আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/রবীন্দ্র-সমসাময়িক কবিগণ
উনিশ শতকের শেষভাগে জন্মগ্রহণ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধে কাব্যচর্চা করে খ্যাতি অর্জন করেছেন, এমন কবির সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিখ্যাতি যখন মধ্যগগনে, তখন এঁরা স্বকীয় প্রতিভার আলোয় বাংলা গীতিকবিতার বিশেষ বিশেষ অঞ্চল আলোকিত করেছেন। এঁদের মধ্যে একদল ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও উৎসাহে রবীন্দ্র-কাব্যপরিমণ্ডলের অন্তর্ভুক্ত। অপর একটি দল প্রাক্-রবীন্দ্র কাব্যধারার পথে চালিত হয়েও রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ প্রভাবকে এড়াতে পারেননি। আবার তৃতীয় একটি দল সচেতনভাবে রবীন্দ্রনাথের রোম্যান্টিক ভাব-কল্পনার প্রতিবাদ করে স্পষ্টভাবেই রবীন্দ্রবিরোধী কবি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।
রবীন্দ্র-পরিমণ্ডলের অন্তর্ভুক্ত কবিগণ
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথের ভাব-কল্পনা ও প্রকাশভঙ্গির অনুসরণে কাব্যরচনা করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭০—১৮৯৯) ও প্রিয়ম্বদা দেবী (১৮৭১—১৯৩৫)। বলেন্দ্রনাথের মাধবিকা (১৮৯৬) কাব্যে প্রেমের কবিতায় স্নিগ্ধ সৌন্দর্য এবং শ্রাবণী (১৮৯৭) কাব্যে প্রেম ও প্রকৃতি বিষয়ক কবিতাবলি স্থান পেয়েছে। অন্যদিকে প্রিয়ম্বদা দেবীর রেণু (১৯০০) কাব্যে তাঁর ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতামূলক গীতিকবিতাগুলি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে। ভুজঙ্গধর রায়চৌধুরী (১৮৭২—১৯৪০) ও রমণীমোহন ঘোষ (১৮৭৭—১৯২৭) উচ্চ কবিপ্রতিভার অধিকারী না হলেও রবীন্দ্র-কাব্যপরিমণ্ডলে দুই বিশিষ্ট কবি। ভুজঙ্গধরের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল মঞ্জির (১৯০৮), গোধূলি (১৯১১), শিশির (১৯১৪), ছায়াপথ (১৯১৪) ও রাকা (১৯১৬) । রমণীমোহনের উল্লেখযোগ্য কাব্য দীপশিখা কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে মুকুর (১৮৯৯), মঞ্জরী, ঊর্মিকা ইত্যাদি। রবীন্দ্রানুরাগী কবিদের মধ্যে বিশেষ ভাবে নাম করা যায় প্রমথনাথ রায়চৌধুরীর (১৮৭৩—১৯৪৯)। ইনি প্রচুর আবেগপ্রবণ কবিতায় দেশপ্রেম ও প্রকৃতিপ্রেমের গভীর পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর পদ্মা (১৮৯৮), গীতিকা, আরতি (১৯০২), যমুনা (১৯০৫), গৈরিক (১৯১৩), গৌরাঙ্গ, পাথার ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে বেশ কিছু উন্নত শ্রেণির কবিতা পাওয়া যায়।
কিন্তু রবীন্দ্র-পরিমণ্ডলের যে দুই গীতিকবি বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন লাভে সক্ষম হয়েছিলেন, তাঁরা হলেন রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫—১৯১৯) ও অতুলপ্রসাদ সেন (১৮৭১—১৯৩৪)। এঁরা দুজনেই রবীন্দ্রনাথের সমকালে বাংলা গানের জগতে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রজনীকান্তের বাণী (১৯০২), কল্যাণী (১৯০৫), অমৃত (১৯১০), অভয়া (১৯১০) প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে এবং অতুলপ্রসাদের গীতিগুঞ্জ (১৯৩১) সংকলনে অজস্র গান ও গীতিকবিতার সুন্দর দৃষ্টান্ত সংকলিত হয়েছে। দুই কবির গানগুলির সাংগীতিক ও কাব্যিক মূল্য বাঙালি সমাজে সমাদরের বস্তু।
রবীন্দ্র-প্রভাবিক কবিগোষ্ঠী
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ প্রভাবাধীন নন, অথচ রবীন্দ্রনাথের ছায়ায় কাব্যরচনা করে কয়েকজন কবি বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলা কবিতার ইতিহাসে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছিলেন। তাঁদের প্রতিভায় ছিল অনন্য এক স্বাতন্ত্র্য।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
[সম্পাদনা]দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩—১৯১৩) রবীন্দ্র-সমসাময়িক এক বিশিষ্ট কবি। তিনি প্রধানত নাট্যকার হিসেবেই খ্যাত এবং প্রথম জীবনে রবীন্দ্র-বিরোধিতায় যথেষ্ট সোচ্চার হয়েছিলেন। হাস্যরসাত্মক সংগীত ও কবিতা রচনায় তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর আষাঢ়ে (১৮৯৯) ও হাসির গান (১৯০০) কৌতুককাব্যের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। আবার ভাবগম্ভীর ও জীবননিষ্ঠ কবিতা রচনাতেও তিনি যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। আর্য্যগাথা (প্রথম ভাগ, ১৮৮২; দ্বিতীয় ভাগ, ১৮৯৩), মন্দ্র (১৯০২), আলেখ্য (১৯০৭) ও ত্রিবেণী (১৯১২) দ্বিজেন্দ্রলালের শ্রেষ্ঠ কবিতা-সংকলন। তিনি জীবনের অসংগতিকে যেমন নির্মল কৌতুকের চোখে দেখেছেন, তেমনই জীবনের বিকৃতিকে কঠিনতম বিদ্রূপে করেছেন বিদ্ধ। প্রত্যয়নিষ্ঠ জীবনের মহিমা তাঁর কাব্যে বিঘোষিত। প্রকাশভঙ্গিতেও দ্বিজেন্দ্রলালের দক্ষতা কম ছিল না। বাংলা ছন্দ নিয়ে তিনি নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
[সম্পাদনা]রবীন্দ্র-সমসাময়িক কালে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবের মধ্যেও স্বকীয় স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল কবি ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২—১৯২২)। চিন্তাবিদ অক্ষয়কুমার দত্তের পৌত্র সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য। বিদ্যাবুদ্ধিতে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। শব্দশিল্পে ও ছন্দের নৈপুণ্যে তাঁর মতো যোগ্যতর কবি সে-যুগে আর দেখা যায়নি। তিনি প্রচুর কবিতা রচনা করে বাংলা কাব্যের আঁচল ভরে দিয়েছেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সবিতা (১৯০০)। ক্রমে প্রকাশিত হয় সন্ধিক্ষণ (১৯০৫), বেণু ও বীণা (১৯০৬), হোমশিখা (১৯০৭), অনুবাদ কবিতার সংকলন তীর্থরেণু (১৯০৮) ও তীর্থসলিল (১৯১০), ফুলের ফসল (১৯১১), কুহু ও কেকা (১৯১২), তুলির লিখন (১৯১৪), মণিমঞ্জুষা (১৯১৫), অভ্র-আবীর (১৯১৬), ব্যঙ্গ কবিতার সংকলন হসন্তিকা (১৯১৭) এবং মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় বেলা শেষের গান (১৯২৩) ও বিদায় আরতি (১৯২৪)। সব কটি কাব্যগ্রন্থেই সত্যেন্দ্রনাথের অবিস্মরণীয় কবিকৃতির পরিচয় ধরা পড়েছে। তিনি ছিলেন আঙ্গিক-সচেতন