আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১—১৯৪১) বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকবি। একজন গীতিকবির শিল্পীমানসে থাকে subjectivity বা মন্ময়তার প্রাধান্য। কিন্তু নাটকে সাধারণত প্রাধান্য objectivity বা বস্তুনিষ্ঠার, কাব্যসুলভ আবেগানুভূতির স্থান সেখানে নেই। কিন্তু গীতিকবি বলেই রবীন্দ্রনাথ যে নাটকগুলি রচনা করেছেন, তার মধ্যে কাব্যধর্মই হয়ে উঠেছে প্রধান। গীতিকবিতা ভাবের লীলাসংগীত, রবীন্দ্রনাটকও তা-ই। রবীন্দ্রনাথের নাট্যসাহিত্যে তাই দৃশ্যত্বলক্ষণের তুলনায় কাব্যলক্ষণই অনেক বেশি পরিমাণে ফুটে উঠেছে। বলা যায়, তাঁর নাটকগুলি কবিমনেরই সংগীতময় প্রকাশ। এইজন্য রবীন্দ্রনাথের নাটকে, এমনকি প্রচলিত নাট্যরীতি অনুসরণ করে রচিত নাটকগুলিতেও, ঘটনা বা চরিত্রের দ্বন্দ্ব-সংঘাত খুব বেশি চোখে পড়ে না, বরং ধরা পড়ে কোনও বিশেষ তত্ত্ব বা idea-র প্রকাশ। এটিই রবীন্দ্রনাটকের বৈশিষ্ট্য। ড. এডওয়ার্ড জন টমসন তাঁর রবীন্দ্রনাথ টেগোর: পোয়েট অ্যান্ড ড্রামাটিস্ট গ্রন্থে রবীন্দ্রনাটক সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, “His dramatic work is the vehicle of ideas rather than the expression of action.” শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, “তাঁর মন্ময়তা এত প্রবল যে, তিনি নাটক লিখিতে গিয়াও আত্মকেন্দ্রিকতার কক্ষাবর্তন হইতে বিরত থাকিতে পারেন নাই—তাঁহার নরনারী এক-একটি মূর্ত ভাববিগ্রহ, কবির বিদেহী চেতনার এক-একটি অর্ধ-পরিস্ফুট মানবিক প্রতীকে পর্যবসিত।” রবীন্দ্রনাথ নিজেও এই বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তাই ফাল্গুনী নাটকে তিনি কবিকে দিয়ে বলিয়েছেন, “চিত্রপটে প্রয়োজন নেই—আমার দরকার চিত্তপট—সেখানে শুধু সুরের তুলি বুলিয়ে ছবি জাগাব।” কিংবা অন্যত্র লিখেছেন, “এই সকল নাটক বাঁশির মতো, বোঝবার জন্যে নয়, বাজবার জন্যে।” এই প্রবণতার দ্বারা চালিত হয়েই তিনি নাটকের প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে অস্বীকার করে নিজের শিল্পীমানসের অনুকূল নাট্যনির্মাণে ব্রতী হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাটকের বিপক্ষে বলা হয়, সাহিত্যের প্রতিটি ধারার নিজস্ব ধর্ম আছে, চরিত্র আছে, রূপরীতি আছে—যে চরিত্র-বৈশিষ্ট্য থেকে নাটককে কবিতা থেকে অথবা ছোটোগল্পকে উপন্যাস থেকে পৃথক করা যায়। কবিতা বা নাটকের রূপ যুগে যুগে পরিবর্তিত হলেও তার সাধারণ রূপকল্প বা চরিত্রলক্ষণের কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। রবীন্দ্রনাথ সেই চরিত্রকেই অস্বীকার করেছেন বলে রবীন্দ্রনাটককে ‘নাটক’ বলে স্বীকার না করার যুক্তিসংগত কারণ আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাটকের সপক্ষে বলা যায়, নিজস্ব শিল্পীমানসের প্রবণতা অনুযায়ী তিনি যে-সব মঞ্চ-নিরপেক্ষ দুঃসাহসিক নাট্যনির্মাণে ব্রতী হয়েছিলেন, তা সর্বাংশে সফল না হলেও তাঁর রূপক নাটকগুলি সার্থক রচনা হয়ে উঠেছে। এর কারণ আধুনিক যুগের সৃষ্টি রূপক নাট্যকলায় যে ইঙ্গিতময়তা বা সাংকেতিকতা থাকে তা ফুটিয়ে তুলতে কাব্যই সহায়ক। এইরকম নাটকে রক্তমাংসের মানুষ নয়, তাদের আকারে ভাববিগ্রহই সৃষ্টি করা হয়। দৃশ্য ও চত্রিত্রের সংলাপধর্মিতা রূপক নাটককে নাটকের গোত্রভুক্ত করে, তবে নাটক হিসেবে এগুলি বিলক্ষণ নাট্যসাহিত্যে স্বতন্ত্র একটি শাখা। বেলজীয় নাট্যকার মোরিস মাতরলাঁক, আইরিশ নাট্যকার উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস, সুইডিশ নাট্যকার অগুস্ত স্ত্রিন্দবারি বা মার্কিন নাট্যকার ইউজিন ও’নিলের রূপক নাটক যদি স্বীকৃত হতে পারে, তবে রবীন্দ্রনাথের রূপক নাটকগুলিরও স্বীকৃতির পথে কোনও বাধা নেই। সেই সঙ্গে এ-কথাও মেনে নেওয়া ভালো যে, রবীন্দ্রনাথের নাটক রবীন্দ্রনাটকই, সেগুলির বৈশিষ্ট্য-স্বাতন্ত্র্যের জন্য অন্য কোনও নাট্যকারের রচনার সঙ্গে তার তুলনা করা চলে না।
রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য: বাল্মীকিপ্রতিভা, কালমৃগয়া ও মায়ার খেলা
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথ গীতিকবি। তাঁর রচিত প্রথম কয়েকটি নাটকেও গানেরই প্রাধান্য দেখা যায়। এই নাটকগুলি হল বাল্মীকিপ্রতিভা (১৮৮১), কালমৃগয়া (১৮৮২) ও মায়ার খেলা (১৮৮৮)। দস্যু রত্নাকর কীভাবে দেবী সরস্বতীর বর লাভ করে আদিকবি বাল্মীকিতে পরিণত হলেন বাল্মীকিপ্রতিভা-য় তা-ই বর্ণিত হয়েছে। কবির মতে, “ইহা সুরে নাটিকা; অর্থাৎ সঙ্গীতই ইহার মধ্যে প্রাধান্য লাভ করে নাই, ইহার নাট্যবিষয়টা সুর করিয়া অভিনয় করা হয় মাত্র।” দশরথ কর্তৃক অন্ধমুনির পুত্রবধ কালমৃগয়া নাটকের বিষয়। এটিও “সুরে নাটিকা”। কবি নিজেই বলেছেন, “বাল্মীকি-প্রতিভা ও কাল-মৃগয়া... গানের সূত্রে নাট্যের মালা। ঐ দুটি গ্রন্থে... একটা সঙ্গীতের উত্তেজনা প্রকাশ পাইয়াছে।” অর্থাৎ এই দুই নাটকে ঘটনা যা সামান্য কিছু আছে তাও গীতিপ্রবাহকে অবলম্বন করে রূপ পেয়েছে। মায়ার খেলা সম্পর্কে কবি লিখেছেন, “...মায়ার খেলা নাট্যের সূত্রে গানের মালা। ঘটনাস্রোতের 'পরে তাহা নির্ভর নহে, হৃদয়াবেগই তাহার প্রধান উপকরণ।” এই নাটকের বক্তব্য, “সুখকামী প্রেমের পশ্চাতে যে-বাসনা আছে, তাহাই প্রেমকে নিরন্তর ব্যর্থতার মরীচিকায় ছুটাইয়া মারে। দুঃখের তপস্যার মধ্য দিয়া বাসনাময় প্রেমকে যদি পরিশুদ্ধ করিয়া লওয়া যায়, তবেই মায়ার বন্ধন কাটাইয়া উঠিয়া প্রেমের মুক্ত স্বরূপ উপলব্ধি করা সম্ভব হয়।” নাটক তিনটি সম্পর্কে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, “গানের জালে প্রেমের ফাঁদ পাতিয়া নাটক-হরিণকে ধরার ব্যর্থ চেষ্টা এখানে দেখি।”
রবীন্দ্রনাথের কাব্যনাট্য
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথের কাব্যনাট্য বা নাট্যকাব্যগুলি সংলাপ-কাব্যধর্মী রচনা। এগুলির মধ্যে চরিত্রদ্বন্দ্বের অভাব, যা আছে তা শুধুই ভাবের দ্বন্দ্ব। এছাড়া কোথাও কোথাও এগুলিতে বিশেষ কোনও তত্ত্বও আভাসিত হয়েছে। তাঁর এই শ্রেণির নাটকগুলি হল প্রকৃতির প্রতিশোধ (১৮৮৪), চিত্রাঙ্গদা (১৮৯২), বিদায় অভিশাপ (১৮৯৩) এবং কাহিনী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘গান্ধারীর আবেদন’ (১৮৯৭), ‘সতী’ (১৮৯৭), ‘নরকবাস’ (১৮৯৭), ‘লক্ষ্মীর পরীক্ষা’ (১৮৯৭) ও ‘কর্ণকুন্তীসংবাদ’ (১৯০০)।
প্রকৃতির প্রতিশোধ
[সম্পাদনা]প্রকৃতির প্রতিশোধ কাব্যনাট্যেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের জীবনদৃষ্টির প্রকৃত পরিচয়টি ধরা পড়েছে এবং কবির উত্তরজীবনে এই উপলব্ধিই তাঁর কাব্যে ও নাটকে নানা রূপে ও নানা ভঙ্গিতে বারবার প্রকাশিত হয়েছে। প্রকৃতির প্রতিশোধ সম্পর্কে কবির উক্তিই নাটকটিকে বুঝে নিতে সাহায্য করে, “নাট্যকাব্যের নায়ক সন্ন্যাসী সমস্ত স্নেহবন্ধন ছিন্ন করিয়া প্রকৃতির উপরে জয়ী হইয়া একান্ত বিশুদ্ধভাবে অনন্তকে উপলব্ধি করিতে চাহিয়াছিল। অনন্ত যেন সবকিছুর বাহিরে। অবশেষে একটি বালিয়া তাহাকে স্নেহপাশে বদ্ধ করিয়া অনন্তের ধ্যান হইতে সংসারের মধ্যে ফিরাইয়া আনে। যখন ফিরিয়া আসিল, তখন সন্ন্যাসী ইহাই দেখিল—ক্ষুদ্রকে লইয়াই বৃহৎ; সীমাকে লইয়াই অসীম, প্রেমকে লইয়াই মুক্তি। প্রেমের আলো যখন পাই তখনি যেখানে চোখ মেলি সেখানেই দেখি সীমার মধ্যেও সীমা নাই।”
চিত্রাঙ্গদা
