আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবন্ধসাহিত্য
রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরকেই বাংলা গদ্যের প্রথম যথার্থ শিল্পী বলেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র সেই গদ্যেই অধিকতর কলানৈপুণ্য এনেছিলেন। রবীন্দ্রনাথে এসে বঙ্কিমী গদ্য হয়ে ওঠে পরম ঐশ্বর্যবান। উপন্যাস ও ছোটোগল্প বাদে প্রায় পঁয়ষট্টি বছর ধরে তিনি যে-সব প্রবন্ধ ও নিবন্ধ রচনা করেছেন, সেগুলির সংখ্যা যেমন প্রচুর, বিষয়বৈচিত্র্যে তার পরিধিও সুবিস্তৃত। ধর্ম, শিক্ষা, ভাষা, সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজ, ইতিহাস, বিজ্ঞান—সব কিছুই হয়েছে তাঁর প্রবন্ধের বিষয়। তাঁর এই বিপুল প্রবন্ধসাহিত্য একদিকে যেমন কাব্যশ্রীমণ্ডিত, অন্যদিকে তেমনই রবীন্দ্রনাথের গভীর মননশীলতা ও স্থির প্রজ্ঞার সাক্ষরবাহী। বাংলা গদ্যশৈলীকে তিনি অনেক দিক থেকেই প্রকাশকলার নৈপুণ্যে লাবণ্যময় করে তুলেছিলেন। প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এই যে, রোম্যান্টিক কবি হওয়া সত্ত্বেও দেশ ও দেশবাসীর সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল নিবিড়। দেশের যা কিছু মহৎ, যা কিছু বরণীয়, তার প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশিত হয়েছে; পাশাপাশি যেখানে দেশের দীনতা ও হীনতা, সেখানে বর্ষিত হয়েছে তাঁর তিরস্কার। দেশবাসীর প্রতি গভীর প্রীতিই তাঁকে বাধ্য করেছে দেশের অভাব, শূন্যতা ও প্রগতির পথে বাধাস্বরূপ জীর্ণ কুসংস্কারকে আঘাত করতে। সেই কারণেই তিনি কেবল দোষটুকু দেখিয়েই ক্ষান্ত হননি, তার কারণও সহৃদয়তার সঙ্গে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। প্রবন্ধসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের এই মননশীলতা, সহৃদয়তা, গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও নিবিড় মানবপ্রীতির সঙ্গে মিলিত হয়েছে সূক্ষ্মতম সৌন্দর্যবোধ ও সরস শিল্পবোধ।
প্রবন্ধসাহিত্যের শ্রেণিবিভাগ
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধসাহিত্যকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করে নেওয়া যায়। প্রাচীন সাহিত্য (১৯০৭), সাহিত্য (১৯০৭), আধুনিক সাহিত্য (১৯০৭), লোকসাহিত্য (১৯০৭), শব্দতত্ত্ব (১৯০৯), সাহিত্যের পথে (১৯৩৬), ছন্দ (১৯৩৬), বাংলা ভাষা পরিচয় (১৯৩৮) ও সাহিত্যের স্বরূপ (১৯৪৩) প্রভৃতি সমালোচনা, সাহিত্যতত্ত্ব ও সাহিত্য আলোচনা-বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন। আত্মশক্তি (১৯০৫), ভারতবর্ষ (১৯০৬), শিক্ষা (১৯০৮), রাজাপ্রজা (১৯০৮), সমাজ (১৯০৮), পরিচয় (১৯১৬), কালান্তর (১৯৩৭), সভ্যতার সংকট (১৯৪১) ইত্যাদি শিক্ষা, সমাজ ও রাজনীতি-বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন। ধর্ম (১৯০৯), শান্তিনিকেতন (১৯০৯-১৯১৬), মানুষের ধর্ম (১৯৩৩) প্রভৃতি ধর্ম, দর্শন ও অধ্যাত্মতত্ত্ব-বিষয়ক প্রবন্ধ ও ভাষণের সংকলন। য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র (১৮৮১), য়ুরোপযাত্রীর ডায়েরি (১৮৯১-১৮৯৩), জাপানযাত্রী (১৯১৯), যাত্রী (১৯২৯), রাশিয়ার চিঠি (১৯৩১), জাপানে-পারস্যে (১৯৩০), পথের সঞ্চয় (১৯৩৯) প্রভৃতি ভ্রমণসাহিত্য। ভানুসিংহের পত্রাবলী (১৯৩০), পথ ও পথের প্রান্তে (১৯৩৮), পত্রধারা (১৯৩৮), ছিন্নপত্র (১৯৬২), চিঠিপত্র (১৯ খণ্ডে প্রকাশিত) প্রভৃতি পত্রসাহিত্য। জীবনস্মৃতি (১৯১২) ও ছেলেবেলা (১৯৪০) আত্মকথামূলক এবং চারিত্রপূজা (১৯৭৩) জীবনী গ্রন্থ। পঞ্চভূত (১৮৯৭), বিচিত্র প্রবন্ধ (১৯০৭) ও লিপিকা (১৯২২) প্রভৃতি আবেগধর্মী প্রবন্ধের সংকলন।
সমালোচনা, সাহিত্যতত্ত্ব ও সাহিত্য আলোচনা-বিষয়ক প্রবন্ধ
[সম্পাদনা]সাহিত্য, সাহিত্যের পথে, সাহিত্যের স্বরূপ প্রভৃতি গ্রন্থে সাহিত্যতত্ত্ব ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিল্পতত্ত্ব সৌন্দর্যানুভূতি ও আনন্দ উপলব্ধির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন। সাহিত্যের বহিরঙ্গ রূপকে স্বীকার করেও তিনি সেটিকে ‘অকারণের আনন্দ’ বলেছেন। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, “তিনিই বোধ হয় শেষ সমালোচক, যিনি বস্তুজগতের সর্বগ্রাসী অভিভবের অব্যবহিত পূর্বে, আদর্শ কল্পনা ও আনন্দানুভূতি হইতে জাত কাব্যসৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠতা ঘোষণা করিয়াছেন।”
প্রাচীন সাহিত্য, আধুনিক সাহিত্য ও লোকসাহিত্য সমালোচনামূলক গ্রন্থ। এই প্রবন্ধগুলি কেবল অধীত সাহিত্যের বিশ্লেষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং অধীত সাহিত্যকে নতুন করে মূল্যায়ন করেছিল। কুমারসম্ভবম্, অভিজ্ঞানশাকুন্তলম্, কাদম্বরী প্রভৃতি প্রাচীন গ্রন্থ যে দেহকেন্দ্রিক সৌন্দর্যভোগের ঊর্ধ্বে সংযম ও তপস্যাপূত কল্যাণধর্মকেই মহত্তর করে দেখিয়েছে, প্রাচীন সাহিত্য সমালোচনায় রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন জীবনাদর্শের এই চেতনাটিকেই কাব্যশ্রীপূর্ণ করে দেখিয়েছেন। এই গ্রন্থের ‘কাব্যে উপেক্ষিতা’ প্রবন্ধে তিনি রামায়ণের উর্মিলা, কাদম্বরীর পত্রলেখা ও অভিজ্ঞানশাকুন্তলম্-এর অনসূয়া-প্রিয়ম্বদা চরিত্রের উপর নতুন করে আলোকপাত করে নিজের সহৃদয়তা ও মনস্তত্ত্ব-বিশ্লেষণের সূক্ষ্মতাই প্রমাণ করেছেন। লোকসাহিত্য আলোচনাতেও রবীন্দ্রনাথ লোকসাহিত্যের মর্মমুলে প্রবেশ করে প্রতিভার সোনার চাবি দিয়ে এমন একটি গুপ্ত ভাণ্ডারের দরজা খুলে দিয়েছেন, যার অনাদৃত ঐশ্বর্যের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ের সীমা থাকে না। এই বইটির ‘ছেলে ভুলানো ছড়া’ একটি অসাধারণ রচনা। আধুনিক সাহিত্য গ্রন্থে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিহারীলাল চক্রবর্তী প্রমুখ আধুনিক যুগের বিশিষ্ট সাহিত্যিকবর্গের যে মূল্যায়ন তিনি করেছেন, তা রবীন্দ্রনাথের গভীর অন্তর্দৃষ্টিরই পরিচায়ক।
রবীন্দ্রনাথ যে বাংলা কাব্যের ধ্বনি ও বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার সম্পর্কে কত গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন, ছন্দ ও শব্দতত্ত্ব গ্রন্থ দুটি তার প্রমাণ। তাঁর প্রতিভায় এই নীরস বিষয়ও এখানে সরস হয়ে উঠেছে।
শিক্ষা, সমাজ ও রাজনীতি-বিষয়ক প্রবন্ধ
