আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাট্যসাহিত্য

বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত (২৫ জানুয়ারি, ১৮২৪—২৯ জুন, ১৮৭৩) মহাকবি রূপেই সমধিক পরিচিত। কিন্তু কালনির্ঘণ্টের খাতিরে তিনি আগে নাট্যকার, পরে কবি। সাহিত্যের উভয় আঙিনাতেই তাঁর আবির্ভাব আকস্মিক। সেই আকস্মিকতা ও আন্তরিক প্রেরণার সঙ্গে তাঁর প্রতিভার মিলনে যে বৈপ্লবিক সৃষ্টিকর্ম তাঁর লেখনী থেকে প্রসূত হয়েছিল, তারই স্ফূরণে বাংলার অন্ধকার নাট্যজগৎ সহসা আলোকিত হয়ে ওঠে। তাঁর নাট্যকর্মের মধ্যেই বাঙালি নাট্যরসিকেরা এক নতুন যুগের সূচনা অনুভব করেছিলেন।
প্রাক্-মধুসূদন যুগের বাংলা নাটক ও মধুসূদন
[সম্পাদনা]মধুসূদনের আগে বাংলা ভাষায় যে কটি মৌলিক নাটক লেখা হয়েছিল, সেগুলি ছিল অঙ্কে ও দৃশ্যে বিভক্ত কাহিনির বর্ণনা মাত্র। নাট্যশৈলী, ভাব, ভাষা, চরিত্রচিত্রণ বা নাটকীয় ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া—সব দিক থেকেই তার মধ্যে ছিল একটা কৃত্রিমতার আবরণ। সেই কৃত্রিমতার মধ্যে প্রাণসঞ্চার করলেন মধুসূদন। তিনি পৌরাণিক নাটক লিখলেন; কিন্তু সেই নাটক তারিণীচরণ শিকদারের ভদ্রার্জুন কিংবা রামনারায়ণ তর্করত্নের বেণীসংহার বা রত্নাবলী নাটকের আদর্শ অনুসরণ না করে এক স্বতন্ত্র সত্তা ঘোষণা করল। তাঁর ঐতিহাসিক নাটক যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্তের কীর্তিবিলাস নাটকের ন্যায় ট্র্যাজেডির অক্ষম অনুকরণ না হয়ে পাশ্চাত্য ট্র্যাজেডির উষ্ণ রক্ত সঞ্চারিত করল বাংলা নাটকের ধমনীতে। অন্যদিকে যে সামাজিক জীবনের প্রতিচ্ছবি তাঁর প্রহসন দুটিতে প্রতিফলিত হল তাতে প্রতিধ্বনিত হল মর্ত্যমানবের সপ্রাণ পদসঞ্চার। বস্তুত নাটকের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি প্রাচীনতার জড়ত্ব মোচন করে স্বতঃস্ফূর্ত নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটালেন।
পৌরাণিক নাটক
[সম্পাদনা]শর্মিষ্ঠা
[সম্পাদনা]মধুসূদনের পূর্বসূরি নাট্যকারেরা পাশ্চাত্য নাট্যসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত থাকলেও সেই নাট্যধারার মূল সূরটিকে রপ্ত করতে পারেননি, নাট্যরচনার প্রতিভাও তাঁদের যথেষ্ট উন্নত ছিল না। ফলে তাঁদের নাটক বহিরঙ্গের দিক থেকে পাশ্চাত্য নাটকের ব্যর্থ অনুকরণেই পর্যবসিত থেকে গিয়েছিল। তাই মধুসূদনের আক্ষেপ ছিল, “অলীক কুনাট্য রঙ্গে/ মজে লোকে রাঢ়ে বঙ্গে,/ নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।” বেলগাছিয়া নাট্যশালায় অভিনীত রত্নাবলী নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে এবং আমন্ত্রিত অতিথি রূপে সেই নাটকের অভিনয় দেখে “কুনাট্য” সম্পর্কে তাঁর ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়েছিল। স্বয়ং নাট্যরচনার তাগিদ তিনি তখনই অনুভব করেছিলেন। ১৮৫৯ সালে তিনি তাঁর প্রথম নাটক শর্মিষ্ঠা রচনা করেন। মহাভারতের যযাতির কাহিনি এই নাটকের উপজীব্য। এই নাটক সম্পর্কে পরে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “আমি এই নাটক এমন সমস্ত লোকের জন্য লিখিয়াছি, যাঁহারা আমার ভাবেই ভাবিত; যাঁহারা ন্যূনাধিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত এবং পাশ্চাত্য নিয়মেই চিন্তা করেন। প্রাচীন সংস্কৃত আদর্শের অনুসরণ করিয়া আমাদের চিন্তার চরণে যে-শৃঙ্খল পড়িয়াছে, তাহা মোচন করাই আমার উদ্দেশ্য।” এইভাবেই প্রাচীন সংস্কৃত প্রয়োগরীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন মধুসূদন। শর্মিষ্ঠা নাটকে তাই নান্দী, প্রস্তাবনা, বিষ্কম্ভক ইত্যাদি সংস্কৃত নাট্যশৈলী পরিত্যক্ত হয়। কিন্তু গভীরে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বহিরঙ্গে সংস্কৃত নাটকের আদর্শ ত্যাগ করলেও অন্য নানা প্রকারে তিনি সেই আদর্শই অনুসরণ করেন। যেমন, শর্মিষ্ঠা নাটকের দীর্ঘ স্বগতোক্তিগুলির কথাই ধরা যেতে পারে। পাশ্চাত্য নাটকে স্বগতোক্তি নাট্যচরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকাশের ও নাটকীয় ক্রিয়াসংঘাতের ধারায় স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপিত হয়; কিন্তু মধুসূদনের এই নাটকে স্বগতোক্তি কেবল কাহিনি বর্ণনার উদ্দেশ্যেই প্রযুক্ত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, নাটকটির ভাষা সংস্কৃত নাটকের অলংকারবহুল ভাষার অনুগামী হওয়ায় কিছুটা কৃত্রিম হয়ে পড়েছে। তৃতীয়ত, নাট্যকাহিনির অনেক কিছুই সংলাপের মাধ্যমে বিবৃত হয়েছে, যা পাশ্চাত্য নাটকে ক্রিয়াসংঘাতের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়। চতুর্থত, শর্মিষ্ঠা-দেবযানী-যযাতি চরিত্র তিনটিকে কেন্দ্রকে যে নাট্যদ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলার সম্ভাবনা ছিল, যে কোনও কারণেই হোক নাট্যকার তা এড়িয়ে গিয়েছেন। তবু যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নাট্যরসের প্রাণবস্তু, দেবযানীর চরিত্রেই তার প্রথম প্রকাশ দেখা যায়। সেই হিসেবে সামগ্রিক দৃষ্টিতে নাটকটি খুব উন্নত না হলেও এতে পুরাণকথাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে।
পদ্মাবতী