[সম্পাদনা]চিত্রাঙ্গদা কাব্যনাট্যের আখ্যানবস্তু মহাভারত থেকে গৃহীত হলেও কবি সেই কাহিনির উপর নতুন কল্পনার আলোকপাত করেছেন। কুরূপা চিত্রাঙ্গদা মদনদেবের বরে এক বছরের জন্য অসামান্য রূপলাবণ্য লাভ করে তা দিয়ে অর্জুনকে আকৃষ্ট করেছিলেন; কিন্তু পরে সেই ঋণকৃত রূপের জন্য তাঁর মনে অতৃপ্তি ও ধিক্কার জন্মালো। অর্জুনের মধ্যেও ক্রমে দেখা দিল অলস ভোগের অবসন্নতা। এক বছর পরে চিত্রাঙ্গদার যথার্থ স্বরূপের ভিতর দিয়েই অর্জুন নর্মসহচরীর মধ্যে মর্মসহচরীকে লাভ করে ধন্য হলেন। এই কাহিনির মধ্যে দিয়ে যে তত্ত্বটি ফুটে উঠেছে তা এই, “সম্ভোগের আনন্দই দাম্পত্যজীবনের সবখানি নহে। কেবলমাত্র দেহমাত্রে পর্যবসিত যে-মিলন তাহা অল্পদিনের অতৃপ্তি ও অবসাদ আনয়ন করে, তখন চিত্ত চায় অন্তরের এবং আত্মার পরিচয় পাইয়া প্রেমাস্পদকে সম্পূর্ণভাবে জানিতে। মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় তাহার দেহ মন চিত্ত অন্তর ও আত্মা লইয়া।” চিত্রাঙ্গদা নাট্যকাব্য হলেও তা গীতিকাব্যের লক্ষণাক্রান্ত। পাত্রপাত্রীর নাটকীয় সংলাপের আড়ালে যে ভাবতত্ত্ব আছে, তা-ই কাব্যসৌন্দর্যের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এখানে।
বিদায় অভিশাপ
[সম্পাদনা]দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র কচ ও দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানীর প্রণয় ও বিদায় গ্রহণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদায় অভিশাপ রচিত। এর মধ্যে তপোবনের বর্ণনা ও দেবযানীর প্রেম-নিবেদনের আশ্চর্য সুন্দর কাব্যশ্রী লাভ করেছে। প্রেম ও কর্তব্যের দ্বন্দ্বে কর্তব্যই এখানে মহত্তর বলে বর্ণিত হয়েছে। কবি বিদায় অভিশাপ-এ পুরুষের কঠোর কর্তব্যনিষ্ঠ জীবনের আদর্শকে মহত্তর করে সৃষ্টি করেছেন।
কাহিনী গ্রন্থের কাব্যনাট্যসমূহ
[সম্পাদনা]‘গান্ধারীর আবেদন’ কাব্যনাট্যে উগ্র স্বার্থপরতার সঙ্গে নিত্য মানবধর্মের সংঘাতের মধ্যে দিয়ে মানবধর্মকে জয়ী করা হয়েছে। এই নাট্যকাব্যে ভাবই প্রধান। এর একমুখী চরিত্রগুলিতে (গান্ধারী, দুর্যোধন ও ভানুমতী) নাটকীয় দ্বন্দ্ব অনুপস্থিত। কেবল ধৃতরাষ্ট্র চরিত্রে কিছু দ্বন্দ্ব আছে। একদিকে ধর্ম, অন্যদিকে পুত্রস্নেহ—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে চরিত্রটিতে নাটকীয় সংঘাততরঙ্গ সৃষ্টি হয়েছে। ‘সতী’, ‘নরকবাস’ ও ‘লক্ষ্মীর পরীক্ষা’ অনুল্লেখ্য রচনা। ‘কর্ণকুন্তীসংবাদ’ কাব্যনাট্যে কর্ণ চরিত্র এক অপরূপ নাটকীয় দ্বন্দ্বে ভাস্বর হয়ে উঠেছে। মাতৃস্নেহ ও কর্তব্যের দোটানার মধ্যে পড়ে কর্ণ শেষপর্যন্ত কর্তব্যকেই বরণ করে বীরের সদ্গতি প্রার্থনা করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের প্রথানুগ নাটক
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথের প্রথানুগ নাটকগুলি উক্ত নাট্যশৈলীর নিয়ম অনুসারেই বিচার্য। এই নাটকগুলি হল রাজা ও রানী (১৮৮৯), বিসর্জন (১৮৯০), মালিনী (১৮৯৬), প্রায়শ্চিত্ত (১৯০৯), গৃহপ্রবেশ (১৯২৫), শোধবোধ (১৯২৬) ও তপতী (১৯২৯)।
রাজা ও রানী ও তপতী
[সম্পাদনা]রাজা ও রানী রবীন্দ্রনাথের প্রথম পঞ্চাঙ্ক নাটক। শেকসপিয়রীয় ট্র্যাজেডির আদর্শে রচিত হলেও নাটকীয় দ্বন্দ্বের অভাব ও অতিনাটকীয়তার জন্য এটি পর্যবসিত হয়েছে মেলোড্রামাতে। জলন্ধরের রাজা বিক্রমদেব ও তাঁর রানি সুমিত্রার দাম্পত্যপ্রেম এই নাটকের আখ্যানবস্তুর মূল উপজীব্য। রাজকর্তব্যবিমুখ বিক্রমদেবের উদগ্র কামনার ক্ষুধা থেকে নিজেকে ও রাজ্যকে রক্ষা করতে সুমিত্রার পিত্রালয়ে গমন, রাজার উদাসীনতার সুযোগে বিদেশি রাজকর্মচারীদের সামন্ততান্ত্রিক শোষণ, প্রতিহতকাম বিক্রমদেবের ক্ষিপ্ত জিঘাংসা এবং পরিণতিতে নানা সংঘাতের ভিতর দিয়ে সুমিত্রার আত্মবলিদান এই নাটকের মূল বিষয়বস্তু। এর সঙ্গে পার্শ্বকাহিনি রূপে যুক্ত হয়েছে কুমারসেন ও ইলার প্রেমকাহিনি। কিন্তু এই পার্শ্বকাহিনিটি নাটকের শেষাংশে অসংগত প্রাধান্য লাভ করায় নাটকের মূল বিষয় ভারগ্রস্থ ও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিক্রমদেব ও সুমিত্রার চরিত্রে কিছুটা দ্বন্দ্ব সৃষ্টির প্রয়াস থাকলেও দুটি