[সম্পাদনা]শিক্ষা-বিষয়ক প্রবন্ধগুলিতে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির যান্ত্রিকতার উপর তীব্র শ্লেষ বর্ষণ করেছেন। প্রকৃতির সাহচর্যে মানবমনের সর্বতোমুখী বিকাশকেই তিনি শিক্ষার উদ্দেশ্য মনে করতেন। অবশ্য এই-জাতীয় প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ জাতির সাধারণ অসন্তোষকেই তাঁর কাব্যময় ভাষায় ও পূর্ণতাকামী কবি-মনের গূঢ় অতৃপ্তিবোধের সঙ্গে প্রকাশ করেছেন। সমস্যার রূপ যতটা দেখিয়েছেন, সমাধানের ইঙ্গিত সেই পরিমাণে দেননি। সমাজ-বিষয়ক প্রবন্ধগুলি ভারতীয় সমাজের মর্মবাণীর মার্জিত ও বিস্তৃত রূপায়ণ। তাঁর কবিমানসে বিশ্ববোধের যে উপলব্ধিই ছিল, রাজনীতি-বিষয়ক প্রবন্ধগুলিতে তা-ই আন্তর্জাতিকতাবোধে পরিণত হয়েছে। উগ্র জাতীয়তাবাদকে তিনি জাতি ও বিশ্বের অভিশাপ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং সাম্রাজ্যবাদের বর্বর লোভ ও হিংস্রতাকে তীব্র ধিক্কার জানিয়েছেন। অথচ এই প্রবন্ধগুলি প্রচারসাহিত্যে পর্যাবসিত হয়নি, বরং রসসাহিত্যই হয়েছে—এখানেই রবীন্দ্রনাথের কৃতিত্ব ও বৈশিষ্ট্য।
ধর্ম, দর্শন ও অধ্যাত্ম-বিষয়ক প্রবন্ধ
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রাহ্ম। তাঁর ধর্ম-বিষয়ক প্রবন্ধগুলিতে ঔপনিষদিক ধর্মের ব্যাখ্যা থাকলেও বৃহত্তর মানবধর্ম ও সত্যধর্মের মিশ্রণে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব ধর্মবোধ এক উদার মহিমায় ব্যক্ত হয়েছে। তাঁর দার্শনিকতা ও অধ্যাত্মবোধের মধ্যে উপনিষদের আনন্দবাদ, হিন্দু পুরাণের লীলাবাদ এবং বৈষ্ণব ও বাউলদের প্রেমতত্ত্ব আশ্চর্য সমন্বয় লাভ করেছে। চোদ্দ খণ্ডে সংকলিত শান্তিনিকেতন গ্রন্থে ব্রাহ্মসমাজের আচার্য রূপে তাঁর দেওয়া ভাষণগুলিতে তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারা ও আত্মোপলব্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। উপাস্যের স্পর্শলাভের জন্য লেখকের আবেগময় আকুতি, লৌকিক উৎসব অনুষ্ঠানের পিছনে লুকিয়ে থাকা মূল ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ও কাব্যসৌন্দর্যে পরিপূর্ণ প্রকাশভঙ্গি এগুলিকে একাধারে সাহিত্যরসিক ও ধর্মপিপাসু উভয়ের কাছেই হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছে।
ভ্রমণসাহিত্য
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণসাহিত্য বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি স্তরভেদ লক্ষ্য করা যায়। য়ুরোপযাত্রীর ডায়েরি গ্রন্থে আছে তথ্যপ্রাধান্য। পরবর্তী ভ্রমণকথাগুলিতে বর্ণনীয় বিষয়ের সঙ্গে ভ্রমণরত দেশের জাতীয় চরিত্রের বৈশিষ্ট্য উদ্ঘাটনের প্রয়াসও দেখা যায়। এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার চিঠি বইটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই বইতে বিপ্লব-পরবর্তী সোভিয়েত রাশিয়ার গঠনমূলক কর্মকাণ্ড এবং সর্বপ্রকার অসাম্য দূর করার নির্ভীক প্রয়াসের কথাই সপ্রশংস বিস্ময়ে উল্লিখিত হয়েছে। এখানে তাঁর কবিসুলভ অন্তর্দৃষ্টির পরিবর্তে পাওয়া যায় পক্ষপাতহীন সংস্কারমুক্ত ন্যায়বোধ।
পত্রসাহিত্য
