস্তিষ্কে নয়, বরং তার বাহুতে থাকে। কার্যত, অক্টোপাসের মস্তিষ্ক বেশিরভাগ সংবেদনশীল তথ্য এবং মোটর কমান্ড প্রক্রিয়াকরণ করে না। বরং, মস্তিষ্ক কেবল একটি অংশ নেয় এবং সাধারণ কিছু নির্দেশ দেয়। এই নির্দেশগুলো তখনই বাস্তবায়িত হয় যখন সেগুলো নির্দিষ্ট অঙ্গে পৌঁছায়। এর মানে হলো অক্টোপাসের মস্তিষ্ক তার বাহুর কাজের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে না। তবে এর মানে এই নয় যে মস্তিষ্কের কোনো ভূমিকা নেই। যদি মেরুদণ্ডী প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্রের স্তরভিত্তিক গঠন দেখি (যেখানে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র পারিপার্শ্বিক স্নায়ুতন্ত্রের ইনপুট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়), তাহলে বলা যায় অক্টোপাসের মস্তিষ্ক এবং বাহুর সম্পর্ক সহযোগিতামূলক। ২০১১ সালে গবেষক তামার গুটনিক, রুথ বাইর্ন, হোচনার ও কুবা একটি পরীক্ষা চালান যাতে দেখা হয় অক্টোপাস কি নির্দিষ্ট অবস্থানে খাবার পেতে একক বাহু চালাতে শিখতে পারে কিনা[৫]। এই পরীক্ষায় দেখা যায় বাহুর রাসায়নিক সংবেদকগুলো খাবারের অবস্থান নির্ধারণে যথেষ্ট নয়। বাহুকে মাঝে মাঝে পানির বাইরে নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু গোলকের দেয়াল স্বচ্ছ হওয়ায় অক্টোপাস চোখ দিয়ে খাবার দেখতে পারে। এইভাবে তাকে চোখের সাহায্যে বাহু পরিচালনা করে গোলকের ভিতরে খাবারে পৌঁছাতে হয়। যদিও এটি শিখতে কিছুটা সময় লেগেছিল তবুও পরীক্ষায় সব অক্টোপাসই শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছিল। এই গবেষণায় দেখা গেছে যে অক্টোপাসের দৃষ্টিশক্তি বাহুকে নির্দিষ্ট কাজ করাতে সাহায্য করতে পারে। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, যখন অক্টোপাস খাবার খোঁজে, তখন তার বাহুগুলো স্থানীয়ভাবে অন্বেষণ করতে করতে ধীরে ধীরে লক্ষ্যবস্তুতে অগ্রসর হয়। ফলে মনে হয় দুটি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে চোখের সাহায্যে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাহুর সামগ্রিক পথ ঠিক করছে। আর বাহু নিজের কাছাকাছি স্থান অন্বেষণের জন্য সূক্ষ্মভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করছে।
বাহুর স্নায়ুতন্ত্র
[সম্পাদনা]অক্টোপাসের আটটি বাহু লম্বা, সরু, পেশিবহুল অঙ্গ যা মাথা থেকে নির্গত হয় এবং মুখের চারপাশে নিয়মিতভাবে সাজানো থাকে। প্রতিটি বাহুর ভেতরের পাশে দুটি সারিতে চোষক থাকে, যেখানে এক সারির চোষক আরেক সারির সঙ্গে পরস্পর পর্যায়ক্রমে বিন্যস্ত থাকে। প্রতিটি বাহুতে প্রায় ৩০০টি চোষক থাকে[৬]।
এই বাহুগুলো মোটর ও সংবেদনশীল—উভয় কাজই করে। বাহুর স্নায়ুতন্ত্র গঠিত হয়েছে স্নায়ু গ্যাংলিয়া দ্বারা, যা মোটর কাজ ও আন্তঃসংযোগের ভূমিকা পালন করে। বাহুর প্রান্তবর্তী স্নায়ুকোষগুলো সংবেদনশীলতায় যুক্ত। স্নায়ু গ্যাংলিয়া এবং প্রান্তবর্তী স্নায়ুকোষের মধ্যে ঘনিষ্ঠ কার্যকর সম্পর্ক রয়েছে।
বাহুর সাধারণ গঠন
[সম্পাদনা]বাহুর পেশিগুলো তিনটি স্বতন্ত্র ভাগে ভাগ করা যায়, প্রতিটি অংশের একটি নির্দিষ্ট গঠনগত ও কার্যকরী স্বতন্ত্রতা রয়েছে:
- বাহুর নিজস্ব পেশি (ইনট্রিনসিক মাংসপেশি)
- চোষকের নিজস্ব পেশি
- অ্যাসিটাবুলো-ব্রাকিয়াল পেশি (চোষককে বাহুর পেশির সঙ্গে সংযুক্ত করে)।
