আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/শ্রীরামপুর মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ
বাংলা গদ্যের সামান্য কিছু নিদর্শন মধ্যযুগে রচিত হলেও ইংরেজ শাসনকালেই যথাযথভাবে আধুনিক বাংলা গদ্যসাহিত্যের উদ্ভব ঘটে। খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের গদ্যচর্চা এই কাজে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। অষ্টাদশ শতকের গোড়া থেকেই মিশনারিরা ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে এবং বিদেশিদের বাংলা শেখানোর জন্য গদ্যের অনুশীলন আরম্ভ করে। যার প্রত্যক্ষ ফল উনিশ শতকের গোড়ায় শ্রীরামপুরে ব্যাপটিস্ট মিশনের প্রতিষ্ঠা। ঠিক একই সময়ে বিদেশ থেকে আগত কোম্পানির অল্পবয়সী কর্মচারীদের দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতি শিক্ষাদানের জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাংলা গদ্যের ব্যাপক চর্চা শুরু হয়। বাংলা গদ্যের বিকাশের ক্ষেত্রে দুই প্রতিষ্ঠানই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন
[সম্পাদনা]মিশনারিদের মধ্যে পর্তুগিজ রোমান ক্যাথলিকেরাই প্রথম গদ্যভাষার অনুশীলন করেন। পরে শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাঙালি খ্রিস্টান দোম আন্তোনিও রচিত ব্রাহ্মণ-রোমান-ক্যাথলিক-সংবাদ এবং পর্তুগিজ পাদরি আস্মুম্পসাঁউ রচিত কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ লিসবন থেকে রোমান হরফে মুদ্রিত হয়েছিল। কিন্তু শ্রীরামপুরের মিশনারিরা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করে বাইবেল অনুবাদ ও প্রকাশ করেন বাংলা হরফে। এই সময়ে খ্রীষ্ট-বিবরণামৃত নামে একটি খ্রিস্ট-জীবনীও প্রকাশিত হয়েছিল। হিন্দুধর্মের অসারতা দেখিয়ে বাঙালি হিন্দুদের খ্রিস্টানুরাগী করে তোলার উদ্দেশ্যে তাঁরা দিগ্দর্শন ও সমাচারদর্পণ নামে দুটি পত্রিকাও প্রকাশ করেন। এইসব পত্রিকায় সরল গদ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয় আলোচনা করা হত। এঁদের কার্যকলাপে শিক্ষিত হিন্দুরা উত্তেজিত হয়ে উঠলে ধর্মীয় বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তাতেও গদ্যচর্চার প্রসার ঘটে। এইভাবে গদ্যচর্চার একটি উন্নত মানও সৃষ্টি হতে থাকে।
শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন প্রতিষ্ঠা
[সম্পাদনা]সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকে বিচ্ছিন্নভাবে বাংলা গদ্যরচনার কিছু প্রয়াস দেখা গেলেও উনিশ শতকের সূচনায় শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠার পরেই বাংলা গদ্যের সাহিত্যিক রূপটি ফুটে উঠতে শুরু করে এবং প্রতিভাবান সাহিত্যিকেরা গদ্যরচনায় আকৃষ্ট হন। খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য প্রোটেস্টান্ট মিশন কলকাতায় একটি প্রচারকেন্দ্র স্থাপনের উদ্দেশ্যে উইলিয়াম কেরিকে নিযুক্ত করে। ধর্মপ্রচারক কেরি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়ে কলকাতা পরিত্যাগ করেন এবং ডেনীয় উপনিবেশ শ্রীরামপুরে ১৮০০ সালের ১২ জানুয়ারি মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। উইলিয়াম ওয়ার্ড, ডেভিড বার্নসডন ও জোশুয়া মার্শম্যান প্রমুখ প্রচারকেরা কেরির সঙ্গে যোগ দেন এবং সোৎসাহে মিশনের কাজ আরম্ভ হয়।
বাইবেল অনুবাদ
