বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/অমৃতলাল বসু

উইকিবই থেকে

সাধারণ রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠায় অমৃতলাল বসু (১৮৫৩—১৯২৯) ও গিরিশচন্দ্র ঘোষ পরস্পরকে সহযোগিতা করেছিলেন। গিরিশচন্দ্রের মতো অমৃতলালও ছিলেন সুদক্ষ অভিনেতা ও যশস্বী নাট্যকার। গিরিশচন্দ্রের কৃতিত্ব নাটক রচনায়, অন্যদিকে অমৃতলালের পারদর্শিতা প্রহসন বা বিদ্রূপাত্মক নকশা রচনায়। সমসাময়িক ভাঁড়ামি ও ইতরতা থেকে প্রহসনকে তিনি মুক্তি দেন। বস্তুত তাঁর প্রতিভাই ছিল প্রহসন রচনার প্রতিভা। প্রহসন বা রঙ্গনাট্য রচনায় তিনি যতটা কৃতিত্ব দেখিয়েছেন, গম্ভীর নাটক রচনায় তিনি ততটাই ব্যর্থ হয়েছেন।

অমৃতলালের প্রথম নাটক হীরকচূর্ণ বা গাইকোয়াড় (১৮৭৫) রেসিডেন্ট কর্নেল ফেয়ারকে বিষপ্রয়োগে হত্যার চেষ্টার অভিযোগে বরোদার গায়কোয়াড় মলহররাওয়ের বিচার ও নির্বাসনের সমসাময়িক ঘটনা অবলম্বনে রচিত। তরুবালা (১৮৯১) নাটকটি স্বাধীন প্রেমের অসারতা প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে রচিত পারিবারিক নাটক। বিজয়-বসন্ত বা বিমাতা (১৮৯৩) প্রচলিত রূপকথা অবলম্বনে লিখিত। হরিশ্চন্দ্র (১৮৯৯) ও যাজ্ঞসেনী (১৯২৮) পৌরাণিক নাটক। দুটিই বিশেষত্ব-বর্জিত; বিশেষত যাজ্ঞসেনী নিকৃষ্ট শ্রেণির রচনা। তবে ১৯১৪ সালে লেখা তাঁর রোম্যান্টিক কমেডি নবযৌবন নির্মল হাস্যরসে সমৃদ্ধ উন্নত রুচির নাটক। সমাজ ও ব্যক্তিবিশেষের দুর্বলতা ও সাময়িক ঘটনা নিয়ে লেখা নকশা ও প্রহসনগুলিতে অমৃতলাল চমৎকার সরসতার অবতারণা করেছেন। এইরকম রচনার মধ্যে বিবাহ বিভ্রাট (১৮৮৪), রাজা বাহাদুর (১৮৯১), খাসদখল (১৯১২) প্রভৃতি সামাজিক কমেডি; চোরের উপর বাটপাড়ি, ডিসমিস, তাজ্জব ব্যাপার, চাটুজ্যে বাঁড়ুজ্যে (১৮৮৪) প্রভৃতি বিশুদ্ধ প্রহসন; একাকার (১৩০১ বঙ্গাব্দ), কালাপানি (১২৯৯ বঙ্গাব্দ), বাবু (১৩০০ বঙ্গাব্দ), অবতার (১৩০৮ বঙ্গাব্দ), গ্রাম্য বিভ্রাট (১৩০৪ বঙ্গাব্দ), দ্বন্দ্বে মাতনম্‌, তিলতর্পণ, কৃপণের ধন (১৯০০) প্রভৃতি শিক্ষামূলক ও বিদ্রূপাত্মক প্রহসনই উল্লেখযোগ্য।

কিন্তু অমৃতলালের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অতিমাত্রায় রক্ষণশীল। সমস্ত রকম প্রগতিরই তিনি বিরোধী ছিলেন। যে শিল্পী যুগের সঙ্গে চলতে পারেন না, গোঁড়ামি যাঁর শৈল্পিক দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রাখে, তাঁর সরস রচনাও তাই শীঘ্রই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। অমৃতলালও তাই পরবর্তীকালে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছেন।