বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/রবীন্দ্র-সমসাময়িক বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য

বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮—১৮৯৪) মনীষার স্পর্শে অভিনব রূপ ধারণ করে বাংলা গদ্যসাহিত্যের গৌরবকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। বিষয়বস্তুর বিস্তারে, মননশীলতায়, ব্যক্তিত্বের স্পর্শে ও তথ্যের প্রাচুর্যে বঙ্কিমযুগেই বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য যথেষ্ট সমৃদ্ধি অর্জন করে। উত্তরকালে তাঁর অনুবর্তী লেখকেরা বঙ্কিম-প্রবর্তিত ধারায় প্রবন্ধকে উৎকৃষ্ট সাহিত্যিক রচনায় পরিণতি দিয়েছিলেন। এই পর্যায়ের প্রাবন্ধিকদের মধ্যে অগ্রণী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১—১৯৪১)। রবীন্দ্রনাথের হাতে প্রবন্ধসাহিত্য কবিত্বের স্পর্শে, কল্পনার সৌন্দর্যে ও প্রকাশভঙ্গির মহিমায় রসসাহিত্যের প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক যুগে ও তাঁর অব্যবহিত পরবর্তীকালে বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যে আসে এক ব্যাপকতর ভাবগভীরতা।

বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর

[সম্পাদনা]
বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্র-সমসাময়িক যুগের কয়েকজন বিশিষ্ট গদ্যশিল্পীর কথা আলোচনা করতে হলে প্রথমেই বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৭০—১৮৯৯) কথা স্মরণ করতে হয়। তিনি রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র এবং ছেলেবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথের স্পর্শে থেকে পিতৃব্যের চিন্তাপ্রণালী ও প্রকাশভঙ্গি অনুশীলন করতে পেরেছিলেন। বলেন্দ্রনাথ নানা বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করেন এবং সেগুলি প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ১৯০২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর চিত্র ও কাব্য নামক প্রবন্ধ-সংকলনটি। বিশ শতকের মধ্যভাগে প্রকাশিত বলেন্দ্র গ্রন্থাবলী-তেও তার অনেক উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ গ্রন্থবদ্ধ হয়েছে। সংস্কৃত কলেজের কৃতী ছাত্র বলেন্দ্রনাথ সংস্কৃত ভাষারীতির সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিত ছিলেন এবং সংস্কৃত সাহুত্যের বিশাল সাম্রাজ্যেও ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ আনাগোনা। সেই সঙ্গে মৌলিক চিন্তা, গবেষণালব্ধ জ্ঞান এবং উৎকৃষ্ট ভাষাশিল্পের সহায়তায় তিনি সাহিত্য, শিল্প, ধর্ম ও সমাজ সম্পর্কিত নানা বিষয়ে উৎকৃষ্ট প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। বলেন্দ্রনাথ সম্পর্কে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর মন্তব্যটি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য, “বয়সে বালকত্ব অতিক্রম করিবার পূর্বেই তিনি প্রৌঢ়ত্বের দুর্লভ অন্তর্দৃষ্টি-ক্ষমতা লাভ করিয়াছিলেন।” বলেন্দ্রনাথ দীর্ঘজীবী হলে বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য আরও সমৃদ্ধ হত তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

