আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/সামাজিক ও পারিবারিক নাটক
উনিশ শতকের মধ্যভাগে বিধবাবিবাহ, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, ব্যভিচার প্রভৃতি সামাজিক বিষয় নিয়ে অনেক নাটক রচিত হয়। পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রেরণায় সমাজ সংস্কারই ছিল এই নাটকগুলির উদ্দেশ্য; তাই নাটকীয় সংঘাত, চরিত্র-সৃষ্টি, সংলাপের ভাষা ইত্যাদির তুলনায় সামাজিক তত্ত্ব ও মতবাদই এগুলিতে প্রাধান্য লাভ করে। এই-সব নাটকের শিল্পমূল্য প্রায় কিছুই ছিল না বলে অল্পকালের মধ্যেই এগুলি বিস্মৃতির গহ্বরে হারিয়ে যায়, কিন্তু সমকালীন সমাজের একটি অংশের অবিসংবাদী প্রগতিশীলতার সাক্ষী হিসেবে আজকের প্রগতিশীল নাট্যসাহিত্যের শিকড় এগুলির মধ্যেই সন্ধান করতে হয়।
নাটকগুলির বিষয়বস্তু ও দৃষ্টিভঙ্গিতে অভিনবত্ব থাকলেও আঙ্গিকের দিক থেকে প্রথম যুগের নাটকগুলি ছিল সংস্কৃত নাট্যশৈলীই অনুসারী। নাটকের সূচনায় নান্দী-সূত্রধার, নটী ইত্যাদির ব্যবহার, অঙ্ক ও দৃশ্যবিভাগ এবং দীর্ঘ উচ্ছ্বাসময় সংলাপ সংস্কৃত নাটকের অনুকৃতি। কিন্তু নবনাটক, বিধবা-বিবাহ নাটক ইত্যাদিতে সামাজিক দুর্দশার দিকটি ফুটিয়ে তুলতে যে বিয়োগান্তক পরিণতি দেখানো হয়েছে, তা সংস্কৃত নাটকের মিলনান্তক পরিণতির সম্পূর্ব বিপরীত ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। দীনবন্ধু-পরবর্তী সামাজিক নাটকের পরিবেশ প্রধানত কলকাতার সমাজকে অবলম্বন করেছিল। কিন্তু তার আগে নাটকের ঘটনাস্থল ছিল কলকাতার নাগরিক সমাজ ও সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত গ্রামাঞ্চল। কিন্তু তার আগে গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ, অন্তঃপুরের মেয়েদের ও চণ্ডীমণ্ডপে পুরুষদের আড্ডার দৃশ্য এগুলিতে এমন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল, যা উনিশ শতকের মধ্যভাগের পর বাংলা নাটকে আর দেখা যায়নি। নকশা-মূলক এই নাটকগুলির আরেকটি বৈশিষ্টয় এই যে, এগুলিতে গাম্ভীর্যপূর্ণ করুণরসের তুলনায় লঘু হাস্যরসই বেশি স্বাভাবিকভাবে ফুটে উঠেছে। এর কারণ দুঃখ-বেদনার দৃশ্যে নাট্যকারেরা অকারণ আড়ষ্ঠ অলংকারবহুল ভাষা আমদানি করতেন বলে নাটক সেখানে নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ত; কিন্তু লঘু রসের অবতারণার সময় তাঁরা মনের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধা দিতেন না বলে সেই অংশগুলি হত সরস ও প্রাণবন্ত।
প্রথম পর্বের সামাজিক নাটক