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথের পত্রসাহিত্য সুবিশাল, কিন্তু তাতে ব্যক্তিজীবনের লৌকিক দিকটি বহুলাংশে অনুপস্থিত। যে ঘরোয়া পরিবেশনের অন্তরঙ্গতার সহজ সুর পত্রসাহিত্যের আদর্শ, তার চেয়ে কাব্যচেতনাই এগুলিতে প্রবলতর। সেখানে কোথাও কাব্যের সৌন্দর্য, কোথাও বা নানারকম তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। কয়েকটি চিঠির নির্বাচিত অংশ গ্রন্থন করে ছিন্নপত্র নামে যে সংকলনটি প্রকাশিত হয়, তাতেও রোম্যান্টিক কবিমনই আত্মপ্রকাশ করেছে। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “দুইটি ছোট মেয়েকে লেখা ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’ এবং ছাপার উদ্দেশ্যে লেখা নয় এমন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের নিকট লেখা পত্রসমূহই তাঁহার ঘরোয়া রূপটি আরও স্পষ্টভাবে ফুটাইয়া তোলে।… তাঁহার ব্যক্তিজীবন কাব্যজীবনের দিব্যজ্যোতিতে এতটাই আচ্ছন্ন হইয়াছিল যে, ঘরোয়া কথা অপেক্ষা কাব্যরহস্যমূলক অসীমতত্ত্বজিজ্ঞাসাই তাঁহার জীবনের সত্যকার পরিচয় বহন করে।”
আত্মকথা ও জীবনী
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণামূলক জীবনস্মৃতি ও ছেলেবেলা গ্রন্থ দুটিতে বাইরের ঘটনার স্থান ততটুকুই হয়েছে যতটুকু কবির প্রথম কাব্যজীবন ও অন্তর্লোকের রহস্য বোঝার পক্ষে অনুকূল। এগুলিকে ঠিক যথাযথ আত্মজীবনী বলা চলে না। তাঁর লেখা জীবনীগ্রন্থ চরিত্রপূজা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই গ্রন্থের ‘বিদ্যাসাগরচরিত্র’ অংশে লেখকের অন্তর্দৃষ্টি বিদ্যাসাগরের চরিত্রের উপর নতুন করে আলোকপাত করেছে।
আবেগধর্মী প্রবন্ধ
[সম্পাদনা]পঞ্চভূত গ্রন্থে পাঁচটি ‘ভূত’-এর (হিন্দুদর্শের পাঁচটি মৌলিক উপাদান: অগ্নি, বায়ু, আকাশ, পৃথিবী ও জল) উপর ব্যক্তিত্ব আরোপ করে এবং সেগুলির সঙ্গে কাল্পনিক বিতর্কসভায় যোগ দিয়ে সকৌতুকে কবি নানা বিষয়ে তাঁর নিজের অনুভূতিকে যেভাবে প্রকাশ করেছেন, তাতে সাহিত্যরস পরম আস্বাদ্য হয়ে উঠেছে। বিচিত্র প্রবন্ধ গ্রন্থের ‘নববর্ষা’, ‘কেকাধ্বনি’, ‘শ্রাবণসন্ধ্যা’, ‘পাগল প্রভৃতি প্রবন্ধ কবিমানসের রাগে রঞ্জিত। এগুলিতে যুক্তিবাদ ও তথ্য আলোচনার বদলে কবির একটি বিশেষ ভাবানুভূতি, ধ্যানদৃষ্টির একটি অতর্কিত উৎক্ষেপ এবং স্বপ্নাতুর কল্পনার এক বর্ণাঢ্য চিত্রকল্প অপরূপ কাব্যসৌন্দর্যে মণ্ডিত হয়ে অভিব্যক্ত হয়েছে। এগুলিতে বিষয় গৌণ, বলার ভঙ্গিটিই মুখ্য। এক কথায়, গদ্য তার স্বভাবধর্মকে কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ না করে কাব্যিক অনুরঞ্জনে সামান্যকে যে অসামান্য করে তুলতে পারে, এই প্রবন্ধগুলিতে তার সাক্ষর কালজয়ী হয়ে রয়েছে। চেনা জগৎকে অচেনার রহস্যে মণ্ডিত করে লিপিকা-র প্রবন্ধগুলির রচিত। এই গ্রন্থের গদ্যভঙ্গি উচ্ছ্বসিত কল্পনালীলায় কবিতার সীমান্তকে স্পর্শ করেছে। রবীন্দ্রনাথের গদ্যকবিতার প্রথম সূচনা ঘটে এই গ্রন্থেই।
মূল্যায়ন
[সম্পাদনা]প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথের পরিচয় কবি রবীন্দ্রনাথের পরিচয়ের থেকে কোনও অংশে কম নয়। কবিতার মতো গদ্যেও তিনি ছিলেন আনন্দবাদী ও আশাবাদী। জীবনপ্রান্তে উপনীত হয়ে আশি বছর বয়সেও সভ্যতার সংকট অভিভাষণে তিনি বলেছেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে আর এক দিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম ক্রমে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে। মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ বলে মনে করি।” অপরাজেয় মানুষের কথাই রবীন্দ্রনাথের সকল রচনায় বারবার প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তাই রবীন্দ্রনাথ মানবতার মহত্তম শিল্পী।