[সম্পাদনা]বাইবেল অনুবাদ ও প্রকাশের মাধ্যমে শ্রীরামপুর মিশন কাজ শুরু করে। গদ্যরচনার এই চেষ্টা বাংলা গদ্যের বিকাশের পথে অনেকটাই সহায়ক হয়েছিল। শ্রীরামপুর মিশনে যোগ দেওয়ার আগেই কেরি বাইবেল অনুবাদের কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁর মুন্সি রামরাম বসু সম্ভবত তাঁকে এই কাজে সাহায্য করেন। ১৮০১ সালে নূতন নিয়মের প্রথম গসপেলটি মঙ্গল সমাচার মাতিউর রচিত (গসপেল অ্যাকর্ডিং টু সেন্ট ম্যাথিউ) নামে প্রকাশ করা হয়। কেরির উদ্যোগে, মার্শম্যান প্রমুখের উৎসাহে এবং রামরাম বসু প্রমুখ বাঙালি শিক্ষকদের সহায়তায় বাইবেলের নূতন নিয়ম সম্পূর্ণত এবং পুরাতন নিয়ম অংশত অনুবাদ করে প্রকাশ করে শ্রীরামপুর মিশন। তারপর ১৮০৯ সালে সমগ্র বাইবেল ধর্ম্মপুস্তক নামে প্রকাশিত হয়। এই বইটি বাংলা গদ্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন নয়, তবে গদ্যরচনার উৎসাহের কারণ হয়েছিল বটে।
ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা ও সাময়িকপত্র
[সম্পাদনা]শ্রীরামপুর মিশন বাংলা গদ্যের বিশেষ উন্নতিসাধন করেছিল সাময়িকপত্র প্রকাশ করে। ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার ফলেই সাময়িকপত্র প্রকাশের চমৎকার সুযোগ ঘটে। মিশনের ছাপাখানায় কৃত্তিবাসী রামায়ণ, অন্যান্য হিন্দু ধর্মগ্রন্থ, বাইবেলের অনুবাদ এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যাপকগোষ্ঠীর রচনাবলি মুদ্রিত হওয়ায় বই লেখার একটি আবহ সৃষ্টি হয়। মিশনের ছাপাখানা থেকেই প্রথম সাময়িকপত্র ছাপা হয়। ১৮০১ সাল থেকে একাদিক্রমে তেত্রিশ বছর শ্রীরামপুর মিশন প্রেস বহু বই প্রকাশ করে। ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা বাঙালির সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা করে জাতীয় জীবনে যুগান্তর এনেছিল। ১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে মার্শম্যানের সম্পাদনায় দিগ্দর্শন নামে সাময়িকপত্র প্রকাশিত হয়। ওই বছরই মে মাসে সাপ্তাহিক পত্রিকা সমাচারদর্পণ প্রকাশ করা হয়। এইসব পত্রপত্রিকার সম্পাদনায় জয়গোপাল তর্কালঙ্কার, তারিণীচরণ শিরোমণি প্রমুখ বাঙালি পণ্ডিতেরা বিশেষ সহায়তায় করেছিলেন।
মিশনারিদের রচনার বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশন খ্রিস্টধর্ম প্রচারের স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে সক্রিয় হয়েছিল। মিশনারিদের বাংলা গদ্য অনুশীলনের পিছনে বাঙালিকে সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত করে তোলার কোনও আকাঙ্ক্ষা অথবা বিজিত জাতির ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ঘটানোর কোনও অভিপ্রায় ছিল না। তাঁদের গদ্যভাষা এতটাই কৃত্রিম ও আড়ষ্ঠ ছিল যে তা ‘বাইবেলী বাংলা’ বা ‘খ্রীষ্টানী বাংলা’ নামে উপহাসের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবু ইতিহাসের সাক্ষ্যে এ-কথা অস্বীকার করা যায় না যে, খ্রিস্টান পাদরিরা বাংলা ও সংস্কৃতি গ্রন্থাবলি প্রকাশ ও প্রচার করে বাঙালিকে আত্মসচেতন করেছিলেন এবং সাময়িকপত্র প্রকাশ করে সেই সচেতনতা প্রকাশের উপযোগী ভাষাপথের সন্ধানও তাঁরা অজান্তেই দিয়ে ফেলেছিলেন।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ
[সম্পাদনা]
