বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/রাজনারায়ণ বসু

উইকিবই থেকে

ব্রাহ্মনেতা রাজনারায়ণ বসু (১৮২৬—১৮৯৯) আজীবন ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুগামী। কলজাতার উপকণ্ঠে বোড়াল তাঁর জন্ম। ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও মাইকেল মধুসূদন দত্তের সমসাময়িক কালে হিন্দু কলেজের মেধাবী ছাত্র রাজনারায়ণ পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইংরেজি সাহিত্যে কৃতবিদ্য হয়েছিলেন। কিন্তু পাশ্চাত্য শিক্ষা তাঁর জাতীয়তাবোধকে তীব্রতর করে তুলেছিল। তাঁর মতো জাতীয়তাবাদী খাঁটি দেশপ্রেমিক বাঙালি সেকালে খুব অল্পই ছিলেন। বাঙালির ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য তিনি তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। শিক্ষিত বাঙালি জাতির মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করে তোলাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। হিন্দুমেলা স্থাপন, জাতীয়-ভাব-সঞ্চারিণী সভা প্রভৃতি বহু প্রতিষ্ঠান তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সব ধরনের সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকাণ্ডে তিনি বিরাজ করতেন প্রাণপুরুষের মতো। প্রথম জীবনে দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে যে কাজে নিয়োজিত করেছিলেন, তা যথাযথভাবে পালন করেন তিনি। পরবর্তীকালে সরকারি চাকুরি গ্রহণ করে মেদিনীপুর স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদে নিযুক্ত হন। ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের প্রচারের জন্য আজীবন তিনি লেখনী পরিচালনা করেছিলেন। সাহিত্য সমালোচনাতেও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। সেকালের শিক্ষিত সমাজে অসাধারণ প্রতিষ্ঠা অর্জনের পর শেষ জীবন তিনি অতিবাহিত করেন বৈদ্যনাথ ধামে।

রাজনারায়ণ বসু ছিলেন প্রথম শ্রেণির গদ্যশিল্পী। মননশীল প্রবন্ধ রচনায় ও আত্মনিষ্ঠ রম্যরচনায় তিনি সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তাঁর গদ্যরীতি তাঁর ব্যক্তিত্বের স্পর্শে সমুজ্জ্বল। তাঁর ধর্মীয় বক্তৃতামালায় চমৎকার ভক্তিভাব ফুটে উঠেছে; আবার জাতীয়তাবাদী প্রবন্ধগুলি অভিব্যক্ত হয়েছে সমাজকল্যাণের ইচ্ছা ও মানবপ্রীতি। ব্রাহ্মধর্ম-বিষয়ক তাঁর বক্তৃতাগুলি বিবিধ প্রবন্ধ (১৮৮২) গ্রন্থে সংকলিত। হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠতা (১৮৭৩) তাঁর বিখ্যাত রচনা। পাশ্চাত্য আদর্শে রচিত আত্মীয় সভার বিবরণ বইটিও অতি উপাদেয়। বঙ্গভাষা ও সাহিত্যবিষয়ক বক্তৃতা (১৮৭৬) নামে একটি বইতে তিনি বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিখে সাহিত্যানুরাগ ও রসবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। বৃদ্ধ হিন্দুর আশা গ্রন্থে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জাতীয়তার আদর্শ। সেকাল ও একাল (১৮৭৪) বইটির ভাষার লালিত্য ও যুগের বিচার এমনই চমৎকার যে সেকালের সকল মনীষীই সাগ্রহে এই বইটি পাঠ করেছিলেন। আজও ভাষাশিল্পের নিদর্শন হিসেবে বইটি উল্লেখযোগ্য। গ্রাম্য উপাখ্যান নামে একটি গ্রন্থে তিনি ছদ্মভাবে নিজের গ্রাম ও গ্রাম্য পরিবেশের বাস্তব ছবি এঁকেছেন। তাঁর আত্মচরিত তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত অপূর্ব একটি গ্রন্থ। তিনি জ্যাঠামিজীবনপ্রান্তোপনীতের জীবন নামে দুটি রম্যরচনা প্রকাশ করে রম্যরচনারও সূত্রপাত করেন। তিনি একান্তভাবে সাহিত্যসেবী না হলেও তাঁর দানে বাংলা গদ্যসাহিত্যের ভাণ্ডারে রত্নসমাবেশ ঘটেছে।