আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/মনোমোহন বসু
মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও দীনবন্ধু মিত্রের পরে বাংলা নাটকে এক আকস্মিক পরিবর্তন দেখা দিল। মধুসূদন পৌরাণিক নাটকের ক্ষেত্রে যে মানবতাবোধের সঞ্চার ঘটিয়েছিলেন, তা মধ্যযুগীয় ভক্তিবাদের বদ্ধ জলাশয়ে আবার পথ হারালো। তারই নিদর্শন দেখা যায় মনোমোহন বসুর (১৮৩১—১৯১২) গীতাভিনয়মূলক নাটকগুলিতে। তিনি যে নাটকগুলি রচনা করেছিলেন সেগুলি হল রামাভিষেক (১৮৬৭), প্রণয়-পরীক্ষা (১৮৬৯), সতী (১৮৭৩), হরিশ্চন্দ্র (১৮৭৫), পার্থপরাজয় (১৮৮১), রামলীলা (১৮৮৯) ও আনন্দময় (১৮৯০)। এগুলির মধ্যে প্রণয়-পরীক্ষা ও আনন্দময় পারিবারিক নাটক, বাকিগুলি পৌরাণিক নাটক। তবে নায়ক না বলে এগুলিকে ‘গীতাভিনয়’ বলাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। কারণ, মনোমোহন যাত্রার ধাঁচেই তাঁর এই নাটকগুলি রচনা করেছিলেন। এগুলিতে মাত্রাত্রিরিক্ত সংগীতের প্রয়োগ, ভক্তিরসের বাহুল্য ও বস্তুনিষ্ঠার অভাবই বলে দেয় যে মনোমোহন পূর্বপ্রচলিত যাত্রাশৈলীকে অস্বীকার না করে কিছুটা সংশোধিত রূপে যা রচনা করেছেন, তা আসলে যাত্রারই নাট্যরূপ মাত্র। বউবাজার নাট্যশালায় এগুলির অভিনয় জনপ্রিয়তাও অর্জন করে। সুতরাং বোঝাই যায় মনোমোহন আত্মসমর্পণ করেছিলেন জনরুচির কাছেই। তাঁর পারিবারিক নাটক দুটিও যাত্রার আধারেই রচিত এবং একান্তভাবেই বিশেষত্বহীন। প্রকৃতপক্ষে উনিশ শতকের শেষভাগেও যে বাঙালির রসপিপাসা যাত্রারই অনুকূল রয়ে গিয়েছিল, যুক্তিবাদ ও বস্তুনিষ্ঠার বদলে অলৌকিকতার আবেগ ও ভক্তির আতিশায্যেই তা ভেসে যেতে চেয়েছিল, মনোমোহন বসুর নাটক ও সেগুলির জনপ্রিয়তা ছিল তারই প্রমাণ।