বাংলা গদ্যের ভিত্তি গঠনে আর-একটি প্রতিষ্ঠানের অবদানও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে কেরির উদ্যোগে ও পৃষ্ঠপোষকতায় এই কলেজের পণ্ডিত-মুন্সিরা গদ্যগ্রন্থ রচনা করতে শুরু করেন। স্বয়ং কেরির নামে দুটি বই প্রকাশিত হয়: কথোপকথন ও ইতিহাসমালা। বিষয়-বৈশিষ্ট্যে ও ভাষাভঙ্গিতে বই দুটি যে অভিনব তাতে সন্দেহ নেই। প্রায় দেড় দশকের চেষ্টায় এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা বহু ধরনের বই লিখে বাংলা গদ্যরীতির নানা আদর্শের সন্ধানও দেন। রামরাম বসুর রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র ও লিপিমালা; গোলোকনাথ শর্মার হিতোপদেশ; তারিণীচরণ মিত্রের ওরিয়েণ্টাল ফেবুলিস্ট; চণ্ডীচরণ মুন্সীর তোতা ইতিহাস এবং রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়ের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রম্ প্রভৃতি গ্রন্থ অনুবাদে, মৌলিক রচনায় এবং গদ্যরীতির নানা বৈচিত্র্যে বাংলা গদ্যসাহিত্যের গৌরবময় ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছিল। সাহিত্যবিচারে এই বইগুলি উচ্চস্তরের রচনা নয়। একমাত্র মৃত্যুঞ্জয় ছাড়া কাউকেই যথার্থ গদ্যশিল্পী আখ্যা দেওয়া যায় না। তবু তাঁদের কাজে বাংলা গদ্যানুশীলনের পথ যে প্রশস্ত হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠা
[সম্পাদনা]উনিশ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বাংলা গদ্যের বিকাশে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। বস্তুত গদ্যভাষার সাহিত্যিক রূপনির্মিতির প্রাথমিক কারুকার্য এই কলেজেরই পণ্ডিত-মুন্সিদের অবদান। এই কলেজ প্রতিষ্ঠার একটি ইতিহাস আছে। কোম্পানির কর্মচারীদের দেশীয় ভাষা ও রীতিনীতি শেখানোর জন্য লর্ড ওয়েলেসলি কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনা করেন এবং ঘোষণা করেন যে, ১৮০১ সালের ১ জানুয়ারির মধ্যে দেশীয় ভাষা সম্পর্কে জ্ঞানের পরিচয় দিতে না পারলে ইংরেজ কর্মচারীদের চাকরি থাকবে না। ১৮০০ সালের ৮ মে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই বছরই ২৪ নভেম্বর সোমবার থেকে যথারীতি পঠন-পাঠন আরম্ভ হয়। ১৮০১ সালের ৪ মে পাদরি কেরি প্রাচ্য বিভাগের কর্ণধার নিযুক্ত হন। কেরির সহকারী রূপে নিযুক্ত হন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, শ্রীপতি মুখোপাধ্যায়, রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়, রামরাম বসু প্রমুখ। ১৮৫৪ সালে কলেজটি উঠে যায়। কিন্তু ১৮১৩ সাল পর্যন্ত এই কলেজে সোৎসাহে পঠন-পাঠন চলে এবং কেরির উৎসাহে অনেকগুলি বাংলা বই লেখা হয়।
পণ্ডিত-মুন্সিদের রচনা
[সম্পাদনা]বাঙালির সাহিত্যিক কৃতিত্বের সূচনার পরিচয় পেতে হলে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে প্রকাশিত রচনাবলির পরিচয় জানা আবশ্যক। এই কলেজের তেরো বছরের ইতিহাসই গৌরবময়; কিন্তু একুশ বছর পর্যন্ত একটানা অনেকগুলি বই প্রকাশিত হয়। গ্রন্থকারদের মধ্যে উইলিয়াম কেরি, রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, গোলোকনাথ শর্মা, তারিণীচরণ মিত্র, চণ্ডীচরণ মুন্সী ও রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়ই বিশেষভাবে উল্লেখ্য। স্বয়ং কেরি এঁদের প্রেরণা দিয়েছিলেন এবং পথ দেখিয়েছিলেন।
উইলিয়াম কেরি
[সম্পাদনা]কেরির নামে প্রকাশিত দুটি বইয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়: কথোপকথন (১৮০১) ও ইতিহাসমালা (১৮১২)। বই দুটি কেরির নিজের রচনা কিনা সন্দেহ আছে। কথোপকথন-এর ভাষা তাঁর সহকারী মৃত্যুঞ্জয়ের সাহায্যে গড়া হয়েছে বলে অনুমান করার সঙ্গত কারণ রয়েছে। কলকাতার নিকটবর্তী অঞ্চলের জীবনযাত্রা ও কথ্যভাষা বইটির উপজীব্য। প্রাচীন পদ্ধতি মেনে উত্তর-প্রত্যুত্তরের ভঙ্গিতে বইটি লেখা। “ওলো তোর ভাতার কারে কেমন ভালবাসে তাহা বল শুনি।”—এইরকম ভাষায় বইটি আদ্যন্ত লেখা। বাংলা গদ্যের চলিত রূপ প্রবর্তনের প্রথম সূচনা এই বইটিতেই দেখা যায়। অন্যদিকে ইতিহাসমালা বইটি পৌরাণিক ও কাল্পনিক গল্পের সমষ্টি। কেরি সম্ভবত এই বইটির সম্পাদক ছিলেন। দেব-প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে লৌকিক জীবন সম্পর্কে গল্প-কৌতূহল সৃষ্টির প্রচেষ্টা রূপে বইটি অভিনন্দনযোগ্য।
রামরাম বসু
[সম্পাদনা]কেরি সাহেবের মুন্সি রামরাম বসু পরপর দুটি বই লেখেন: রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১) ও লিপিমালা (১৮০২)। এই দুটি রামরাম বসুর মৌলিক রচনা। কথকতার ভঙ্গিতে তিনি লিখেছেন। যশোহরের রাজা প্রতাপাদিত্য সম্পর্কে লেখা বইটিতে আরবি-ফারসি শব্দের প্রাচুর্য সম্ভবত কেরি অনুমোদন করেননি। তাই দ্বিতীয় বইটির ভাষায় অনেকটা সাবলীল ভাব লক্ষ্য করা যায়। চিঠি লেখার পদ্ধতি এই বইটির বিষয়বস্তু হলেও লেখক বেশ সরস ভঙ্গিতে নানা গল্প জুড়ে দিয়ে কথাসাহিত্যের প্রথম সূচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার
[সম্পাদনা]ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকগোষ্ঠীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। তিনি প্রথমে বত্রিশ সিংহাসন (১৮০২) ও হিতোপদেশ (১৮০৮) অনুবাদ করেন। তাঁর মৌলিক রচনা রাজাবলি (১৮০৮) ও প্রবোধচন্দ্রিকা (১৮১৩ সালে রচিত, ১৮৩৩ সালে মুদ্রিত) তাঁর প্রতিভার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। মৃত্যুঞ্জয় সমসাময়িক লেখকগোষ্ঠীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর প্রথম তিনটি বইতে তিনি অলংকারবহুল গুরুগম্ভীর রচনাদর্শ অবলম্বন করেছিলেন। কিন্তু প্রবোধচন্দ্রিকা-র ভাষায় তিনি গদ্যরীতির নানা ভঙ্গি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। বাংলা চলিত রীতির অতি উৎকৃষ্ট ব্যবহার মৃত্যুঞ্জয়ের রচনায় পাওয়া যায়। তিনি যথার্থই প্রতিভাবান পণ্ডিত ও উন্নত স্তরের কথাশিল্পী ছিলেন।
অন্যান্য লেখকবর্গ
[সম্পাদনা]ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অন্যান্য লেখকদের কীর্তিও নগন্য নয়। রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রম্ (১৮০৫)। ছেদচিহ্নাদি না থাকায় বইটি কিছুটা দুষ্পাঠ্য, তা না হলে লেখক চমৎকার অন্বয়বোধের পরিচয় দিয়েছেন। গোলোকনাথ শর্মা হিতোপদেশ প্রকাশ করেন ১৮০২ সালে। এই গ্রন্থের ভাষাও প্রাঞ্জল। তারিণীচরণ মিত্র ওরিয়েণ্টাল ফেব্যুলিস্ট (১৮০৩) ইংরেজি গ্রন্থের অনুবাদ। এই গ্রন্থের ভাষা খুবই আড়ষ্ঠ। চণ্ডীচরণ মুন্সীর তোতা ইতিহাস (১৮০৫) ফারসি আদিরসাত্মক কেচ্ছার অনুবাদ। উপকথা জাতীয় এইসব রচনা সেকালে বেশ সমাদর লাভ করেছিল। তোতা ইতিহাস-এর অবৈধ প্রণয়কাহিনিগুলি মানবিক রসের আস্বাদনবৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছিল। এটিকে আদিরসাত্মক উপন্যাসের প্রাগ্রূপ বলা যায়।
পণ্ডিত-মুন্সিদের গদ্যের রচনার বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত-মুন্সিরা যে সব বই লিখেছিলেন, তা অনেকটা পাঠ্যপুস্তক জাতীয় এবং পরবর্তীকালের গদ্যরীতির নির্দেশক। মিশনারিদের মতো কোনও গূঢ় উদ্দেশ্য তাঁদের গদ্যচর্চায় ছিল না। গল্প, উপকথা, ইতিহাস ও দর্শন বিষয়ে তাঁরা নানা ধরনের বই লেখেন। এর কিছুটা অনুবাদ, কিছুটা অন্য রচনা দ্বারা প্রভাবিত এবং কিছুটা মৌলিক রচনা। যে ভাষারীতি তাঁরা ব্যবহার করেছিলেন, তাতে প্রধানত কথকতামূলক বর্ণনাত্মক ভাষায় আত্মপ্রকাশের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। কোনও রীতিতে আরবি-ফারসি শব্দের বাহুল্য, কোনও রীতিতে সংস্কৃত শব্দের আধিক্য ও গাম্ভীর্য, আবার কোনও রীতিতে ছিল চলিত ভাষার কথোপকথনের ভঙ্গি। এই রীতিগুলিই পরে পরিমার্জিত হয়ে বাংলা গদ্যের সাধু ও চলিত এই দুটি ব্যবহার্য রীতিতে পরিণত হয়।
মিশনারি ও কলেজের পণ্ডিত-মুন্সিদের গদ্যচর্চার তুলনা
[সম্পাদনা]শ্রীরামপুর মিশন ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ উভয়েরই দান উল্লেখযোগ্য। তবু উভয়ের অবদানের তুলনাগত পার্থক্য আছে। প্রতিষ্ঠান দুটির উদ্দেশ্য ছিল পৃথক এবং রচয়িতাদের স্বাতন্ত্র্যের জন্যই এই দুই প্রতিষ্ঠানের অবদানের তারতম্য ঘটেছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বইগুলিতে দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়নি ঠিকই, তবু সেগুলিতে উন্নত গদ্যশিল্পের সম্ভাবনা সূচিত হয়েছিল। মিশনারিরা প্রচারের উদ্দেশ্যে সাংবাদিকতার ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন, সাহিত্যিক সুষমার দিকে দৃষ্টিপাত করেননি। বিতর্কমূলক গদ্যপ্রবন্ধ রচনার উপযোগী গদ্যরীতি তাঁদেরই আবিষ্কার। কিন্তু হৃদয়ের সুকুমার অনুভূতি ও কল্পনাশক্তিকে প্রকাশের উপযোগী গদ্যরীতির সন্ধান তাঁরা করেননি।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রকাশিত বইগুলি ছিল নানা বিষয়ের। গল্প, উপকথা, ইতিহাস, দর্শন, জীবনচরিত প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় অবলম্বনে বিভিন্ন শ্রেণির লেখকেরা গ্রন্থ রচনা করেছেন। কাল্পনিক কাহিনি রচনায়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনায়, গার্হস্থ্য জীবনের বাস্তবানুগ চিত্রাঙ্কনে কলেজের পণ্ডিত-মুন্সিরা যথাসম্ভব কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। বত্রিশ সিংহাসন ও তোতা ইতিহাস মানবজীবনরসে নিষিক্ত চিত্তাকর্ষক রচনা। লিপিমালা ও ইতিহাসমালা-র কাহিনি অনৈতিহাসিক হলেও কৌতূহলোদ্দীপক। সর্বোপরি গদ্যশিল্পে চলিত রীতির উপযোগিতা এই কলেজেই প্রমাণিত হয়। মৃত্যুঞ্জয়ের রাজাবলি ও বত্রিশ সিংহাসন-এ আবার সাধুরীতির উৎকৃষ্ট প্রয়োগ দেখা যায়। তুলনায় মিশনারিদের বাইবেল অনুবাদের ভাষা নিঃসন্দেহে নিকৃষ্ট। দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্ত চলিত কথাকে কেরি ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তার মান উচ্চ নয়। তুলনায় মৃত্যুঞ্জয়ের প্রবোধচন্দ্রিকা-র ভাষা গদ্যরীতি উদ্ভাবনের একটি সুন্দর প্রচেষ্টা। এই কলেজের সৃষ্ট গদ্যরীতিই কালক্রমে "আলালী" ও "বিদ্যাসাগরী" রীতির পথ অতিক্রম করে বঙ্কিমী রীতিতে সার্থকতা লাভ করেছে। সব রকম ভাবই যে গদ্যভাষায় সুন্দর করে প্রকাশ করা চলে এই প্রত্যয় সৃষ্টির মূল্যও নিতান্ত কম নয়। ফোর্ট উইলিয়ামের ভাষা উৎকৃষ্ট গদ্যরীতি না হলেও প্রত্যয় সৃষ্টির জন্যও চিরকাল সমাদৃত হবে।