[সম্পাদনা]
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গদ্যকার রূপে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে দীপ্যমান হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের অপর ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭১—১৯৫১)। ভারতীয় চিত্রশিল্পকে সমৃদ্ধ করে তোলার পাশপাশি গদ্যশিল্পীর ভূমিকাতেও তিনি বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে যে বহুমূল্য রত্নসমাবেশ ঘটিয়েছিলেন তার মূল্যও নিতান্ত কম নয়। তাঁর গদ্যরীতির মধ্যে চিত্রশিল্পের অপূর্ব সুষমা সন্নিবেশিত। খেয়ালি কল্পনার বিচিত্র ভাবে বিভোর হয়ে আলাপচারী ভঙ্গিতে গদ্যরচনা করতেন তিনি। তাঁর গদ্যভঙ্গির এই স্বকীয়তা অননুকরণীয়। তাঁর রচনা শকুন্তলা (১৮৯৫), ক্ষীরের পুতুল (১৮৯৬), রাজকাহিনী (১৯০৯), ভূতপত্‌রীর দেশ (১৯১৫), নালক (১৯১৬), বুড়ো আংলা (১৯৩৪), আলোর ফুলকি (১৯৪৭) বিশুদ্ধ প্রবন্ধ নয়। রূপকথা, পুরাণ ও ইতিহাসকে আশ্রয় করে কোনওটি কল্পনাবিলাস, কোনওটি বা বাস্তব ঘটনা ও তথ্যের রসরূপ। শিল্পীমানসের কল্পনার রঙে তিনি রচনাগুলিকে মণ্ডিত করেছেন। তাঁর পরিণত বয়সের রচনাবলিতে চিন্তার গভীরতার সঙ্গে বাক্‌-শিল্পের সরসতার আশ্চর্য সমন্বয় ঘটেছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রূপে প্রদত্ত তাঁর বাগীশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী প্রবন্ধসাহিত্যে বিস্ময়কর সংযোজন। অবনীন্দ্রনাথ প্রথম ভারতীয় যিনি শিল্পতত্ত্ব সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। ভারতশিল্প (১৯০৯), বাংলার ব্রত (১৯১৯), বাগীশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী (১৯২২-২৭ সালে রচিত, ১৯২৯ সালে প্রকাশিত), ভারতশিল্পের ষড়ঙ্গ (১৯৪৪), ভারতশিল্পে মূর্তি (১৯৪৭) গ্রন্থে তাঁর স্বকীয় শিল্পচিন্তা অপরূপ ভাষায় প্রকাশিত। খাজাঞ্চির খাতা (১৯১৬) ও পথে বিপথে (১৯১৯) গ্রন্থের কাহিনিগুলির মধ্যে প্রাত্যহিক জীবনের এক রহস্যময়তা অবনীন্দ্রনাথের অনবদ্য ভাষানির্মাণের মাধ্যমে রূপ লাভ করেছে। আবার রানী চন্দ অনুলিখিত ঘরোয়া (১৯৪১), জোড়াসাঁকোর ধারে (১৯৪৪) ও আপন কথা (১৯৪৬) এই তিন স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থে এক নতুন ধরনের শিল্প-কথকতার মাধ্যমে একই সঙ্গে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস ও অন্যদিকে তাঁর শিল্পীমানসের বিকাশের ইতিহাস প্রকাশিত। আলাপচারিতার ঢঙে, কৌতুকরসের বৈচিত্র্যে, কী কিশোরপাঠ্য গ্রন্থে, কী প্রবন্ধে, কী স্মৃতিচারণায় গদ্যরীতিকে নিজস্ব কল্পনাভঙ্গি প্রদান ও বাক্‌শিল্পের মাধুর্য সৃষ্টির জন্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয়।

রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী

[সম্পাদনা]
রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী

রবীন্দ্র-সমসাময়িক প্রাবন্ধিকদের মধ্যে প্রতীভার দীপ্তিতে সর্বাধিক উজ্জ্বল রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী (১৮৬৪—১৯১৯)। বিদ্যা, মননশীলতা, স্বদেশচেতনা ও ভাবগভীরতায় তাঁর সমতুল্য মনীষা তৎকালীন বাংলায় খুব অল্পই ছিলেন। নৈষ্ঠিক ব্রাহ্মণ পরিবারে রামেন্দ্রসুন্দরের জন্ম। মেধাবী ছাত্র হিসেবে তিনি প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) অধ্যক্ষ ও বিজ্ঞানের অধ্যাপকের পদে বৃত ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর মতো সর্বশাস্ত্রবিদ প্রগতিবাদী পণ্ডিত খুবই কম দেখা যায়। নবযুগে বিজ্ঞানতত্ত্ব ও ধর্মজিজ্ঞাসা নতুন পথে প্রবর্তিত হওয়ার মুখে যে নতুন জীবনজিজ্ঞাসা জাগে তা অবলম্বন করেই রামেন্দ্রসুন্দর দৃঢ় হস্তে লেখনী ধারণ করেছিলেন। প্রকৃতি (১৮৯৬), জিজ্ঞাসা (১৯০৪), বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা (১৯০৬), চরিতকথা (১৯১৩), শব্দকথা (১৯১৭) ইত্যাদি গ্রন্থে যে কথার মালা গেঁথেছিলেন তা নিছক কথার কথা ছিল না। প্রতিটি রচনাই বিজ্ঞানতত্ত্ব-নির্ভর দার্শনিকতায় অপূর্ব। বৈজ্ঞানিক অথচ ধর্মবিশ্বাসী, যুক্তিবাদী অথচ হৃদয়বান এই মনীষী নতুন ধরনের প্রবন্ধ রচনার ভবিষ্যৎ সূচনা করেন। তিনি দুরূহ তত্ত্বগুলিকে চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিতে নানা উদাহরণের সার্থক সমাবেশে, কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নের চতুর ইঙ্গিতে এবং সর্বোপরি কল্পনারসের মাধুর্যে সরল ও সুন্দর করে উপস্থাপিত করতে পারতেন। তাঁর রচনা প্রসাদগুণে, স্মিত কৌতুকের স্নিগ্ধচ্ছটায় অপরূপ হয়ে উঠত। রামেন্দ্রসুন্দরের রচনা শুধু বিজ্ঞান ও দর্শনতত্ত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। জ্ঞানবিজ্ঞানের এমন কোনও দিক ছিল না, যেদিকে তিনি লেখনী পরিচালনা করেননি। গঠনশিল্পের দিক থেকে তাঁর প্রবন্ধে কিছু ত্রুটি ছিল। বুদ্ধির বিচার ও যুক্তির সারবত্তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিলেন বলে অনেক প্রবন্ধ আয়তনে দীর্ঘ হয়েছে এবং কোনও কোনও স্থানে প্রসঙ্গান্তরের সম্ভাবনাও ঘটেছে। তবু প্রবন্ধসাহিত্যে তাঁর দান অসামান্য।

প্রমথ চৌধুরী

[সম্পাদনা]
প্রমথ চৌধুরী

বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যে প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮—১৯৪৬) এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব। তিনি সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা ইন্দিরা দেবীকে বিবাহ করেন এবং রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে এসেও রবীন্দ্র-ভাবকল্পনার প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে পেরেছিলেন। পাবনার (অধুনা বাংলাদেশে) বারেন্দ্র জমিদার বংশে তাঁর জন্ম, ইউরোপে তাঁর শিক্ষা, নাগরিক বৈদগ্ধ্যে তাঁর রুচি। বাংলা সাহিত্যের সেবায় আত্মনিয়োগ করে তিনি সনেট পঞ্চাশৎ (১৯১৩) ও পদচারণা (১৯১৩) নামে দুটি কাব্যগ্রন্থ এবং চার ইয়ারী কথা (১৯১৬), আহুতি (১৯১৯), নীললোহিত (১৯৩২), ফার্স্ট ক্লাশ, বড়বাবুর বড়দিন প্রভৃতি কয়েকটি গল্প-সংকলন রচনা করলেও প্রাবন্ধিক হিসেবেই তাঁর খ্যাতি সর্বাধিক। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন যে, প্রমথ চৌধুরী আপাদমস্তক ছিলেন প্রবন্ধকার। তাঁর সকল রচনা, এমনকি গল্প ও কবিতাও, প্রবন্ধধর্মী। বীরবল ছদ্মনামে তিনি সবুজ পত্র (১৯১৪—১৯২৮) নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করে বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যে যুগান্তর আনয়ন করেন। চলিত ভাষায় প্রবন্ধ রচনা এবং চিন্তার ক্ষেত্রে সংস্কার-মুক্ত স্বাধীন মনন ও যুক্তিনিষ্ঠার প্রবর্তন করে বীরবল বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন অর্জন করেন। তেল-নুন-লকড়ী (১৯০৬), বীরবলের হালখাতা (১৯১৭), নানা কথা (১৯১৯), নানা চর্চা (১৯৩২) প্রভৃতি প্রবন্ধে বীরবল অভিনব প্রাবন্ধিক বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করেছেন।

