আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/রাজা রামমোহন রায়
বাংলা গদ্যসাহিত্যের বিকাশে শ্রীরামপুরের খ্রিস্টান মিশনারি ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত-মুন্সিদের অবদান অনস্বীকার্য। উনিশ শতকের গোড়ায় তাঁদের কর্ষিত ভূমিতেই বাংলা গদ্যের সাহিত্যিক অভ্যুদয় ঘটেছিল। তারপর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই দেখা যায়, গল্প-উপন্যাস, রম্যরচনা, সমালোচনা সাহিত্য ও জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ রচনার মাধ্যমে বাংলা গদ্যসাহিত্য এতটাই উন্নতি লাভ করেছে যে পৃথিবী অন্যান্য ভাষার সাহিত্যের ইতিহাসে এত অল্প সময়ের মধ্যে বিরল ঘটনা। বিদেশিদের চেষ্টায় তাঁদের স্বার্থে যে গদ্যভাষার বিকাশ ঘটেছিল, তা দেশের মনীষীদের চেষ্টায় সৌষ্ঠবের ক্রান্তিলগ্নে উন্নীত হয়। সেই চেষ্টায় যাঁরা প্রথম মনোযোগী হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হলেন রাজা রামমোহন রায় (১৭৭৪—১৮৩৩)। তিনি ছিলেন এক যুগন্ধর পুরুষ। তিনি বাঙালি জাতির জন্য অনাগত কালের জয়বার্তা বয়ন করে এনেছিলেন। বাঙালির আত্মবিকাশের সব কটি পথ তিনি স্বহস্তে নির্মাণ করে গিয়েছেন। ১৮১৩ থেকে ১৮৩৩ সাল পর্যন্ত একটানা কুড়ি বছর তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে একাধিপত্য করে গিয়েছেন। দেশে তখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ও শোষণ চলছে পুরোদমে; দেশবাসীও আচ্ছন্ন নানা কুসংস্কারে এবং খ্রিস্টান পাদরিরা হিন্দুধর্ম ও দেশীয় সংস্কৃতিকে হেয় প্রতিপন্ন করতে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। এ-হেন পরিস্থিতিতেই রামমোহন রায়ের আবির্ভাব। তিনি সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করে, বিচার ও বিতর্কমূলক নানা গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রচনা করে এবং শাস্ত্রগ্রন্থাদির বাংলা অনুবাদ ও ভাবার্থ প্রকাশ করে বাঙালিকে আত্মস্থ ও সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
রামমোহন রায়ের রচনাবলি
[সম্পাদনা]রামমোহন প্রকৃত অর্থে সাহিত্যিক ছিলেন না। কালজয়ী সাহিত্য রচনা করে অমরত্ব লাভের জন্য লেখনী তিনি ধরেননি। তাঁর গ্রন্থ বা প্রবন্ধ সবই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সমাজকল্যাণ ও লোকহিতৈষণার দিকে লক্ষ্য রেখে রচিত। তাঁর অনুবাদমূলক গ্রন্থ বেদান্ত গ্রন্থ (১৮১৫), বেদান্ত সার (১৮১৫) এবং কেন, ঈশ, কঠ, মাণ্ডুক্য ও মুণ্ডক উপনিষদের অনুবাদ (১৮১৯) প্রকাশিত হওয়ার পর যে ধর্মীয় বিতর্কের সূচনা ঘটে তার প্রেক্ষিতে তাঁকে স্বাধীনভাবে প্রবন্ধ রচনায় আত্মনিয়োগ করতে হয়। উৎসবানন্দ বিদ্যাবাগীশের সহিত বিচার, গোস্বামীর সহিত বিচার, ভট্টাচার্যের সহিত বিচার, কবিতাকারের সহিত বিচার, পথ্যপ্রদান ইত্যাদি হিন্দু রক্ষণশীল সমাজের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রামের ফসল। এই প্রসঙ্গে সতীদাহ প্রথা রদের উদ্দেশ্যে লেখা সহমরণ বিষয়ক প্রবর্তক ও নিবর্তকের সংবাদ (১ম ভাগ ১৮১৮, ২য় ভাগ ১৮১৯) তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি। সম্বাদ কৌমুদী ও ব্রাহ্মণ সেবধি নামে দুটি সংবাদপত্র সম্পাদনা করেও তিনি বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি গায়ত্রী মন্ত্রেরও ব্যাখ্যা রচনা করেছিলেন। আবার ব্রাহ্মণ-মিশনারী-সম্বাদ, পাদ্রী-শিষ্য-সম্বাদ প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করে তিনি খ্রিস্টান মিশনারিদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে হিন্দুসমাজের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। বেশ কিছু গান রচনা করে তিনি প্রকাশ করেন ব্রহ্মসঙ্গীত (১৮২৮)। কিন্তু বাংলা গদ্যরীতি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন বলে ১৮৩৩ সালে গৌড়ীয় ভাষার ব্যাকরণ রচনা করে মৌলিক চিন্তা ও মুক্তদৃষ্টির পরিচয় রাখেন।
রামমোহন রায়ের গদ্যরীতি
[সম্পাদনা]অনুবাদ সাহিত্য, বিতর্কমূলক আলোচনা ও মীমাংসামূলক গ্রন্থরচনায় বাংলা গদ্যভাষার প্রয়োগ করে রামমোহন বাংলা গদ্যকে আড়ষ্ঠতামুক্ত করেছিলেন। গদ্যভাষার শৈল্পিক সৌন্দর্যের তুলনায় ঋজুতা, সহজবোধ্যতা ও যুক্তিপ্রাধান্যের দিকেই তিনি লক্ষ্য স্থির রেখেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁর ভাষা সম্পর্কে মন্তব্য করেন, “দেওয়ানজী জলের ন্যায় সহজ ভাষা লিখিতেন। কিন্তু সে লেখায় শব্দের বিশেষ পারিপাট্য ও তাদৃশ মিষ্টতা ছিল না।” বস্তুত সারল্য ও স্পষ্টতাই রামমোহনের গদ্যরীতির বিশেষত্ব। এইজন্য অনেকে রামমোহনকে বাংলা গদ্যভাষার জনক বলে থাকেন। তাঁর রচনাগুলি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, বাক্শিল্পের চমৎকারিত্ব বা কল্পনা-মুখরিত সৌন্দর্যের রমণীয়তার দিকে লক্ষ্য না রেখে বিষয়বস্তুর গভীরতা এবং প্রকাশভঙ্গির স্পষ্টতার দিকেই তিনি মনোযোগী হয়েছিলেন। সেই জন্যই বাক্যগুলিকে তিনি নিরাভরণ ও পরিমিত করেছেন। রচনার গুণগত উৎকর্ষ না থাকায় রামমোহন প্রথম শ্রেণির প্রাবন্ধিকের গৌরব অর্জন করেননি। কিন্তু সাহিত্যকর্মে একান্তভাবে আত্মনিয়োগ করলে তা যে তিনি সহজেই করতে পারতেন, তার প্রমাণও তাঁর রচনায় দুষ্প্রাপ্য নয়।
গদ্যশিল্পে রামমোহন রায়ের প্রভাব
[সম্পাদনা]ভাষার প্রধান গুণ সহজবোধ্যতা এবং প্রকাশের সাবলীল প্রাঞ্জলতা। এই গুণ রামমোহনের রচনায় প্রচুর পরিমাণে ছিল বলে তিনি পরবর্তী বাংলা গদ্যশিল্পে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁর সমকালীন লেখকদের মধ্যে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলিকাতা কমলালয়, গৌরমোহন বিদ্যালঙ্কারের স্ত্রীশিক্ষাবিষয়ক এবং কাশীনাথ তর্কপঞ্চাননের পাষণ্ডপীড়ন ইত্যাদি গদ্যগ্রন্থের ভাষা অনেক মার্জিত ও সাহিত্যগুণ-সমন্বিত ছিল। রামমোহনের সুস্পষ্ট প্রভাবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-কেন্দ্রিক সাহিত্যিকগোষ্ঠীর ভাষাও নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল। তাতে বোঝা যায়, রামমোহন বাস্তবিকই বাংলা গদ্যের এমন একটি “গ্রানিট স্তর” নির্মাণ করেছিলেন যার উপর পরবর্তীকালের প্রতিভাবান গদ্যকারেরা অনায়াসে বা অল্পায়াসে গদ্যসাহিত্যের দিব্য সৌধ নির্মাণের সক্ষম হন।