এই প্রতিটি পেশি দল তিনটি করে পেশি বান্ডেল নিয়ে গঠিত, যেগুলো একে অপরের সাথে সমকোণে বিন্যস্ত। প্রতিটি বান্ডেল চারপাশের অংশ থেকে আলাদা স্নায়ু দ্বারা উদ্দীপ্ত হয় এবং অত্যন্ত স্বতন্ত্রভাবে কাজ করতে পারে। অক্টোপাসের দেহে হাড় বা তরুণাস্থি না থাকলেও, পেশির সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে সে বাহু চালাতে পারে। আচরণগত দিক থেকে দেখা যায়, লম্বালম্বি পেশিগুলো বাহুকে ছোট করে এবং মূলত বস্তু ধরে মুখের দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর তির্যক ও আড়াআড়ি পেশিগুলো বাহু লম্বা করে এবং অবাঞ্ছিত বস্তু ফেলে দিতে কাজে লাগে।

বাহুর মধ্যে ছয়টি প্রধান স্নায়ু কেন্দ্র রয়েছে যেগুলো বাহুর বিভিন্ন পেশির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো অক্ষীয় স্নায়ু কর্ড। আটটি বাহুর প্রতিটিতে একটি করে অক্ষীয় স্নায়ু কর্ড থাকে। সবমিলে এতে প্রায় 3.5 × 108টি নিউরন থাকে। প্রতিটি অক্ষীয় কর্ড পাঁচটি বহিস্থ স্নায়ু কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এর মধ্যে চারটি অন্তঃপেশী স্নায়ু কর্ড, যেগুলো বাহুর অভ্যন্তরীণ পেশির মধ্যে থাকে, এবং প্রতিটি চোষকের অ্যাসেটাবুলার কাপের নিচের অংশে অবস্থিত চোষকের গ্যাংলিয়াগুলো অন্তর্ভুক্ত।
এই ছোট ছোট বহিস্থ স্নায়ুগুলোর মধ্যে মোটর নিউরন থাকে এবং এগুলো গভীর পেশির রিসেপ্টর থেকে সংবেদী সংকেত গ্রহণ করে। এই রিসেপ্টরগুলো স্থানীয় রিফ্লেক্স কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। বাহুর পেশিগুলোর মোটর স্নায়ু উদ্দীপনা শুধু অক্ষীয় স্নায়ু কর্ডের মোটর নিউরন থেকেই আসে না, বরং এসব বহিস্থ মোটর কেন্দ্র থেকেও আসে।
সংবেদী স্নায়ুতন্ত্র
[সম্পাদনা]অক্টোপাসের বাহুতে একটি জটিল ও বিস্তৃত সংবেদী সিস্টেম রয়েছে। বাহুর তিনটি প্রধান পেশি সিস্টেমের গভীরে থাকা রিসেপ্টরগুলো প্রাণীটিকে পেশি থেকে তথ্য সংগ্রহ করার বিস্তৃত সংবেদী ক্ষমতা দেয়। বাহুর বাইরের ত্বকে অনেক প্রাথমিক রিসেপ্টর থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংবেদী কোষ থাকে চোষকে, বিশেষ করে এর প্রান্তে। বাহুর ত্বক অপেক্ষাকৃত কম সংবেদনশীল। প্রতিটি চোষকে কয়েক হাজার রিসেপ্টর থাকে।
অক্টোপাসের বাহুতে তিন ধরনের রিসেপ্টর পাওয়া যায় গোলাকার কোষ, অনিয়মিত বহুপ্রসারী কোষ, এবং সরু সিলিয়া-যুক্ত কোষ। এরা সবাই তাদের সংকেত গ্যাংলিয়ার দিকে প্রেরণ করে। এই তিন ধরনের রিসেপ্টরের কার্যকারিতা এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি শুধু অনুমান করা হয়েছে। ধারণা করা হয় যে গোলাকার ও বহুপ্রসারী কোষ যান্ত্রিক উদ্দীপনা অনুভব করতে পারে, আর সিলিয়াযুক্ত রিসেপ্টরগুলো রাসায়নিক উদ্দীপনার প্রতিক্রিয়ায় কাজ করে।
সিলিয়াযুক্ত রিসেপ্টরগুলো সরাসরি গ্যাংলিয়াতে অ্যাক্সন পাঠায় না বরং এদের অ্যাক্সনগুলি ত্বকের নিচে অবস্থিত একটি আচ্ছাদিত নিউরনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। সেখানে ডেনড্রাইটিক শাখার সঙ্গে সিন্যাপটিক সংযোগ তৈরি হয়। এতে প্রাথমিক স্নায়ু কোষের মধ্যে সংকেত প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে থাকে। অপরদিকে গোলাকার ও বহুপ্রসারী রিসেপ্টরগুলো সরাসরি গ্যাংলিয়াতে অ্যাক্সন পাঠায় যেখানে মোটর নিউরন থাকে।
বাহু নাড়ানোর ক্ষেত্রে বাহুর স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা
[সম্পাদনা]আচরণগত গবেষণায় দেখা গেছে বাহুর পেশি চলাচলের তথ্য মস্তিষ্কের শিক্ষণ কেন্দ্রে পৌঁছে না। আর শারীরিক গঠন বিশ্লেষণে দেখা যায় যে গভীর রিসেপ্টরগুলো তাদের অ্যাক্সন প্রেরণ করে চোষকের গ্যাংলিয়া কিংবা অন্তঃপেশী স্নায়ু কর্ডের মতো বহিস্থ কেন্দ্রে।[৭] ফলে পেশি প্রসারণ বা চলাচলের তথ্য কেবল স্থানীয় রিফ্লেক্সের জন্য ব্যবহৃত হয়।
যখন অক্ষীয় স্নায়ু কর্ডের পৃষ্ঠীয় অংশে, যেখানে মস্তিষ্ক থেকে আগত স্নায়ুর সংযোগ দেওয়া থাকে সেখানে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দেওয়া হয় ফলে পুরো বাহু নড়ে ওঠে। এই নড়াচড়া সম্পূর্ণভাবে দেওয়া উদ্দীপনার ফলে সৃষ্টি হয়। এটি সরাসরি মস্তিষ্ক থেকে আগত সংকেত দ্বারা নয়। অর্থাৎ বাহুতে একটি সাধারণ সংকেত পাঠালেই মস্তিষ্কের কাজ শেষ এরপর বাহু নিজেই পুরো কাজটি করে।
পৃষ্ঠমুখী একটি বাঁক বাহুর দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং চোষকগুলো নড়াচড়ার দিকে মুখ করে থাকে। বাঁকটি যতদূর যায় ততটুকু বাহু প্রসারিত অবস্থায় থাকে। অক্টোপাসের বাহু যেন নিজের মতো কাজ করে, এমন প্রমাণ আরও মেলে যখন বাহুর স্নায়ুগুলো দেহের অন্যান্য অংশ, এমনকি মস্তিষ্ক থেকেও বিচ্ছিন্ন করা হয়। তখনও বাহুর স্নায়ু কর্ড বা চামড়া বা চোষকে স্পর্শ করলে স্বাভাবিক প্রসারণের মতো নড়াচড়া দেখা যায়।
বাহু যদি একেবারে শিথিল অবস্থায় থাকে এবং উদ্দীপনা দেওয়া হয়, তাহলেও প্রাথমিক নড়াচড়া একটি বাঁক তৈরি করে এবং সেটি ছড়িয়ে পড়ে। এর মানে বাহুর স্নায়ুতন্ত্র শুধু স্থানীয় রিফ্লেক্সই নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং সম্পূর্ণ বাহু জুড়ে জটিল গতিবিধিও নিয়ন্ত্রণ করে।
এই উদ্দীপিত নড়াচড়াগুলো আচরণগতভাবে অক্টোপাসের স্বাভাবিক নড়াচড়ার মতোই দেখা যায়। বিচ্ছিন্ন বাহুতে যখন উদ্দীপনা দেওয়া হয়, তখন পেশির সক্রিয়তা প্রাকৃতিক বাহু প্রসারণের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একই ভঙ্গিমা থেকে উদ্ভূত নড়াচড়াগুলোর পথও একরকম হয়। আবার আলাদা ভঙ্গিমা থেকে শুরু করলে পথও ভিন্ন হয়।
যেহেতু বিচ্ছিন্ন বাহুর নড়াচড়া প্রাকৃতিক বাহু চলাচলের মতোই দেখা যায়, তাই ধারণা করা হয়, এই নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে একটি মোটর প্রোগ্রাম কাজ করে। এটি বাহুর স্নায়ু ও পেশি ব্যবস্থার মধ্যেই অন্তর্নিহিতভাবে সংরক্ষিত থাকে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের দরকার হয় না।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ G. S. et al., Control of Octopus Arm Extension by a Peripheral Motor Program . Science 293, 1845, 2001.
- ↑ Y. Gutfreund, Organization of octopus arm movements: a model system for study- ing the control of flexible arms. Journal of Neuroscience 16, 7297, 1996.
- ↑ Frank, Marcos G., et al. "A preliminary analysis of sleep-like states in the cuttlefish Sepia officinalis." PLoS One 7.6 (2012): e38125.
- ↑ ৪.০ ৪.১ P. Godfrey-Smith, The Mind of an Octopus, Sci Am Mind, vol. 28, no. 1, pp. 62–69, Dec. 2016
- ↑ Gutnick, Tamar et al. “Octopus vulgaris uses visual information to determine the location of its arm.” Current biology : CB vol. 21,6 (2011): 460-2. doi:10.1016/j.cub.2011.01.052
- ↑ P. Graziadei, The anatomy of the nervous system of Octopus vulgaris, J. Z. Young. Clarendon, Oxford, 1971.
- ↑ M. J. Wells, The orientation of octopus. Ergeb. Biol. 26, 40-54, 1963.