[সম্পাদনা]আদি পর্বের সামাজিক নাটকগুলি সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যেই রচিত হয়েছিল। নাট্যকারেরা তা অস্বীকারও করেননি। এই নাটকগুলিতে সংস্কৃত নাট্যশৈলী ও যাত্রাশৈলী উভয়ই অনুসৃত হয়েছে। এগুলির ভাষা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছিল তৎসম-শব্দবহুল ও সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্র-সম্মত। অবশ্য নারীচরিত্র ও নিম্নবর্ণের চরিত্রগুলির মুখের মাষা অনেকটাই বাস্তবসম্মত হয়েছিল।
রামনারায়ণ তর্কালঙ্কার (১৮২২—১৮৬৬) প্রথম সামাজিক সমস্যা নিতে নাটক লিখতে শুরু করেন এবং দুটি সামাজিক নাটক রচনা করেন: কুলীনকুলসর্বস্ব (১৮৫৪) ও নবনাটক (১৮৬৬)। নিজে সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও সমাজ সংস্কারের বিষিয়ে তাঁর দৃষ্টি ছিল যথেষ্ট উদার ও আধুনিক। সামাজিক সমস্যাগুলির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল এবং সেগুলির বাস্তব রূপ দেখাতেও তিনি সফল হয়েছিল। কুলীনকুলসর্বস্ব ও নবনাটক যথাক্রমে কৌলীন্যপ্রথা ও বহুবিবাহ প্রথার অপকারিতা প্রদর্শনের জন্য লেখা হয়েছিল। উভয় নাটকেই পুরুষ চরিত্রগুলির ভাষা গুরুগম্ভীর সংস্কৃত শব্দ ও তত্ত্বকথায় ভারাক্রান্ত এবং নারী চরিত্রগুলির ভাষা সহজ ও স্বাভাবিক। নবনাটক-এ সংস্কৃত নাট্যাদর্শের বিপরীত পথে গিয়ে নাটকটিকে বিয়োগান্তক করে তোলা হয়েছে। এই নাটক দুটির শিল্পগত মূল্য বিশেষ নেই; কিন্তু বাংলা নাটক যে নবযুগের নতুন চিন্তাভাবনায় দীক্ষিত হয়েছে, কুলীনকুলসর্বস্ব ও নবনাটক তারই সাক্ষ্য বহন করে। রামনারায়ণের এই সামাজিক নাটকগুলি যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে এবং পরবর্তীকালে এই নাটকের ধারা একাধিক নাট্যকারের দ্বারা অনুসৃতও হয়।
কুলীনকুলসর্বস্ব মঞ্চস্থ হওয়ার দুই বছর পর উমেশচন্দ্র মিত্র রচনা করেন বিধবা-বিবাহ নাটক (১৮৫৬)। বৈধব্যযন্ত্রণার করুণ চিত্র সম্বলিত এই নাটকটিকেই বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সার্থক সামাজিক নাটক বলা যায়। এই নাটকের নায়িকা সুলোচনা নামে এক যুবতী বিধবা। এই চরিত্রের দৈহিক কামনা-বাসনার অভিব্যক্তির মধ্যে দিয়ে বিধবার জীবনের যে সুগভীর বেদনার সন্ধান নাট্যকার করেছেন, তা কেবল এই আন্দোলনেরই সহায়ক হয়নি, বরং সমাজের বাস্তব রূপটিকেও সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। সংলাপের ভাষায়, সমাজ ও জীবনদর্শনের গভীরতায় চরিত্রটি শুধু বাংলা নাটকের ক্রমবিকাশের ধারাতেই নয়, দেশের সামাজিক ইতিহাসেও একটি বিশেষ স্থান অধিকার করেছে। বিধবা-বিবাহ নাটক-এ ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর ও রামনারায়ণের কুলীনকুলসর্বস্ব-এর প্রভাব সুস্পষ্ট। তবু আধুনিক বাংলা নাটকে সুলোচনাই প্রথম চরিত্র যা পূর্ণাঙ্গ নাটকীয় চরিত্র রূপে বিকাশ লাভ করেছে। তাছাড়া এই নাটকেই প্রথম আদ্যন্ত সুষ্ঠুভাবে একটি বিয়োগান্ত পরিণতির দিকে লক্ষ্য রেখে নাট্যকাহিনি বয়ন করা হয়েছে। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে, “…ইহার পরিণামে এমন একটি দূরতিক্রম্য ওবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে, যাহাতে ইহা কেবলমাত্র বিয়োগান্তক নাটক বলিয়াই গৃহীত হইবার যোগ্য নহে, ইহাকে বাংলা সাহিত্যের সর্বপ্রথম ট্র্যাজিডি বলিয়াও উল্লেখ করা যাইতে পারে।” তৎকালীন বাংলার গার্হস্থ্য চিত্র এর মধ্যে যতটা প্রাণবন্ত হয়েছে, ততটা আর কোনও নাটকের মধ্যেই হয়নি। আবার এই নাটকে যে একটি উন্মাদ চরিত্র আছে, সেটিও শেকসপিয়রের উন্মাদ চরিত্রের প্রত্যক্ষ প্রভাবে সৃষ্টি। সেই হিসেবে এই নাটকেই প্রথম শেকসপিয়র-সৃষ্ট চরিত্র অবলম্বনে চরিত্র-সৃষ্টির প্রয়াস লক্ষিত হয়।
সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যে এই যুগে বিধবোদ্বাহ (১৮৫৬), বিধবা-মনোরঞ্জন (১৮৫৬), সপত্নী নাটক (১৮৫৮), কলিকৌতুক নাটক (১৮৫৮), চার ইয়ারে তীর্থযাত্রা (১৮৫৮), বাসর কৌতুক নাটক (১৮৫৯), বিধবা বিরহ নাটক (১৮৬০), বাল্যোদ্বাহ নাটক (১৮৬০), কুলীন-কায়স্থ (১৮৬১), চপলাচিত্ত-চাপল্য (১৮৬১), পুনর্বিবাহ নাটক (১৮৬২), বুঝলে কি না (১৮৭৩) বাল্যবিবাহ প্রভৃতি নাটক রচিত হয়েছিল। কিন্তু এই নাটকগুলি অত্যন্ত সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিশেষ উল্লেখযোগ্য নয়।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত উৎকৃষ্ট সামাজিক প্রহসন রচনা করেছিলেন, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নাটক রচনা করেননি। সামাজিক নাটকের রচয়িতা হিসেবে তাই এরপরে যাঁর নাম করতে হয়, তিনি দীনবন্ধু মিত্র। তাঁর প্রথম নাটক নীলদর্পণ (১৮৬০) সামাজিক নাটক। রামনারায়ণ বা উমেশচন্দ্রের নাটকগুলির মতো এটিও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, কিন্তু এর ক্ষেত্র আরও প্রসারিত, আরও গভীর। তাই কিছু শৈল্পিক ত্রুটি সত্ত্বেও নাটকটি প্রথম যুগের বাংলা নাট্যসাহিত্যে বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। যে অর্থনৈতিক শোষণে সমাজে বিপর্যয় নেমে আসে, নীলদর্পণ নাটকে দুটি পরিবারকে তারই প্রতীক করে সেই শোষণের ও তার করুণ পরিণতির ছবি গভীর বাস্তবতার সঙ্গে আঁকা হয়েছে। আর্থ-সামাজিক ও বৈদেশিক শক্তির তাড়নাতেই মানুষের জীবনে সেখানে বিষাদের ম্লান ছায়া নেমে এসেছে, নাটকের চরিত্রগুলিও তারই আবর্তে ঘুরপাক খেয়েছে—এই কারণেই এটি পারিবারিক নাটক না হয়ে সামাজিক নাটকের স্বীকৃতি পেয়েছে। এই নাটকে দীনবন্ধু প্রথম সামাজিক নাটকের একটি সুস্পষ্ট রূপ দিলেন। তাঁর হাতে সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষেরা জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠল। কিন্তু তাঁর লীলাবতী (১৮৬৭) পারিবারিক নাটক হয়েও রোম্যান্টিক কমেডিতে পর্যবসিত হয়েছে। আবার সধবার একাদশী (১৮৬৬) প্রহসন হলেও নাটকের লক্ষণাক্রান্ত বলে এটিকে নাটক হিসেবেই ধরা হয়। এই নাটকেই প্রথম নায়ক চরিত্রের মধ্যে এক গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বের পরিচয় পাওয়া যায়।
প্রথম পর্বের নাটকগুলির বিশেষত্ব এই যে, এগুলির অধিকাংশই সামাজিক নাটক, পারিবারিক নয়। এগুলি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যে রচিত। নীলদর্পণ এর ব্যতিক্রম। এটিতে সামাজিক নাটকের ক্ষেত্র যেমন অনেক বেশি প্রসারিত, চরিত্র-চিত্রণেও তেমনই বাস্তবতাবোধের পরিচয় বিধৃত। সধবার একাদশী-তে গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বের পরিচয় আছে। সামাজিক নাটকের এই অগ্রগতি দীনবন্ধুর অসামান্য নাট্যপ্রতিভার সাক্ষরবাহী।
দ্বিতীয় পর্বের সামাজিক ও পারিবারিক নাটক
[সম্পাদনা]বাংলা নাটকের দ্বিতীয় পর্বে পারিবারিক নাটক হিসেবে পাওয়া যায় উপেন্দ্রনাথ দাসের শরৎ-সরোজিনী (১৮৭৪) ও সুরেন্দ্র-বিনোদিনী (১৮৭৫) নাটক দুটিকে। দুটিই নিকৃষ্ট শ্রেণির মেলোড্রামা। লোমহর্ষক ঘটনা, নায়ক, বিশেষত নায়িকার যথেচ্ছ গুলিবর্ষণ, ডাকাতি, খুন-জখম, ইংরেজ প্রহার ও হেনস্থার মাধ্যমে রোমাঞ্চ সৃষ্টির প্রবণতাই এ-দুটিতে বেশি দেখা যায়। প্রথম পর্বের তুলনায় উপেন্দ্রনাথের নাটকে নাট্যশিল্পের যে বিশেষ অগ্রগতি ঘটেছিল তা নয়, তবে এই দুই নাটকের বিষয়বস্তুতে স্বদেশচেতনার সঞ্চার লক্ষণীয় বিষয় বটে।
এই পর্বের অপর উল্লেখ্য নাট্যকার হলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ। তাঁর প্রথম পারিবারিক নাটক প্রফুল্ল (১৮৮৯)। মেলোড্রামা হলেও এটি বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম উল্লেখযোগ্য পারিবারিক নাটক। নির্দিষ্ট কোনও সামাজিক সমস্যা নয়, যৌথ পরিবারের ভাঙনের কাহিনিই এর বিষয়বস্তু। নাট্যকার শেকসপিয়রীয় ট্র্যাজেডির অনুকরণে নায়ক-চরিত্রে দুর্বলতার ছিত্রপথে তার করুণ পরিণতি আঁকতে চেয়েছেন। সে প্রয়াস কতটা সফল হয়েছে, সে প্রশ্ন আলাদা; কিন্তু নাটকটির গতি-প্রকৃতির দিক থেকে এটি বাংলা নাটকের বিবর্তনের ধারায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অন্যান্য বিষয়ে গিরিশচন্দ্র উপেন্দ্রনাথ দাস বা তাঁরও পূর্বসূরি দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকের দ্বারা প্রভাবিত। প্রফুল্ল নাটকেও মৃত্যু, মস্তিষ্কবিকৃতি, হত্যা ইত্যাদি রোমাঞ্চকর ঘটনার ঘনঘটা দেখা যায়। প্রধান চরিত্রগুলি অভ্যন্তরীণ অসংগতি কারণে পূর্ণত লাভ করতে পারেনি। গিরিশচন্দ্রের বলিদান (১৯০৫) ও শাস্তি কি শান্তি (১৯০৮) নাটক দুটিও একই দোষে দুষ্ট। কেবল একটি বিষয়ে গিরিশচন্দ্র পূর্ববর্তী নাট্যকারেদের তুলনায় প্রগতিশীল এবং সেটি হল তাঁর নাটকের সংলাপের ভাষা। গিরিশচন্দ্রই প্রথম সামাজিক ও পারিবারিক নাটকে সকল শ্রেণির চরিত্রে বাস্তবানুগ ভাষা প্রয়োগ করেছেন।
এই বিষয়ে পরবর্তী নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। গিরিশচন্দ্রের অন্যান্য ত্রুটি তো দ্বিজেন্দ্রলালের পরপারে (১৯১২) ও বঙ্গনারী (১৯১৬) নামক পারিবারিক নাটক দুটিতে আছেই, সেই সঙ্গে কাব্যধর্মী সংলাপ নাটক দুটিকে অবাস্তব করে তুলেছে। অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের শুভদৃষ্টি (১৯১৫) ও ছিন্নহার (১৯২০); ভূপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাঙালী, প্রমথনাথ রায়চৌধুরীর জয়-পরাজয়, নিশিকান্ত বসুরায়ের পথের শেষে নাটকে একই ধারা বয়ে চলেছে।
তৃতীয় পর্বের পারিবারিক নাটক
[সম্পাদনা]তৃতীয় পর্বের পারিবারিক নাটকের সূত্রপাত ঘটে শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের (১৮৯২—১৯৬১) হাত ধরে। তাঁর ঝড়ের রাতে (১৯৩১) নাটকে সর্বপ্রথম পারিবারিক নাটকে ইবসেনীয় শৈলী অনুসৃত হয়। এটিতে নাট্যকাহিনির সংক্ষিপ্ততাও লক্ষণীয়। নাটকটিতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যেরকথাই সোচ্চারে ঘোষিত। এই বিষয়ে তিনিই পারিবারিক নাটকে আধুনিক মানসিকতার উদ্গাতা। তাঁর অন্যান্য পারিবারিক নাটক নার্সিং হোম (১৯৩৩), স্বামী-স্ত্রী (১৯৩৭), তটিনীর বিচার (১৯৩৯) ইত্যাদি বিরলদৃষ্ট সমাজের অতিনাটকীয় চরিত্রের সমাবেশ মাত্র। তবু শচীন্দ্রনাথের নাটকে যতখানি আধুনিক মানসিকতা ও মার্জিত রুচির পরিচয় আছে, জলধর চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৯০—১৯৬৪) রীতিমত নাটক, পি. ডব্লিউ. ডি. (১৯৪০), সিঁথির সিঁদুর (১৯৫২), আঁধারে আলো, ডাক্তার শুভংকর প্রভৃতি নাটকে তা নেই। জলধরের নাটকে কয়েকটি অবাস্তব চরিত্র ইচ্ছেমতো বিচরণ করে গিয়েছে কোনও সুগভীর কার্যকারণ-পরম্পরা ছাড়াই। কেবল ভাষা ছাড়া আর সব দিক থেকেই এগুলি প্রথম পর্বের নাটকগুলির চেয়েও নিম্নমানের। মহেন্দ্র গুপ্তের স্বর্গ হতে বড় ও কঙ্কাবতীর ঘাট অতিনাটকীয়তায় পর্যবসিত। আবার এরই মধ্যে বিধায়ক ভট্টাচার্যের (১৯০৭—১৯৮৬) মেঘমুক্তি (১৯৩৮), মাটির ঘর (১৯৩৯), বিশ বছর আগে (১৯৪০), রক্তের ডাক (১৯৪১), খেলা ভাঙার খেলা, খবর বলছি (১৯৫০), ক্ষুধা (১৯৫৬) প্রভৃতি নাটকে নাট্যকার সংলাপ রচনায় বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এই পর্বের নাটকগুলিতে অভিনবত্ব কিছুই নেই। এই পর্বে সামাজিক নাটক সৃষ্টি হয়নি, কেবল লেখা হয়েছে কিছু গতানুগতিক পারিবারিক নাটক। শৈল্পিক বিচারে এই পর্বের কোনও নাটকই রসোত্তীর্ণ নয়; কারণ গভীর জীবনবোধের পরিচয় এই পর্বের কোনও নাট্যকারই দেখাতে পারেননি। শুধু বিবর্তনের স্বাভাবিক পথে অগ্রগতি ঘটেছে সংলাপের ভাষায়।
চতুর্থ পর্বের আধুনিক সমাজ-সচেতন নাটক
[সম্পাদনা]চতুর্থ পর্বের নাটকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল তীক্ষ্ণ সমাজ-সচেতনতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পাঁচ বছর পরেই এই পর্বের সূচনা। এই পর্বের সামাজিক নাটক বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন (১৯৪৪)। শাসক ও অভিজাত শ্রেণির স্বার্থে কৃত্রিম অন্নসংকট সৃষ্টি করে যে পঞ্চাশের মন্বন্তর ঘটানো হয়েছিল, নাটকটিতে তা-ই নিপূণভাবে চিত্রিত হয়েছে। বিজন ভট্টাচার্যের অন্যান্য নাটক মরা চাঁদ, গোত্রান্তর, প্রভৃতি। এই পর্বের সকল নাট্যকারই গভীরভাবে সমাজ সচেতন; তাই তাঁদের নাটকে বাস্তবতাও উজ্জ্বলভাবে চিত্রিত। পূর্ববর্তী কোনও পর্বেই এইরকম বাস্তবতাবোধ দেখা যায়নি। কল্পনা, রোম্যান্টিকতা বা ভাবালুতার মেদমর্জিত এই-সব নাটক তাই বহুলাংশে নাট্যগুণসম্পন্ন হয়েছে। তবে নাটকীয় চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বের অভাব কমবেশি সব নাটকেই রয়ে গিয়েছে।
এই পর্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাটক তুলসী লাহিড়ীর ছেঁড়া তার। একমাত্র এই নাটকেই তীক্ষ্ণ সমাজবোধের সঙ্গে নায়ক-নায়িকার চরিত্রে গভীর অন্তর্দ্বন্দ্ব অসামান্য দক্ষতায় চিত্রিত হয়েছে। এটিকে বাংলা ভাষায় লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামাজিক নাটক বলা যেতে পারে। তুলসী লাহিড়ীর অন্যান্য নাটক হল পথিক, উলু খাগড়া ও দুঃখীর ইমান।
এই পর্বের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নাটক হল জিতেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের পরিচয় ও প্রশ্ন; সলিল সেনের নতুন ইহুদী, ডাউন ট্রেন, মৌ-চোর; উৎপল দত্তের অঙ্গার ইত্যাদি। এই পর্বের নাটকের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল নাট্যকাহিনির বিষয়বস্তুর পরিধি-বিস্তার। এই পর্বে নাটক উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির গণ্ডী পরিয়ে নিম্নশ্রেণির মানুষের কাছাকাছি নেমে এসেছে। কৃষক, শ্রমিক বা শোষিত দরিদ্র মানুষ নাটকে নায়কের স্থান গ্রহণ করেছেন। তাছাড়া অনেক নাটকই আর এক-নায়ক নির্ভর হতে থাকেনি। বহু নায়কের কলরবে মুখর ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতে চঞ্চল চতুর্থ পর্বের নাটক এক গণতান্ত্রিক চরিত্র অর্জন করে। চরিত্রের দ্বন্দ্বের ন্যূনতা নাটকগুলিতে থেকেই গিয়েছে। কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক নাটকের বিবর্তনের ধারায় চতুর্থ পর্বে এসে নাটকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ও প্রগতি ঘটেছে।