আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৩৭—১৮৮৭) ছিলেন কলকাতার খিদিরপুরের অধিবাসী। স্কুল-কলেজে পড়ার সুযোগ না পেলেও তিনি যথেষ্ট উচ্চশিক্ষা লাভ করেছিলেন এবং আয়ত্ত করেছিলেন ইংরেজি, সংস্কৃত, বাংলা ও ফারসি ভাষা। প্রথম জীবনে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তাঁর সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করতেন। নিজেও সম্পাদনা করেছেন সংবাদ-রসসাগর নামে একটি পত্রিকা। এছাড়া তিনি ছিলেন এডুকেশন গেজেট ও সাপ্তাহিক বার্তাবহ পত্রিকার সহ-সম্পাদক। প্রথম জীবনে তিনি ঊষা-অনিরুদ্ধ নামে একটি পাঁচালিকাব্য রচনা করেন। প্রাচীন ভঙ্গিতে লেখা সেই কাব্য লুপ্ত হয়ে গিয়েছে। সেই কাব্যের একটি গান আছে তাঁর কাঞ্চীকাবেরী কাব্যের পঞ্চম সর্গে। রঙ্গলাল বাংলা আখ্যানকাব্য রচনার প্রথম পথনির্দেশক। ইংরেজি কাব্যসাহিত্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের ফলে তাঁর কাব্যরচনায় নতুন সুর ধ্বনিত হয়ে ওঠে। বহু ইংরেজি কবিতার আক্ষরিক ও ভাবানুবাদ করে তিনি প্রথম জীবনে হাত পাকিয়েছিলেন।
রঙ্গলাল ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্তের অব্যবহিত পূর্ববর্তী কবি এবং ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক আখ্যানকাব্যের প্রবর্তকের সম্মান পাওয়ার অধিকারী। শিল্পবিচারে তিনি উন্নত কবিপ্রতিভার অধিকারী ছিলেন না সত্য, কিন্তু বাংলা কাব্যধারার গতি পরিবর্তনে তাঁর দান অসামান্য। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল প্রগাঢ়। ইংরেজি-নবিশ হরচন্দ্র দত্ত বিটন সোসাইটির এক অধিবেশনে ইংরেজি কাব্যের সঙ্গে বাংলা কাব্যের তুলনা করে বাংলা কবিতাকে হেয় প্রতিপন্ন করলে রঙ্গলাল পরবর্তী অধিবেশনে বাংলা কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধ লিখে পাঠ করেন। তারপর তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাব্যরচনায় আত্মনিয়োগ করেন। পদ্মিনী উপাখ্যান (১৮৫৮), কর্মদেবী (১৮৬২), শূরসুন্দরী (১৮৬৮) ও কাঞ্চীকাবেরী (১৮৭৯) তাঁর রচিত আখ্যানকাব্য। এছাড়া তিনি অলিভার গোল্ডস্মিথের দ্য হারমিট কাব্যটি অনুবাদ করেন। বিদেশি সাহিত্যের ঋণ গ্রহণ ও স্বীকার করে তিনি ভেকমূষিকের যুদ্ধ নামে একটি ব্যঙ্গকাব্য রচনা করেছিলেন। ১৮৭২ সালে কালিদাসের কুমারসম্ভবম্ কাব্যের অনুবাদ করেন এবং দুশো উদ্ভট সংস্কৃত শ্লোক অনুবাদ করে নীতিকুসুমাঞ্জলি নামে প্রকাশ করেন বঙ্গদর্শন পত্রিকায়। তাঁর বেশ কিছু কবিতা রহস্য-সন্দর্ভ পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছিল। ওয়াটের অনুসরণে ‘প্রভাতসঙ্গীত’, কুপারের অনুকরণে ‘নদী ও কালের সমতা’, মিলটনের অনুকরণে ‘আদিম নরদম্পতীর প্রাতরুপাসনা’ ইত্যাদি অনুবাদ কবিতা তাঁর রচনা। কয়েকটি ওড়িয়া কবিতারও তিনি পদ্যানুবাদ করেন। এছাড়া ওমর খৈয়ামের প্রথম বাংলা পদ্যানুবাদ রঙ্গলালের একটি বিশিষ্ট কীর্তি।