চরিত্রই দুটি ভাবের প্রতীক হয়ে উঠেছে: বিক্রমদেব অন্ধ আবেগের এবং সুমিত্রা নিঃস্বার্থ ত্যাগের। এই নাটক সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ নিজেই একবার বলেছিলেন, “ওটা আবার নাটক নাকি! একটা মেলো-ড্রামা, কাটা-মুণ্ডু নিয়ে বাড়াবাড়ি কাণ্ড!” এই ত্রুটি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন বলেই পরবর্তীকালে তিনি এটিকে মার্জিত করে তপতী নাটকে রূপান্তরিত করেন। কুমারসেনের মৃত্যু নাট্যকাহিনির অনিবার্য পরিণাম নয় বলেই তপতী থেকে বাদ যায় কুমারসেন ও ইলার আখ্যানভাগ। রাজা ও রানী-র ছন্দময় ভাষাও গদ্যে রূপান্তরিত হয় তপতী-তে। তবু সম্পূর্ণ ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেননি নাট্যকার। বরং তপতী কিছুটা রূপক-লক্ষণাক্রান্ত হয়ে তাত্ত্বিক নাটক হয়ে ওঠে।
বিসর্জন
[সম্পাদনা]আঙ্গিকের দিক থেকে বিসর্জন নাটকটিও একটি পঞ্চাঙ্ক নাটক। এটি রবীন্দ্রনাথের রাজর্ষি (১৮৮৫) উপন্যাসের কিছু অংশের নাট্যরূপ। এই নাটকের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে কবি নিজেই লিখেছেন, “এই নাটকে বরাবর দুটি ভাবের মধ্যে বিরোধ বেধেছে—প্রেম ও প্রতাপ। রঘুপতির প্রভুত্বের ইচ্ছার সঙ্গে গোবিন্দমাণিক্যের প্রেমের শক্তির দ্বন্দ্ব বেধেছিল।.. নাটকের শেষে রঘুপতিকে হার মানতে হয়েছিল—তার চৈতন্য হলো, বোঝবার বাধা দূর হলো, প্রেম জয়যুক্ত হলো।” নাট্যকাহিনির বিচারে ‘প্রতাপ’ কথাটির সঙ্গে যুক্ত করে নেওয়া যেতে পারে ‘প্রথা’ শব্দটিকেও। এই নাটকে রঘুপতি প্রথা ও প্রতাপের প্রতীক, অন্যদিকে অপর্ণা প্রেমের মূর্ত বিগ্রহ। বিসর্জন নামটিও খুবই ইঙ্গিতপূর্ণ। এর বহিরঙ্গে প্রতিমা-বিসর্জন, অন্তরঙ্গে জয়সিংহের মহত্তর প্রাণবিসর্জন। রাজা ও রানী নাটকের অন্যতম প্রধান ত্রুটি সেটির অতিকাব্যিকতা। বিসর্জন নাটকেও “লিরিকের বড় বাড়াবাড়ি” থাকলেও তা কখনও অতিকথন হয়ে নাটকের গতিকে রুদ্ধ করেনি। এই নাটকের ঘটনাবিন্যাসের মধ্যেই সর্বপ্রথম রবীন্দ্রনাটকে সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব এক সংহতি লক্ষ্য করা যায়। ভাবকল্পনা বা চরিত্রের আবেগ সৃষ্টির দিক থেকেও এটি রাজা ও রানী-র তুলনায় উন্নততর একটি রচনা।
মালিনী
[সম্পাদনা]মালিনী নাটকে ধর্মীয় প্রথা বা সংস্কারের সঙ্গে হৃদয়ধর্ম বা মানবধর্মের দ্বন্দ্ব দেখানো হয়েছে। রাজকন্যা মালিনীর ধর্ম শাস্ত্রবর্ণিত কোনও শুষ্ক আচার মাত্র নয়, আপন অন্তরের করুণাই তাকে নবধর্ম প্রবর্তিকা দেবী রূপে মানবলোকের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। মালিনীর এই নবধর্মের শত্রু বিপ্র ক্ষেমংকর; কিন্তু ক্ষেমংকরের বাল্যবন্ধু সুপ্রিয় মালিনীর ধর্মমতে বিশ্বাসী। অবশেষে সুপ্রিয়ের করুণ মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে মালিনীর করুণাধর্মের চরম পরীক্ষা ও তার জয় হয়েছে। ভাবের দিক থেকে এই নাটকটি বিসর্জন নাটকের সমধর্মী, কিন্তু বেদনার মধ্যে দিয়ে সত্য উপলব্ধির যে চিত্র এতে তুলে ধরা হয়েছে তা রবীন্দ্রনাথের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অন্যান্য নাটকের অনুরূপ। মালিনী নাটকের কাহিনি ও গঠনে গ্রিক নাটকের সংহতি দেখা যায়।
প্রায়শ্চিত্ত ও পরিত্রাণ
[সম্পাদনা]প্রায়শ্চিত্ত রবীন্দ্রনাথেরই বৌ ঠাকুরানীর হাট (১৮৮৩) উপন্যাসের নাট্যরূপ। এতেও কোনও চরিত্রের দ্বন্দ্বকে অবলম্বন করে নাটকের ঘটনাস্রোত প্রবাহিত হয়নি, বরং এক মহৎ আদর্শের জন্য দুঃখভোগের প্রায়শ্চিত্তই এই নাটকের প্রতিপাদ্য বিষয়। রাজা শক্তিমদে মত্ত হয়ে পাপ করে, আর একজন দুঃখভোগ করে তার প্রায়শ্চিত্ত করে। উদয়াদিত্য ও ধনঞ্জয় দরিদ্র নির্যাতিত প্রজাদের হয়ে সেই দুঃখভোগ করেছেন; আবার অন্যদিকে বিভাও স্বামীর নীচতার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন জীবনের শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থলকে ত্যাগ করে এবং সকল প্রকার সুখকে জলাঞ্জলি দিয়ে। কিন্তু চরিত্রসৃষ্টির অভাব এবং তত্ত্বের প্রাধান্য এর নাট্যরস অনেকটাই ক্ষুণ্ণ করেছে। এই নাটকটিই পরবর্তীকালে পরিত্রাণ নামে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু পরিত্রাণ-এ তত্ত্বই প্রধান হয়ে ওঠায় এর নাটকীয় গতি আরও রুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক নাটক: গৃহপ্রবেশ ও শোধবোধ
[সম্পাদনা]গৃহপ্রবেশ ও শোধবোধ রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক নাটক। রবীন্দ্রনাথের "শেষের রাত্রি" গল্পের নাট্যরূপ গৃহপ্রবেশ। ভাবপ্রবণ ও কল্পনাবিলাসী যতীন তার যথাসর্বস্বের বিনিময়ে গৃহ নির্মাণ করেছিল। কিন্তু গৃহপ্রবেশের আগেই সে যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়। স্বামীর অসুখ সত্ত্বেও স্ত্রী মণি চলে যায় তার বাপের বাড়িতে। যতীনের মাসি ও বোন হিমি এই খবর সযত্নে গোপন রাখে। কিন্তু যেদিন সে এই খবর পায়, সেইদিনই মণি এসে তার পায়ের উপর উপুর হয়ে পড়ে। কিন্তু যে স্ত্রীর মন সে এতদিন পায়নি, সেই স্ত্রীর এই আত্মসমর্পণের কথা যতীন আর জানতে পারে না। কারণ তখন সে জীবনাতীত লোকের যাত্রী। এই নাটকেও আন্তর-গৃহপ্রবেশকে বাইরের গৃহপ্রবেশের সাংকেতিকতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। নাটকটি পেশাদারি মঞ্চে অভিনীত হলেও জনপ্রিয় হয়নি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের "কর্মফল" গল্পের নাট্যরূপ শোধবোধ নিতান্তই গতানুগতিক প্রথায় লেখা বলে পেশাদারি মঞ্চে সেটির অভিনয় সাফল্যমণ্ডিত হয়েছিল। রঙ্গনাট্য চিরকুমার সভা ও শেষরক্ষা বাদে এই একটি মাত্র নাটকেই রবীন্দ্রনাথের স্বভাবসুলভ কাব্যধর্মিতা বা সাংকেতিকতা নেই।
রবীন্দ্রনাথের প্রহসন বা কৌতুকনাট্য
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথের প্রহসন বা কৌতুকনাট্যগুলির মধ্যে গোড়ায় গলদ (১৮৯২) ও সেটির পরবর্তী অভিনয়যোগ্য সংস্করণ শেষরক্ষা (১৯২৮), বৈকুণ্ঠের খাতা (১৮৯৭), হাস্যকৌতুক ও ব্যঙ্গকৌতুক (উভয়ই ১৯০৭) ও প্রজাপতির নির্বন্ধ উপন্যাসের নাট্যরূপ চিরকুমার সভা (১৯২৬) উল্লেখযোগ্য। এই নাটকগুলির বৈশিষ্ট্য অদ্ভুত বাক্চাতুর্য, নানা ভ্রান্তি, কৌতুকাবহ ঘটনা ও খেয়ালি চরিত্রের সমাবেশে সৃষ্ট নির্মল হাস্যরস। ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, “রবীন্দ্রনাথের রঙ্গনাট্যগুলিতে একটা ভদ্র মার্জিত রুচির উজ্জ্বল ও তীক্ষ্ণ হাস্যকৌতুক প্রাধান্য পাইল। অবশ্য শ্রেষ্ঠ হাস্যরসাত্মক নাটকের গৌরব নির্ভর করে ঘটনা ও চরিত্রের উপর। বিশেষত ঘটনাসংস্থানের সকৌতুক বয়নকৌশল এই-জাতীয় নাটকের প্রাণস্বরূপ।… [কিন্তু] তিনি ঘটনা ও চরিত্রের বক্রতা বাদ দিয়া সংলাপের কৌতুকজনক পরিস্থিতিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়াছেন; কাজেই তাঁহার রঙ্গনাট্যে কথা বা 'উইট'-এর মারপ্যাঁচ অধিক। হাস্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি, কৌতুকজনক কাহিনি নির্বাচন বা ব্যক্তিবৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল চরিত্রসৃষ্টিতে তিনি ততদূর সফলকাম হন নাই!”
গোড়ায় গলদ ও শেষরক্ষা
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথের রঙ্গনাট্যগুলির মধ্যে গোড়ায় গলদ বা শেষরক্ষা নাটকটিই সম্ভবত শ্রেষ্ঠ। গদাই নামে এক কল্পনাপ্রবণ যুবক ছদ্মবেশিনী ইন্দুমতীকে জনৈকা কাদম্বিনী মনে করে যৌবনের প্রমত্ততার বশে সেই কাল্পনিক নারীর সন্ধানে পথে পথে হা-হুতাশ করে বেড়ায়। পরে নানা হাস্যকর অবস্থার ভিতর দিয়ে তার সেই ভ্রান্তি দূর হয় এবং ইন্দুমতীকেই সে বিয়ে করে। পেশাদারি মঞ্চে নাটকটির অভিনয় বিশেষ সাফল্যমণ্ডিত হয়েছিল।
বৈকুণ্ঠের খাতা
[সম্পাদনা]বৈকুণ্ঠের খাতা নাটকের কাহিনি-সংক্ষেপ এই: বৈকুণ্ঠ ও অবিনাশ দুই ভাই। বৈকুণ্ঠের সাহিত্যরচনার বাতিক। তাঁর খাতাতে নিবদ্ধ তাঁর সাহিত্যিক মনের প্রকাশ। অবিনাশের বিয়ে দেওয়ার পর অবিনাশের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাঁর বাড়িতে এসে বাস করতে আরম্ভ করে এবং তাঁর উপর দৌরাত্ম্য শুরু করে। বৈকুণ্ঠ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চান। তখন অবিনাশ তাদের তাড়িয়ে দেয়। শেষপর্যন্ত বৈকুণ্ঠ থেকে যান। নাটকটিতে এক সরল ও উদারহৃদয় বৃদ্ধের সাহিত্যিক দুরাকাঙ্ক্ষা, যাকেই তিনি পান তাকেই খাতা পড়ে শোনানোর অদ্ভুত খেয়াল নানা কৌতুককর অবস্থার সঙ্গে মাঝে মাঝে করুণ পরিস্থিতিও সৃষ্টি করে। প্রভুভক্ত দুর্মুখ ভৃত্য ঈশান ও অন্তরালবাসিনী বিধবা কন্যা নীরু এই নাটকের হাস্যরসের মধ্যে একটা অপ্রত্যাশিত গম্ভীর সুরও নিয়ে এসেছে। এই নাটকের অন্যতম পার্শ্বচরিত্র বিপিনের ভূমিকাটিও বেশ উপভোগ্য।
হাস্যকৌতুক ও ব্যঙ্গকৌতুক
[সম্পাদনা]হাস্যকৌতুক ও ব্যঙ্গকৌতুক পূর্ণাঙ্গ নাটক নয়, এই দুটি গ্রন্থে ছোটো ছোটো কয়েকটি নাট্যদৃশ্যের সমাবেশ আছে; অবশ্য প্রত্যেকটিই এককভাবে সম্পূর্ণ।
চিরকুমার সভা
[সম্পাদনা]চিরকুমার সভা নাটকে চিরকৌমার্য ব্রতের অন্তঃসারশূন্যতার প্রতি ব্যঙ্গ করা হয়েছে। এর সংক্ষিপ্ত কাহিনিটি এইরকম: পূর্ণ, শ্রীশ ও বিপিন চিরকুমার সভার সদস্য। তাঁরা বিয়ে করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন। চিরকুমার বৃদ্ধ চন্দ্রবাবু এই সভার সভাপতি। সভার ভূতপূর্ব সদস্য অক্ষয়ের দুই শ্যালিকা নীরবালা ও নৃপবালা। চন্দ্রবাবুর ভাগ্নি নির্মলা। কিছুকাল পরে সভার তিন সদস্য পঞ্চশরে বিদ্ধ হয়ে এই তিন কুমারীর পাণিগ্রহণ না করে পারলেন না। চিরকুমার সভা থেকে চিরকুমার ব্রত উঠে গেল।
রবীন্দ্রনাথের রূপক-সাংকেতিক নাটক
[সম্পাদনা]বিজাতীয় দুই বস্তুর মধ্যে অভেদত্ব কল্পনার মাধ্যমেই রূপক নাটকের সৃষ্টি। এই শ্রেণির নাটকে বিষয়ের প্রাধান্য নেই, আছে বিষয়াতীতের ব্যঞ্জনা। এতে দৃশ্যত একটি আখ্যানভাগ থাকে বটে, কিন্তু তার আড়ালে আরও একটি নিগূঢ় অর্থ লুকিয়ে থাকে। দু’টি ধারা প্রবাহিত হয় সমান্তরালভাবে। কাহিনি যা বর্ণনা করে বা দেখায়, আড়ালে থাকা ভাবটি বহন করে রূপকের আসল অর্থটিকে। রূপকে একটি বিশিষ্ট ভাবজগৎ চোখের সামনে ছবির মতো ফুটে ওঠে। রূপক ও সংকেতে কিছু পার্থক্য আছে। সাংকেতিক সাহিত্যে অপরূপ রহস্যকে আরও রহস্যময় করে তোলা হয়। সৃষ্টির চরম তত্ত্ব ও চূড়ান্ত রূপটিকে রূপকের সীমাবদ্ধ সংস্কারের মধ্যে দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না বলে সংকেত, আভাস ও ইঙ্গিতের সাহায্যে শুধু রহস্যই ঘনীভূত হয়ে ওঠে। সাংকেতিক নাটকে দুর্জ্ঞেয় রহস্য রহস্যই থেকে যায়, তার অবসান আর ঘটে না। এ-হেন রূপক-সাংকেতিক নাটকগুলিই রবীন্দ্রনাথের নাট্যপ্রতিভার শ্রেষ্ঠ সাক্ষর বহন করছে। তাঁর এই শ্রেণির নাটকগুলি প্রধানত রূপক হলেও সেগুলির সঙ্গে সাংকেতিকতার মিশ্রণ প্রচুর ঘটেছে। সংকেত দ্বারা তিনি ভাবকে ফুটিয়ে তুলেছেন, ইঙ্গিতের সাহায্যে যা ইন্দ্রিয়াতীত, যা অনাদি, অনন্ত, অপার্থিব, যা দৃষ্টির অতীত, সে অমূর্ত ভাব সম্পর্কে কবি আমাদের বিস্ময় উৎপাদন করেছেন। তাই তাঁর নাটকগুলিকে রূপক নাটক না বলে রূপক-সাংকেতিক নাটকই বলতে হয়। শারদোৎসব (১৯০৮), রাজা (১৯১০), অচলায়তন (১৯১২), ডাকঘর (১৯১২), ফাল্গুনী (১৯১৬), মুক্তধারা (১৯২৪), রক্তকরবী (১৯২৬), কালের যাত্রা (১৯৩২), তাসের দেশ (১৯৩৩) রবীন্দ্রনাথের রূপক-সাংকেতিক নাটক।
শারদোৎসব ও ঋণশোধ
[সম্পাদনা]শারদোৎসব নাটকের ব্যাখ্যায় কবি নিজেই বলেছেন, “বিশেষ বিশেষ ফুলে-ফলে হাওয়ায় আলোকে আকাশে পৃথিবীতে বিশেষ বিশেষ ঋতুর উৎসব চলিতেছে। সেই উৎসব মানুষ যদি অন্যমনস্ক হইয়া অন্তরের মধ্যে গ্রহণ না করে; তবে সে পার্থিব জীবনের একটি বিশুদ্ধ এবং মহৎ আনন্দ হইতে বঞ্চিত হয়।” অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে যোগের মধ্যে দিয়েই সত্যের সাধনায় মানবজীবনের সার্থকতা—এটিই নাটকটির নিগূঢ় অর্থ। শারদোৎসব-এর উপনন্দ তাই দুঃখের সাধনার মধ্যে দিয়েই প্রকৃতির কাছ থেকে লব্ধ অসীম আনন্দরসের ঋণ শোধ করেছে। এই নাটকটিই পরে ঋণশোধ (১৯২২) নামে কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত আকারে প্রকাশিত হয়।
রাজা ও অরূপরতন
[সম্পাদনা]বৌদ্ধ কুশজাতকের একটি কাহিনির ছায়া অবলম্বন করে রচিত রাজা নাটকে রূপ ও অরূপের দ্বন্দ্ব অপরূপ ব্যঞ্জনায় আভাসিত হয়েছে। রানি সুদর্শনার রূপতৃষ্ণা তাঁকে প্ররোচিত করেছিল রূপের মধ্যে রাজাকে সম্ভোগ করতে। তাই নকল রাজা সুবর্ণের বাহ্য রূপ তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল, তাকেই তিনি দিয়েছিলেন মালা। এই ভুলের প্রায়শ্চিত্তে দুঃখের দাহনে পুড়ে তিনি শুদ্ধ হলেন, তাঁর মোহ অপসৃত হল এবং তখনই আসল রাজার সঙ্গে মিলন হল তাঁর—আসল রাজার কালো রূপে তাঁর চোখ জুড়িয়ে গেল, পরিপূর্ণ আত্মদানের ভিতর দিয়েই অরূপরতনকে উপলব্ধি করলেন তিনি। মধুর ভাবের সাধনার দৃষ্টিকোণ থেকে মানবাত্মা বা সুদর্শনার সঙ্গে বিশ্বাত্মা বা রাজার সম্পর্কটি পরিস্ফুট হয়েছে এই নাটকে। বিশেষ রূপে নয়, রূপ-নির্বিশেষের মধ্যেই ঈশ্বরানুভূতি লাভ করতে হবে এবং তা হবে সকল অহংকার ত্যাগ করে দুঃখের সুমহৎ তপস্যার দ্বারা—সুদর্শনার কাহিনিতে রয়েছে তারই ইঙ্গিত। ১৯২০ সালে এই নাটকটিকেই সংক্ষিপ্ত ও অভিনয়যোগ্য করে রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেন অরূপরতন নাটকটি।
অচলায়তন ও গুরু
[সম্পাদনা]অচলায়তন নাটকের মূল কথাটি হল, “জগৎ সচল। এই সচলতার মধ্যে যে বা যাহা অচল হইয়া থাকিতে চায়, তাহাই একদিন অকস্মাৎ গুরুর আগমনে ভাঙিয়া ধূলিসাৎ হয়, এবং অনড়কে বাধ্য হইয়া নড়িতে হয়।” এই নাটকে জ্ঞানমার্গী মহাপঞ্চক, কর্মমার্গী শোণপাংশু ও ভক্তিমার্গী দর্ভকের দল সাধনার একমুখী ধারার প্রাচীনতার মধ্যেই অচলায়তন গড়ে তোলে। তাকে ভেঙে সমন্বয়ের সাধনার ভিতর দিয়েই জীবনের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “যে-বোধে আমাদের আত্মা আপনাকে জানে সে-বোধের অভ্যুদয় হয় বিরোধ অতিক্রম করে, আমাদের অভ্যাসের এবং আরামের প্রাচীরকে ভেঙে ফেলে।... অচলায়তনে এই কথাটাই আছে।” ১৯১৮ সালে গুরু নামে এটির একটি অভিনয়যোগ্য সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
ডাকঘর
[সম্পাদনা]সংকেতের সার্থক ব্যঞ্জনায় ডাকঘর রবীন্দ্রনাথের অনুপম নাট্যসৃষ্টি। মানবাত্মার সঙ্গে বিশ্বাত্মার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নাটকটি রচিত হলেও এতে অনির্দেশ সুদূরের প্রতি এক সুতীব্র উৎকণ্ঠা ও পিপাসাও ব্যঞ্জিত হয়েছে। গৃহবদ্ধ রোগার্ত অমল সেই সুদূরের ডাক শুনেছিল এবং মৃত্যুর ভিতর দিয়ে সেই অজানা সুদূরের সঙ্গে একাত্ম হয়েছিল। সাংকেতিকতার দিক থেকে অমল মানবাত্মার এবং রাজা বিশ্বাত্মার প্রতীক। ডাকঘর বিচিত্র বিশ্বপ্রকৃতির, চিঠি সকল সৌন্দর্যরূপ ও আনন্দরূপের এবং ডাকহরকরা ঋতুসৌন্দর্যের প্রতীক। বিশ্বরাজ বিচিত্র সৌন্দর্যের মধ্যে দিয়ে মানবাত্মাকে মিলনসংকেত জানিয়েছেন, আর মানবাত্মা অহরহ চঞ্চল হয়ে উঠছে। অমলের ঘুম মৃত্যুর প্রতীক হলেও তা নবজীবনলাভের মাধ্যম মাত্র। নাটকে সুধা নামে একটি চরিত্র আছে। সুধা সৌন্দর্যের প্রতীক। নাটকের শেষ দৃশ্যে সুধার হাতে ফুল প্রেমের প্রতীক। পরমাত্মা ও মানবাত্মার সম্পর্ক-ব্যঞ্জিত এই নাটকের শেষ মুহূর্তে অমলকে দেওয়ার জন্য ফুল নিয়ে সুধার প্রবেশ ও অনুরোধ জ্ঞাপনের মধ্যে মানবীয় প্রেমের করুণ স্পর্শ দ্বারা কবি তাঁর শিল্পসৃষ্টিকে একটি ট্র্যাজিক মাধুর্য দান করেছেন।
ফাল্গুনী