প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধ রচনার রীতি ‘বীরবলী ঢঙ’ নামে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যুগপৎ প্রশংসিত ও নিন্দিত হয়। প্রবন্ধরচনায় তিনি যে মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন তাতে মজলিসি আলাপের সুর ও খেয়ালখুশির বৈশিষ্ট্য। তাঁর যুক্তিগুলি তীক্ষ্ণ সন্দেহ নেই, কিন্তু লঘুকল্পনা ও কথার মারপ্যাঁচে তা হৃদ্য হয়ে ওঠেনি। বীরবলী প্রবন্ধে আঙ্গিকের দৃঢ়তা নেই। ফলে যে-কোনও বিষয়ের আলোচনায় অনবরতই প্রসঙ্গান্তরের অবতারণা হয়। বীরবলের প্রবন্ধে স্বচ্ছন্দ মানস-বিচরণের সর্পিল গতি পাঠককে যেমন সচকিত করে, তেমনই বিভ্রান্ত ও বিমূঢ় করে তোলে। আগাগোড়া বৈঠকি মেজাজে বীরবল বাঙালির স্বভাবসিদ্ধ ভাবপ্রবণতা ও প্রচলিত ধ্যানধারণাগুলিকে শ্লেষব্যঙ্গের কশাঘাতে জর্জরিত করেছেন। ফরাসি ভাষায় পণ্ডিত এই ব্যক্তি ফরাসি প্রবন্ধসাহিত্যের বাগ্‌বৈদগ্ধ্য ও মননশীলতা বাংলা ভাষায় প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। বীরবল মনে করতেন যে, ভাববিলাসের দিন ফুরিয়েছে এবং এখন সংস্কারমুক্ত মন ও মার্জিত রুচি নিয়ে জীবন ও কর্মকে নতুনভাবে পরিচালিত করতে হবে। তাঁর প্রবন্ধে সমাজ, সাহিত্য, সৌন্দর্যতত্ত্ব, সংগীততত্ত্ব, ধর্ম, নীতি প্রভৃতি বহু বিষয়ের নির্মোহ আলোচনা রয়েছে। ভাষার মধ্যে শ্লেষ-বক্রোক্তির প্রাধান্য, কালোয়াতি মারপ্যাঁচের চমক সাধারণ পাঠকের কাছে প্রবন্ধগুলিকে দুর্বোধ্য করে রেখেছে। তাঁর ভাষায় বড়ো বেশি ‘প্যারাডক্সের খোঁচা’ রচনার প্রাঞ্জলতাকেও নষ্ট করেছে। তবু বাগ্‌বৈদগ্ধ্য, পরিহাসকুশলতা, বুদ্ধির সূক্ষ্মতা এবং মননের বিশিষ্টতায় বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য বীরবলের হাতে অদ্ভুত বৈচিত্র্য লাভ করেছে।

পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়

[সম্পাদনা]

বীরবলী যুগের প্রাবন্ধিকদের মধ্যে পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৬৬—১৯২৩) বিশেষভাগে উল্লেখযোগ্য। বিপিনচন্দ্র পাল, চিত্তরঞ্জন দাশ প্রমুখ নেতৃবর্গ ধর্মপ্রচার ও রাজনৈতিক বক্তৃতার মাধ্যমে বাংলা গদ্য-প্রবন্ধে আবেগ ও ওজস্বিতা এনেছিলেন। পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিক হিসেবে নানা প্রবন্ধ করেন এবং সাহিত্য সমালোচনাতেও বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেন। মতবাদের দিক থেকে তিনি ছিলেন বঙ্কিমপন্থী। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ভাবধারা ও বীরবলী চিন্তাপ্রণালী তিনি সমর্থন করেননি। তাঁর প্রবন্ধগুলিতে সূক্ষ্ম চিন্তা ও বিস্ময়কর বিশ্লেষণ-পদ্ধতির পরিচয় পাওয়া যায়। উনিশ শতকের জীবন ও চিন্তাকে পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় সরল ভাষায়, তথ্যসমৃদ্ধ ভঙ্গিতে এবং যুক্তিনিষ্ঠ উপায়ে প্রকাশ করে প্রবন্ধ রচনায় প্রভূত উৎকর্ষ দেখিয়েছিলেন।

