বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/সাধারণ নাট্যশালা প্রতিষ্ঠার পূর্ববর্তী নাট্যশালা

নাট্যরচনার সঙ্গে নাট্যশালার যোগ অবিচ্ছেদ্য। কারণ নাটক অভিনয়ের মুখাপেক্ষী এবং নাটকের অভিনয় নাট্যমঞ্চেই হয়ে থাকে। কলকাতায় ইংরেজ বণিক গোষ্ঠীই সর্বপ্রথম নাট্যশালার স্থাপন করেছিল। এগুলি ইংরেজি নাটক অথবা সংস্কৃত নাটকের ইংরেজি অনুবাদ অভিনীত হত। অষ্টাদশ শতকের শেষে গেরাসিম লেবেদভের উদ্যোগে একটি বাংলা নাট্যশালা স্থাপিত হলেও সেটি বেশিদিন চলেনি। উনিশ শতকের মধ্যভাগে প্রথমে ধনী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় অভিজাতবর্গের বিনোদনের জন্য একাধিক নাট্যশালা গড়ে ওঠে। পরে ১৮৭২ সালে স্থাপিত হয় প্রথম সাধারণ নাট্যশালা ন্যাশনাল থিয়েটার।

প্লে হাউস ও অন্যান্য ইংরেজি নাট্যশালা

[সম্পাদনা]

১৭৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত প্লে হাউস হল কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম নাট্যশালা। এখানে ইংরেজি নাটকেরই অভিনয় চলত। এরপর ১৭৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ক্যালকাটা থিয়েটার। এখানে ইংরেজি নাটকের পাশাপাশি কালিদাসের অভিজ্ঞানশাকুন্তলম্‌ নাটকের ইংরেজি অনুবাদও অভিনীত হয়েছিল। পরবর্তী ইংরেজি নাট্যশালাগুলির মধ্যে ব্রিস্টো থিয়েটার, এথনিয়াম, চৌরঙ্গী থিয়েটার, খিদিরপুর থিয়েটার, দমদম থিয়েটার, বৈঠকখানা থিয়েটার, সাঁসুচি থিয়েটার প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য। শিক্ষিত বাঙালিরা এইসব নাট্যশালায় অভিনয় দেখতে যেতেন এবং এখানেই পাশ্চাত্য নাট্যকলা সম্পর্কে তাঁদের ঔৎসুক্য জেগে ওঠে। এরই ফলে বাংলা নাট্যশালা স্থাপনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন বাঙালি নাট্যরসিকেরা।

গেরাসিম লেবেদেভ ও বেঙ্গলি থিয়েটার

[সম্পাদনা]

কিন্তু প্রথম বাংলা নাট্যশালা কোনও বাঙালির কীর্তি নয়। গেরাসিম লেবেদেভ নামে এক রাশিয়ান পর্যটক ১৭৯৫ সালে ২৫ নং ডোমতলায় (বর্তমানে এজরা স্ট্রিট) বেঙ্গলি থিয়েটার নামে একটি নাট্যশালা গড়ে তোলেন। এখানে The Disguise ও Love is the Best Doctor নামে দুটি ইংরেজি নাটকের বঙ্গানুবাদ অভিনীত হয়েছিল। বাংলা অনুবাদে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন গোলোকনাথ দাস নামে এক পণ্ডিত। কিন্তু এই নাট্যশালা স্থায়ী হয়নি। ১৭৯৬ সালের মার্চ মাসে এখানে সর্বশেষ নাট্যাভিনয় আয়োজিত হয়।

হিন্দু থিয়েটার ও নবীন বসুর বাড়ির নাট্যশালা

[সম্পাদনা]

এরপর প্রায় চল্লিশ বছর বাংলা নাটক অভিনয়ের কথা শোনা যায়নি। ১৮৩১ সালে প্রসন্নকুমার ঠাকুর যে হিন্দু থিয়েটার স্থাপন করেছিলেন, তাতে ইংরেজি নাটক এবং সংস্কৃত উত্তররামচরিত নাটকের ইংরেজি অনুবাদ ছাড়া অন্য কোনও নাটক অভিনীত হয়নি। এরপর বাংলা নাটকের অভিনয় হয় শ্যামবাজারে নবীনচন্দ্র বসুর বাড়িতে। ১৮৩৫ সালের অক্টোবর মাসে এখানে বিদ্যাসুন্দরের নাট্যরূপ অভিনীত হয়। সমসাময়িক তথ্য থেকে জানা যায়, সেই অভিনয়ে বিদ্যাসুন্দরের গান এবং স্ত্রী-চরিত্রে অভিনেত্রীদের অভিনয় বিশেষ প্রশংসিত হয়েছিল।

ওরিয়েন্টাল থিয়েটার

[সম্পাদনা]