ও বস্তুনিষ্ঠ গীতিকবি। তিনি জীবনকে নানা রূপে, নানা বৈচিত্র্যে দেখিয়েছেন বটে, কিন্তু জীবনাতিশয়ী শাশ্বত সত্যের সন্ধান দিতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে তিনি যে পরিমাণে শিল্পী ছিলেন, সেই পরিমাণে কবিত্বশক্তির অধিকারী ছিলেন না। তবু শব্দকুশলী ‘ছন্দের জাদুকর’ পণ্ডিত কবি সত্যেন্দ্রনাথ স্বদেশপ্রেম, সৌন্দর্যচিত্র, সমসাময়িক সমাজের নীতিবোধ প্রভৃতিকে কাব্যের বিষয় করে “বঙ্গভারতীর তন্ত্রী”তে নতুন তার সংযোজনে যে সমর্থ হয়েছিলেন তা অস্বীকার করা যায় না।
করুণানিধন বন্দ্যোপাধ্যায়
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথের ভাবচ্ছায়ায় প্রেম, ভক্তি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ অবলম্বন করে যাঁরা কাব্যের এক স্নিগ্ধ পরিবেশ রচনা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন করুণানিধন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭—১৯৫৫)। ঝরাফুল (১৯১১), শান্তিজল (১৯১৩), ধানদূর্বা (১৯২১), শতনরী (১৯৩০) প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে তিনি প্রীতিভক্তির একটি মধুর পরিবেশ রচনা করেছেন। তাঁর কবিতায় যুগযন্ত্রণার জ্বালা নেই, প্রসন্ন মনের একটি পরিতৃপ্তির সুর সমগ্র কাব্যে ছড়িয়ে আছে। তাঁর মূল প্রকৃতি ছিল রোম্যান্টিক, তাই কাব্যের ক্ষেত্রে একটি অলৌকিক রসের জগৎ রচনা করতে পেরেছেন তিনি।
যতীন্দ্রমোহন বাগচি
[সম্পাদনা]যতীন্দ্রমোহন বাগচি (১৮৭৮—১৯৪৮) করুণানিধনেরই সমভাবাপন্ন কবি। তবে কাব্যের বিষয় নির্বাচনে ও রচনাভঙ্গিতে তিনি কিছু বিশেষত্ব দেখিয়েছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ লেখা প্রকাশিত হয় ১৯০৩ সালে। তারপর প্রকাশিত হয় রেখা (১৯১০), অপরাজিতা (১৯১৩), নাগকেশর (১৯১৭), বন্ধুর দান (১৯১৮), জাগরণী (১৯২২), নীহারিকা (১৯২৭) এবং সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ মহাভারতী (১৯৩৬)। যতীন্দ্রমোহন গ্রামবাংলার ছবি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অনাড়ম্বরতা, মানুষের সহজ ধর্মবিশ্বাস প্রভৃতি অবলম্বন করে সুন্দর গীতিকবিতা রচনা করেছেন। তাঁর কাব্যের আঙ্গিকে নাটকীয় একোক্তি ও স্বগতভাষণের চমৎকারিত্ব তাঁর কোনও কোনও কবিতাকে বিশেষ সৌন্দর্যে ভূষিত করেছে। মহাভারতী কাব্যগ্রন্থে মহাভারতের চরিত্রগুলি তিনি নতুন তাৎপর্যে উপস্থিত করে বেশ কৌতূহল সৃষ্টি করেছেন। সুস্থ বাস্তব জীবনবোধ তাঁর কবিধর্মের বিশেষত্ব। কাব্যমালঞ্চ নামক গ্রন্থে সংকলিত তাঁর কবিতাগুলিতে সেই বাস্তবতাবোধ, রোম্যান্টিক কল্পনা, ইতিহাস-নিষ্ঠা ও ঐতিহ্যপ্রিয়তা সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
কুমুদরঞ্জন মল্লিক, কালিদাস রায় ও কিরণধন চট্টোপাধ্যায়