[সম্পাদনা]শীতের ভিতর দিয়ে বসন্ত যেমন নতুন করে ফিরে আসে, জরাকে অতিক্রম করে যৌবন যেমন বারবার নতুন হয়ে দেখা দেয়, মৃত্যুর ভিতর দিয়েও তেমনই জীবনের জয়গান ঝংকৃত হয়—ফাল্গুনী নাটকের এটিই তত্ত্ব। এই নাটকের সর্দার প্রাণশক্তির প্রতীক, চন্দ্রহাস প্রেমের প্রতীক এবং অন্ধ বাউল প্রজ্ঞা বা বিদ্যানুভূতির প্রতীক। গুহাদ্বার এখানে মৃত্যুর প্রতীক। এখানেই বসন্ত উৎসবের আবহে যুবকদলের সঙ্গে সর্দারের নতুন করে সাক্ষাৎ হয় অর্থাৎ মৃত্যুর ভিতর দিয়েই উন্মোচিত হয় জীবনের রহস্য। ফাল্গুনী নাটকে নাট্যবস্তু বিশেষ কিছু নেই; কবির অনুভবের জীবনসত্যকে কয়েকটি ভাববিগ্রহরূপী মানবচরিত্রের গান ও সংলাপের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে।
মুক্তধারা
[সম্পাদনা]আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অহংকার ও যন্ত্রশক্তির সংকটের বিরুদ্ধে প্রাণের বিদ্রোহ ঘোষণায় প্রাণকেই জয়ী করা হয়েছে মুক্তধারা নাটকে। যন্ত্রশক্তি সহজ জীবনধারার বাধা, তা রাষ্ট্রীয় পীড়নেরও পরিপোষক। উত্তরকূটের রাজার মধ্যে ছিল সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধ। তিনি যন্ত্রকে আশ্রয় করে বিজিত জাতি শিবতরাইয়ের অধিবাসীদের দমন করতে চেয়েছিলেন। বিশালাকায় লৌহযন্ত্রের বাঁধ দিয়ে মুক্তধারাকে অবরুদ্ধ করে শিবতরাইয়ের লোকেদের পিপাসার জল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজকুমার অভিজিৎ প্রাণ দিয়ে সেই বাধা অপসৃত করেছিলেন। এতে যন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষের প্রাণশক্তিকেই বড়ো করে দেখানো হয়েছে। অভিজিৎ এখানে পীড়িত ও বিদ্রোহী মানবাত্মার প্রতীক।
রক্তকরবী
[সম্পাদনা]রক্তকরবী নাটকে প্রাণ ও প্রেমের সঙ্গে যন্ত্রের দ্বন্দ্ব ও পরিণামে প্রেমের জয় সূচিত হয়েছে। মাটির তলার রাজ্য যক্ষপুরীর রাজা অসীম ক্ষমতাধর যন্ত্রসভ্যতার প্রতীক; লোভ আর সঞ্চয়েই তাঁর আনন্দ। তিনি সেখানে দুশ্ছেদ্য জালের আড়ালে আবৃত রেখেছেন নিজেকে, বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের পথ করে রেখেছেন রুদ্ধ। সহজ আনন্দ থেকে বঞ্চিত সেখানকার মানুষেরাও কেবল সোনা তোলার যন্ত্রস্বরূপ। সেই প্রাণহীন, গানহীন, আনন্দহীন রাজ্যে অফুরন্ত প্রাণ ও প্রেমের ঐশ্বর্য নিয়ে এল নন্দিনী। দ্বন্দ্ব বাধল প্রেমে অ যন্ত্রে। শেষপর্যন্ত প্রেমই হল জয়ী, রাজা নিজের লৌহজালকে চূর্ণ করে প্রেমের মধ্যে মুক্তির আনন্দ উপলব্ধি করলেন। এই কাহিনির পিছনে বস্তুসর্বস্ব জড়বাদী সভ্যতার কদর্য রূপের আভাস আছে। যন্ত্রসভ্যতা যে মনুষ্যত্বের বিলোপ ঘটায়, কল্যাণের পথ রোধ করে, সেই ইঙ্গিত রক্তকরবী নাটকে ব্যঞ্জিত। নাটকের রক্তকরবী অপরাজেয় প্রাণ ও সৌন্দর্যের প্রতীক। কবির ভাষায়, “ঐ রক্তকরবী ফুলের রক্ত-আভায় একটা ভয়লাগানো রহস্য আছে, শুধু মাধুর্য নয়। ঐ রক্তকরবী সুন্দরের হাতে বিধাতার দান—রক্তের তুলিকা।” রাজা লোভ ও শক্তির তথা ধনতন্ত্র ও যান্ত্রিকতার প্রতীক। সর্দার শোষণ ও পীড়নের, অধ্যাপক জড়বাদ ও বস্তুবাদের, বিশু অসীম অপরিতৃপ্তি ও বিরহবেদনার, রঞ্জন যৌবনের প্রাণশক্তির, কিশোর সৌন্দর্যসাধকের, গোঁসাই ও পুরাণবাগীশ প্রাচীন অন্ধ সংস্কারের, লৌহজাল অনিয়ন্ত্রিত বাসনা ও যন্ত্রবদ্ধতার, নীলকণ্ঠ পাখির পালক অনন্তের ইঙ্গিত এবং ধ্বজা জয়শক্তির প্রতীক।
রথের রশি ও তাসের দেশ
[সম্পাদনা]মানবতার অপমানে যে মহাকালের রথ অচল হয়ে পড়ে, এই তত্ত্বই কালের যাত্রা-র রথের রশি-তে আভাসিত। আবার রবীন্দ্রনাথেরই একটি আষাঢ়ে গল্প নামক ছোটোগল্পের নাট্যরূপ তাসের দেশ। নিয়মের নিগড়ে বদ্ধ প্রাণহীন সনাতন দেশে বাইরে থেকে যখন প্রাণবান এসে উপস্থিত হয়, তখন কীভাবে জড়তার রাজ্যে মুক্ত হাওয়া প্রবাহিত হতে থাকে, বাঁধা কাজের ভিতর শুরু হয় আনন্দের আয়োজন, তা-ই রূপকের মধ্যমে নাটকটিতে প্রকাশিত।