কিন্তু ততদিনে বাঙালি শেকসপিয়রের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। তাই বিদ্যাসুন্দর আর তাদের রসপিপাসা নিবৃত্ত করতে পারেনি। অথচ বাংলা নাটক তখনও সৃষ্টি হয়নি। তাই আবার ইংরেজি নাটকের দিকে মুখ ফেরাতে হল। ওরিয়েন্টাল সেমিনারির ছাত্ররা ওরিয়েন্টাল থিয়েটার স্থাপন করে ১৮৫৪ সালে মঞ্চস্থ করল ওথেলো। এরপর মার্চেন্ট অফ ভেনিস ও হেনরি দ্য ফোর্থ নাটক দুটিও এখানে অভিনীত হল। কিন্তু এই প্রয়াসও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

সংস্কৃত নাটকের বঙ্গানুবাদ ও প্রথম মৌলিক বাংলা নাটকের অভিনয়

[সম্পাদনা]

এরপর নাট্যশালায় শুরু হল বাংলা নাটকের যুগ। এই নাটকগুলির মধ্যে কয়েকটি সংস্কৃত নাটকের বঙ্গানুবাদ, আবার কয়েকটি মৌলিক বাংলা নাটক। এইরকম প্রথম উল্লেখযোগ্য নাটক হল শকুন্তলা। ১৮৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে এটি আশুতোষ দেবের (ছাতুবাবু) বাড়িতে অভিনীত হয়। সেই বছরই মার্চ মাসে নতুনবাজারে রামজয় বসাকের বাড়িতে অভিনীত হল রামনারায়ণ তর্করত্নের কুলীনকুলসর্বস্ব। এটি বিশেষভাবে স্মরণীয় এই কারণেই যে, এটিই ছিল প্রথম মৌলিক বাংলা নাটকের অভিনয়। ১৮৫৭-৫৯ সালের মধ্যে কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রতিষ্ঠিত বিদ্যোৎসাহিনী থিয়েটারে অভিনীত হল বেণীসংহার, বিক্রমোর্বশী, মালতীমাধব প্রভৃতি অনূদিত নাটক এবং কালীপ্রসন্নেরই মৌলিক নাটক সাবিত্রী-সত্যবান।

বেলগাছিয়া থিয়েটার ও মাইকেল মধুসূদন দত্ত

[সম্পাদনা]

পাইকপাড়ার রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ ও তাঁর ভাই ঈশ্বরচন্দ্র সিংহের উদ্যোগে তাঁদের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে স্থাপিত হয় বেলগাছিয়া থিয়েটার। ১৮৫৮ সালের জুলাই মাসে রামনারায়ণ অনূদিত রত্নাবলী নাটক দ্বারা মহাসমারোহে এই মঞ্চের উদ্বোধন হয়। এই অভিনয়ের সূত্রেই মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা নাটক রচনার প্রেরণা লাভ করেন। পরের বছর সেপ্টেম্বর মাসে এখানে মধুসূদনের মৌলিক নাটক শর্মিষ্ঠা অভিনীত হয়। এরপর ধনী ব্যক্তিদের প্রচেষ্টায় আরও বহু মঞ্চ গড়ে ওঠে। এগুলির মধ্যে মেট্রোপলিটান থিয়েটার, পাথুরিয়াঘাটা বঙ্গ নাট্যালয়, জোড়াসাঁকো নাট্যশালা, বহুবাজার নাট্যালয় প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য।

ন্যাশনাল থিয়েটার: বাংলার প্রথম সাধারণ নাট্যশালা

[সম্পাদনা]

ইতিপূর্বে হিন্দু থিয়েটার থেকে আরম্ভ করে সব কটি নাট্যশালাই ধনী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় হয় তাঁদের বাড়িতে না হয় তাঁদের বাগানবাড়িতে স্থাপিত হয়েছিল। এগুলিতে অভিজাত সম্প্রদায় ছাড়া আর কারও প্রবেশাধিকার ছিল না। কিন্তু জনগণের সঙ্গে যোগ না ঘটলে নাটক ও নাট্যশালার উন্নতি হতে পারে না। তাই নাটককে সাধারণের উপভোগ্য করে তোলার দায়িত্ব নিলেন বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটারের কয়েকজন সদস্য। ১৮৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে জোড়াসাঁকোর মধুসূদন সান্যালের বহির্বাটীর প্রশস্ত প্রাঙ্গনে ন্যাশনাল থিয়েটার স্থাপিত হল এবং দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকের অভিনয়ের মাধ্যমে তার উদ্বোধন করা হল। উল্লেখযোগ্য, গিরিশচন্দ্র ঘোষ বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটারের এক বিশিষ্ট সদস্য হলেও ন্যাশনাল থিয়েটারের প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ করেননি। ন্যাশনাল থিয়েটারে তিনি যোগ দিয়েছিলেন আরও পরে। ন্যাশনাল থিয়েটারই প্রথম এদেশে সর্বসাধারণের কাছে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করে। এইভাবে বাংলা শখের থিয়েটার সাধারণ নাট্যশালায় পরিণত হয়।