[সম্পাদনা]মধুসূদনের পরবর্তী নাটক পদ্মাবতী (১৮৬০) একটি গ্রিক পুরাণকথার বঙ্গীকরণ। গ্রিক Apple of Discord কাহিনির হেরা, আথিনা ও আফ্রোদিতি এই নাটকে হয়েছেন যথাক্রমে ইন্দ্রপত্নী শচী, কুবেরপত্নী মুরজা ও মদনপত্নী রতি; প্যারিস ও হেলেন এখানে বিদর্ভরাজ ইন্দ্রনীল ও পদ্মাবতী; গ্রিক কাহিনিতে সোনার আপেল নিয়ে বিরোধ, পদ্মাবতী-তে স্বর্ণপদ্ম নিয়ে এবং গ্রিক আখ্যানে আফ্রোদিতিকে সুন্দরীশ্রেষ্ঠা বলায় প্যারিস অপর দুই দেবীর কোপে পড়েছিলেন, আর মধুসূদনের নাটকে একইভাবে রতিকে সুন্দরীশ্রেষ্ঠা ইন্দ্রনীলকে শচী ও মুরজার ক্রোধে অশেষ দুর্গতির সম্মুখীন হতে হয়। অবশ্য দুই কাহিনির মিল এটুকুই, পদ্মাবতী-র অবশিষ্ট কাহিনি মধুসূদনের কল্পনাপ্রসূত। একটি পাশ্চাত্য পুরাণকথাকে নিজের কল্পনাবলে প্রাচ্য পুরাণকথার পোষাকে সজ্জিত করতে পারাতেই মধুসূদনের কৃতিত্ব। এছাড়া নাটকটির ক্ষেত্রে মধুসূদন যে বিশেষ কৃতিত্ব দেখাতে পেরেছিলেন, তা নয়। তবে শর্মিষ্ঠা-র তুলনায় এই নাটকের ভাষা অনেকটাই সরল, কাহিনিতেও নাটকীয় সংঘাত সৃষ্টির প্রয়াস লক্ষণীয়। বর্ণনাত্মক সংলাপের পরিবর্তে ক্রিয়াত্মক ঘটনাকেই এই নাটকে প্রাধান্য দিয়েছেন মধুসূদন। সর্বোপরি এই প্রথম বাংলায় রোম্যান্টিক কমেডি রচনায় প্রয়াস দেখা যায়। আরও একটি কারণে নাটকটির ঐতিহাসিক মূল্য আছে। এই নাটকেই মধুসূদন প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার করেন; যদিও তা ছিল অপরিণত ও অত্যন্ত অল্প।
ঐতিহাসিক নাটক: ট্র্যাজেডি
[সম্পাদনা]কৃষ্ণকুমারী
[সম্পাদনা]মধুসূদনের শ্রেষ্ঠ নাটক কৃষ্ণকুমারী প্রকাশিত হয় ১৮৬১ সালে। এই নাটকের আখ্যানভাগ কর্নেল টডের অ্যানালস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ অফ রাজস্থান থেকে নেওয়া হলেও মধুসূদন সর্বাংশে টডের বর্ণনাকে অনুসরণ করেননি। তবু এটিই প্রথম মৌলিক বাংলা ঐতিহাসিক নাটক। শুধু তাই নয়, এই নাটকেই সর্বপ্রথম সার্থক ট্র্যাজেডি রচনার প্রয়াস লক্ষিত হয়। নাট্যকাহিনিটি এইরকম: জয়পুরের বিলাসী লম্পট রাজা জগৎসিংহের এক রক্ষিতা ছিল, নাম বিলাসবতী। রাজার ধূর্ত পারিষদ ধনদাস বিলাসবতীর ক্ষমতা হ্রাস করার জন্য উদয়পুরের রাজা ভীমসিংহের অনিন্দ্যসুন্দরী কন্যা কৃষ্ণকুমারীর ছবি আনে দেখাল জগৎসিংহকে। মোহিত হলেন জগৎসিংহ, কৃষ্ণকুমারীর পাণিপ্রার্থনা করে ভীমসিংহের কাছে পাঠালেন দূত। কিন্তু বিলাসবতীর সখী মদনিকা সখীর মঙ্গলের জন্যই দাঁড়াল এই বিবাহের বিরুদ্ধে। সে কৌশলে মরুরাজ মানসিংহকে কৃষ্ণকুমারীর পাণিপ্রার্থী রূপে দাঁড় করালো এবং কৃষ্ণকুমারীকে করে তুলল মানসিংহের প্রতি অনুরক্তা। ভীমসিংহ পড়লেন উভয়সংকটে। কারণ, জগৎসিংহ ও মানসিংহ উভয়েই জানিয়েছেন, কৃষ্ণকুমারীকে না পেলে উদয়পুর ধ্বংস করে দেবেন। ভীমসিংহ স্থির করতে পারলেন না কী করবেন। মন্ত্রী জানালেন, এরূপ অবস্থায় কৃষ্ণকুমারীর মৃত্যু ছাড়া অন্য গতি নেই। গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত ভীমসিংহ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে উন্মাদ হয়ে গেলেন। রাজভ্রাতা বলেন্দ্রসিংহের উপর পড়ল কৃষ্ণকুমারীকে হত্যা করার ভার। কিন্তু তার আগেই কৃষ্ণকুমারী আত্মহত্যা করে সকল দ্বন্দ্বের অবসান ঘটালেন। দেশরক্ষার্থে কৃষ্ণকুমারীর আত্মত্যাগের সঙ্গে গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিদিসের The Iphigenia of Tauris নাটকের কিছু মিল দেখা যায়। সেখানে রাজা অ্যাগামেনন দেবী আর্তিমিসের ক্রোধ নিবারণের জন্য নিজ কন্যা ইফিজেনিয়াকে বলি দিয়েছিলেন। কৃষ্ণকুমারী নাটকে গ্রিক অদৃশ্যবাদের ছায়াই এই নাটকের উপর ইউরিপিদিসের নাটকটির প্রভাবের পরিচায়ক। কাহিনিবিন্যাস ও চরিত্রসৃষ্টির দিক থেকে কৃষ্ণকুমারী মধুসূদনের অন্যান্য নাটকগুলির থেকে উন্নততর রচনা। পাশ্চাত্য নাটকে চরিত্রদ্বন্দ্বের ফলে যেভাবে ঘটনা প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং তা একটি অখণ্ড রূপ ধারণ করে পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়, কৃষ্ণকুমারী নাটকেও সেই আদর্শের সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে। সূক্ষ্ম বিচারে কৃষ্ণকুমারী-তে পাশ্চাত্য ট্র্যাজেডির গভীরতম অন্তর্বেদনার সুরটি ধ্বনিত হয়নি, তবু এই নাটকটিই ভবিষ্যৎ বাংলা ট্র্যাজেডির পথনির্দেশ করেছিল। সেটি মধুসূদনের শক্তিশালী নাট্যপ্রতিভারই পরিচায়ক।
প্রহসন
[সম্পাদনা]মধুসূদনের প্রতিভা ছিল মূলত কবিপ্রতিভা। তাই নাট্যরচনায় রোম্যান্স বা ট্র্যাজেডির প্রতি তাঁর আকর্ষণ খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় এই যে, এ-হেন প্রতিভাও সমকালীন সমাজের প্রতি উদাসীন থাকেনি। মধুসূদন কোনও সামাজিক নাটক রচনা করেননি বটে, কিন্তু সমাজের ছবি এঁকেছিলেন দুটি প্রহসনে: একেই কি বলে সভ্যতা (১৮৬০) ও বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (১৮৬০)। তাঁর পূর্বসূরি রামনারায়ণ তর্করত্ন ব্যঙ্গপ্রধান সামাজিক রচনা করলেও তাতে প্রচারের উদ্দেশ্যই প্রধান হয়ে উঠেছিল। কিন্তু মধুসূদন রচনা করলেন সত্যিকারের প্রহসন। চারিত্রিক অসংগতির মাধ্যমেই প্রহসনের নাট্যকাহিনি গড়ে ওঠে। একেই কি বলে সভ্যতা-য় সমকালীন পাশ্চাত্য শিক্ষাভিমানী যথেচ্চাচারী যুবসমাজের বিকৃতি ও উচ্ছৃঙ্খলতার গভীর বাস্তবচিত্র অঙ্কিত হয়েছে। যে ইয়ং বেঙ্গলকে এই প্রহসনে বিদ্রূপ করা হয়েছে, মধুসূদন নিজেও ছিলেন তার অন্যতম সদস্য। সুতরাং বাস্তব অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে তাঁর সহায়ক হয়েছে।
বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ প্রহসনটিতে প্রাচীনপন্থী হিন্দুসমাজের ভণ্ডামি ও চরিত্রহীনতা নির্মম নগ্ন বাস্তবতায় চিত্রিত হয়েছে। ভণ্ড জমিদার ভক্তপ্রসাদ একদিকে হরিণাম করেন, অন্যদিকে খাজনার কড়াক্রান্তির হিসাব করেন এবং লাম্পট্যবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য পরস্ত্রীর সন্ধান করে বেড়ান। এ-বিষয়ে তিনি জানি মানেন না, আচার মানেন না, “মুখে প্যাঁজির গন্ধ” থাকলেও মুসলমান প্রজা হানিফের স্ত্রী ফতেমার প্রতি আসক্ত হতে তাঁর বাধে না। পরিণামে তাঁকে হানিফ ও বাচস্পতির হাতে বিলক্ষণ লাঞ্ছিত হতে হয়। রচনার দিক থেকে একেই কি বলে সভ্যতা-র চেয়ে বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ অনেক বেশি পরিণত। এই প্রহসনের প্রতিটি চরিত্র আশ্চর্য সুন্দর বাস্তবতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। চাষিদের মুখে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ কাহিনির পরিবেশকেও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সহায়ক হয়েছে। এভাবেই সমকালীন সমাজ মধুসূদনের স্পর্শে এক নতুন জীবন লাভ করেছে। বলা যায়, পূর্ণাঙ্গ নাটক অপেক্ষা প্রহসন রচনাতেই মধুসূদন অনেক বেশি কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। কাহিনিবিন্যাস, চরিত্রচিত্রণ, চরিত্র-উপযোগী সংলাপ—সব মিলিয়ে প্রহসন দুটিতে জমে উঠেছে অখণ্ড নাট্যরস। মধুসূদনের আগে এমন সর্বাঙ্গসুন্দর প্রহসন কেউ রচনা করতে পারেননি, আবার তাঁর পরেও প্রহসন রচনায় কেউই তাঁকে অতিক্রম করে যেতে পারেননি।
অন্যান্য নাটক
[সম্পাদনা]১৮৭৪ সালে রূপকথার আধারে মধুসূদন মায়াকানন নামে একটি বিয়োগান্ত কাল্পনিক নাটক রচনা করেন। কিন্তু তাতে মধুসূদনের অস্তমিত প্রতিভার ম্লান ছায়া ছাড়া কিছুই নেই। বিষ না ধনুর্গুণ নামে অপর একটি নাটকও তিনি লিখতে আরম্ভ করেছিলেন, কিন্তু তা শেষ করার আগেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। মধুসূদনের নাট্যকৃতির ইতিহাসে এই দুই নাটকের স্থান নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর।
বাংলা নাটকের ইতিহাসে মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্থান
[সম্পাদনা]বাংলা সাহিত্যে মধুসূদনের আবির্ভাব যেমন আকস্মিক, তেমনই বিস্ময়কর। অনন্যসাধারণ প্রতিভার সঙ্গে সুগভীর আত্মপ্রত্যয় নিয়ে তিনি বাংলা কাব্যে ও নাটকে বিপ্লব সূচিত করেছিলেন। প্রথম নাটক শর্মিষ্ঠা-য় তিনি পুরাতনের বিরোধী ও নবীনের আহ্বায়ক। সর্বপ্রকারে গতানুগতিকতার বাঁধন ছিঁড়ে ফেলাই ছিল তাঁর সাহিত্যিক প্রবণতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। কাব্যে যেমন তিনি পয়ারের বেড়ি ভেঙেছিলেন, নাটকেও পাশ্চাত্য নাট্যকলার আদর্শকে আত্মীভূত করে প্রাচীন নাট্যশৈলীর বিরুদ্ধে সজ্ঞানে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি কতটা সফল হয়েছিলেন সে প্রশ্ন আলাদা, কিন্তু তিনি যে বাঁধা পথে চলতে চাননি, তা সত্য।