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রানুসারী দুই কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক (১৮৮২—১৯৭০) ও কালিদাস রায় (১৮৮৯—১৯৭৫) বৈষ্ণবীয় ভাবরস, গ্রামীণ জীবনের প্রতি ভালোবাসা, পারিবারিক স্নেহপ্রীতির মাধুর্য, আদর্শনিষ্ঠ জীবনের মহিমা প্রভৃতি অবলম্বনে সরল সুন্দর কবিতা রচনা করে জনপ্রিয় হয়েছে। উচ্চতর কবিকল্পনা অথবা প্রকাশভঙ্গির কোনও বৈশিষ্ট্য তাঁদের নেই; কিন্তু এঁদের অনুভূতির মধ্যে য়াছে একধরনের স্নিগ্ধতা, ঈশ্বর-বিশ্বাস ও মানবপ্রীতির মাধুর্য। প্রাচীন বাংলার কাব্যধারা যুগধর্মের প্রভাবে কিছুটা মার্জিত হয়ে এঁদের রচনায় যেন পুনরায় আবির্ভূত হয়েছে। কুমুদরঞ্জনের উজানী (১৯১১), বনতুলসী (১৯১১), একতারা (১৯১৪), বনমল্লিকা (১৯১৮), অজয় (১৯২৭), স্বর্ণসন্ধ্যা (১৯৪৮) প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ তাঁর প্রতিভার পরিচয় বহন করছে। কবিশেখর কালিদাস রায়ের কাব্যগ্রন্থ পর্ণপুট (১৯১৪), বল্লরী (১৯১৫), বৈকালী (১৯৪০) ও ব্রজরেণু (১৯৪৫), তাঁর প্রশংসনীয় কৃতিত্বের পরিচায়ক। কবি কিরণধন চট্টোপাধ্যায় (১৮৮৭—১৯৩১) এক সময়ে গার্হস্থ্য প্রেমকে অবলম্বন করে সুখপাঠ্য সহজবোধ্য কবিতা রচনা করেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থ নূতন খাতা (১৯২৩) বাঙালি পাঠকের সশ্রদ্ধ কৌতূহল আকর্ষণ করেছিল। তাঁর কাব্যে জীবনবোধের গভীরতা বা ক্রান্তদর্শিতা না থাকলেও সহজ প্রাণের কবিত্বে তা ছিল পরিপূর্ণ।
রবীন্দ্রবিরোধী কবিগোষ্ঠী
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথের প্রভাব অতিক্রম করার প্রচেষ্টায় এবং রবীন্দ্রনাথের রোম্যান্টিক ভাব-কল্পনার বিরোধিতায় একদল তরুণ কবি এক সময়ে নতুন কাব্যরীতির প্রবর্তন করে বাংলা সাহিত্যে নতুন চমক সৃষ্টি করলেন। রবীন্দ্রনাথের সর্বব্যাপী প্রভাব তাঁরা সম্পূর্ণ অতিক্রম করতে পারেননি বটে, কিন্তু কবিতার উপকরণ ও প্রকরণে এবং কাব্যভাবনায় তাঁরা যে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পথ অবলম্বন করতে চেয়েছিলেন তা সত্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগে নতুন জীবনজিজ্ঞারার দ্বারা চালিত তাঁদের মনে যে ভাব-তরঙ্গের উৎক্ষেপ ঘটে তার প্রকাশ ঘটেছে এই যুগের কাব্যভাবনায়। কয়েকজন প্রতিভাধর কবি ছিলেন এই নতুন সুরের সাধক।
মোহিতলাল মজুমদার
[সম্পাদনা]রবীন্দ্র-প্রতিভার সর্ব্যব্যাপী শক্তি ও বিস্ময়কে স্বীকার করেও যাঁরা স্বকীয় স্বাতন্ত্র্যে বিশিষ্ট তাঁদের মধ্যে প্রধান কবি মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮২—১৯৫২)। তিনি রবীন্দ্রনাথের মতোই ভাববাদী; কিন্তু অধ্যাত্মবিলাসী বা মহাজীবনপিপাসু হতে পারেননি। বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের চেতনায় তিনি তান্ত্রিক সাধকের মতো দেহসাধনার মধ্যেই জীবনের সিদ্ধি ও সার্থকতা খুঁজেছেন। এইজন্য কেউ কেউ তাঁকে ‘দেহাত্মবাদী তান্ত্রিক কবি’ বলেছেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থ স্বপনপসারী (১৯২২), বিস্মরণী (১৯২৭), স্মরগরল (১৯৩৬), হেমন্ত গোধূলি (১৯৪১) ও ছন্দ চতুর্দশী (১৯৫১) তাঁর কবিপ্রতিভা ও কাব্যের রূপনির্মিতির বিশিষ্টতার পরিচায়ক। জীবনবোধ ও কাব্যের শিল্পরূপ সম্পর্কে মোহিতলাল ছিলেন ক্ল্যাসিক-পন্থী। পরিমার্জিত বুদ্ধি ও তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ শক্তি নিয়ে তিনি জীবনের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে কামনা-বেদনা মর্মদাহ অনুভব করেছেন এবং তারই মধ্যে পান করেছেন প্রেম ও সৌন্দর্যের অমৃতরস। দক্ষ চিত্রকরের মতো রূপনির্মাণের ক্ষমতা নিয়ে তিনি এই ভাবকে বাণীমূর্তি দিয়েছেন। এই কারণেই তিনি রবীন্দ্রযুগে স্বতন্ত্র প্রতিভার অধিকারী এক কবি হিসেবে স্বীকৃত।
যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রকাব্যের ব্যঙ্গানুকরণ করতে গিয়ে এক ইঞ্জিনিয়ার কবি বাংলা সাহিত্যে দীপ্যমান হয়ে ওঠেন। তাঁর নাম যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (১৮৮৭—১৯৫৪)। বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের কঠিন প্রস্তরে প্রাচীন সংস্কারকে চূর্ণবিচূর্ণ করে মানুষের জীবনের সীমাহীন দুঃখের বাণীমূর্তি রচনা করেন তিনি। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলির নামকরণ বিশেষ অর্থবহ। মরীচিকা (১৯২৩), মরুশিখা (১৯২৭), মরুমায়া (১৯৩০), সায়ম্ (১৯৪০), ত্রিযামা (১৯৪৮) প্রভৃতি কাব্যের নামকরণে তাঁর কবিমনের ক্রমবিকাশের ইঙ্গিত আছে। তাঁর নিশান্তিকা কাব্যগ্রন্থটি তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত হয়। যতীন্দ্রনাথকে বলা হয় দুঃখবাদী কবি। কিন্তু তাঁর দুঃখবাদ জীবনবাদেরই নামান্তর; দুঃখ তাঁর কাছে ভাববিলাস নয়। মানবজীবনে দুঃখের সত্যকে দেখেছিলেন বলেই ‘বহ্নিস্তুতি’ দিয়ে তাঁর কাব্যের সূচনা এবং কাব্যধর্মে তিনি দুঃখের দেবতা শিবের উপাসক। যাঁরা সৌন্দর্য ও আদর্শবাদের প্রলেপ দিয়ে জীবনের নগ্নতাকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে কবি নিক্ষেপ করেছেন নিষ্ঠুর ব্যঙ্গবাণ। তাই যতীন্দ্রনাথের কবিতার ভঙ্গি তির্যক, বাক্রীতি অভিনব এবং কাব্যভাবনায় বুদ্ধির তীক্ষ্ণ দীপ্তি। বস্তুত প্রচলিত রীতি উলঙ্ঘনের অসাধারণত্বেই যতীন্দ্রনাথের মতো বিশিষ্ট কবি বাংলা সাহিত্যে তুলনারহিত।
কাজী নজরুল ইসলাম
[সম্পাদনা]বিশ শতকের তৃতীয় দশকে কল্লোল ও কালিকলম পত্রিকাকে কেন্দ্র করে সাহিত্যরীতির এক নতুন আন্দোলন গড়ে ওঠে। তাতে যাঁর দৃপ্ত পৌরুষ রুদ্রবীণায় বেজে উঠেছিল, তিনি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯—১৯৭৬)। একদা সৈনিক এই কবির কণ্ঠে বিদ্রোহের গান তীব্র সুরে বেজে উঠেছিল। তাঁর অগ্নিবীণা প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। তিনি আবেগপূর্ণ ভাষায় মানুষের স্বাধিকার ও সাম্যের দাবি তোলেন, ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে মুখর হয় তাঁর কণ্ঠ। চিন্তার বলিষ্ঠতায়, প্রকাশের ঋজুতায় ও আবেগের গভীরতায় রবীন্দ্র-সমসাময়িক নজরুল বাংলা সাহিত্যের আসনে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে নেন। তাঁর রচিত গানগুলিও বাংলা সাহিত্যের অপূর্ব সম্পদ। দোলন চাঁপা (১৯২৩), ভাঙার গান (১৯২৪), বিষের বাঁশী (১৯২৪), ছায়ানট (১৯২৫), পূবের হাওয়া (১৯২৬) ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে কাজী নজরুলের প্রচুর কবিতা ও গান সংকলিত আছে। ১৯৪১ সালে অসুস্থ ও পঙ্গু হয়ে পড়ার পর তাঁর লেখনী চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়।