মোহিতলাল মজুমদার

[সম্পাদনা]
মোহিতলাল মজুমদার

রবীন্দ্র-সমসাময়িক যুগে বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যে নানা গুণের সমন্বয় ঘটেছিল। চিন্তার বলিষ্ঠতায় ও প্রকাশভঙ্গির বৈশিষ্ট্যে পাশ্চাত্য গদ্যের অনুসরণ দেখা গিয়েছিল কারও কারও রচনায়। অপর এক দল রমরচনা-জাতীয় গদ্যে উৎসাহ দিয়েছিলেন। এই পরিমণ্ডলের বাইরে স্বকীয় সাতন্ত্র্যে আবির্ভাব ঘটেছিল কবি-প্রাবন্ধিক মোহিতলাল মজুমদারের (১৮৮৮-১৯৫২)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা অগ্রণী রবীন্দ্র-বিরোধী কবি মোহিতলাল সাহিত্য-সমালোচনামূলল গদ্যে গভীর নিষ্ঠার পরিচয় দিয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্থায়ী আসন লাভ করেন। মোহিতলালের প্রবন্ধের বিষয় সাহিত্যতত্ত্ব ও সাহিত্য সমালোচনা। সত্যসুন্দর দাস ছদ্মনামে তিনি সাহিত্যের স্বরূপ, সংজ্ঞা, আদর্শ, লক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে উৎকৃষ্ট প্রবন্ধ করনা করেছিলেন। পরে বঙ্কিমচন্দ্র, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের সাহিত্যকৃতির বিচার-বিশ্লেষণ করে অগ্রসর হয়ে ক্রমে বাংলার সকল শ্রেণির লেখকদের সম্পর্কেই সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করেন সমালোচনা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। সাহিত্য কথা (১৯৩৮) গ্রন্থে তিনি সাহিত্যের বিশুদ্ধ আদর্শ নিরূপণের চেষ্টা করেছেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্য (১৯৩৬), সাহিত্য বিতান (১৯৪২), বাংলার নবযুগ (১৯৪৫), শ্রীমধুসূদন (১৯৪৭), বঙ্কিমবরণ (১৯৪৯), শ্রীকান্তের শরৎচন্দ্র (১৯৫০) প্রভৃতি গ্রন্থে বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের তিনি একটি আদর্শ স্থির করে দিয়েছেন।

রবীন্দ্র-পরবর্তীকালের বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য

[সম্পাদনা]

রবীন্দ্র-পরবর্তীকালে প্রবন্ধসাহিত্যের গতি-প্রকৃতি বিভিন্নমুখী হয়েছে। আগে বাংলার মনীষীদের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী ও স্বদেশানুরাগীরাই বাংলা সাহিত্যের চর্চা করতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ইংরেজি শিক্ষায় কৃতবিদ্য ব্যক্তিবর্গও তাঁদের দর্শন, বিজ্ঞান ও ইতিহাস সম্বন্ধীয় গবেষণার বিষয়গুলি বাংলা ভাষায় প্রকাশ করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। এর ফলে বাংলা গদ্যনিবন্ধ বিষয়বৈচিত্র্যে ও আয়তনে প্রসারিত হয়েছে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধকুমার চক্রবর্তী, সুকুমার সেন, প্রমথনাথ রায়চৌধুরী, বিজনবিহারী ভট্টাচার্য, আশুতোষ ভট্টাচার্য, শশিভূষণ দাশগুপ্ত, নীহাররঞ্জন রায় প্রমুখ খ্যাতনামা অধ্যাপকবৃন্ধ তাঁদের চিন্তা ও গবেষণামূলক বিষয়গুলিকে প্রকাস করে বাংলা গদ্যসাহিত্যের সমৃদ্ধির সূচনা ঘটিয়েছেন। বিজ্ঞান ও দর্শন বিষয়ক গবেষণাও কেউ কেউ গদ্যনিবন্ধে প্রকাশ করায় বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমস্ত শাখাগুলিকেই ক্রমশ অধিকার করেছে।