বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা

উইকিবই থেকে

কেবল বাংলা সাহিত্যে নয়, সমগ্র বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই কবিসার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ এক অপার বিস্ময়। প্রতিভার এমন সর্বতোমুখী ভাস্বর দীপ্তি আর কোনও মহৎ শিল্পীর জীবনে দেখা যায়নি। সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রে তাঁর অবাধ বিচরণ। তাঁর অসামান্য রচনাশক্তি অনন্য রূপ-ভঙ্গিমায় ও অন্তহীন বৈচিত্র্যে অফুরন্তভাবে উৎসারিত হয়েছে। বাঙালির হাজার বছরের সাহিত্যসাধনা যেন এই একটি মানুষের মধ্যেই রূপ পরিগ্রহ করেছিল। সুদীর্ঘ ষাট বছর ধরে রবীন্দ্রনাথ অতন্দ্র সাধনায় যে অসামান্য রূপ সৃষ্টি করে গিয়েছেন, সাহিত্যের ইতিহাসে তা অভূতপূর্ব। সমালোচক মোহিতলাল মজুমদারের ভাষায়, “প্রাণের অনির্বচনীয় অনুভূতিকে—সৌন্দর্যবিধুর ভাবাকুল চিত্তের গহনবাসিনী অলক্ষ্যচারিণী ছায়ামায়াময়ী মূর্তিগুলিকে—তিনি বাংলা ভাষার অক্ষরধ্বনিতে ধরিয়া দিয়াছেন; যাহা সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক তাহাকে এমন বাঙ্ময়ী রাগিণীতে যুগপৎ ভাষার ইন্দ্রজাল ও সুরের মোহিনী মূর্ছনায় আর কেহ শ্রুতিগোচর করিতে পারিয়াছেন কি না সন্দেহ।” মোহিতলাল অবশ্য রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কে এই কথা বলেছেন, কিন্তু সমগ্র রবীন্দ্র-কাব্যসাহিত্য সম্পর্কেই এই কথাগুলি সমানভাবে প্রযোজ্য।

আত্মপরিচয় গ্রন্থের চতুর্থ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “একটি মাত্র পরিচয় আমার আছে, সে আর কিছুই নয়, আমি কবি মাত্র।” এই উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে সমালোচক নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন, “কাব্য সাধনাই রবীন্দ্রনাথের আজন্ম সাধনা’এবং কাব্য সাধনাই তাঁহার জীবন সাধনাও বটে।” রবীন্দ্রনাথ নিজেও স্বীকার করেছেন, “কবিতা আমার বহুকালের প্রেয়সী”। (ছিন্নপত্র) তাঁর সুদীর্ঘ জীবনের কালপর্বে এই “বহুকালের প্রেয়সী” কবিতাই বারবার দেখা দিয়েছে নানা রূপে-রূপান্তরে।

রবীন্দ্রনাথ রোম্যান্টিক গীতিকবি। তাঁর কাব্যে প্রকৃতির প্রতি নিবিড় আকর্ষণ, গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতি, মর্ত্যপৃথিবীর প্রতি মমতাময় আসক্তি এবং মানবজীবনের প্রতি ঐকান্তিক ভালোবাসার ভাবটি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। সেই সঙ্গে রোম্যান্টিক বিষাদ-বেদনার অনুভব যুক্ত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যগুলি। কল্পনা ও অনুভূতির রসসঞ্চারে তাঁর কাব্য যথার্থই রসাত্মক কাব্য হয়ে উঠেছে।

রবীন্দ্র-পূর্ববর্তী যুগে মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতে যে ক্লাসিকাল রীতির মহাকাব্য রচনার ধারা সূচিত হয় রবীন্দ্রনাথে এসে তা প্রবাহিত হয় অন্য এক ধারায়। প্রাথমিকভাবে বিহারীলাল চক্রবর্তীর কাব্যেই সেই রোম্যান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রথম দেখা যায় এবং রবীন্দ্রনাথের কাব্যে এসে তার পরিপূর্ণ বিকাশ ও সমৃদ্ধি ঘটে।

সৌন্দর্য ও প্রেমের মরমি কবি বিহারীলালের কাব্যেই রবীন্দ্রনাথ প্রথম অনুভব করেছিলেন কাব্যের অন্তর্লীন সুর ও আবেগ। তাঁর কাব্যেও আমরা উপলব্ধির ক্রমপর্যায়ে দেখি রোম্যান্টিক চেতনা থেকে প্লেটোনিক ভাবনা স্পর্শ করে গিয়ে মরমি ভাবকল্পনায় মুক্তিলাভ করেছে তাঁর কবিতা এবং এভাবেই তা বিকশিত হয়েছে সসীম থেকে অসীমে, রূপ থেকে অরূপে।

প্রথম কৈশোর থেকে মৃত্যুর পূর্বাবধি পর্যন্ত কবিতা রচনায় অক্লান্তভাবে ব্যাপৃত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর শিল্পীমানসের একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এই যে, তা কোথাও সীমিত ক্ষেত্রে স্থির থাকেনি, তা ছিল এক চলমান সত্তা। নিত্য নতুনের অভিসারে তার প্রবাহ বারে বারে বাঁক পরিবর্তন করেছে। সেই বাঁকের মুখে মুখে কত না বৈচিত্র্য, কত না রূপবিভূতির বৈভব। রূপকর্ম ও ভাবের দিক থেকে আমরা এই বিশাল কবিকৃতিকে কয়েকটি পর্বে ভাগ করে বিশ্লেষণ করতে পারি।

প্রথম পর্ব: কবিকাহিনি, বনফুলশৈশবসঙ্গীত

[সম্পাদনা]

রবীন্দ্রকাব্যের প্রথম পর্বকে আমরা উন্মেষ পর্ব আখ্যা দিতে পারি। এর বিস্তৃতিকাল ১৮৮২ থেকে ১৮৮৬ সাল। কিন্তু এর আগে রবীন্দ্রনাথের আরও কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলি হল কবিকাহিনী (১৮৭৮), বনফুল (১৮৮০) ও শৈশবসঙ্গীত (১৮৮৪)। কবি নিজেই এই রচনাগুলি সম্পর্কে বলেছেন যে, এগুলি তাঁর “অপরিণত মনের প্রকাশ অপরিণত ভাষায়”। ইতিহাসের ধারা রক্ষার খাতিরেও তিনি এই রচনাগুলিকে স্বীকার করতে চাননি। কারণ, তাঁর মতে, “লেখা যখন কবিতা হয়ে উঠেছে তখন থেকেই তার ইতিহাস।” তবু রবীন্দ্রকাব্যের বিবর্তনের ধারাটি অনুসরণ করার জন্যই তাঁর শৈশব পর্বের এই কাব্যগুলির উল্লেখ প্রয়োজন। লক্ষ্য করার বিষয় হল, তিনটি কাব্যই আখ্যানকাব্যের ভঙ্গিতে লেখা। এগুলির ভাষা ও ভাব অপরিণত হলেও রবীন্দ্রনাথের শিল্পীমানসের দু-একটি দিকের আভাস এখানে ফুটে উঠেছে। যেমন, বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিগূঢ় সম্বন্ধের কথা বনফুল-এ ধ্বনিত হয়েছে। আবার কবিকাহিনী-র মূল বক্তব্যটি হল, “মানুষের নিকটের জিনিসকে অবহেলা করিয়া দূরে চলিয়া যায়, তাহাতে সে নিকটকে হারায়, দূরকেও পায় না।”

কবিকাহিনী রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। ১৮৭৮ সালে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই কাব্য সম্পর্কে জীবনস্মৃতি-তে কবি লিখেছেন, “যে বয়সে লেখক জগতের আর-সমস্তকে তেমন করিয়া দেখে নাই, কেবল নিজের অপরিস্ফুটতার ছায়ামূর্তিটাকেই খুব বড়ো করিয়া দেখিতেছে, ইহা সেই বয়সে লেখা।” সমালোচকেরা এটিকে ট্র্যাজিক রোম্যান্স আখ্যা দিয়েছেন। কবির মতে, “ইহার মধ্যে বিশ্বপ্রেমের ঘটা খুব আছে।”

বনফুল রবীন্দ্রনাথের প্রথম উল্লেখযোগ্য রচনা। তাঁর তেরো বছর বয়সে রচিত এই কাব্য অবশ্য গ্রন্থাকারে কবিকাহিনী-র পরে ১৮৮০ সালে প্রকাশিত হয়। এর আগেও কিশোর কবি রচনা করেছিলেন পৃথ্বীরাজ পরাজয়, যদিও নিজেই সেই রচনাটিকে সাহিত্যপদবাচ্য বলতে চাননি তিনি। বনফুল কাব্যে লেখা একটি গল্প। বিশ্বজীবন ও মানবজীবনের সুগভীর বন্ধনকে রবীন্দ্রনাথ বারবার নানাভাবে তাঁর রচনায় প্রকাশ করেছেন। কিশোর রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাহিত্য-কোরক বনফুল-এই তা প্রকাশীত। প্রাথমিক পর্যায়ের এই রচনার মধ্যেই ভাবীকালের শ্রেষ্ঠ গীতিকবির রোম্যান্টিক মন্ময়তা আত্মপ্রকাশের পথ খুঁজে পেয়েছিল। এই আবেগধর্মী, গীতিময় ভাবনারই প্রকাশ পরবর্তী শৈশবসঙ্গীত গ্রন্থে। হৃদয়-উচ্ছ্বাসের তীব্র মধুর রোম্যান্টিক বেদনা-ভরা এই গ্রন্থের গাথাগুলি প্রায় সবই ট্র্যাজেডি। এগুলিকে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পর্যায়ের গীতিকবিতা রচনার প্রয়াস বলা যায়। বনফুল থেকে শুরু করে এই পর্যায়ের সব রচনাতেই এই সুরের আভাস পাওয়া যায়।

বনফুল কাব্যে দেখা যায় বনপ্রকৃতিতে পালিতা কমলার প্রেমের বিষাদঘন পরিণতি। বনাঞ্চলের বালিকা লোকালয়ে নিজেকে মেলাতে না পেরে ব্যর্থ প্রণয় বুকে নিয়ে বনপ্রকৃতিতে ফিরে আসে। তবু খুঁজে পায় না জীবনের সার্থকতা। মৃত্যুতেই তার প্রেমের সমাপ্তি। কমলা, বিজয়, নীরদ, নীরজা ভালোবাসার আলো-আঁধারিতে চারটি বিষণ্ন চরিত্র। বিবাহিত জীবনের সঙ্গে মুক্ত প্রেমের এই সংঘাত, যা রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী রচনাগুলিতে বহু-বিচিত্র রূপে প্রকাশিত, তার সূচনা বনফুল কাব্যের কমলা চরিত্রে লক্ষ্য করা যায়। মানবজীবন ও প্রকৃতি—সসীম ও অসীমের মিলন-সাধনের এই পালাই রবীন্দ্র-সাহিত্যাদর্শের মূল সুর। এরই সংযোগে বিষাদমগ্ন এক তত্ত্বময়তা এই পর্যায়ের কাব্যগুলিতে প্রকাশিত।

নিশীথে আঁধার নাই, আলোকে তীব্রতা নাই,
কোলাহল নাইক দিবায়!
আশায় নাইক অন্ত, নূতনত্বে নাই অন্ত,
তৃপ্তি নাই মাধুর্যশোভায়।

বনফুল-এর ন্যায় কবিকাহিনী-র মধ্যেও রোম্যান্টিক বেদনার তীব্রতা অকারণ বিষাদ ও শূন্যতাবোধ এবং অতৃপ্তির যন্ত্রণাবোধ লক্ষ্য করা যায়।

এখনো কহিছে কবি,
"আরো দাও ভালবাসা,
আরো ঢালো' ভালবাসা হৃদয়ে আমার।"
প্রেমের অমৃতধারা
এত যে করেছে পান,
তবু মিটিল না কেন প্রণয়পিপাসা?

কবিকাহিনী-র কবি যেন রবীন্দ্রনাথের ঈষৎ পরিবর্তিত ছায়াভাস। এই কাব্যের নায়িকা নলিনীর মৃত্যুতে কবির মনে জেগেছে সংশয়। এই সময় থেকেই প্রচ্ছন্নভাবে রবীন্দ্রমানসে জীবনের ট্র্যাজেডি ও দুঃখবোধের জিজ্ঞাসা জেগে উঠেছে। মৃত্যুতেই কি সব শেষ, নাকি দুঃখোত্তীর্ণ এক অতীন্দ্রিয় চেতনার বিকাশও সম্ভব—এই প্রশ্ন প্রেমিকার মৃত্যুতে কবি উচ্চারণ করেছেন:

গিয়াছে কি আছে বসে
জাগিল কি ঘুমাল সে
কে দিবে উত্তর?

শৈশবসঙ্গীত-এর কবিতাগুলিতেও এই অকারণ বিষাদ, অনুত্তর প্রশ্ন, Romantic Agony-র সুর ধ্বনিত:

ওগো দেবী, ওগো বনদেবী
বল মোরে কি হয়েছে মোর
কি ধন হারায়ে গেছে, কি সে কথা ভুলে গেছি
হৃদয় ফেলেছ ছেয়ে সে কি ঘুম ঘোর

শৈশবসঙ্গীত গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার কালের হিসেবে সন্ধ্যাসঙ্গীত-এর অনুজ হলেও রচনাকালের দিক থেকে অগ্রজ। এর অধিকাংশ কবিতাই ১২৮৪-১২৮৭ বঙ্গাব্দে (ইং ১৮৭৮-৮৯) ভারতী পত্রিকায় মুদ্রিত হয়েছিল।