মধুসূদনের আগে যোগেন্দ্রচন্দ্র তারাচরণ ও রামনারায়ণ বাংলা নাটকে পাশ্চাত্য নাট্যশৈলীকে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তা প্রধানত বাহ্য গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কাহিনিবিন্যাসে পারিপাট্য ছিল না, রচনারীতিও ছিল অস্বাভাবিক গুরুগম্ভীর। রামানারায়ণের সামাজিক নাটক ছিল কেবল দৃশ্যপরম্পরার সমষ্টি এবং তার মধ্যে প্রবেশ করেছিল স্থূলরুচির ভাঁড়ামি। সেখানে লঘু রচনারীতি, দক্ষ কাহিনিবিন্যাস ও বিশুদ্ধ কৌতুকরস প্রয়োগ করে মধুসূদন নাটককে নতুন জীবন দান করেন। শর্মিষ্ঠা নাটকে সংস্কৃত প্রভাব বা অলংকারবহুল ভাষা সম্পূর্ণ পরিহার করতে না পারলেও পরবর্তী নাটক পদ্মাবতী-র কাহিনিবিন্যাস ও সংলাপে সে ত্রুটি অনেকটাই অতিক্রম করতে পেরেছিলেন তিনি। যাঁরা নতুনকে আবাহন করে আনতে চান, তাঁদের কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্তর পার হতেই হয়। তাই মধুসূদনের এইসব ত্রুটি মার্জনীয়। তবু এ-কথা অস্বীকার করা যায় না যে, তিনি তাঁর তৃতীয় তথা শ্রেষ্ঠ পূর্ণাঙ্গ নাটক কৃষ্ণকুমারী-তেই পাশ্চাত্য ভাবধারাকে অনেকখানি আয়ত্ত করে প্রথম সার্থক বাংলা ট্র্যাজেডি রচনায় সক্ষম হয়েছিলেন। এটি প্রথম বাংলা ঐতিহাসিক নাটকও বটে। বিশ শতকের প্রথম দুই দশকে বাংলা নাট্যসাহিত্যে ঐতিহাসিক নাটকের যে প্লাবন দেখা দিয়েছিল এবং গিরিশচন্দ্র ঘোষ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ যে পথে নাট্যরচনা করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, সেই পথের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয় মধুসূদনের কৃষ্ণকুমারী নাটক।
সার্থক সামাজিক প্রহসনেরও প্রথম স্রষ্টা মধুসূদন। রামনারায়ণের কুলীনকুলসর্বস্ব ছিল প্রচারগন্ধী। কিন্তু নাটক প্রচার নয়, তা মানবজীবনের তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্বস্ত প্রতিচ্ছবি। একেই কি বলে সভ্যতা ও বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রহসন। নাটক অপেক্ষা প্রহসন রচনায় মধুসূদন অনেক বেশি দক্ষতা ও বিস্ময়কর প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। কাহিনি এখানে সুসংবদ্ধ, ভাষা ও চরিত্র বেশ জীবন্ত। মধুসূদনের এই দুটি প্রহসন পরবর্তীকালেও প্রহসন রচনার আদর্শ হয়ে রয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালের বহু প্রহসন এই দুটির ছাঁচেই গড়ে উঠেছে, বহু চরিত্রও এই দুটি প্রহসনের চরিত্রের ছাঁদে রূপায়িত হয়েছে; কিন্তু উত্তরকালের অনুকৃত রচনাগুলি মধুসূদনের প্রহসন দুটির শিল্পনৈপুণ্যকে অতিক্রম করে যেতে পারেনি।