উনিশ শতকের আখ্যানকাব্যের ইতিহাসে রঙ্গলাল শীর্ষস্থানীয় কবি। তিনি মহাকবির প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেননি। কিন্তু স্বদেশপ্রেমের আবেগ দিয়ে টডের অ্যানালস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ অফ রাজস্থান অবলম্বনে অপূর্ব আখ্যানকাব্যের সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীকালের কাব্যপ্রবাহের উৎসমুখে রঙ্গলাল কর্তৃক এই আবেগসঞ্চার সাহিত্যের ইতিহাসে চিরকাল মুদ্রিত হয়ে থাকবে। স্কটের মিনস্ট্রেলের অনুকরণে চারণের মুখে চিতোর আক্রমণ ও রানি পদ্মিনীর জহরব্রতে আত্মোৎসর্গের বিবরণ অবলম্বনে পদ্মিনী উপাখ্যান কাব্যটি রচনা করেন রঙ্গলাল। ঘটনাগুলি নিঃসংশয়ে ঐতিহাসিক সত্য না হলেও ঐতিহাসিক আখ্যানকাব্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন রূপে কাব্যটিকে গ্রহণ করা যেতে পারে। এই কাব্যের দেশপ্রেমের উদ্দীপনামূলক সংগীতগুলি বাঙালির জাতীয় জীবনে অনুপ্রেরণায় সঞ্চার করেছিল। রঙ্গলালের দ্বিতীয় কাব্য কর্মদেবী-র বিষয়বস্তুও রাজপুত ইতিহাস থেকে গৃহীত। ভট্টি জাতির অধিপতি অনঙ্গদেবের পুত্র সাধুর সঙ্গে গোহিল-বংশীয় রাজা মাণিকদেবের কন্যা কর্মদেবীর প্রণয় এই কাব্যের কথাবস্তু। কাব্যটিতে দেশপ্রেমের আদর্শ আছে, কিন্তু কাব্যকলার বিশেষ কোনও পরিচয় নেই। শূরসুন্দরী কাব্যের বিষয়বস্তুও রাজপুত ইতিহাস। নওরোজ উৎসবে সম্রাট আকবর প্রতাপসিংহের ভ্রাতুষ্পুত্রীকে অপমান করার চেষ্টা করে লাঞ্ছিত হন। এটিই কাব্যটির বিষয়বস্তু। আকবরের প্রাসাদ ও অন্তঃপুরের বর্ণনায় কবি কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। কাঞ্চীকাবেরী গ্রন্থের বিষয়বস্তু কিংবদন্তিমূলক। ওড়িয়া কবি পুরুষোত্তমের কাব্য অনুকরণে এই কাব্য রচিত। উড়িষ্যার রাজা কপিলেন্দ্র দেব স্বপ্নাদেশে কনিষ্ঠ পুত্র পুরুষোত্তমকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। কাঞ্চী রাজকন্যার সঙ্গে তাঁর বিবাহের সম্বন্ধ এল। রথযাত্রার সময় কাঞ্চীরাজ পাত্র দেখতে এসে দেখলেন যে পুরুষোত্তম রথের সম্মুখে রাজপথ ঝাঁট দিচ্ছেন। চণ্ডালের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তির হাতে কন্যা সম্প্রদান করতে অস্বীকার করে কাঞ্চীরাজ ফিরে গেলেন। পুরুষোত্তম কাঞ্চী রাজ্য আক্রমণ করে রাজকন্যাকে কেড়ে আনলেন এবং চণ্ডালের হাতে সমর্পণ করতে উদ্যত হলেন। কিন্তু সমস্যার সমাধান করলেন মন্ত্রী। রথের সময় রাজা চণ্ডালের কর্মে নিযুক্ত থাকাকালীন মন্ত্রী রাজার হাতে রাজকন্যা পদ্মাবতীকে সমর্পণ করলেন। এই কাব্যটি ভক্তিমূলক রোম্যান্টিক প্রেমের গল্প।
রঙ্গলালকে নবযুগের বার্তাবহ কবি বলা যায়। তিনি কাব্য সংস্কারে বা আঙ্গিক রূপান্তরে আমূল পরিবর্তন আনতে পারেননি। কিন্তু স্বদেশপ্রেম ও আখ্যান-কৌতূহল সঞ্চার করে বাংলা আখ্যানকাব্যের গোড়াপত্তন করেছিলেন। বলা হয় যে, তিনি খাঁটি বাঙালি কবি ঈশ্বর গুপ্ত এবং “ডাহা ইংরাজ” মধুসূদনের মধ্যবর্তী “হাইফেন”। তাঁর কাব্যসৃষ্টিতে রসমূল্য খুব উচ্চস্তরের না হতে পারে, কিন্তু বিষয়ের বিস্তারে, ঐকান্তিকতায় ও নিষ্ঠায় তিনি বাংলা কাব্যের ধারাকে প্রবহমান ও পরিণামমুখী করে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন।